Monday, 27 February 2017

অগ্নিগর্ভ থেকে উঠে আসা নাম তসলিমা নাসরিন।

চারিদিকে একসময় হইহই, মারমার রব শুনেছিলাম। জানতাম না, বুঝতাম না কিসের এই দাঙ্গা। সবেমাত্র কলকাতা এসেছি পড়তে। কলকাতা আমার কাছে স্বপ্নের শহর। ছোট থেকেই স্বপ্ন দেখতাম কলকাতা নিয়ে। অত্যন্ত মাঝারি মানের ছাত্র, তারপরও কলকাতাতে পড়ার স্বপ্ন! এর প্রধান কারণ ছিল আমার দিদি। আমি আমার দিদিকে খুব ভালবাসতাম, আর দিদি কলকাতাতে থাকে, কলকাতার মেয়ে, আমিও চাইতাম ওর কাছে কাছে থাকতে। ইংরাজি সাহিত্যে অনার্স নিলাম বিদ্যাসাগর কলেজে, ও পার্কসার্কাস গাইডেন্সে ক্লাস করতে শুরু করলাম পরের বছর জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবো ভেবে। সেদিন ক্লাস করতে যাচ্ছিলাম, বাস শিয়ালদাহ পেরিয়ে মৌলালি ঢুকছে, হঠাৎ বাস থেমে গেলো। গাড়ি যাবে না। সামনে নাকি মারামারি হচ্ছে, অসম্ভব মারামারি! পুলিশ, সাধারন মানুষে ধস্তাধস্তি হচ্ছে। বিএসএফ জওয়ানও এসেছে, গুলি চলছে, আগুন জ্বলছে পার্কসার্কাসে। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না, মাসিকে ফোন করি। মাসি যেই শুনেছে আমি ওই রাস্তায়, মাসি আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলে, মাকেও ফোন করে জানিয়ে দেয়। আমি মৌলালি যুব কম্পিউটার সেন্টারে ঢুকে যাই, জিজ্ঞাসা করি সামনে কি হয়েছে! ওরা বলল, "সামনে পার্কসার্কাসে আগুন জ্বলছে, মুসলিমগোষ্ঠী ও পুলিশের মধ্যে মারামারি হচ্ছে, লাঠি চার্জ চলছে, বিএসএফ রাবারের গুলি ছুঁড়ছে, সাধারন মানুষ ইট, কাঁচের বোতল ছুঁড়ে মারছে পুলিশের দিকে। ওদিকে একদম যাওয়া যাবেনা, রাস্তায় বাস দাঁড়িয়ে গেছে সব।" ছোট ছিলাম, চঞ্চল মাথা, তাই মারামারির কারণ বিশদে জানতে চাইনি, মুখরোচক করার জন্য মারামারির গল্পটাই যথেষ্ট ছিল। হঠাৎ বাইরে মিছিল দেখতে পেলাম, "তসলিমা নাসরিন হটাও।" প্ল্যাকার্ডে লেখা "তসলিমা নাসরিন হটাও।" একদল সাদা টুপি পরা কিছু মানুষ মৌলালির রাস্তা দিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে, বড় বড় সাদা কাপড়ে লাল রঙ দিয়ে লেখা "তসলিমা নাসরিন হটাও" গর্জন করতে করতে যাচ্ছে, আশেপাশে মানুষ রাস্তার ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে আর নিজেদের মধ্যে গুনগুন করে আলোচনা করছে। আমিও মজা দেখছি।

আমি চিনতাম না তসলিমা নাসরিনকে। জানতাম না কেন এই মিছিল, কেন মারামারি! সেইসময় কলকাতাতে চাঞ্চল্যকর একটা ঘটনা ঘটেছিল। পার্কসার্কাসে বিখ্যাত চর্ম ব্যবসায়ী অশোক তোদি এক মুসলিম লোক রিজয়ানকে খুন করেছিলেন। খুনের কারণ তার মেয়ে প্রিয়াঙ্কা তোদির সাথে রিজয়ানের প্রেম। মূলত সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পার্কসার্কাসে এই মারামারি শুরু হয়েছিল। যেটা বিশালাকার ধারন করে। পরে বুঝলাম, সেই সুযোগে রাজনীতি নিজের রঙ পাল্টায়, কিছু ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল বার করায় তৎকালীন সিপিআইএম সরকার। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নির্দেশে কিছু ভাড়াটে গুন্ডা, পার্কসার্কাসের মারামারির জায়গা থেকে কিছু দূরে ওই মিছিল করে তসলিমা নাসরিনের বিতাড়ন চেয়ে। একটা সাজানো নাটক সংবাদ মাধ্যম ও কলকাতাবাসীকে প্রভাবিত করতে। একটা সাজানো নাটক পরবর্তী বিধানসভার আগে মুসলিমদের নজর সিপিআইএমের দিকে ঘোরাতে। এই সাজানো নাটকের দরকার ছিল সিপিআইএমের, একটা ইস্যু তৈরি করে তসলিমা নাসরিনকে অপসৃত করে মুসলিম ভোট ফিরে পাওয়ার জন্য। নন্দিগ্রাম কাণ্ড মুছে নন্দিগ্রামের মুসলিমদের ভোট ফিরে পাওয়ার জন্য। মুসলিম ভোট পাওয়ার উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়েছিল সেটা বাংলার মানুষ জানে, কিন্তু এই নাটক যথেষ্ট ছিল তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা থেকে বের করে দিতে। একটা খুনের ঘটনার প্রতিবাদের বিক্ষোভ ঘুরে গেল একজন লেখিকার বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিক্ষোভে। খবর হল - "The 2007 Kolkata riots took place in Kolkata on 21 November 2007, when anti-Taslima protesters under the banner of All India Minority Forum blockaded major portions of central Kolkata and resorted to arson and violence. The Left Front led State Government deployed the army in the afternoon of that day."

আমি দিদিকে জিজ্ঞাসা করলাম তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে। কে এই ব্যক্তি! কি এমন করেছে! দিদি আমাকে লেখিকার বাংলাদেশ থেকে নির্বাসনের গল্প শোনালো। বলল লেখিকার লেখা "লজ্জা" বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করেছিল, লেখিকা দুমাস অন্তর্ধানে ছিলেন। রাতের অন্ধকারে পালিয়ে বেড়াতে হতো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গাতে। সেখানে নাকি আরও ভয়ঙ্কর বিক্ষোভ মিছিল বেরিয়েছিল সেই সময়। কিন্তু লেখিকা তাতে দমে যাননি একদমই। দেশ থেকে নির্বাসিত হয়েও তিনি লেখার মধ্যে দিয়ে প্রতিবাদ জারি রেখেছিলেন। ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও লেখিকা এখনও তার লেখা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে "দ্বিখণ্ডিত" নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাথে লেখিকার বিরোধ হয়। হাইকোর্ট পর্যন্ত লড়াই চলে। পরে ২০০৬ তে "দ্বিখণ্ডিত" মুক্ত ঘোষিত হলে রাজ্য সরকার সেটা ভালো চোখে নেয়নি। লেখিকাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। রাজ্য ছাড়তে বলা হয়। কিন্তু লেখিকা একেবারেই নারাজ। এসবকিছু শুনতে শুনতে আমি যেন একপ্রকার কাল্পনিক জগতে দেখতে পাচ্ছিলাম লেখিকা তসলিমা নাসরিনের জীবন। মনে মনে তসলিমা নাসরিন তখন আমার হিরোর আসনে জায়গা করে নিচ্ছে। এরপরই দিদি আমাকে "লজ্জা" বইটা পড়তে দেয়। দেখি লেখিকার লেখা। শুধুই লেখা নয়, বাস্তব জীবনের এক যুদ্ধ, সমাজের যুদ্ধ। তার পরবর্তী ঘটনাগুলো জানতে থাকি, বুঝতে থাকি। লেখিকা যেন অগ্নি গহ্বর থেকে উঠে আসা সেই অগ্নি যে সমাজকে সত্যের সাথে পরিচয় করাতে চাইছে, সমাজের সামনে সত্যের রূপ তুলে ধরতে চাইছে। মানুষকে এক নতুন চিন্তাভাবনার জগত খুলে দিচ্ছে। আর এই প্রতিবাদে যে কিছু মানুষের মুখোশে আঘাত লেগেছে, তাদের প্রভাবে, এবং রাজনৈতিক নাটকের প্রভাবে লেখিকা বারেবারে মানুষের ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছে। লেখিকাকে সাধারন মানুষের সামনে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বারেবারে। এতকিছুর সাথে লড়াই করেও এই লেখিকা তসলিমা নাসরিন একদম দমে যায়নি। একাই উঠে দাঁড়িয়েছে, লড়াই করেছে, আবারও লিখেছে। মনের ভিতরে যে সত্যের আলো, সমাজে নিষিদ্ধ চিন্তাভাবনাগুলোর নেতিবাচক ও ইতিবাচক রূপ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তুলে ধরেছে।

