মেয়েমা,
"আদর্শের জীবন দিয়ে আমাকে গড়েছ তুমি,
আমার এ জীবন আমি তোমাকেই উৎসর্গ করলাম।"
আজ ভীষণ কষ্ট নিয়ে, অনেক অভিমান নিয়ে এই চিঠি লিখছি তোমাকে। আমার জীবনের পথপ্রদর্শক তসলিমা নাসরিন, সে শুধুই ভার্চুয়াল জগতে আমার ফেসবুক বন্ধু নয়, এই প্রাণ প্রতিমা আমার বাস্তব জীবনের স্বপ্নে, জাগরণে এমন এক যোদ্ধা, যে আমার সেইসব অন্ধকার জীবনের মানুষ শরীরে থাকা অমানুষটার মধ্যে আদর্শের প্রদীপ জ্বেলেছিল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষ হয়ে একটু একটু করে বড় হওয়া মানুষটা যখন নিজের করা ভুলে একেরপর এক ধাক্কা খেয়ে জর্জরিত, তখন এই যোদ্ধার লেখা বইগুলো আমাকে মানুষ জন্মের মন্ত্র শিখিয়েছিল। তারপর যখন ফেসবুক জগতে সেই যোদ্ধার কাছাকাছি আসতে পেরেছিলাম, আমি ধন্য হয়ে গেছিলাম। মানুষটাকে ভীষণ নিজের, ভীষণ কাছের মনে হতে থাকে। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে আমার লেখা "মেয়েমা, তুমি আর আমি স্বপ্ন পাড়িতে", "অগ্নি উৎস তুমি তসলিমা নাসরিন", "আলো", "বস্তু নারীর আবার অধিকার কিসের?", "উৎসর্গ", "আমার মেয়েমা", "সাহসী যোদ্ধা", "আমি- আমি নই, আমিটাও তুমি", "গেরন", "হারিয়ে যাই গল্পকথায়", "বাংলা তোমায় প্রণাম", "ভাষা আন্দোলন আমার কাছে তসলিমা নাসরিনের কান্না", "সত্যের যোদ্ধা তসলিমা নাসরিন", "আদর্শ তুমি", "ফিরে এসো", "চেতনা বাহক তসলিমা নাসরিন", "যোদ্ধা তসলিমা নাসরিন, তোমায় সেলাম", "আঁধারে আলো", "তসলিমা নাসরিনের জীবন থেকে চেতনার পথে", "চেতনার জনক তসলিমা নাসরিন, তোরা অর্থহীন", "স্বপ্নে এবার নতুন তুমি", "প্রণাম রবিকন্যা", "ভালোবাসার হাসি", "তসলিমা নাসরিন ও সমাজ", "উতল হাওয়া-ফুলশয্যা থেকে", "তোমাকে দিলাম", "তোমারই আদর্শে গড়া আমি" প্রভৃতিতে। এই যোদ্ধার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ। প্রতিটা মুহুর্তে চলার পথে আমি এই যোদ্ধার কাছথেকে প্রেরণা, সাহস, স্নেহ, ভালবাসা পেয়ে এসেছি। এই স্নেহ, ভালবাসা আমাকে মন খুলে, আবেগ দিয়ে কথা বলতে শিখিয়েছে, নিজের স্বাধীনতাতে কথা বলতে শিখিয়েছে। এমন এক বড় মাপের মানুষের কাছে আমি যখন যা ইচ্ছা আবদার করেছি, সবসময় শুধু স্নেহই পেয়েছি। প্রতিটা পদে আমার মনে হয়েছে, আমার সাথে সত্যের পথে আপোষহীন আমার মেয়েমার স্নেহ আছে। আমি কোনকিছুতে ভয় পাইনি শুধু মাত্র এই ভরসার জন্যই। তোমার সাথে আমার সম্পর্কটা আমার মনের এত গভীরে প্রবেশ করেছে, যেখান থেকে আমি শুধুই তোমার দেওয়া আদর্শ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারিনা।
গত কয়েকদিন ধরে আমি প্রতিমুহুর্তে অনুভব করছি যে, আমি তোমার স্নেহ থেকে, ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছি। এমন এক অনুভুতিতে আমি ভীষণ ভেঙে পড়ছি। এই মানুষটা, আমার মেয়েমা, যাকে আমার এত পরিচিত মনে হত, সেই একই মানুষটাকে আজ আমার ভীষণ অচেনা লাগছে। এই অচেনা মানুষটার ওপর আমার ক্ষোভ হচ্ছে, অভিমান হচ্ছে। আস্তে আস্তে এই ক্ষোভ আর অভিমান কষ্টে রুপান্তরিত হয়েছে। তীব্র