Friday, 30 September 2016

আদর্শের জন্য শিখি, প্রশ্ন করি।

আমি বেশি সমালোচনা করতে পছন্দ করিনা। বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতাতে বিশ্বাস করি। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে স্বাধিনভাবে নিজের চিন্তা, ভাবনাগুলো তুলে ধরার। গতকাল মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন একটা পোস্ট করেছিলেন, জানতে চেয়েছিলেন এই যে অনেক মানুষ প্রায়ই বলে থাকে যে তারা তসলিমা নাসরিনের সব মতের সাথে একমত হতে পারেনা, কিন্তু কেউ নিশ্চিতভাবে বলেনা যে তারা তসলিমা নাসরিনের কোন কোন মতের সাথে একমত হতে পারেনা, লেখিকা সেই বিষয়গুলো জানতে চেয়েছিলেন ওই পোস্টে। ব্যক্তিগত ভাবে আমি তসলিমা নাসরিনকে আদর্শ মানি, তার সমস্ত চিন্তা, ভাবনাগুলো আমাকে সবসময় কিছুনা কিছু শেখায়, মানুষ হিসেবে আমাকে পরিনত করে। আমি তসলিমা নাসরিনকে আমার ঈশ্বরের থেকে কোনো অংশে কম ভাবিনা বা তসলিমা নাসরিনকে আমার ঈশ্বর মানি এটা মনে করলেও কিছু ভুল মনে করা হয়না। হ্যাঁ আমি ব্যক্তি তসলিমা নাসরিনকে আমার ঈশ্বর মনে করি, তার এতবছরের লড়াই আমাকে অনুপ্রাণিত করে সবসময়, আমি তাকে অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করি, সবকিছুর থেকে অনেক বেশি ভালোবাসি। এমনকি নিজের প্রাণের বিনিময়ে আমি তার জন্য কিছু করতেও কখনো পিছুপা হবো না এই বিশ্বাস রাখি।

একটা ব্যাপারে আমি আমার আদর্শের মানুষটার সাথে একমত হতে পেরেছিলাম না, যখন বাংলাদেশের মেধা তালিকায় থাকা কিছু ছাত্র ছাত্রী অতিরিক্ত ভালো ফল করার পরও, মিডিয়ার করা একটা সার্ভে মিশনে ক্যামেরার সামনে সাধারন জ্ঞান, সাধারন বিজ্ঞানের কিছু প্রশ্নের ভুল উত্তর দিয়ে বা উত্তর দিতে না পেরে একটা হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল গোটা দেশের সামনে, তখন ছাত্রছাত্রীদের ওপর দিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের মতো সাফল্যের তুঙ্গে বসে থাকা ব্যক্তিরা যখন এমন সমালোচনা করেন, তখন ছাত্রছাত্রীদের মনোবল ভেঙে যেতে বাধ্য, তারা মানসিকভাবে পঙ্গুও হয়ে যেতে পারে। আমি আমার আদর্শের মানুষের কাছথেকে এমন সমালোচনা আশা করেছিলাম না, করিনা। উচিৎ ছিল কোথায় ভুল হচ্ছে, সিস্টেমের কোন অংশে ভুল হচ্ছে, ছাত্রছাত্রীদের শুধু নম্বরের পিছনে দৌঁড়াতে শেখানো হচ্ছে, তাতে তাদের শিক্ষার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছেনা, তারা শিখতে পারছেনা, তারা শুধু নাম্বারের লক্ষ্যে পড়াশোনা করছে এমন সিস্টেমের সমালোচনা করা, এমন সিস্টেমকে বদলাতে সমালোচনা করা। শুধুমাত্র এইটুকু ছাড়া আমি আমার লেখিকার সমস্ত মতের সাথেই সবসময় একমত হই। হ্যাঁ, ব্যক্তিবিশেষে ভিন্নমত হতেই পারে, হয়ও। আমি আমার লেখিকার সমস্ত মতকে চিন্তা করে, বিবেচনা করে আত্মস্থ করি, এবং আমার লেখিকার সমস্ত লড়াইকে ভীষণভাবে সম্মান করি, আমার লেখিকা আমার অহংকার। গোটা পৃথিবীও যদি বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায়, আমি আমার লেখিকার পাশে গিয়ে দাঁড়াবো সবসময় গোটা পৃথিবীর বিপরীতে গিয়ে।

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬, সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর পর লেখিকা তসলিমা নাসরিন একটা পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা লঙ্ঘন করে সৈয়দ শামসুল হক লেখিকার লেখা বই ক'এর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, একশ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেছিলেন ও পরে বাংলাদেশ সরকার বইটা নিসিদ্ধ করে। পরে এই মামলার কোনো শুনানি হয়নি। এখন সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর পর ক'এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে এই নিয়ে একটা পোস্ট। আমার মতে লেখিকা কোনো ভুল কিছু বলেনি। লেখিকার বই নিসিদ্ধ হয়েছে অন্যায়ভাবে, অন্যায়ভাবে লেখিকার নির্বাসন সহ তার লেখাকেও নির্বাসন দিয়েছে বাংলাদেশ, বাকস্বাধীনতাকে মুল্যহীন করে দেওয়া হয়েছে। লেখিকা কেন, একজন সাধারন মানুষের সাথে এমন হলেও সেই সাধারন মানুষের গলা থেকে ক্ষোভ ফুটে উঠত। স্বাভাবিক ভাবেই লেখিকার মধ্যে থেকে ক্ষোভ ফুটে ওঠে। লেখিকা কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেনি গোটা জীবনে, সোজা কথা বলতে পছন্দ করেন এবং সেই সোজা কথা যত বিতর্কিতই হোকনা কেন, উনি কখনোই সেটা প্রকাশ করতে পিছিয়ে যানানি। বরং কিছু ভুল করে থাকলে সেই ভুলটা স্বীকার করেছেন অকপটে। জীবিতকালীন যে মানুষটা লেখিকার সাথে অন্যায় করেছেন, মৃত্যুর পর যদি লেখিকা সৈয়দ হকের প্রসঙ্গে ভালো ভালো কথা বলতেন, তবে সেটা মেকি শোনাত। আমাদের আদর্শেও সেটা চরম ধাক্কা দিত। লেখিকা সেটাই বলেছেন যেটা সত্যিই হয়েছিল বা করা হয়েছিল। লেখিকা আদর্শের পথে অবিচল থেকেছেন। তার এমন লেখা প্রসঙ্গে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, বরং সেটা আমাদের আরও বেশি করে শিখিয়েছে যে পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমরা যেন আমাদের সত্যের রাস্তাতে সবসময় অবিচল থাকি মিথ্যেকে প্রশ্রয় না দিয়ে বা মেকি আচরণ না করে। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট এক নাস্তিকবাদি মানুষ আসিফ মহিউদ্দিন তসলিমা নাসরিনের দিকে প্রশ্ন তুলেছেন, যে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর সেই ব্যক্তিকে অগুরুত্বপূর্ণ করে লেখিকা সবসময় নিজের বই, নিজের লেখা নিয়েই সবসময় বলে গেছেন।