হ্যাঁ, আমি চিন্তাভাবনার এমনই ধার অনুভব করেছিলাম তার লেখাতে। ছোট ছিলাম, কিন্তু ছোট বয়সেই সমাজের যে সত্যির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম তা সমাজ স্রোতের প্রতিকূলে বয়ে যাওয়া সব সত্য। যা সমাজ স্রোতের অনুকূলে বয়ে চলা মানুষের সত্যিকারের লজ্জা। তাই তসলিমা নাসরিন সেদিন বাংলা থেকেও নির্বাসিত হয়েছিল, কিন্তু জায়গা করে নিয়েছিল সেই ছোট ছেলেটার হৃদয়ে।

- সৌম্যজিৎ।
অগ্নিগর্ভ থেকে উঠে আসা নাম তসলিমা নাসরিন।


চারিদিকে একসময় হইহই, মারমার রব শুনেছিলাম। জানতাম না, বুঝতাম না কিসের এই দাঙ্গা। সবেমাত্র কলকাতা এসেছি পড়তে। কলকাতা আমার কাছে স্বপ্নের শহর। ছোট থেকেই স্বপ্ন দেখতাম কলকাতা নিয়ে। অত্যন্ত মাঝারি মানের ছাত্র, তারপরও কলকাতাতে পড়ার স্বপ্ন! এর প্রধান কারণ ছিল আমার দিদি। আমি আমার দিদিকে খুব ভালবাসতাম, আর দিদি কলকাতাতে থাকে, কলকাতার মেয়ে, আমিও চাইতাম ওর কাছে কাছে থাকতে। ইংরাজি সাহিত্যে অনার্স নিলাম বিদ্যাসাগর কলেজে, ও পার্কসার্কাস গাইডেন্সে ক্লাস করতে শুরু করলাম পরের বছর জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবো ভেবে। সেদিন ক্লাস করতে যাচ্ছিলাম, বাস শিয়ালদাহ পেরিয়ে মৌলালি ঢুকছে, হঠাৎ বাস থেমে গেলো। গাড়ি যাবে না। সামনে নাকি মারামারি হচ্ছে, অসম্ভব মারামারি! পুলিশ, সাধারন মানুষে ধস্তাধস্তি হচ্ছে। বিএসএফ জওয়ানও এসেছে, গুলি চলছে, আগুন জ্বলছে পার্কসার্কাসে। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না, মাসিকে ফোন করি। মাসি যেই শুনেছে আমি ওই রাস্তায়, মাসি আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলে, মাকেও ফোন করে জানিয়ে দেয়। আমি মৌলালি যুব কম্পিউটার সেন্টারে ঢুকে যাই, জিজ্ঞাসা করি সামনে কি হয়েছে! ওরা বলল, "সামনে পার্কসার্কাসে আগুন জ্বলছে, মুসলিমগোষ্ঠী ও পুলিশের মধ্যে মারামারি হচ্ছে, লাঠি চার্জ চলছে, বিএসএফ রাবারের গুলি ছুঁড়ছে, সাধারন মানুষ ইট, কাঁচের বোতল ছুঁড়ে মারছে পুলিশের দিকে। ওদিকে একদম যাওয়া যাবেনা, রাস্তায় বাস দাঁড়িয়ে গেছে সব।" ছোট ছিলাম, চঞ্চল মাথা, তাই মারামারির কারণ বিশদে জানতে চাইনি, মুখরোচক করার জন্য মারামারির গল্পটাই যথেষ্ট ছিল। হঠাৎ বাইরে মিছিল দেখতে পেলাম, "তসলিমা নাসরিন হটাও।" প্ল্যাকার্ডে লেখা "তসলিমা নাসরিন হটাও।" একদল সাদা টুপি পরা কিছু মানুষ মৌলালির রাস্তা দিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে, বড় বড় সাদা কাপড়ে লাল রঙ দিয়ে লেখা "তসলিমা নাসরিন হটাও" গর্জন করতে করতে যাচ্ছে, আশেপাশে মানুষ রাস্তার ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে আর নিজেদের মধ্যে গুনগুন করে আলোচনা করছে। আমিও মজা দেখছি।

আমি চিনতাম না তসলিমা নাসরিনকে। জানতাম না কেন এই মিছিল, কেন মারামারি! সেইসময় কলকাতাতে চাঞ্চল্যকর একটা ঘটনা ঘটেছিল। পার্কসার্কাসে বিখ্যাত চর্ম ব্যবসায়ী অশোক তোদি এক মুসলিম লোক রিজয়ানকে খুন করেছিলেন। খুনের কারণ তার মেয়ে প্রিয়াঙ্কা তোদির সাথে রিজয়ানের প্রেম। মূলত সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পার্কসার্কাসে এই মারামারি শুরু হয়েছিল। যেটা বিশালাকার ধারন করে। পরে বুঝলাম, সেই সুযোগে রাজনীতি নিজের রঙ পাল্টায়, কিছু ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল বার করায় তৎকালীন সিপিআইএম সরকার। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নির্দেশে কিছু ভাড়াটে গুন্ডা, পার্কসার্কাসের মারামারির জায়গা থেকে কিছু দূরে ওই মিছিল করে তসলিমা নাসরিনের বিতাড়ন  চেয়ে। একটা সাজানো নাটক সংবাদ মাধ্যম ও কলকাতাবাসীকে প্রভাবিত করতে। একটা সাজানো নাটক পরবর্তী বিধানসভার আগে মুসলিমদের নজর সিপিআইএমের দিকে ঘোরাতে। এই সাজানো নাটকের দরকার ছিল সিপিআইএমের, একটা ইস্যু তৈরি করে তসলিমা নাসরিনকে অপসৃত করে মুসলিম ভোট ফিরে পাওয়ার জন্য। নন্দিগ্রাম কাণ্ড মুছে নন্দিগ্রামের মুসলিমদের ভোট ফিরে পাওয়ার জন্য। মুসলিম ভোট পাওয়ার উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়েছিল সেটা বাংলার মানুষ জানে, কিন্তু এই নাটক যথেষ্ট ছিল তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা থেকে বের করে দিতে। একটা খুনের ঘটনার প্রতিবাদের বিক্ষোভ ঘুরে গেল একজন লেখিকার বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিক্ষোভে। খবর হল - "The 2007 Kolkata riots took place in Kolkata on 21 November 2007, when anti-Taslima protesters under the banner of All India Minority Forum blockaded major portions of central Kolkata and resorted to arson and violence. The Left Front led State Government deployed the army in the afternoon of that day."


