যেভাবে কাটালাম গত একবছর।
চরম ব্যস্ততা ও অসহায়তার মধ্যে পার করে আসলাম গোটা একটা বছর। গত বছর আমাদের কলকাতার ফ্ল্যাটটা বিক্রি করেছিলাম। নিচতলার ফ্ল্যাট ছিল। কুকুর, বেড়াল এসে পেচ্ছাপ, পায়খানা করে দিয়ে যেত, ওপর তলার ফ্ল্যাটগুলো থেকে নোংরা ফেলত নিচে, আমাদের জানালা দিয়ে সেসব নোংরা ঘরে ঢুকে আসত। আমরা ভীষণ বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম সেসবে তিনবছর ধরে। পাপা সিদ্ধান্ত নিল ফ্ল্যাট বিক্রি করে দেবে। কিন্তু বিক্রি করলেই তো হল না, থাকার জায়গা প্রয়োজন। আমার ইউনিভার্সিটি এখানেই, আমার সব কাজ এখানেই, তাই এখানেই থাকতে হবে। তাই ফ্ল্যাট বিক্রি করার কিছুদিন আগে আরেকটা ফ্ল্যাট দশ লক্ষ টাকা দিয়ে বুক করে ফেললাম। চারতলার ওপরে একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাট তৈরি হতে, ব্যাঙ্কের কাগজপত্র ঠিক করতে সময় লাগবে বলে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে নিলাম। এগারো মাসের চুক্তিতে বাড়ি ভাড়া নিলেও ভেবেছিলাম তিন থেকে চারমাস সময় লাগবে নতুন ফ্ল্যাটের সব কাজ মিটিয়ে গৃহ প্রবেশ করতে। এখানেই হয়ে গেল বিপদ। কাগজপত্র করতে গিয়ে দেখা গেল বার্ষিক আয়ের ব্যালান্স শিট দেখানো আছে তিন লক্ষ টাকা। তিন লক্ষ টাকার হিসেব দেখিয়ে আমরা ফ্ল্যাট কিনতে পারিনা। এখানেই সুযোগ নিল বিল্ডার। সে ভেবেছিল তিন লক্ষ টাকার বার্ষিক আয়ের হিসেবে আমরা ফ্ল্যাট নিতে পারবনা। অতয়েব এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী পঁচিশ শতাংশ টাকা কেটে সে বাকি টাকা আমাদের ফেরত দেবে। দশ লক্ষ টাকার পঁচিশ শতাংশ মানে আড়াই লক্ষ টাকা। বিল্ডার নানান রকম ছক কষতে থাকে এগ্রিমেন্টের তারিখটুকু পার করে দেওয়ার জন্য। নানান বাহানা দেখিয়ে তারিখটুকু পার করে হাইকোর্ট উকিলের চিঠি পাঠায় পঁচিশ শতাংশ কেটে টাকা ফেরত দিয়ে দেবে বলে। আমরা মেনে নিতে পারিনি। এভাবে এত সহজে আড়াই লক্ষ টাকা লোকসান মেনে নেওয়া যায়না। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে চিঠি পাঠিয়ে আমরা ফাইন দিয়ে গত তিনবছরে বার্ষিক আয় তিন লক্ষ টাকা থেকে সতের লক্ষ ষাট হাজার টাকার নতুন ফাইল বানাই এবং হাইকোর্টের উকিলকে দিয়ে বিল্ডারের চিঠির জবাব পাঠাই নতুন ফাইলের কাগজের কথা উল্লেখ করে। বিল্ডারের আড়ায় লক্ষ টাকা লাভের স্বপ্নে সেখানেই ইতি। বিল্ডার নতুন এগ্রিমেন্ট করে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করে দেয়। এই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আমাদের সময় লেগে যায় দশ মাস। অতয়েব আমাদের ভাড়া বাড়িতেই দিন কাটাতে হচ্ছে তখনও। ফ্ল্যাটে থাকতে আমাদের যাবতীয় জিনিসপত্রে ইলেকট্রিক বিল আসত মাসে