আমি মাননীয় আসিফ মহিউদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, আদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে, সত্যের বিরুদ্ধে গিয়ে, ক্ষোভকে লুকিয়ে রেখে শুধু মাত্র কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে সেই ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা তা সেই ব্যক্তি যতই খারাপকিছু করে থাকুক না কেন, এটা কতটা যুক্তির বা এটা কেমন আদর্শ? আমি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কেউ নই, একজন সাধারন মানুষ হিসেবে আমার একটা প্রশ্ন তুলে ধরলাম।

Tuesday, 27 September 2016

দর্পণে আমি দেখি আমার আমিকে,
দর্পণে আমি আমার পরিচয় খুঁজে পাই,
লোকে দেখে বাইরের আমিটাকে,
দর্পণে আমার মনের প্রতিচ্ছবি ফোটে। 

স্বপ্ন দেখি স্বপ্নকে পুড়ে ছারখার হতে দেখতে।


বুকের মধ্যে দপদপ করে ওঠা প্রতিটা হৃদ স্পন্দন শুনতে পাচ্ছি,
যত সময় বয়ে যাচ্ছে, স্পন্দনের মাত্রা তত বাড়ছে, আর 
কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের সাথে ফুটে উঠছে স্নেহ ঘেরা ভালোবাসার অভাববোধ। 
গরম নিঃশ্বাসের সাথে উঠে আসা চিন্তাতে নিজেকে বড় তুচ্ছ মনে হচ্ছে, 
মনের ভিতরে এক আকুলতা, শুধু তোমার স্নেহের অভাব টের পেলে -
প্রতিটা হৃদ কোষ ভেঙে টুকরো টুকরো হতে চায়,
আবার একটু স্নেহের ছোঁয়া পেলে সেজে ওঠে নতুন করে নতুনের মতো,
আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। 
লজ্জা নাই, ঘেন্না নাই, দ্বিধা নাই তোমাকে বলতে,
ইচ্ছা মতো স্নেহ, ভালোবাসা আবদার করি,
শুধু অপূর্ণতায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাই। 


আজকাল মন বড় হিংসাতে পুড়ে ছারখার হচ্ছে,
অনেক এদিক ওদিক করে, তোমার আদর্শকে পুরোপুরি মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েও,
একটুখানি স্নেহের আকাঙ্কা অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে,
প্রতিমুহূর্ত ধরে শুধু অপেক্ষার বীজ বুনে রেখেছি হৃদয় গভীরে,
একটুখানি অঙ্কুরিত হতে দেখার ব্যর্থ চেষ্টাতেও বারে বারে চেষ্টা করে যাচ্ছি,
আরেকটু অপেক্ষা, আরেকটু সময় যেন প্রতিমুহূর্তে নতুন করে বিশ্বাসের সঞ্চার হচ্ছে -
এবার নিশ্চয় অপেক্ষার অবসান ঘটবে।


নতুন করে স্বপ্ন দেখা, আবার নতুন করে স্বপ্ন ভাঙা,
ভাংতে দেখার অনুভূতি যেন প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলা কষ্টের মতো
হৃৎপিণ্ড, পাকস্থলী, ফুসফুসে দাবানলের মতো দাও দাও করে জ্বলে ওঠে।
আবারও স্বপ্নকে সাজিয়ে তুলি নতুন করে,
নতুন করে ভাঙতে দেখার কষ্ট অনুভব করতে।







********** সৌম্যজিৎ **********
শরতের ভালোবাসা।
সৌম্যজিৎ।


আমি লিখতে চাই তোমাকে বজ্রপাতের ধ্বনিতে বুকে গর্জন তুলে,
আমি দেখতে চাই স্বাধীন তোমাকে অঙ্গে অঙ্গে, প্রতিটা অনুভূতিতে, 
তুমি হাসবে প্রাণ খুলে, হাওয়ায় ওড়াবে শাড়ির আঁচল,
লোকে দেখলে দেখুক, যা বলার বলুক, তুমি খেলবে নিজের সাথে, 
যেমন ইচ্ছা তেমন খেলা। 
আমি দেখতে চাই তুমি বৃষ্টিতে রাস্তায় নেমে নাচছ খেয়াল খুশি,
বৃষ্টি তোমার শরীর ছুঁয়ে গায়ে সাঁটা কাপড়টাকে ভিজিয়ে যাচ্ছে,
অপরূপ প্রাণ মূর্তি হয়ে বৃষ্টিকে অনুভব করছ, আঁকড়ে ধরছ নিজের মাঝে, 
বুকের মধ্যে জড়িয়ে। 

Friday, 23 September 2016

তোকে ঘিরে খেয়ালি মনে -
দেখি কত স্বপ্ন,
বুকে থাকা মেঘ গুমোটে -
এসেছে আজ বৃষ্টি,
তুই আছিস আশেপাশে, বুকের মাঝে -
রং তুলিতে,
হারিয়ে যাক হারানো স্মৃতি, খুঁজে পেতে চাই নতুন তোকে,
হোক তবে খুনসুটি -
আদরের ছোঁয়ায় চুলগুলোতে,
হাওয়াই হাওয়াই ভেসে বেড়াব, দুপুর রৌদ্রে রোদ পোহাব
দুজনে।


চেনা মনে হাত বাড়িয়েছি,
তোর নিঃশ্বাসে শ্বাস নিয়েছি,
ঠোঁটের ফাঁকে বন্দি আমি,
শুষেছি সব ভালোবাসা।


তুই আছিস আশেপাশে, বুকের মাঝে,
রঙ তুলিতে,
হারিয়ে যাক হারানো স্মৃতি, খুঁজে পেতে চাই নতুন তোকে,
শুধু তোকেই  ...