আমি দিদিকে জিজ্ঞাসা করলাম তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে। কে এই ব্যক্তি! কি এমন করেছে! দিদি আমাকে লেখিকার বাংলাদেশ থেকে নির্বাসনের গল্প শোনালো। বলল লেখিকার লেখা "লজ্জা" বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করেছিল, লেখিকা দুমাস অন্তর্ধানে ছিলেন। রাতের অন্ধকারে পালিয়ে বেড়াতে হতো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গাতে। সেখানে নাকি আরও ভয়ঙ্কর বিক্ষোভ মিছিল বেরিয়েছিল সেই সময়। কিন্তু লেখিকা তাতে দমে যাননি একদমই। দেশ থেকে নির্বাসিত হয়েও তিনি লেখার মধ্যে দিয়ে প্রতিবাদ জারি রেখেছিলেন। ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও লেখিকা এখনও  তার লেখা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে "দ্বিখণ্ডিত" নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাথে লেখিকার বিরোধ হয়। হাইকোর্ট পর্যন্ত লড়াই চলে। পরে ২০০৬ তে "দ্বিখণ্ডিত" মুক্ত ঘোষিত হলে রাজ্য সরকার সেটা ভালো চোখে নেয়নি। লেখিকাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। রাজ্য ছাড়তে বলা হয়। কিন্তু লেখিকা একেবারেই নারাজ। এসবকিছু শুনতে শুনতে আমি যেন একপ্রকার কাল্পনিক জগতে দেখতে পাচ্ছিলাম লেখিকা তসলিমা নাসরিনের জীবন। মনে মনে তসলিমা নাসরিন তখন আমার হিরোর আসনে জায়গা করে নিচ্ছে। এরপরই দিদি আমাকে "লজ্জা" বইটা পড়তে দেয়। দেখি লেখিকার লেখা, লেখা নয় বাস্তব জীবনের এক যুদ্ধ, সমাজের যুদ্ধ। তার পরবর্তী ঘটনাগুলো জানতে থাকি, বুঝতে থাকি। লেখিকা যেন অগ্নি গহ্বর থেকে উঠে আসা সেই অগ্নি যে সমাজকে সত্যের সাথে পরিচয় করাতে চাইছে, সমাজের সামনে সত্যের রূপ তুলে ধরতে চাইছে। মানুষকে এক নতুন চিন্তাভাবনার জগত খুলে দিচ্ছে। আর এই প্রতিবাদে যে কিছু মানুষের মুখোশে আঘাত লেগেছে, তাদের প্রভাবে, এবং রাজনৈতিক নাটকের প্রভাবে লেখিকা বারেবারে মানুষের ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছে। লেখিকাকে সাধারন মানুষের সামনে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বারেবারে। এতকিছুর সাথে লড়াই করেও এই লেখিকা তসলিমা নাসরিন একদম দমে যায়নি। একাই উঠে দাঁড়িয়েছে, লড়াই করেছে, আবারও লিখেছে। মনের ভিতরে যে সত্যের আলো, সমাজে নিষিদ্ধ চিন্তাভাবনাগুলোর নেতিবাচক ও ইতিবাচক রূপ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তুলে ধরেছে।


হ্যাঁ, আমি চিন্তাভাবনার এমনই ধার অনুভব করেছিলাম তার লেখাতে। ছোট ছিলাম, কিন্তু ছোট বয়সেই সমাজের যে সত্যির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম তা সমাজ স্রোতের প্রতিকূলে বয়ে যাওয়া সব সত্য। যা সমাজ স্রোতের অনুকূলে বয়ে চলা মানুষের সত্যিকারের লজ্জা। তাই তসলিমা নাসরিন সেদিন বাংলা থেকেও নির্বাসিত হয়েছিল, কিন্তু জায়গা করে নিয়েছিল সেই ছোট ছেলেটার হৃদয়ে। 

Sunday, 26 February 2017

ডর নাই মোর প্রকাশ্যে কবো,
কবো তসলিমা নাম,
তুমি না সইবে, দূরে চলে যাবে,
বন্ধ করিবে কান।
ডর নাই মোর সত্য কহিতে,
কহিব বারেবারে,
উচ্চ শির আমি উচিয়াই কবো সত্য অভিমুখে।
বাংলা যেমনে তোমার অধিকার,
তেমনই বাংলা আমারও,
তুমি যদি পারো গায়ের জোরে
সত্যকে নির্বাসন দিতে,
আমিও পারি বুদ্ধি দিয়ে
সত্যকে সম্মুখে আনতে।
মোর নাই ডর নিজ প্রাণে,
শুধু ন্যায়কে করি সম্মান,
মুহুর্মুহু বিপদেও থাকিব অবিচল,
তবু তোমারে দিবো না প্রশ্রয়।


শত প্রলোভনে দমিব না,
শত বিপদে হারিব না,
শত মৃত্যুতেও নোয়াবো না মাথা,
আদর্শকে ত্যাগ করিব না।


- সৌম্যজিৎ। 

Saturday, 25 February 2017

মন খারাপের বেলারা হারিয়ে যাক,
অঝোরে বয়ে যাক অশ্রু কণারা,
ভালোবাসা হোক শীতল ছোঁয়ায়,
স্নেহের পরশে,
অশ্রুরা হয়ে উঠুক মায়ের অহঙ্কার। 
২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কলকাতা একাডেমী অফ ফাইন আর্টসে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে পাঠ করলাম আমার লেখা কবিতা "বাংলা তোমায় প্রণাম।" শুরুতে মাইক হাতে বলে দিয়েছিলাম কবিতাটা আমি বাংলা ভাষা ও মানববাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে উৎসর্গ করে লিখেছি। লেখিকা তসলিমা নাসরিনের নাম যখন মাইক হাতে জনসমক্ষে বলছিলাম, তখন এক তীব্র অহঙ্কার ফুটে উঠছিল আমার ভিতর থেকে। ভীষণ গর্ব হচ্ছিল। আমি মেয়েমার নাম গর্বের সাথে উচ্চারণ করি, এটাতেই আমার শান্তি হয়। কবিতা পাঠ শেষে ওখানকার এক সম্মানীয় ব্যক্তি বুলবুল'দি আমার কাছে এসে আমাকে বললেন পরবর্তীকালে ওখানে গিয়ে আমার আরও কবিতা তুলে ধরতে, বললেন আজ থেকে আমি ওখানকার একজন সদস্য হয়ে গেলাম। বেশ ভালো লাগল, মনটা ভরে গেল। ভরে গেল বাচ্চাদের ছবি আঁকা দেখেও। তনুশ্রী আমাকে আজ গর্বিত করলো নতুন করে, আমাকে ওখানে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিল কবিতা পাঠ করার জন্য। ধন্যবাদ জানিয়ে ওকে ছোট করতে চাইনা।

Tuesday, 21 February 2017

বাংলা আজ সন্ত্রাসের ত্রাস।
সৌম্যজিৎ।

আজ বাংলা মুখরিত হয়েছে বীর বিপ্লবী টানে,
আজ বাংলায় সবাই বীর, সবাই স্লোগান দিচ্ছে দলে দলে –
“মোরা ভাইয়ের রক্ত দিয়েছি বলিদান,
মায়ের ভাষা এনেছি,
বাংলা ভাষা আমার ভাষা, মাতৃভাষা করেছি।
বাংলা আমার মা, বাংলায় মোরা বাঁচি,
বাংলার টানে আবারও দেবো প্রাণ,
বাংলাই মোদের জীবন, বাংলাই মোদের ঘ্রাণ।”

একদিন ওরা বলেছিল –
“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি,”
একদিন ওরা রক্ত দিয়ে বাংলার গান গেয়েছিল,
বাংলা উঠেছিল গর্জন করে নাভিশ্বাসে ঢেউ তুলে,
পথে ঘাটে লাশ হয়ে পড়ে থেকেও বাংলাকে ওরা বাঁচিয়েছিল।

