ভালো আছো লেখক!
তোমার ছাত্র - সৌম্যজিৎ।
কেমন আছ তুমি,
তোমার কথা রোজ ভাবি, কল্পনাতেই আঁকি নানান ছবি!
ইচ্ছেগুলো পাড়ি দিতে চায় আকাশমেঘে,
তোমার আদর্শকে রূপ দিতে চায় হাজারও, লাখো জনমানসে,
ততোক্ষণে আমি হয়ত হয়ে যাই তুমি, -
যেন তুমিটাই আমি!
আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছা করে তুমি কেমন আছ,
কেমন করে বাঁচো!
একা থাকো তো!
দুশ্চিন্তা হয় কলকাতার বুকে এক কোণে পড়ে থাকা এই মানুষটির বুকে,
মাথায়,
রোজ দিন ভয় হয়,
"হয়ত সারাদিন এ-জায়গায়, সে-জায়গায় মিটিং করে, কনফারেন্স করে ঘরে ফিরলে,
দরজাটা বন্ধ করে দিলে,
বন্ধ ঘরে তোমার শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেলো!
হয়ত তুমি কাওকে ডাকতে পারলে না!
হয়ত কাওকে একটি ফোন কলও করতে পারলে না!
সিকিউরিটিগুলো তো তোমার দরজার বাইরে থাকে,
হয়ত ওরা জানতেই পারলো না ভিতরে তোমার শরীর খারাপ হয়েছে!"
এসব ভেবেই ভীষণ ভয় হয় আমার!
সেবার যেবার তুমি হাসপাতালে ভর্তি হলে,
আমি এদিক ওদিক হাতড়েও তোমার একটুকু খোঁজ পাচ্ছিলাম না কোথাও!
ভীষণ অসহায় হয়ে উঠেছিলাম।
চারিদিকে সবাইকে জিজ্ঞাসা করেও তোমার সঠিক কোনো খবর আমি পাই নি,
ইয়াসমিন দিদিমণিকে জিজ্ঞাসা করতেই সে তো আরও ভয় ধরিয়ে দেয়!
উত্তরে শুধু বলে, "তোমার মেয়েমা একটুও ভালো নেই দাদামণি, ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে।"
আমি অস্থির হয়ে উঠি।
ছটপট করি মনের মধ্যে!
ইচ্ছা হয় একছুটে তোমার কাছে চলে যাই!
উপায় পাই না।
ইচ্ছা তো আমাদের অনেককিছুই হয়,
আমরা সবকিছু করতে পারি না।
মনে আছে সেবার যখন দেশে নোট বদলির পালা চলছে,
মানুষ এটিএমের সামনে, ব্যাঙ্কের সামনে সকাল, দুপুর কাঠফাটা রোদে
পশুর মতো দাঁড়িয়ে আছে!
তোমায় দেখলাম ক্লান্ত শরীর, ক্লান্ত মনে মুখে মাস্ক লাগিয়ে পার্কে বসে পড়েছ।
আমি অসহায় হয়ে উঠেছিলাম তোমায় ওভাবে বসে থাকতে দেখে!
কেন আমি নেই তোমার কাছে!
কেন নেই মেয়েমা!
মনে পড়ে আমার সেদিনের কথা,
যেদিন তুমি এয়ারপোর্টে ব্যাগ, ল্যাপটপ সব হারালে,
কতো অসহায় না হয়েছিলে তখন এদিক ওদিক ছুটতে ছুটতে!
অথচ কিছুক্ষণ আগেই আমায় মেসেজ করেছিলে,
কতো প্রশান্তি ছিল তোমার মেসেজে!
ল্যাপটপ হারিয়ে, - হারিয়ে ফেলেছিলে কতো কতো অপ্রকাশিত ম্যানুস্ক্রিপ্ট!
আমাদের কতো মহা মূল্যবান সম্পদ সেসব!
কতো কতো আদর্শলেখা লিপিবদ্ধ ছিল ওই ল্যাপটপে!
কতো কতো অসহায়তা, কতো কতো বিপ্লব,
কতো কতো উন্নতি, প্রগতির চিন্তা তুমি লিখে রেখেছিলে ওই ল্যাপটপটিতে!
আমরা বঞ্চিতই থেকে গেলাম সেসব থেকে!
বঞ্চিত থেকে গেলাম তোমার জীবনের চিন্তাভাবনার একটি দিক থেকে!
যদি পারতাম তোমার সাথে সবসময় ছায়ার মতো লেগে থাকতে!
যদি পারতাম!
তাহলে হয়ত বঞ্চিত হতাম না কেউ আমরা!
কল্পনাতে তোমায় কতো কতো অনুভব করেছি, উপলব্ধি করেছি,
সে'সবের বেহিসেবি হিসেব নাহয় অপ্রকাশিতই থাক মেয়েমা!
ওই যে তোমার পড়ার টেবিল, চেয়ার,
যেখানে বসে তুমি রাতের পর রাত জেগে,
পাতার পর পাতা ভর্তি করে তৈরি করো ন্যায়ের তহবিল!
আমি পর্দার আড়ালে থেকে তোমায় লক্ষ্য করি সবটা,
আমি দেখি তোমার লেখার প্রতি, চিন্তার প্রতি তীব্র একনিষ্ঠতা,
অটোপ্সি ছুরির মতন ধারালো চিন্তা দিয়ে তুমি ফালাফালা করো এই সমাজের -
অনৈতিক কোষপর্দা, ফালা ফালা করে তুমি লিখে দাও পোস্টমর্টেম বিশ্লেষণ,
অন্ধকারকে ছিন্ন করে এনে দাও আলোর খোঁজ,
আমি সবটা লক্ষ্য করি।
একমনে তুমি ভেবে চলো, লিখে চলো পাতার পর পাতা,
সোফার ওপর বা কখনো খাটের বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে কোলের ওপর ল্যাপটপ রেখে,
চোখে চশমা, আমি সবটা লক্ষ্য করি তোমায় ..
তোমার তখন খেয়াল থাকে না এদিক সেদিকে,
শুধু মিনুটা এসে কখনো খেলা করলে, জ্বালালে, ওকেও বুকের ওপর তুলে নিয়ে লিখে চলো।
আমি এভাবেই লক্ষ্য করি তোমায়, শুধু জিজ্ঞাসার চোখে চেয়ে থাকি -
"তুমি কেমন আছ!"
আমিও পাতার পর পাতা ভর্তি করে সেসব লিখে রাখি,
কেমন করে তোমায় দেখি,
কেমন করে তোমায় অনুভব করি!
এবার আবারও জমা করছি আমার লেখা,
"উৎসর্গ - নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনকে" পাণ্ডুলিপিটি।
যদি প্রকাশ পায়!
আমি নিজে হাতে বইটি ছুঁয়ে দেবো তোমার পায়ে,
তোমায় জড়িয়ে ধরে একটু হাসবো তখন,
একটুখানি কাঁদবো!