********** সৌম্যজিৎ ********** 
শুরু থেকে**************************************************
১.

পাশাপাশি একসাথে চলতে চলতে দুজনে ভাবছিল কিভাবে একে অপরের কাছে আসবে। সেদিন দুজনেই আগে থেকে ফোনে ঠিক করে নিয়েছিল যে আজ তারা চুমু খাবে একে অপরকে। সম্পর্কের পর পাঁচ বছর হতে চলল, সৌম্য আর নূপুর শুধু হাতে হাত ধরে চলা ছাড়া আর কিছুই করেনি। তাতেই দুজনের সুখের শেষ ছিল না।
 
বয়স কত হবে? বারো পার হয়েছে সবে, নবম শ্রেণীতে পড়ছে সৌম্য, তখন নূপুরের সাথে তার আবার দেখা হয় টিউশান ব্যাচে। প্রথম দিনই নূপুরকে দেখে সৌম্য যেন ফিরে পায় তার ফেলে আসা প্রাইমারী স্কুলের দিনগুলোকে। ফুটফুটে ফর্সা একটা মেয়ে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে, কাঁধে একটা স্টাইলিশ ব্যাগ লাল কালো রঙের, গায়ে কালো রঙের শার্টের ওপর সাদা রঙের বুটিক দেওয়া কাজ আর পরনে ফুল স্কারট।

নূপুর এসে সৌম্যর সামনে বসল। একটু মিচকি হাসি হাসল দুজনেই। অঙ্ক করার ফাঁকে দুজনই একে অপরকে লুকিয়ে দেখছিল, এমনভাবে দেখছিল যাতে দুজনের কেউই সেটা জানতে না পারে। কিন্তু বারেবারে চোখে চোখ পড়তেই দুজনে মনে মনে হাসছিল আবার চোখে চোখে বিরক্তি প্রকাশ করছিল। দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত টান ছিল। অনেকে অনেক ভাবে দুজনকে আটকানোর চেষ্টা করেছে, যাতে ওরা একে অপরের সাথে না মেশে। কেউ কিছু করতে পারেনি। সৌম্য একটু ভীতু আর নূপুর ছিল পুরো উল্টো, এক ডাকাবুকো মেয়ে। তের বছর বয়সের একটা মেয়ে নূপুর, যে বয়সে মেয়েরা পরিনত হয়না, পুতুল খেলে কাটায়, নূপুর তখন সুজুকি ফিওরো গাড়ি চালায়, ছেলেদের সাথে টক্কর নেয়, ছেলেদের সাথে গাড়ির রেস দেয়, ক্যারাম খেলাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেদের হারিয়ে দেয়, ক্রিকেট খেলে। আর সৌম্য তখন একবারে বাচ্চা ছেলে। হাফ প্যান্ট পরে পড়তে আসে, ভীষণ দুষ্টু, ছোটাছুটি করে বেড়ায়। মাথাতে সবসময় দুষ্টুমি বুদ্ধি ঘোরে। সৌম্যকে হাফ প্যান্ট ছাড়ানোর জন্য নূপুরকে অনেক সাধ্য সাধনা করতে হয়েছে, মুখের ওপর অপমানও করেছে ব্যাচের সামনে যাতে সৌম্য লজ্জা পেয়ে ফুল প্যান্ট পরে।


*** (গল্প থেকে বেরিয়ে কিছুটা এই সময়ের কথা বলছি। আজ ২৯ শে আগস্ট, ২০১৬। সকাল ১১ টা ৪১ মিনিট। আই.এস.আই তে বসে লিখছি। আত্মজীবনীর এই খণ্ডটা শুরু করার প্রথমেই বিতর্কে জড়ালাম। গতকাল ২৮ শে আগস্ট, রাত সাড়ে ন’টাতে আমার ফোনে একটা ফোন আসে। ফোন জিনিসটা এমনিতেই আমার কাছে এক বিরক্তিকর বস্তু। তবু প্রয়োজনে রাখতে হয়। ফোনটা যিনি করেন, উনি নিজের পরিচয় দিলেন করিমপুর থানার এক পুলিশ। পদ জানিনা। বলেননি। কয়েকটা কথা যা বললেন, সেগুলো এমন –
তুই সৌম্যজিৎ দত্ত বলছিস? বাপ – শঙ্কর দত্ত? তোর নামে জি.ডি হয়েছে। তুই একটা মেয়েকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে উত্যক্ত করছিস। সাইবার ক্রাইম। শোন বাড়াবাড়ি করছিস ..