আজ বাংলা বাংলিশ হয়েছে, আজ বাংলা আরও আধুনিক,
কথায় কথায় ইংরাজির বুলি,
আজ বাংলা হয়েছে বেঙ্গলি।
তবু আজ একুশে সবাই গেয়ে উঠছে জয়গান,
“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।”

বাংলা মোদের মাতৃভাষা,
মোরা মাকে করি অশ্লীল,
রাস্তাঘাটে আজ বাংলা গালাগালিতেই অস্থির।
কোথায় গেল প্রাণের ডাক “আমার সোনার বাংলা!”
ওই যে দেখো আগুন জ্বলে বইতে, ওরা বাংলাকে করে হামলা,
তবু আজ ওদেরই মুখে মুখে “আমার সোনার বাংলা।”

বাংলা বলা বাঙালিরা আজ যতটা না বাঙালি,
তার থেকেও বেশি করেছে ধর্মের যত গোঁড়ামি,
বাংলা ভাষা আজ শুধুই শোভা পায় তর্কে বিতর্কে,
আজ বাংলা রাজনীতির রণক্ষেত্র,
বাংলা লেখিকাও নির্বাসিত।
ঠেঙিয়েছে ওরা বইমেলাতে, ঠেঙিয়েছে ওরা রাস্তাঘাটে,
লেখক, ব্লগারকে হত্যা করেছে অবলীলায়,
“আল্লাহু আকবর” চেঁচিয়ে।

যত আত্মত্যাগ, যত বলিদান বাংলাকে দিয়েছিল যোদ্ধারা,
আল্লাহু আকবরে সব গেছে মিটে,
লাসের নিচে চাপা পড়ে।
এই বাংলা আমার নয়, এই বাংলা সোনার বাংলা নয়,
এই বাংলা আল্লাহু আকবরের পরাধীন এক চাষের ভূমি,
এই বাংলা সন্ত্রাসের ত্রাস।


তোমরা বৃথা দিয়েছিলে জীবন যোদ্ধারা,
তোমাদের আত্মত্যাগ আমাদের স্বাধীনতা দিতে পারেনি।

Monday, 20 February 2017

আমি ধৈর্যের সাথে লড়ছি,
সহ্যের সাথে লড়ছি,
নিজের সাথে লড়াই করছি,
পরিবারের সাথে লড়াই করছি,
লড়াই করছি কতোগুলো ভিন্ন মস্তিষ্কের মানসিকতার সাথে,
লড়াই করছি ভিন্ন ভিন্ন মানুষের অবাস্তব চিন্তাগুলোকে নিজের ওপর
জোর করে চাপিয়ে না দেওয়ার জন্য,
নিজ মস্তিষ্কে অসীম চাপ নিয়ে প্রতিমুহূর্তে লড়াই করছি,
বিন্দু বিন্দু রক্ত মস্তিষ্কেই শুকিয়ে যাচ্ছে লড়াই করতে করতে,
তবু মনে জোর রেখে লড়াই করে যাচ্ছি জেতার লক্ষ্যে,
আমি জিততে চাই।

হেরে গেলে আমি হারিয়ে যাবো নিজ অস্তিত্ব থেকেই,
অস্তিত্বহীন আমাকে আমি দেখতে পারবো না,
এ আমার অস্তিত্বের লড়াই।

- সৌম্যজিৎ। 

Saturday, 18 February 2017


"আমি রোজ শত শতবার আত্মহত্যা করি,
নতুন করে জন্ম নিই, এক নতুন স্বপ্নের আশায়।"



"লক্ষ্য"।

সৌম্যজিৎ।


১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭।
রাত ৯:৩৫।


লড়াই করছি নিজের মানসিক বাধাগুলোর সাথে। মনকে জোর করে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি লক্ষ্যের দিকে। অবিরাম মনের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে, নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে। সামনে কঠিন লড়াই। নেট ও গেট একটা পরীক্ষাও ভালো হয়নি, সেই একটা চাপ মনের ওপর পড়ছে। ফ্ল্যাট নিয়ে ঝামেলাতে জর্জরিত হয়ে উঠেছি। কেউ বোঝার চেষ্টা করছেনা সবদিক যখন খারাপ হয়, তখন একটা দিক ভালোকিছু করার জন্য, ভালোকিছু ঘটানোর জন্য আঁকড়ে ধরতে হয়। আর সেই একটা দিক হল আমার পড়াশোনা। আমি যদি আজ থেকেই নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে পারি, আসন্ন নেট পরীক্ষায় আমি চূড়ান্ত তালিকাতে স্থান পেয়ে যাবোই, এমনকি প্রথম দশেও স্থান পেতে পারি। আমাকে সবাই বিনা কারণে মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে দেয়, সেই মানসিক চাপের প্রভাব আমার পড়াশোনার ওপর পড়ে, যার জন্য আমি পরীক্ষার প্রস্তুতি ঠিকভাবে নিতে পারছিনা। ওরা সেটা বুঝতেই চায় না। সবকিছুকে ওরা ভীষণ সোজা ভেবে নেয়, পড়াশোনা যে এক কঠোর অনুশীলন পর্ব, সেখানে লক্ষ্য সবসময় স্থির রেখে, মনে অদম্য জোর ও সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়, এই সাধারন কথাটা না ওরা বুঝতে পারে, না আমি ওদের বোঝাতে সফল হতে পেরেছি কখনো। আমাকে নেট পরীক্ষায় ভালো ফল করতেই হবে। ঠিক এই সময় যদি মেয়েমা আমার দিকে একটু ফিরে তাকাতো, আমি মনে ভীষণ জোর পেয়ে যেতাম। মেয়েমা সেই একজন মানুষ, যে মানুষটার একটা কথা আমার জীবনে ভীষণ প্রভাব ফেলে। মেয়েমাকে আমি কত ভালোবাসি! মেয়েমা কি পারেনা আমার একটা লেখা শেয়ার করে, একটু ভালোকিছু আমাকে বলতে! কত লেখা লিখেছি মেয়েমাকে নিয়ে, মেয়েমার লেখা বই পড়ে সেই বইগুলো নিয়ে! একটা লেখাও কি মেয়েমা শেয়ার করতে পারেনা! এটা নয় যে আমি মেয়েমার প্রভাবশালী নামকে সিঁড়ি করে ওপরে উঠতে চাই, মেয়েমা এমন একজন মানুষ যার একটু ভালোবাসা আমাকে ভীষণ উৎসাহ দেয়, আর সেই উৎসাহের জন্যই আমি চাই মেয়েমা আমার একটা লেখা শেয়ার করে আমাকে ভালোবেসে কিছু একটা বলুক। সেটা আমার একঘেয়ে সাদাকালো জীবনে রঙ ঢেলে দেবে।


দেখি, একটু পড়ার চেষ্টা করি। আজ "ডেটা কমিউনিকেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্ক" থেকে দুটো প্রশ্ন সমাধান করবো, অ্যাসাইনমেন্টের জন্য লিখবো। তার সাথে আশা নিয়ে থাকবো, অপেক্ষায় থাকবো মেয়েমার একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার জন্য। 