গড়ে দেড় হাজার টাকা করে। ভাড়াবাড়িতে আমরা সেসব আর সেট করিনি খুলে ফেলতে হবে বলে। এরপরও দীর্ঘ ছয় থেকে সাত মাসে আমাদের ইলেকট্রিক বিল দিতে হয় মাসে গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা করে। আমাদের সন্দেহ হয়। আমরা খতিয়ে দেখতেই দেখি বিলে কারচুপি আছে। সেটা ধরা পড়তেই ভাড়া বাড়ির মালিক আমাদের ওপর প্রতিদিন মানসিকভাবে অপমান, হেনস্থা করতে থাকে যাতে আমরা চলে আসি। কখনো জল নিয়ে, কখনো বাইক রাখা নিয়ে, কখনো বাইরের দরজা নিয়ে, কখনো জলের মেশিন চালানো নিয়ে ও আরও অনেকভাবে। আমরা মনে মনে ভাবি যে প্রতিবাদ করব, পুলিশে খবর দেব, কিন্তু নতুন ফ্ল্যাট নিয়ে এত ঝামেলাতে ফেঁসে গেছিলাম যে আমরা সেসব কিছুই করিনি। প্রতিদিনের অপমান জোর করে হজম করতে থাকি। অসহায় হয়ে উঠি। ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি হওয়ার পর থেকে শেষ দুমাস ধরে মিস্ত্রীরা নানাভাবে টাকা পয়সা ঠকিয়ে হাতাতে থাকে। মিস্ত্রী পাল্টে আবার নতুন মিস্ত্রী নিয়ে আসি, কিন্তু ঝামেলা পিছু ছাড়ে না কিছুতেই। এরাও সুযোগ পেলেই নানাভাবে ঠকিয়ে নিয়েছে। কখনো রঙে ঠকিয়েছে, কখনো প্লাইতে ঠকিয়েছে, কখনো আসবাবপত্রে ঠকিয়েছে। আমরা বুঝতে পেরেও অসহায়ভাবে শুধু ঠকেইছি। ইতিমধ্যে নতুন বিপদ আসে। স্থানীয় কিছু দালাল স্তরের ছেলে জুলুম করে ওদের টাকা দিতে হবে বলে। আমরা পুলিশে খবর দিলে যখন পুলিশ ওদের ডেকে পাঠায়, তখন ওরা স্থানীয় কাউন্সিলরকে দিয়ে পুলিশে ফোন করায়। হুমকির শাস্তি ওরা আর পায়নি, পুলিশ ওদের সাবধান করে ছেড়ে দিয়েছে। ওরা ওত পেতে আছে হয়ত, সুযোগ পেলেই ক্ষতি করবে। সেসব ভয় পাইনা। এত বিপদের মুখোমুখি হয়েও যখন সহ্য করে, সমস্যার সমাধান করে নতুন ফ্ল্যাটে আসতে পেরেছি, তখন পরবর্তী বিপদগুলোও সামলে নিতে পারব। সারাজীবন আমরা মানুষের কাছ থেকে ভীষণ সম্মান পেয়েছি, কিন্তু গত একটা বছরে আমাদের নানান অপমান, বিপদের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে হল। এর প্রভাব আমার পড়াশোনাতেও পড়েছে। নেট পরীক্ষাতে কোয়ালিফাই করতে পারিনি। প্রতিনিয়ত মানসিক অশান্তিতে দিন কাটিয়েছি। আইএসআইতে কাজে ফাঁকি পড়েছে, বারবার কথা শুনতে হয়েছে সুপিরিওরদের কাছ থেকে। পরীক্ষার প্রস্তুতি খারাপ হয়েছে, পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। নানান দুশ্চিন্তাতে ভালোবাসার সাথে সম্পর্কে অবনতি ঘটেছে। মেয়েটা বড্ড ভালো, কিন্তু আমার মানসিক অশান্তিতে ওকেও ভুগতে হয়েছে। ওর দিকে ঠিক মত লক্ষ রাখতে পারিনি। এর জন্য নিজেকে ভীষণ দোষী মনে হয়। হিনমন্যতা বাসা বেঁধেছে মনের মধ্যে। এখন নতুন ফ্ল্যাটে এসেছি দুদিন হল। চেষ্টা করবো আবারও সবকিছু সামলে ভালো করে দেওয়ার।