ব্যস, এটুকু বলতেই আমার খারাপ লাগল, আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। একেতে আমি কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করিনি, কোনো সাইবার ক্রাইম করিনি, তার ওপর আমার সাথে তুই তুই করে কথা বলছে। সে যেই হোক, তুই তুই করে এভাবে কথা বলছে আমার সাথে? মানুষের কাছে এত সম্মান পেয়েছি, কোনো অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত নই, আর এক লোক  পুলিশের পরিচয়ে এভাবে কথা বলবে? না, সেটা ভয় পেয়ে আর যেই মানুক, আমি সৌম্যজিৎ দত্ত, আমি মানবো না। অপরাধ, অন্যায়কে ভয় পাইনা, সত্যের পথে চলি। সত্যের পথে মানবতাবাদি লেখক তসলিমা নাসরিন’কে আদর্শ মেনে চলি, সম্মানজনক জায়গাতে কাজ করি, সেখানে আমি এমন মিথ্যে আর অন্যায় হুমকি কখনই মানবো না। আমি ফোন রেখে দিলাম। ক্রাইম করেছি কি করিনি সেটা প্রমাণ সাপেক্ষ। সৌম্যজিৎ দত্ত এত দুর্বল নয় যে বাজে হুমকিতে ভয় পেয়ে হুশ হারাবে। ঘটনাটা আমার কাছে যথেষ্ট বিরক্তিকর মনে হল। রাতে এক বন্ধু মারফৎ নূপুরের কিছু কথা জানতে পারলাম। আমার লেখালেখিতে নূপুরের কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমি যেন তার নাম এখানে ব্যবহার না করি। ঝামেলা পছন্দ করিনা আমি। লেখা শুরু করার আগে অনেক চিন্তা করেছি, বারবার ভেবেছি এভাবে একটা আসল নাম তুলে ধরবো, সেটা মেয়েটার জন্য ঠিক হবে? কিন্তু মন থেকে একটাই উত্তর পেয়েছি, আমি যদি নাম পাল্টে অন্যকোনো নাম লিখি, তবে সত্যিকে কি অপমান করা হবেনা? পাঠকদের কি আমি সত্যি থেকে বঞ্চিত করবো না? আর আমি তো বানিয়ে বানিয়ে কোনো মিথ্যে গল্প লিখছিনা, আমি সত্যি লিখছি। মানুষের জীবনের প্রতি মুহূর্তে একটা করে সত্যি তৈরী হয়, সেই সত্যিটা যদি কাগজের পাতাতে জমা হয়, তাতে তো কোনো লজ্জা নেই, কোনো অপরাধও নেই। অপরাধ, লজ্জা মানুষের মনে থাকে। মানুষ যেটাকে মনে মনে ভাবে ভুল, অথচ জেনে শুনেও একটু আনন্দ পেতে সেই ভুলটা করে, সেটাকে মানুষ প্রকাশ করতে লজ্জা পায়, ভয় পায়, সেটাকে অন্যায় ভাবে। তাছাড়া আমি মনে করিনা যে নূপুর জেনেশুনে সম্পর্কে কোনো ভুল করেছিল বলে। অজান্তে মানুষের অনেক ভুল হয়ে থাকে, যেটা হয়ত সময়সাপেক্ষে বড় আকার ধারন করে, কিন্তু এই গল্পের নায়িকা ছিল আদর্শ প্রেমিকা। হ্যাঁ, সেও কিছু ভুল করেছিল, কিন্তু সেটা ছিল ভুল বোঝাবুঝি। আর গল্পের নায়ক সেই ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে জর্জরিত হয়ে স্থির বুদ্ধির অভাবে অন্যায় পথে চলতে শুরু করেছিল। লেখকেরা যখন কিছু লেখে, তখন তারা শুধু নিজের জন্য লেখেনা, তারা মানুষের জন্য লেখে, পাঠকদের জন্য লেখে। সমাজকে একটা বার্তা দিতে চায়। আমিও সমাজকে একটা বার্তা দিতেই এই লেখা শুরু করেছি। ভুল বোঝাবুঝি থেকে একটা মানুষ বা কিছু মানুষকে সারাজীবন যে শাস্তি বয়ে বেড়াতে হয়, মানুষ যদি সময় থাকতে সেই ভুল বোঝাবুঝিকে চিনতে পারে, তবে মানুষ অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে অগ্রসর হতে পারবে। শুধু এটুকুর জন্যই আমার এই লেখা “শুরু থেকে” শুরু করেছি।)




২.

যখন দেখি তোমাকে, এক অজানা ভালোলাগা ছুঁয়ে যায়, পাশে চম্পা, সীমাদের সাথে গল্প করো, হাসো, আমি আড় চোখে তোমাকে বারেবারে দেখি। তোমার প্রতিটা নজর আমার চোখকে কখনও এড়িয়ে যায়নি। এক অদ্ভুতরকম হাসি হাসতাম দাঁত বার করে, তুমি মুগ্ধ হয়ে দেখতে। তোমার মুগ্ধ চোখ আমার চোখে ঝিলিক খেলাত। লাজুক ছিলাম, লজ্জা পেতাম, হাসিতে লজ্জা ঝরে পড়ত।

আগে আগে চলে আসতাম, তোমার অপেক্ষা করতাম। আমার পরপরই তুমি ঢুকতে। খুব ইচ্ছা করত তোমার খুব কাছে যাই, হাত দিয়ে ধরি তোমার গালদুটো, নাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাসকে আমার নাকে, মুখে, ঠোঁটে মাখি। ইচ্ছা করত দরজার পাশে তোমাকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ি, আমার ঠোঁটদুটো বুলিয়ে দিই তোমার ঠোঁটে, গলাতে। তোমাকে হাল্কা করে চেপে ধরি, একটু জড়িয়ে ধরি। বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরি তোমাকে। ছুটির সময় যখন অন্ধকার হয়ে যেত, আমি যেন সেই অন্ধকারেরই অপেক্ষা করতাম। সবার নজর এড়িয়ে তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। ইচ্ছা করত তোমাকে চুমু খাই, সাহস আর হয়ে উঠত না। তোমার শরীরে সবসময় যে ঘামের গন্ধ থাকত, আমি সবার অজান্তেই সেই গন্ধটাকে পান করতাম। কখনো বুঝেছ?