Friday, 17 February 2017

ও আসে ..
আমায় ঘিরে থাকে।

সৌম্যজিৎ।


আমি প্রায়ই আমার মৃত দিদিকে ঘুরে বেড়াতে দেখি চোখের সামনে,
কখনো অন্ধকার ঘরে, কখনো ঘর ভর্তি আলোতে যখন একা থাকি গভীর রাতে বা
কখনো স্বপ্নের মধ্যে দেখি।
দেখি আমাকে কিছু বলছে, কিছু দেখাচ্ছে,
ছটপট করছে একাকীত্বে ভুগে,
নিজের অস্তিত্ব বোঝাতে আমার সাথে কথা বলতে চায়ছে।
সেদিন যখন শেষবার আমার সাথে ও কথা বলেছিল সশরীরে,
আমায় বারবার ডেকেছিল কাছে,
অনেক কথা আমায় বলতে চেয়েছিল,
মনের কথা খুলে বলার জন্য ওর কোনো বন্ধু ছিলনা আমি ছাড়া,
ওর যা'কিছু আনন্দের,
যা'কিছু কষ্টের শুধু আমাকেই বলত।
প্রেমের প্রতারণায় যখন ও জর্জরিত,
বাড়ির চাপে যখন ওর জীবন হাঁসফাঁস করছে শান্তিতে একটু প্রশ্বাস নিতে,
আমায় বলেছিল একটুখানি সময় বার করে দেখা করার জন্য।
বেরোতে চেয়েছিল সমস্ত মানসিক যন্ত্রণা থেকে,
ইকোনমিক্স স্নাতক করেই এমবিএ পড়বে বলে ভেবে রেখেছিল,
আমাকে বলেও ছিল,
বলেছিল সময় করে যেন আমি একটু দেখা করি,
অনেক কিছু বলার,
অনেক কিছু আলোচনা করার আছে।
আমি ওর জীবনের কষ্টে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম,
বারেবারে আমাকে জেরা করা হতো ওর জন্য,
আমাকে ভয় দেখিয়ে ওর কথা জিজ্ঞাসা করত মা, মাসিরা,
ঝামেলা এড়িয়ে যেতেই ও নিজের কাজের চাপে আমি ওকে শান্তনা দিয়ে বলেছিলাম -
"দেখা করবো।"
আমি দেখা করিনি আর,
বিশ্বকর্মা পূজাতে যখন ওকে নিয়ে আমার দেশের বাড়িতে যাওয়ার কথা হয়েছিল,
ওকে না নিয়ে দুদিন আগেই আমি চলে গেছিলাম প্রেমিকার অভিমান ভাঙাতে,
বুঝতে পারিনি এভাবে ওকে একা করে চলে যাওয়াতে
মৃত্যু নেমে আসবে ওর জীবনে,
বুঝতে পারিনি আমি ওকে আর দেখতে পাবো না,
বুঝতে পারিনি আমি আর ওর গলার আওয়াজ শুনতে পাবো না,
ওকে ছুঁতে পারবো না, জড়িয়ে ধরতে পারবো না,
বুঝতে পারিনি আমি আমার দিদির আদর আর পাবো না কোনোদিন।
ছুটে এসে দেখলাম একটা কাঁচের ঘরে সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা, শুয়ে আছে,
মুখে হাসির ছোঁয়া, নিশ্চিন্ত, শান্তিতে ঘুমোচ্ছে,
এতটা শান্তিতে সে অনেক বছর ঘুমায়নি।
সবাই ওর কাছে,
অগণিত পাড়াপড়শির ভিড়,
মা, মাসিরা কাঁদছে,
একটা শান্ত বিকেলে কান্নার শব্দ যেন শূন্য বাতাস ভেদ করে
আমার কানে এসে পৌঁছতে পারছেনা,
আমি দাঁড়িয়ে আছি পাঁচতলা বাড়িটার ছাদে, একদম একা,
নিচে তাকিয়ে এক দৃষ্টে দেখছি শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা আমার দিদিকে,
আমার পৃথিবী একদম স্থির হয়ে গেছে,
শুধু দুটো মানুষ, শরীরে প্রাণ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমি আর
নিচে কাঁচের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আমার নিষ্প্রাণ দিদিটা,
আমার পৃথিবীতে যেন আর কেউ নেই তখন।
ওকে নিয়ে যখন গাড়িটা চলে যাচ্ছে শ্মশানমুখে,
তখনও আমি দাঁড়িয়ে ওর যাওয়া দেখছি,
স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি,
কোনো অনুভূতি, উপলব্ধি নেই আমার মধ্যে,
একবিন্দু কান্নার জল ফুটে বেরোচ্ছে না আমার চোখ থেকে,
আমি শুধু তাকিয়ে দেখছি।
যতদূর দেখা যায়, গাড়িটা অনেক দূরে ছোট হতে হতে মিলিয়ে গেল,
আর দেখতে পেলাম না,
ছাদের ধারটাতে একা একাই বসে পড়লাম।
এই জায়গায় আগে কতবার যে বসেছি!
একসাথে বিকেলের আলোকে সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে দেখেছি,
রাস্তার মানুষদের সামনে এটা ওটা ছুঁড়ে ভয় দেখিয়ে লুকিয়ে পড়েছি,
আর তখন সবকিছু আছে,
আমি আছি, রাস্তায় লোকেরা আছে,
শুধু আমার দিদি নেই,
দুষ্টুমি করে এটা ওটা ছুঁড়ে ভয় দেখানোও নেই ..


বিকেলটা নিয়ম করে সন্ধ্যার কোলে গিয়ে মুখ লুকিয়ে ফেলল,
অন্ধকার নেমে এল,
আমি স্থির হয়ে বসে ছাদের মেঝেতে।
হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠেছে,
আমি নিচে নামতে গেলাম, অন্ধকার সিঁড়িতে নামতে গিয়ে খেপা কুকুরটার গায়ে পা উঠে গেল,
কুকুরটা একবার চিৎকার করে উঠল,
তখনই একবার মনে হল কেউ যেন ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলল পিছন থেকে,
কুকুরটা চুপ হয়ে গেল, সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেল,
আমিও নিচে চলে গেলাম অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে।
আমি প্রায়ই ওকে দেখি আমার আশেপাশে, যখন একা থাকি,
প্রায়ই যখন স্বপ্নে দেখি, -
দেখি ও আমার সাথে কথা বলছে, হাসছে,
হাসিতেও ওর মুখে যন্ত্রণা ফুটে উঠছে,
দেখি অতৃপ্তি নিয়ে ও পাগলের মতো কথা বলছে।
অতৃপ্তি আমি বুঝি,
আমি আমার মধ্যে অতৃপ্তিকে প্রবলভাবে উপলব্ধি করতে পারি,
যতক্ষণ না লক্ষ্যে পৌঁছই, আমার মধ্যে একরকম অতৃপ্তি ভীষণভাবে কাজ করে,
আমাকে অস্থির করে তোলে,
সেই একইরকম অতৃপ্তি, একইরকম অস্থিরতা আমি ওর মধ্যেও দেখতে পাই,
অবচেতন বা স্বপ্ন হলেও,
হোক না সে কাল্পনিক কোনোকিছু,
আমি ছবির মতো স্পষ্ট দেখতে পাই ওর মৃত্যুর দৃশ্য,
আমাকে বলছে শেষ লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে।
বলছে ও ভীষণ একা হয়ে আছে,
ছটপট করছে, কথা বলার কেউ নেই, আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাবে।


আমি হাসি,
সত্যিই কি ও পারবে আমাকে ওর কাছে নিয়ে যেতে!
আমার যে কাজ ফুরোইনি,
জীবন এখনো ঢের বাকি,
আমাকে ও এখনই নিয়ে যেতে পারবে না। 

Thursday, 16 February 2017



জানি একদিন আলোকিত হবেই জীবন,
জানি একদিন চিন্তাগুলো হবে শেষ, সেজে উঠবে ভুবন,
জানি সেদিন মাতামাতি হবে পথে ঘাটে,
মানুষে মানুষে মুখরিত হবে নাম, অন্ধকারের শেষ হবেই।
জানি সেদিন আদর্শ হবে মুখ থেকে বেরোনো শব্দগুলো,
জানি সেদিন মিটবে বুকে আছে যত কষ্টগুলো।
জানি আজ কঠিন লড়াই, টিকে থাকা শুধু সহ্য করে,
গালাগালি, অসহ্য লাগা যন্ত্রণাগুলোও মানতে হবে মুখ বন্ধ করে,
দৃঢ়তাকে বহন করে নিয়ে যেতে হবে শেষ লক্ষ্যে,
জানি সেদিন হাসি ফুটবে অন্তর থেকে উঠে আসা তৃপ্তিতে।
জানি একদিন তুমিও বলবে অনেককিছু,
অপেক্ষা করে আছি সেইদিনের,
ভুলে যাবো সব কষ্টগুলো সেদিন,
তোমার থেকে শুনে।


