Monday, 25 July 2016

সত্যিই যদি সহচর হতাম!
সৌম্যজিৎ।

উৎসর্গ- তসলিমা নাসরিন'কে।

ভাবো আমি ছিলাম সেই দেশে,
তোমার সাথে সহচর হয়ে,
চলতাম, হাঁটতাম তোমার সাথেই ছায়ার মতো লেগে থাকতাম,
তুমি যখন লিখতে, তুমি যখন ভাবতে আমি পর্দার পিছন থেকে তোমাকেই দেখে যেতাম।
চেয়ারে বসে, টেবিলটাতে খাতা কলম রেখে তুমি গালে হাত দিয়ে ভাবতে জানালাতে তাকিয়ে,
বাইরে ওই গাছগুলোতে সবুজ পাতা আর ডালগুলোর মাঝে বসেথাকা পাখিগুলো দেখতে,
দেখতে তুমি রাস্তাতে চলা মানুষগুলোকে,
ভাবতে তাদের জীবন নিয়ে, কল্পনাতে ভেসে যেতে।
হঠাৎ একদিন দেখলে সাদা টুপি পরা কিছু মানুষ মিছিল করে হাঁটছে,
মিছিলে তাদের নানান স্লোগান হৈ হৈ করে ভাসছে,
ওরা ভিড় করে, দল বেঁধে চেঁচিয়ে বলছে "আল্লাহু আকবর",
ওরা দাবি করছে, "কোথাও কোনো মন্দির থাকবে না,
কোথাও কোনো মূর্তি পূজো করা চলবে না,
ভার্সিটি, রাস্তাঘাটে দেওয়ালে কোনো মূর্তির ছবি আঁকা চলবে না,
কোনো দোকানে, বাজারে মূর্তি রাখা চলবে না,
এই বাংলা আমাদের, এই বাংলায় শুধু ইসলামের জয়গান হবে, অন্যথায় কুপিয়ে মারা হবে।"
তোমার হৃদয় জুরে তোলপাড় হয়েগেল নানা প্রশ্নের তিরে,
ক্ষত বিক্ষত করে তিরগুলো তোমাকে ভাবিয়ে তুলছে, "কেন এই দেশ শুধু ইসলামের হবে?
কেন এই দেশ মানুষের হবেনা?
কেন মানুষকে ভেদ করা হবে ধর্ম, জাতি দিয়ে?
কেন এই দেশে আর কারোর কোনো অধিকার থাকতে হয়না?
কেন জাতির নামে, ধর্মের নামে মানুষকে ভয় দেখানো হবে? কেন খুন করা হবে?"
তুমি আকাশ পাতাল ভাবতে থাকলে।

তুমি অধিকার চাইলে মানুষের, অনেক অনেক প্রশ্ন আর অনেক যুক্তি দেখিয়ে ওদের
অনুভুতিতে ঝড় বইয়ে দিলে,
চিন্তাবিদ মানুষ, সাধারন কিছু মানুষ তোমার যুক্তিতে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল,
ইসলামি শাসনের গড়া নিয়ম থেকে বেরিয়ে সমাজে স্বাধীন হতে চেয়েছিল।
ইসলাম তোমাকে ছাড় দেয়নি। ইসলাম অনুভুতিতে আঘাত, কটাক্ষ করা মন্তব্যে যেন
ক্ষুধার্ত বাঘকে খুঁচিয়ে খেপিয়ে দিলে খোলা জঙ্গলে,
ওরা তোমাকে থাবা বসাতে দেশজুরে তোলপাড় শুরু করেদিল।
তোমার যুক্তিতে নতুন করে ভাবতে শুরু করা মানুষগুলোও ভয়ে শিটিয়ে গেল,
পা গুটিয়ে, চিন্তা বন্ধ করে ওরাও যেন নিজেদের বুদ্ধিকে বন্দি করে দিল বেঁচে থাকার লোভে।
ওদের চাইনা কোনো মুক্তি, চাইনা কোনো অধিকার,
ওরা যেমনই থাক, বেঁচে থাকলেই সব পাওয়া পূর্ণ,
পরাধীনতাও মঞ্জুর।

ইসলাম হেফাজতি তোমাকে ক্ষুধার্ত খ্যাপা বাঘের মতো তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে
তোমাকে আঁচড়ে, ছিঁড়ে খেতে,
তোমাকে কুপিয়ে তোমার রক্তে স্নান করে বেহেস্তের পথ সুগম করতে চেয়েছে,
তুমি পালিয়ে বেরিয়েছ জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে, লড়াইকে বাঁচিয়ে রাখতে,
সমাজের প্রগতি তখনও অনেক বাকি, মানুষের সামনে নতুন আদর্শের নিদর্শন তুলে ধরতে হবে,
প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে ইসলামি থাবা থেকে।
একটু আশ্রয় খুঁজে পেতে, একটু সুরক্ষা পেতে তোমাকে কত ভিক্ষা করতে হয়েছে
পরিচিত, অপরিচিতদের কাছে!
আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে সেসব দেখে।

আমি যদি সত্যিই তখন তোমার সহচর হতাম,
আমি যদি কল্পনাতে না গিয়ে, সত্যিই তোমার কাছে চলে যেতে পারতাম,
আমি তোমাকে আঁকড়ে ধরে রাখতাম।
অসহায় হতে দিতাম না তোমাকে,
নির্ভয়ে চেঁচিয়ে বলতাম, "কে আসবি আয়। কে মারবি আয়। যে আসবি, আর ফিরে যাবি না।"
একটা নাম তসলিমা নাসরিন, আমার রক্তে প্রবল জোশের স্রোত বইয়ে দেয়,
একটা মানুষের জন্য আমি গোটা পৃথিবীর সাথে লড়াই লড়তে পারি অক্লান্ত মনে,
শুধু তুমি শক্ত করে আমার হাত ছুঁইয়ে রেখো,
আমি কাওকে ভয় পাইনা, তোমাকে নিজের সবটুকু দিয়ে আগলে রাখবো।

কল্পনাতে বারবার দেখি তোমার লড়াইকে,
কল্পনাতে আমি বারবার পৌঁছে যাই তোমার কাছে, তোমার পাশে।
সেদিন যদি আমি থাকতাম!
সেদিন যদি আমি তোমার সহচর হতাম! 

No comments:

Post a Comment