সেই সময় তুমি দিল্লি গেছিলে। দু’সপ্তাহ যে কি ভীষণ কষ্ট আর অপেক্ষা নিয়ে দিনগুলো কেটেছে, যেন হাহাকার! রুমা বারেবারে আমার কাছে ছুটে আসে। রুমাকে আমি খুব কাছথেকে চিনতাম। ও আমার সাথে সবসময় লেগে থাকত, জুরে থাকত। বারবার আমার ঘরে আসে, বারবার আমার জানালায় এসে আমার সাথে কথা বলে। ভালোবাসতাম ওকে, নিজের থেকেও বেশি ভালবাসতাম। ওর কষ্ট সহ্য করতে পারিনা। ওর কষ্ট হলে আমি কষ্ট পাই খুব। কান্না পায় আমার। বাসবোই না কেন? মেয়েটা আমাকে পাগল করে দিত সবসময়। কথা নেই বার্তা নেই, রাত নেই দিন নেই বারেবারে ছুটে আসে, একটু দেখে বা হাসে, মা’র সাথে কথা বলে আর আমার ঘরে উঁকি মারে, আবার পালায়। ও বুঝতে পেরেছিল মনেহয় যে আমি তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি, আমাকে খুব বেশিই চিনত ও। একসময় দেখতাম ও আমার জানালায় এসে বারবার তোমার নামে আমাকে দু-চার কথা শুনিয়ে যেত। বলত তুমি অহংকারী, দিদি তোমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দেয় বা করে দেয়। তুমি ছেলেদের সাথে ঝামেলা করো রাস্তাঘাটে। আরও কত কি বলত! আমি প্রতিবাদ করে উঠতাম, বুঝতাম আমার সেই প্রতিবাদ করে ওঠাটা ওকে খুব কষ্ট দিত। কিন্তু তোমার নামে ও কিছু বলুক, আমি সহ্য করতে পারতাম না। তুমি হঠাৎ করেই ফিরে এলে দিল্লি থেকে। প্রথমে রুমাদের বাড়িতে গেছিলে। তোমার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বাড়িতে আসা, আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু ভয় হোক বা লজ্জা, তুমি পারোনি সেদিন। তবু সাহস করে বাড়ির সামনে এসে সাইকেলে বেল বাজিয়ে ছিলে। তোমার ওই হাঙ্ক স্ট্রেট হ্যান্ড সাইকেলের বেল আমি কোটি কোটি সাইকেলের বেলের থেকে আলাদা করতে পারি না দেখেই। বেল শুনে বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল। ছুটে আসলাম, দেখি তুমি গেটের বাইরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। খুব কালো হয়ে ফিরেছিলে, তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। তবু আমাকে দেখে যেন তোমার চোখ থেকে ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। আমাকে বললে, তোর অঙ্ক খাতাটা দে। বাহানা খুঁজে বার করতে তোমার জুরি মেলা ভার। দিদিকে বলেছিলে অঙ্কে পিছিয়ে পড়েছ, দিদি তোমাকে বলেছিল রুমার কাছথেকে খাতা নিতে। তুমি বলেছিলে সৌম্যর কাছথেকে নিই? দিদি জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন ও পড়াশোনাতে ভালো নাকি যে ওর কাছথেকে নিবি? তুমি বলেছিলে ভালোই তো।


৩.

আমি হেরে যাচ্ছি সবকিছুতে। তুমি পাপ্পুর সাথে ক্যারাম খেলছ, পড়া শেষে পাপ্পুর সাথে কোথায় একটা যাচ্ছ। পাপ্পুর সাথে বেশি কথা বলছ। স্যার বারেবারে কেমন ইঙ্গিত করছে তোমাকে আর পাপ্পুকে নিয়ে। ব্যাচে দিনগুলো খুব অসহায় কাটছে। বাড়ি ফিরছি রাস্তা থেকে একবুক আগুন নিয়ে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করছে। দিনেরপর দিন আমি ভেঙে পড়ছি, শুকিয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ছি, বই সামনে খুলে শুধু মনে মনে তোমার সাথে কথা বলছি, অনেক অনেক অভিযোগ করছি আর কাঁদছি। রাতগুলো দীর্ঘ কাটছে। রুমাকে একেবারে সহ্য হচ্ছেনা, বারবার আমার কাছে আসছে, আমাকে কেমন ভাবে দেখছে। পাশে এসে বসছে। ওর উপস্থিতি আমাকে বিরক্ত করছে, যেন গোটা ঘরে আমি আমার কান্নার শব্দের থেকে বেশি করে রুমার শ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ পাচ্ছি আর দেওয়াল ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটা ঘোরার খচখচ শব্দ আমার কানদুটো ঝালাপালা করে দিচ্ছে। রুমা আমাকে বারেবারে জিজ্ঞাসা করছে, কি হয়েছে তোর? আমি কোনো কথা বলছিনা। শুধু ইচ্ছা করছে দেওয়াল ঘড়িটাতে ঘুসি মেরে ভেঙে ফেলি আর রুমার গলা টিপে ওর প্রশ্নগুলো বন্ধ করে দিই। দুটোর একটাও করিনা। আমি চুপ করে থাকি।


“হঠাৎ আসা মেঘ আর উতলে ওঠা ঢেউয়ে
প্রাণ  চঞ্চল হয়ে ওঠে কোনো এক গভীর ক্ষতকে অনুভব করে।
রক্তের সাথে দানা বেঁধে আছে যে স্পর্শ,
অস্পর্শেই তা ক্ষত করে হৃৎপিণ্ডকে বারে বারে।”


পড়াশোনা দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিনের অনুশীলন ঠিকমত করতে পারছিনা। ইতিহাস, ভূগোল, বাংলা, জীবন বিজ্ঞান পাতার পর পাতা পড়া জমে থাকছে। ইংরাজি সহজাত, অঙ্ক ও ভৌতবিজ্ঞান ভালোবাসি। কোনোরকমে এই তিনটে বিষয় পড়ছি। তাও সেভাবে চিন্তাভাবনা না করেই পড়ছি। পড়ছি, যেন মন নেই। বাকি বিষয়গুলোতে একেবারেই পড়া হচ্ছেনা। এই তিনটেতে যদিও বা একটু পড়ি, চিন্তাভাবনাহীন। পাতার পর পাতা বীজগণিতের অঙ্ক কষছি, যেন মাথা কাজ করছে না। অঙ্ক মুখস্থ হয়ে গেছে। বই না দেখেই অঙ্কগুলোর প্রশ্ন খাতাতে লিখছি, আর সমাধান করছি। কিন্তু ওই একই রকমের অন্য অঙ্ক করতে গেলে চার, পাঁচ ভুল করে সমাধান করতে পারছি। বিশ্বাস, ভরসা আমার সবথেকে বড় শক্তি। এতদিন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করেছি মনের তীব্র জোরে। এখন সেই বিশ্বাস বড় ঠুনকো মনে হচ্ছে। নিজেকে একেবারে নিয়ন্ত্রন করতে পারছিনা। বারেবারে ভাবছি ভুলে যাবো সব, আমি কেন ভালোবাসবো। তুমি তো আমাকে ভালোই বাসোনি। শুধু আমিই বেসেছি আর আমিই কষ্ট পাচ্ছি। খেতে পারছিনা, ঘুমোতে পারছিনা। সবসময় দেবদাসের মতো মন খারাপ নিয়ে পড়ে আছি। তুমি তো পাপ্পুর সাথে গল্প করো, ছুটির শেষে পাপ্পুর সাথে যাও কোথায় একটা। আমার কি? তোমার ইচ্ছায় তুমি ঘুরছ। কিন্তু তবু আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি ভুলতে পারছিনা। পারছিনা কিছু। আমি হেরে যাচ্ছি।