- সৌম্যজিৎ। 

Monday, 13 February 2017

একজাইল পড়লাম। বেশ কিছুটা পড়েছিলাম পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে, তারপর লেখিকার আদেশে একজাইল রেখে পরীক্ষার পড়া পড়তে শুরু করি। পরীক্ষা শেষে তাই আবার একজাইল নিয়ে বসে গেলাম। একদম শুরু থেকে। একজাইল সম্পর্কিত কিছু বলি। সবার প্রথমে বলি, একজাইল- লেখিকা তসলিমা নাসরিনের লেখা "নির্বাসন" এর ভাষান্তরিত ইংরাজি সংস্করণ। ভাষান্তরের কৃতিত্ব ও শ্রদ্ধা মহার্ঘ্য চক্রবর্তী মহাশয়ের প্রাপ্য। পেঙ্গুইন পাবলিকেশনকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের হাতে বইটা তুলে দেওয়ার জন্য।

সূচীপত্রে যে দশটি অধ্যায় আছে -

১) ফরবিডেন,
২) অ্যান্ড দেন ওয়ান ডে ...
৩) হাউজ অ্যারেস্ট,
৪) কনভারসেসনস,
৫) ডেথ ওয়েটস পাস্ট দ্যা উইন্ডো,
৬) একজাইল্ড,
৭) ফেয়ারওয়েল, ২২ নভেম্বর ২০০৭,
8) পোয়েমস ফ্রম অ্যা সেফ হাউজ,
৯) একসারপ্টস ফ্রম অ্যা ডায়েরি,
১০) নো, নট হিআর! এলসহ্যয়ার! ইন অ্যানাদার ল্যান্ড!



সূচনাতে আমরা দেখতে পেয়েছি - একজাইল এর বাংলা মূল বই "নির্বাসন"-এর প্রথম প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল ২০১১ সালে কলকাতা বইমেলাতে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে যেটা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়ে ওঠেনি। লেখিকার উক্তি - "My name had been prohibited in West Bengal, much like how it had been prohibited in Bangladesh so long ago."

লেখিকাকে কিভাবে পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করা হল,  পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহিষ্কার করা হল, তার পরবর্তীকালে কি কি ঘটনা ঘটেছে লেখিকার জীবনে, রাজনীতির খেলা লেখিকার জীবনে কিভাবে অন্ধকারের ছায়া নামিয়ে নিয়ে এসেছিল, "ক" (পশ্চিমবঙ্গে "দ্বিখণ্ডিত") নিয়ে যেসমস্ত সমালোচনা   ঝড় বইয়ে দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে, রাজনীতির মিথ্যাচার, পুরুষতন্ত্রের গোঁড়ামি, লেখক সমাজে লেখিকাকে একঘরে করে দিতে ও প্রচারের আলোতে নিজেদের নাম নিয়ে মাথা চাড়া দিতে লেখিকার বিরুদ্ধে কিভাবে এগিয়ে আসে দুদেশের এক ঝাঁক নামী, অনামী লেখক, লেখিকারা এবং দ্বিখণ্ডিতকে অশ্লীল করতে, লেখিকাকে অশ্লীল করতে ভাষা জ্ঞানের, চেতনার ও শিক্ষার প্রসারের যে শ্লীলতাহানী  করেছিলেন ওই এক ঝাঁক লেখক, লেখিকারা, সেই সমস্তকিছুই অকপটে, প্রকাশ্য চিত্রের মতো তুলে ধরেছেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন।


এই বইটা শুধুমাত্র যে জানার কৌতূহলে পড়ার জন্য, তা নয়। সত্য ও বাস্তব ঘটনাগুলো এতটাই অকপট এবং সমাজ চেতনার আদর্শের ক্ষেত্রে সত্যকে জানতে, বাস্তবকে বুঝতে বইটা বিশেষ শিক্ষণীয় ও যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। লেখিকার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার জন্য এবং সমাজ বিভিশিখা ও বিশৃঙ্খলতার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য, লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।



                                                             
- সৌম্যজিৎ।




Sunday, 12 February 2017

পরিণত।
সৌম্যজিৎ।

জীবনের লড়াইটা বুঝতে পারছি,
শিখছি, লড়ছি,
এখন অনেক লড়াই লড়তে হবে,
অনেক খারাপকিছুর মুখোমুখি হতে হবে,
কিন্তু আমি এই লড়াইতে প্রকৃত মানুষ হতে পারবো।
আমি জিতবোই,
অনেক হারের মুখোমুখি হয়ে যেটা শিখবো,
সেটাই আমার জয় হবে।
আমার পরিশ্রম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা
আমাকে পৌঁছে দেবে সংগ্রামের উল্টোদিকে থাকা জয়ের সীমানায়।

আগে যখনই ভেঙে পড়তাম,
খুব সহজেই বিচলিত হয়ে পড়তাম,
অস্থির হয়ে উঠতাম,
মুখিয়ে থাকতাম তখন প্রিয় আদর্শের মানুষটার দিকে,
লেখিকা তসলিমা নাসরিনের দিকে।
মানুষটার একটু স্নেহ আমাকে অনেক ভরসা দেয়,
অদম্য সাহস দেয়,
কিন্তু সেই অদম্য সাহস তো মনকে জোর করে ঠেলে নিয়ে যেতে চাই জয়ের লক্ষ্যে,
পরিস্থিতিতে নিজেকে হারতে দেখার মধ্যে দিয়ে যে শেখা,
সেই শেখা নিজের থেকে উৎপন্ন হয়,
সেই শেখা আরও সবল হয়।
শুধু মাত্র প্রিয় লেখিকার স্নেহের আঁচলে জড়িয়ে থেকে আমি জিততে চাইনা,
আমি লড়তে চাই,
পরিস্থিতির সাথে এক কঠিন লড়াই করেও শিখতে চাই এবার,
নিজেকে আরও পরিণত করতে।

আমি একজন ভালো মানুষ হতে চেয়েছি।
সৌম্যজিৎ।


বরাবরই মানুষ হতে চেয়েছি,
ভালো যাকিছু তা শিখতে চেয়েছি,
ভালো লেখা পড়েছি, খারাপ লেখা পড়েছি,
আগে বিচার করে পড়ি নি, পড়ার পর বিচার করেছি,
যতটা ভালো শেখা যায়, শিখেছি,
যতটা খারাপকে চিনে, বুঝে, জেনে সতর্ক হওয়া যায়,
খারাপগুলোকে স্বভাব থেকে দূরে রাখা যায়,
চেষ্টা করেছি সেগুলোকে দূরে রেখে দিতে।


মানুষের মুখোশের আড়ালে ভণ্ড হতে চাই নি কখনো,
স্পষ্ট দেখেছি, স্পষ্ট চিন্তা করেছি, স্পষ্টভাবে বলতে চেয়েছি,
অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট বলা হয়ে ওঠেনি,
অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট বলতে পারিনি,
মনের মধ্যে তখন একপ্রকার দ্বন্দ্ব করেছি নিজের সততা নিয়ে,
তাই শতভাগ সৎ আমি হতে পারিনি।