যন্ত্রণা আমাকে দংশন করছে অনবরত, যা আমার সহ্যের অধিক। আমি জানি, আমি তোমাকে অতিরিক্ত বিরক্ত করি, অনেক অনেক বাচ্চামি করি, অনেক আবদার করি। অনেক ভুল করে ফেলি। কিন্তু এগুলো আমি করে ফেলি, নিজেকে আটকাতে পারিনা। তোমার সাথে আমার মনের সম্পর্কটা এমনই হয়েছে, যে সমস্ত লজ্জা এড়িয়ে আমি তোমার প্রতি বড্ড অধিকার রাখি। গত কয়েকদিন আগে আমি তোমার লেখা দুটো বইয়ের লিংক দিয়ে মানুষকে পড়তে দিয়েছিলাম, গুগলে সার্চ করে পাওয়া যাচ্ছিল, আমি ভেবেছিলাম প্রকাশক ও তোমার সম্মতি আছে, তোমার ওপরে আমার অধিকার আছে, তাই বিনা দ্বিধাতে তোমাকে জিজ্ঞাসা না করেই আমি লিংক দিয়েছিলাম। পরে যখন তুমি জানালে ম্যানুস্ক্রিপ্ট চুরি গেছে, সম্মতি ছাড়া এগুলো দেওয়া হয়েছে, তখনই আমি লিংক মুছে দিই। আমার মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করে, ও পরে যখন দেখি তুমি আমাকে আর স্নেহ করছো না, আমি ভেঙে পড়ি। আমাকে ক্ষমা করে দাও মেয়েমা। কিছুদিন আগে আমি একটা সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে পরি, যদিও মেয়েটার সাথে আমার এখনও দেখা হয়নি, মেয়েটা আমাকে বন্ধুর মত ভরসা জুগিয়ে গেছে, তাই আমরা সম্পর্কে এসেছিলাম। কিন্তু আমার মনের এমন ভাঙন দশাতে সেই সম্পর্কও ভেঙে যেতে বসেছে। আমার মন একদমই সেই সম্পর্কের দিকে নেই আর। আমার সমস্ত প্রেমের সম্পর্ক গুলো এভাবেই ভেঙে গেছিল, আমি কারোর দিকে মন দিতে পারিনি। একটা সময় কেরিয়ারের পিছনে ছুটেছি, তারপর আমার মন, প্রাণ সমস্তটা জুরে শুধুই তুমি, তাই বারবার সম্পর্কে এসেও আমি কোনো সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। তোমার স্নেহ না পেয়ে আমি বুঝে গেছি, পৃথিবীতে আর কিছুই আমাকে শান্তি দিতে পারবেনা, যে শান্তি আমাকে তোমার স্নেহ দিতে পারে। অতিরিক্ত আবেগ, মনের জোরে আমার কাজগুলো আমি করি, কোনোকিছুতেই ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসিনা, কিন্তু আমার সেই জোরটা আসে তোমার কাছথেকে, আজ সেই জোর না পেয়ে আমি শেষের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। আমি আর কখনো কোনো প্রেমের সম্পর্কে জড়াবো না, শপথ করছি। নিজেকেই আমি তোমার জন্য উৎসর্গ করছি। শুধু আমাকে তোমার থেকে বঞ্চিত কোরো না। আমি বাঁচতে পারবো না। মুখ্যমন্ত্রী, আনন্দবাজার পত্রিকাতে তোমাকে নিয়ে অনেক লেখা লিখেও, অনেক চিঠি পাঠিয়েও কোনো ফল হয়নি, ওরা আমার আপন নয়, তাই ওদের আমি ভরসা করিনা। কিন্তু তুমি আমার সবথেকে আপন, আমি বিশ্বাস করি তুমি আমার এই চিঠিকে ভালোবাসা দিয়ে মনে জায়গা দেবে।
মেয়েমা, আমার ভালোবাসা, আমার প্রশ্বাস, আমার নিজস্বতা সমস্তটা জুরে শুধুই তুমি। আর কেউ কখনো সেই জায়গা নিতে পারবে না। আমি যেন কখনো তোমার স্নেহ থেকে বঞ্চিত না হই। তুমি আমাকে বলেছিলে, অনেক ভালোবাসা, স্নেহ, শুভ কামনা তোমার জন্য সৌম্যজিৎ। সেই ভালোবাসার অধিকারে আমি তোমাকে এই চিঠিটা লিখলাম। ভুল হলে আমাকে ক্ষমা কোরো। ভালো থেকো, সুস্থ থেকো।
তোমার আদর্শে গড়া
সৌম্যজিৎ।