“এক মহাকাশ ভালোবাসা আমি বুকে ধরেছি,
আলো আছে, অন্ধকার আছে, ঘূর্ণাবর্ত আছে, বৃষ্টিও আছে,
জোর করে ধরিনি।
কক্ষপথের তীব্র আকর্ষণে ছুটে গেছি তোমার কাছে,
গা ঘেসে ভালোবাসা দিতে চেয়েছি,
বাইরে কত সুন্দর আরও উপগ্রহদের আমি দেখিনি,
শুধু দেখেছি তোমায় অপ্রতিম।”



আচ্ছা তুমিও মণ্ডল, পাপ্পুও মণ্ডল। আমি দত্ত। তাই বুঝি আমাকে ভালোবাসো না? কিন্তু আমি দত্ত তাতে কি? সবাই তো বলে আমরা চাঁদসওদাগর বংশ। বনিক জাতি। আমরা তো নিচু নই। কোনোভাবেই তোমাদের থেকে নিচু নই, বরং আমাদের বংশের সাথে ইতিহাস জুরে আছে। তাহলে কি শুধু পদবি আলাদা বলেই আমাকে ভালবাসবেনা??


আচ্ছা। তোমরা বিয়ে কর। সুখে সংসার কর। আমি সারাজীবন একাই থাকবো। শুধু তোমাদের যখন মেয়ে হবে, আমাকে সেই মেয়েটা দিও। আমি ওকে নিয়ে বাঁচবো। ওকেই ভালবাসবো। বড় করবো। ও আমার মেয়ে হবে। আচ্ছা নূপুর, সত্যিই কি তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি। সবটাই কি শুধুই আমিই বেসেছি?


“কতদিন, কতরাত পার হয়ে যায় হাহাকারে,
বুক ফেটে চৌচির হয়,
কত প্রশ্ন দরজা, জানলা দিয়ে প্লাবন বইয়ে দেয়,
আমি অসহায়।
ঘুম হারিয়েছি, খিদে হারিয়েছি, ভরসা হারিয়েছি নিজের,
যেটুকু চলছি,
তলিয়ে যাচ্ছি সমুদ্রের তলদেশে।”



৪.



জীবন বারেবারে সুযোগ দেয়। প্রতিটা মুহূর্তে প্রতিটা চিন্তা ও চিন্তার পিছনে ব্যর্থতা একটা করে নতুন রাস্তা খুলে দেয় লড়াই করার। লড়াইকে লড়ার মানসিকতা, সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করার নামও জীবন। আবার সময়কে সময়ের মতো করে বইতে দিয়ে নিজেকে স্রোতের টানে ভাসতে দেওয়াটাও জীবন। উপভোগ দুটোই করা যায়। আমি সৌম্য, একদিকে আমার সারল্য, ভালোবাসা, সবকিছুর মধ্যে থেকে হাসিকে খুঁজে বার করা, আবেগে ভেসে যাওয়া আমার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে আমি সময় বিশেষে চরম প্রতিহিংসা পরায়ন, বিজয় অভিলাসি, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে যেকোনো বাধা, দুর্গম পথ পেরোতে দ্বিধাহীন।


একটা মেয়ে ও। আমি কেন নিজেকে শেষ করে ফেলছি একটা মেয়ের জন্য? আমি তো অপরাজেয়। হ্যাঁ, সৌম্য অপরাজেয়। মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিশিং, সল্ভ ফ্যাক্টর, দুটো থিওরেম, দুটো ইংরাজি কবিতা, বাংলাতে দেনা পাওনা, তাসের ঘর, ফিজিক্সের ভেক্টরের দশটা অঙ্ক সমাধান করে ফেললাম। সৌম্য অপরাজেয়, আমি হেরে যাবো না। আজ মন ভীষণ চনমনে লাগছে। হ্যাঁ, আমি আমার পুরোনো বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছি। স্কুলে পরপর দুবার ক্লাস নাইনে ফেল করা তরুন ও বিকাশ, রীতিমত সেকশানের গুন্ডা হয়ে উঠেছে। ওদের কেউ ঘাঁটতে যায়না। অঙ্কের ক্লাসে কেউ কথা বললে মাথা গরম হয়ে যায় আমার। সেদিন শেষ বেঞ্চে বসে আছি, থিওরেম বোঝার চেষ্টা করছি অঙ্কের ক্লাসে। হঠাৎ তরুন আমার খাতাটা নিয়ে নিল, কাগজ ছিঁড়ে নোংরা কথা লিখে এর ওর দিকে ছুঁড়ে মারবে।