বই পড়া, জানা, বিজ্ঞানকে বোঝা,
আদর্শ শেখা, নিজের ওপর ভরসা করে ওপরে ওঠা,
আমার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
নিশ্চিত ব্যর্থ হতে পারি জেনেও,
অসৎ উপায়ে উঠতে চাইনি, জিততে চাইনি কখনো,
পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে না পারা প্রশ্নগুলোর দিকে বারবার চেয়ে দেখেছি,
চিন্তা করেছি, সমাধান করার চেষ্টা করেছি নিজে নিজে,
কখনো পিছন ফিরে বা সামনে কারোর থেকে উত্তর জানতে চাইনি,
নিজের মতো করে প্রশ্নপত্রের সাথে তন্ময় থেকেছি,
কখনো সফল হয়েছি, কখনো ব্যর্থ হয়েছি,
ব্যর্থতা থেকে শিখেছি,
দৃঢ় মানসিকতা গড়েছি,
আবারও প্রস্তুতি নিয়েছি ওপরে ওঠার জন্য।


আমি একজন ভালো মানুষ হতে চেয়েছি সবসময়। 

Sunday, 5 February 2017

তোর কালো ফ্রেমের চশমার কাঁচে
আমার আটকে যাওয়া চোখ,
রংতুলিতে ভালোবাসায় ভালোবাসার ঠোঁট,
দিকে দিকে ছবিবিদরা মত্ত
ছবির নেশায়,
ফুটিয়ে তুলছে যেমন খুশি
স্বপ্ন রঙের পাতায়,
হাসি মুখে তোর চাহনি পাগল করে
হৃদয় আমার,
ছুটে যেতে চাই বারেবারে
তোকে নিয়ে শালবনি বাগানে,
পাখির ডাক আর গাছের ফাঁকে
প্রেমের বেলা কাটাতে ..


- সৌম্যজিৎ। 

Saturday, 4 February 2017

আমি চাই সকলে বাঁচুক আপন স্বাধীনতায়,
যা ইচ্ছা করুক, যেভাবে ইচ্ছা উড়ুক,
থাকবে না ভয়, থাকবে না কোনো বিধি নিষেধ,
আমি চাই কেউ কাউকে জোর করে যেন বলে না দেয় বাঁচার নিয়ম,
স্বতঃস্ফূর্ত হোক মানুষ জাতি,
স্বতঃস্ফূর্ত হোক জীবন,
পৃথিবী হোক নতুন পৃথিবী এক নতুন সাজে,
আমি চাইনা রাজনীতির সংসার আমার মাঝে,
আশেপাশে,
কোনো দিকেই।


*** সৌম্যজিৎ। 

Friday, 3 February 2017


ভিখ চাহিনা,
মোরা গড়ে নেব স্বাধীনতার সমাজ।

সৌম্যজিৎ।


ভিখ চাহিনা মোরা,
মানুষে মানুষে বাঁচব আদর্শে শির উঁচিয়ে,
তোরা যারা করেছিলিস অন্যায়, অবিচার, -
তোদের শত ধিক,
মোরা চাহিনা ভিখ।
জাতির নামে উস্কানিতে
এক সন্ত্রাসবাদী রাজ্য গড়তে চেয়েছিলিস,
তামাসা গড়েছিলিস তোরা
রাজনীতির পাশা খেলায়,
সময়ের চাকা ঘুরবেই,
নিভবে আগুন,
ভালোবাসা জাগবেই,
সেদিন খুব কাছেই যেদিন
স্বপ্নেরা উড়বে পাখা মেলে ..


ভিখ চাহিনা মোরা,
মানুষে মানুষে বাঁচব আদর্শে শির উঁচিয়ে,
তোরা যারা করেছিলিস অন্যায়, অবিচার, -
তোদের শত ধিক,
মোরা চাহিনা ভিখ।


শিক্ষায়, জ্ঞানে অর্জন করে নেবো স্বাধীনতা,
তোদের দয়া চাইনা মৌলবাদী সরকার,
মোরা মানুষ হয়ে জেগে উঠবো সবাই,
মনুষ্যত্বের আহ্বানে।

ভিখ চাহিনা মোরা,
চাহি স্বাধীনতার এক বাংলা,
যেখানে মানুষ বাঁচবে গোঁড়ামির শৃঙ্খল ছিন্ন করে,
পরাধীনতার বাধ ভাঙবে ..

ভিখ চাহিনা,
আমরা গড়ে নেবো সেই সমাজ যেখানে
তসলিমা নাসরিনও ফিরবে,
ফিরবেই .. 

Thursday, 2 February 2017



প্রতিমুহূর্তের অসহায়তার মধ্যেও পড়াশোনার যুদ্ধ।


আমার পড়াশোনার জীবনে প্রতিমুহূর্তে ভিন্ন ভিন্ন রকমের বাধা পেয়েছি। চব্বিশ বছর পড়াশোনা করছি, চব্বিশ বছরের পড়াশোনার জীবনে প্রতিবছর পরীক্ষা আসে, নিচু ক্লাসে পড়তে বছরে দুবার করে পরীক্ষা দিতাম, একটু উঁচুতে উঠতে পড়াশোনার চাপও বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে নানান বাধা বিপত্তিও। সারাবছরই বাধা বিপত্তি চলতে থাকে, পরীক্ষার মুহূর্তেও প্রচুর অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়। অসুবিধাগুলো পরীক্ষার মুহূর্তে অসহনীয় হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তে যে প্রধান বাধা এসে উপস্থিত হয়েছে সেটা হল একটা নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি কিনতে গিয়ে একরকমের প্রতারণার ফাঁদে পড়েছে আমার পাপা ও মা। আর পাপা যতরকম ঝামেলার মধ্যে পড়ে, সেসবের মধ্যে আমাকেও জড়িয়ে ফেলে, বা কোনো না কোনো কারণে আমি জড়িয়েই যাই। ২০১২ এর শেষের দিকে কলকাতাতে একটা ফ্ল্যাট বাড়ি কিনি। নগদ কুড়ি লক্ষ টাকাতে কিনেছিলাম বাড়িটা। সেবার আমার মাস্টার ডিগ্রীর পরীক্ষা চলছে, তার মধ্যেই টানা চার পাঁচ মাস এদিক ওদিক ঘুরে ফ্ল্যাট খুঁজে, টাকা জোগাড় করে রেজিস্ট্রি করেছিলাম। পাপার টাকাতেই কেনা হয়েছিল বাড়িটা, কিন্তু টাকা জোগাড় করতে খুব হয়রানি হতে হয়। পাপার ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসা, আর এই ব্যবাবসায় টাকা এহাত ওহাত হয়, মুখের কথাতে ব্যাবসা চলে, বাইরে টাকা ছড়িয়ে থাকে লোকের কাছে, নাম ও অভিজ্ঞতায় এই ব্যাবসা চলে মূলত। যে ফ্ল্যাট বাড়িটা কিনেছিলাম, সেটা ছিল নিচতলা। তাই নানান অসুবিধার মধ্যে পড়তে হতো। ওপর থেকে নোংরা যাকিছু সব আমাদের ঘরের সামনে পড়ত, কুকুর বেড়াল ঘরের সামনে এসে পেচ্ছাপ, পায়খানা করে চলে যেত। ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দিল পাপা ২০১৬ এর শেষের দিকে। কুড়ি লক্ষ টাকার ফ্ল্যাট চব্বিশ লক্ষ টাকায় বিক্রি হল। পাশের বাড়ির একটা ফ্ল্যাট পছন্দ হল, চার তলায়। সেখানে নগদ দশ লক্ষ টাকা দিয়ে বাইনানামা কাগজ করলো পাপা। এই ফ্ল্যাট বাইনা করার সময় আমি জানতাম না, আমি আইএসআই তে ছিলাম, ক্লাস নিচ্ছিলাম, সেই মুহূর্তে পাপা ও মা গিয়ে বাইনা করে এসেছে। বাইনানামা কাগজ বিল্ডার নিজের ইচ্ছামত করে লিখে পাপা ও মাকে দিয়ে সই করিয়ে নেয়। সবই প্রায় ঠিক আছে, দশ লক্ষ টাকা নগদে ও বাকি পনের লক্ষ টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ করিয়ে রেজিস্ট্রি করে দেবে বিল্ডার, কিন্তু এই সমস্তটার জন্য সময় লিখে দিয়েছে মাত্র তিন মাস। আর এই তিন মাসের মধ্যে যদি পনের লক্ষ টাকার ব্যাঙ্ক ঋণের কাজ সম্পূর্ণ করে রেজিস্ট্রি না হয়, তবে বিল্ডার পঁচিশ শতাংশ অর্থাৎ আড়াই লক্ষ টাকা কেটে বাকি সাড়ে সাত লক্ষ টাকা ফেরত দেবে। কাগজে এই শর্ত লিখে দিয়েছে। ইংরাজিতে লেখা, আমার পাপা, মা অতটা বুঝতে পারেনি। সই করে দিয়েছে।


          বিল্ডারের এই শর্তটা এক পাক্ষিক। আর একটা ফ্ল্যাট বাড়ি কলকাতার মতন জায়গায় কিনতে গেলে তিন মাস যথেষ্ট হয়না যদি সেটা ব্যাঙ্ক ঋণের মাধ্যমে কেনা হয়। ব্যাঙ্কের কাজে সময় লেগে যায় অনেকটা। তাই একটু বেশি সময় রাখতে হয় হাতে। সেটা মা ও পাপা বুঝতে পারেনি শুরুতে। বিল্ডার যেভাবে বুঝিয়েছে, সেভাবেই বুঝেছে তখন। পাপার আরও দুটো বাড়ি আছে, কিন্তু যেহেতু সেই বাড়িগুলো নগদ টাকায় করা, তাই পাপার বাড়ির জন্য ব্যাঙ্ক ঋণ সম্পর্কে কোনো ধারনা ছিলনা। ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসা, পাপার দশটা ট্রাক আছে, পাঁচটা ছোট গাড়ি আছে যেগুলোর বেশিরভাগই ব্যাঙ্ক ঋণ করেই কেনা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কখনো পাপার সমস্যা হয়নি, মুখের কথাতে ও সাধারন কিছু নিয়মাবলীতে পাপা যখন তখন গাড়ি কিনে নিতে পারে আবার বিক্রিও করে দিতে পারে। তাই পাপা ভেবেছিল বাড়ির জন্যও হয়ত সেই একই হবে। তাই পাপা ঝামেলা না বুঝেই বাইনানামাতে সই করে ফেলে।  



                       এরপর থেকে শুরু হয় ঝামেলা। ব্যাঙ্ক ঋণ করতে গিয়ে দেখা যায় আর্থিক বর্ষে পাপার আয় দেখানো আছে তিন লক্ষ ষাট হাজার টাকা। অর্থাৎ মাসে ত্রিশ হাজার করে। কিন্তু পাপার দশটা ট্রাকের মধ্যে তিনটে ট্রাকের ব্যাঙ্ক ঋণ চলছে মাসে বাহান্ন হাজার টাকা করে, যা এখনও সাত মাস চলবে। অর্থাৎ হিসাব মতো ত্রিশ হাজারের মাসিক আয়ে পাপা বাহান্ন হাজার টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ পরিশোধ করে, যেটা বাস্তবে কখনো সম্ভব নয়। এর ওপর ফ্ল্যাটের জন্য ব্যাঙ্ক ঋণের কোনো প্রশ্নই আসেনা। তাই ব্যাঙ্ক ফ্ল্যাটের ঋণের জন্য আবেদনপত্র বাতিল করে দেয়। বিল্ডার এখানে সুযোগ পেয়ে যায়, একেতে বাইনানামা কাগজে তিন মাসের সময়, অর্থাৎ ওই সীমা পার হলেই আড়াই লক্ষ টাকা এমনি এমনি সে পেয়ে যাবে এবং চুক্তিপত্র বাতিল হয়ে যাবে। বিল্ডারের সাথে পরামর্শ করতে চাইলে সে প্রতারণার ফাঁদ পাতে, পঁচাত্তর হাজার টাকার বিনিময়ে ব্যাঙ্ক ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে। পাপা তখন উকিলের সাথে কথা বলে ও সরকারকে গত তিন বছরে বার্ষিক সতের লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা করে সর্বমোট বাহান্ন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা আয় দেখিয়ে আয়কর জমা করে। এতে সমস্ত সমস্যা সমাধান হওয়ার পরেও পাপার কাছে বার্ষিক ছয় লক্ষ টাকা করে সঞ্চয়ের খাতায় জমা পড়ছে সরকারি হিসাবে। এক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক ঋণেও আর কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই পুরো কাজটা করতে গিয়ে চুক্তিপত্রের তিন মাস সময় পার হয়ে যায়। এই মুহূর্তে সাড়ে চার মাস চলছে। চুক্তিপত্র অনুযায়ী বিল্ডার সময়সীমা বাড়িয়ে না দিলে ব্যাঙ্ক ঋণ দিতে পারবে না, আর যত ঝামেলা আমার ও মায়ের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। পাপা নিজের কাজে ব্যস্ত, বিল্ডারের সাথে দেখা করেনা, আর আমাকে ও মাকে বারেবারে বিল্ডারের কাছে পাঠায় বিল্ডারকে বুঝিয়ে মীমাংসার পথে আসার জন্য। বিল্ডার না নিজে দেখা করে, না ফোন করলে ফোন তোলে। যে দু-তিনবার দেখা হয়েছে, বিল্ডার এই কাজটা করে দেওয়ার জন্য একেকবার একেক রকম টাকা চাইছে অনৈতিকভাবে। এবং সেই টাকার পরিমাণ নেহাতই কিছু কম নয়, লাখের কাছাকাছি। এই মুহূর্তে পাপার দশ লক্ষ টাকা অন্যের হাতে পড়ে আছে বলে পাপার মেজাজ বাড়ছে, ভাড়া বাড়িতে থাকতে হচ্ছে জন্যে মার মাথা খারাপ হয়ে আছে, আর সব তেজ মেজাজের প্রভাব এসে পড়ছে আমার ওপর। এতসব ঝামেলার মধ্যে আমার পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে সেসব নিয়ে আমার পাপার দুশ্চিন্তা নেই। বরং আমার পড়াশোনা করা ও পরীক্ষা দেওয়া নিয়ে হাজারটা বাজে বাজে কথা বলে দিচ্ছে। আবার পাপার কাজগুলো ঠিক ভাবে না করতে পারলে তো আর রক্ষা নেই। নিজে তো প্রতারণার ফাঁদে পা বাড়িয়ে ফেঁসে গেছে, আমাকেও টেনে নিয়ে গেছে, আবার পরীক্ষা দেওয়া নিয়েও ঝামেলা করে অত্যাচার করে যাচ্ছে। 


                  আমি বলবো না পাপার ভুল। পাপা ফেঁসে আছে, তাই তার মাথার ঠিক নেই। আর পাপা এতকিছু পড়াশোনা নিয়ে বোঝে না, তাই আদর্শগতভাবে পড়াশোনার পরিবেশ কেমন হয়, সেটা সে জানেনা। কিন্তু এসবের মধ্যে আমি কি করি!!! আমাকে তো ঠিক করে পড়তে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে ভালো করে, কিন্তু বাজে কথাগুলো তো সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়। পড়তে পারিনা, রাগ হয়, সব ভেঙে ফেলতে ইচ্ছা করে তখন। মরে যেতে ইচ্ছা করে। এখন হয়ত পাপাকে আদালতের পথেই হাঁটতে হবে, এবং সেখানে আমার ওপর দিয়েও কম ঝক্কি যাবে না।