আমার খাতাতে হাত দিয়েছে? আমার খাতাতে নোংরা কথা লিখবে, ছিঁড়বে নোংরা হাতে? আমি তখন খাতাটা কেড়ে নিলাম। স্যার সামনে আছে, তাই ওরা তখন কিছু বলল না। স্যার চলে যেতেই তরুন আর বিকাশ এসে আমার জামার কলার চেপে ধরল। আমি বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে তরুন ও বিকাশের গলা টিপে ধরেছি দুহাতে দুজনের, ওদের শরীরে আর জোর নেই উঠে দাঁড়ানোর। সবাই অবাক। সৌম্য কখনো কারোর সাথে ঝামেলা করেনা, আজ ওই দুই গুণ্ডার গলা টিপে ধরেছে দু হাত দিয়ে।
দিনেশ বাবুর ডাক পড়ল। মানিক মনে হয় দিনেশ বাবুকে ডেকে ছিল। দিনেশ বাবুর ভয়ে গোটা স্কুল কাঁপে। আর মানিক আমাদের ক্লাসের এক বন্ধু। আমি মানিক ও শ্রীকান্তকে খুব সম্মান করি। দুজনেই ভীষণ সাহসী ও সৎ। আমি দুজনকে খুব ভরসা করি, ওরা সত্যের সাথে থাকে সবসময়। মানিক দিনেশ বাবুকে জানাল, সৌম্য দুহাতে তরুন আর বিকাশের গলা টিপে ধরেছিল, এটাও বলল তরুন আর বিকাশ ক্লাসে খুব ঝামেলা করে। দিনেশ বাবু আমাদের তিনজনকেই বোর্ডের কাছে ডাকলেন, বললেন কি হয়েছে শুনতে চাইনা, তিনজনেই কান ধরে ওঠবোস কর দশবার। তিনজনেই তাই করলাম। তরুন, বিকাশ সেদিনের পর আর ঝামেলা করেনি আমার সাথে।







৫.


আমাকে যেতে হবে অনেক দূরে,
এখানেই তবে শেষ,
ফিরবো না কখনো, তুমি ভালো থেকো,
আমার চোখে প্রেমের রেশ।

অনেক দেখেছি স্বপ্নে তোমায়,
থাকতে চেয়েছি পাশে, ভালোবাসি শুধু এটুকু জানাতে চেয়েছি,
পারিনি হয়ত জানাতে।
বুকের মধ্যে গর্জায় মেঘ, অঝরে বইতে চায় প্রাণ,
চোখের কালো আবছায়াতে ভিজিয়ে দেয় ভালোবাসা।




বড় অস্থির মনে হচ্ছে। দুদিন ভালোই ছিলাম। আবার যখন তোমাকে সামনে, খুব কাছে থেকে দেখলাম, দেখলাম যেন মনের ভিতরে প্রবল বর্ষণ হয়ে গেছে, বৃষ্টি শেষে চারিদিকে ঝলমলে সবুজ আর নতুন বাতাসের গন্ধ ভেসে আসছে। সেদিন আমরা ব্যাচের মধ্যেই স্যার আসার আগে ঠিক করলাম লুকোচুরি খেলবো। বুদ্ধিটা আমারই ছিল। আমি ভেবেছিলাম লুকোনোর বাহানায় আমি তোমার কাছে যাবো, আরও কাছথেকে অনুভব করবো তোমাকে। কিন্তু রুমা বাধ সাধল। তোমাকে চোর করা হল। নিরুপায় আমি জানালার পাশে এসে লুকিয়ে পড়লাম একা, ভাবলাম ওই একা জায়গায় তুমি নিশ্চয় আমাকে খুঁজতে আসবে। কিন্তু রুমা সেটা হতে দিলনা। আমি জানালায় লুকিয়েছি, আর রুমা আমার কাছে এসে লুকোলো। আমার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে রুমা। আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাস আমার মুখের ওপর পড়ছে, ওর চোখ অন্যকিছু বলতে চাইছে, রুমার চোখ দিয়ে ভালোবাসা ঠিকরে বের হচ্ছে, আর ঠোঁট কাঁপছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে রুমার নিঃশ্বাসে। আমি বুঝতে পারি, রুমা ছোট থেকে ভীষণ জেদি, ও আমাকে ভালোবাসে, ও তোমাকে আর আমাকে কাছে আসতে দেবে না। এমনিতে মনের মধ্যে তীব্র অসহায়তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছি, আর রুমা সুযোগ খুঁজেই যাচ্ছে আমাকে পাওয়ার জন্য। সব বুঝি আমি, তবু আমাকে মনের মধ্যেই চেপে রাখতে হয়। আমার একটা ভুল পদক্ষেপ রুমার জীবনে যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে। আমি রুমাকে সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে নিজে ধরা দিই তোমার সামনে। সেদিন খুব বকা শুনতে হয়েছিল আমাদের সবাইকেই। আমরা ওভাবে পড়তে গিয়ে হৈচৈ করে খেলতে শুরু করেছিলাম বলে।

Wednesday, 21 September 2016

রজনীগন্ধা।
সৌম্যজিৎ।

আমি রজনীগন্ধা,
লোকে লোকে আমাকে চেনে রাতের রজনী নামে,
দিনে রাতে এপাড়ায় ভিড় জমে পুরুষের,
এ ঘর, সে ঘর সব ঘরে বন্ধ দরজা, জানালার পিছনে ঠিক যেন পরিবারের মতো -
রোজ একটা করে পরিবার গড়ে ওঠে,
কিছু মুহূর্তের জন্য স্বামী, স্ত্রী'র মতো একটা পরিবার।
আমার ঘরেও একটা করে পরিবার হয় রোজ,
ঘরের আসবাবপত্র, টেবিল, আয়না, বিছানা সব স্থির, যেমন থাকে,
আমিও সেই পরিবারের একটা স্থির অংশ, জড় পদার্থের মতো,
শুধু পাল্টে যায় পুরুষ মানুষটার মুখ।
লোকের চোখে আমি একটা শুধুই আস্ত রক্ত মাংসের শরীর,
এক জীবন্ত জড়। প্রাণ আছে, শরীর আছে, রক্ত, মাংস সব আছে,
শুধু মন নেই।
মন নেই, প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই, নেই কোনো শখ, আল্লাদ,
শুধু সেই পুরুষগুলোর মনোরঞ্জনের জন্য মুখে রং মেখে, শরীরে সুগন্ধি মেখে,
তাদের হাতে নিজেকে তুলে দেওয়া।


আমারও একটা পরিবার ছিল,
একটাই পরিবার আবছা মনে আসে।
আমি তখন পাঁচ, ছয় হবো,
বাড়িতে উঠোনে দৌঁড়ে দৌঁড়ে খেলতাম, রাতে মা'র কোলে মাথা রেখে ঘুমাতাম,
বাবা ভোর রাতে রিক্সা নিয়ে বের হয়ে যেত,
সন্ধ্যার পর মাতাল হয়ে ফিরত।
একদিন ভীষণ জ্বরে মা আমার বিছানা থেকে উঠতে পারলনা,
আমি পাশের গ্রামের ডাক্তার ডাকতে যাবো, মা আমাকে বারবার যেতে নিষেধ করছিল,
আমি শুনিনি। দৌঁড়ে গিয়ে দেখি ডাক্তার নেই, বাড়ি ফিরে এসে –
উঠোন ভর্তি ভিড় ঠেলে ঘরে ঢুকে দেখি মা শুয়ে আছে,
চুপচাপ। একদম স্থির হয়ে আছে, ঘরের সব জিনিসের মতো স্থির।
আমি ডাকলাম, “মা।”
“মা ওঠো, কথা বলো।”
মা উঠল না। কথা বলল না।
বাবাকে কিছু মানুষ ধরে আনল,
পা টলতে টলতে বাবা এসে মা’র সামনে কিছুক্ষণ বসে থাকল।
তারপর সবাইমিলে মা’কে নিয়ে গেল,
পুড়ে ছারখার হল গোটা শরীর।
কিছুদিন বাবার দেখা পেলাম না, যখন ফিরল,
আমায় এসে বলল, “তুই নতুন জায়গায় যাবি। সেখানে অনেক মানুষ পাবি।
সবাই তোকে খুব ভালোবাসবে, খাইয়ে দেবে।”
আমাকে নিয়ে এখানে চলে এলো।
এ পাড়ার মাসির কাছে আমাকে রেখে বলল,
“আজ থেকে এখানেই থাকবি। মাসি যা বলবে, তাই করবি।
আমি আসবো মাঝে মাঝে। দেখা করে যাবো।”
বাবা চলে গেল।
আর সে এখানে আসেনি।
মাসি আমাকে নাচ শেখাল, গান শেখাল, খাবার দিল,
দিদিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল,
আস্তে আস্তে এটাই আমার পরিবার হয়ে গেল।


এখন আমি বড় হয়েছি, ভরা যৌবন, টানটান চামড়া শরীর জুরে আছে,
আমার ঘরে এখন রোজ রোজ নতুন সঙ্গী আসে, পুরুষ সঙ্গী।
গায়ে পারফিউম আর মুখে মদের গন্ধ নিয়ে আসে,
টলকাতে টলকাতে এসে দরজায় কড়া নাড়ে,
দরজা খুললেই ভিতরে ঢুকে আমাকে জড়িয়ে ধরে,
দরজা বন্ধ করে গোটা শরীরে চুমু খায়, গায়ের কাপড় খুলে দিয়ে –
নেকড়ের মতো কামড়ে কামড়ে দাগ বসিয়ে দেয়,
আমি যন্ত্রণাতে ছটপট করি, যন্ত্রণাতে মুখ ফুটে বেরিয়ে আসা আওয়াজে
তারা তৃপ্ত হয়।
ওরা আমার যন্ত্রণা বোঝেনা, ওরা শুধু আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা-
যন্ত্রণার আওয়াজ উপভোগ করে।
আমি যত চিৎকার করি, তত জোরে আমাকে চেপে ধরে নখের আঁচড় দেয়,
কামড়ায়।
শরীর ফুটে রক্তের দাগ বেরিয়ে আসে।
আমি চুপ হয়ে যাই।


আমার পেট ভারি হয়েছে,
একজন সন্তান আসছে আমার কোলে,
সন্তানের বাবা, মা দুটোই আমি,
শুধু চিন্তাগুলো মাথা নাড়া দিয়ে ওঠে, সন্তানের ভবিষ্যৎ কি হবে!
যদি মেয়ে হয়, সেও কি আমার মতো করেই বড় হবে এখানে?
সেও কি কখনো আমারই মতো করে যন্ত্রণায় ছটপট করবে আর-
পুরুষগুলো সেটাকে উপভোগ করবে?
আমি চাইনা আমার সন্তান এখানে থাকুক,
আমি চাই সে নিজের পরিচয়ে সম্মানের সাথে বড় হোক,
আমি চাই সে লড়াই করুক অসহায় মেয়েদের জন্য,
আমি চাই আর যেন কোনো মেয়ে এই যন্ত্রণার মধ্যে জীবন না কাটায়।
এক মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের কথা খুব শুনি,
শুনেছি সে নারীদের জন্য অনেক লড়াই করে,
নারীর অধিকার তুলে ধরার চেষ্টা করছে,
আমি চাই আমার সন্তানও যেন নারীদের জন্য লড়াই করে,
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে,
নারীর কষ্ট দূর করতে তসলিমা নাসরিনের মতো একজন মানুষ হয়ে ওঠে।

আরেকটা রজনীগন্ধা যেন এখানে না আসে আমার মতো,
বরং সমস্ত জায়গায় যেন একটা করে তসলিমা নাসরিন জন্ম নিয়ে আসে।

Tuesday, 20 September 2016


এক আদর্শের লক্ষ্যে।
সৌম্যজিৎ।


জীবন লাগে পূর্ণ এখন,
ভালোবাসার হাসি জুরেছে প্রাণে,
এদিক সেদিক চিন্তাগুলো আজ -
হারিয়েছে প্রান্তরে।


আজ প্রথম আমি অনুভব করি, -
আজ আমি একা নই,
আজ আমার পরিচয় পেয়েছি,
লক্ষ্য পেয়েছি দৌঁড়োনোর।
আজ আমি আদর্শের পথে পেয়েছি -
এক হীরের খনি,
চকমকিতে আলো দেখায়,
পথ হারানোর চিন্তা গেছে মুছে।
মানব শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী -
তোমার আশকারা আর আঁচল ঢালা স্নেহে -
জড়িয়েছ আমায় স্পর্শে স্পর্শে,
ভয় নাই আর, সে যেমনই হোক দুর্গম পথ,
আমি চলবো।
রোদে পোড়া দিন হোক বা
অন্ধকার ঘুটঘুটে রাত,
বা হোক সে ফাটলে ফাটলে জমা পাথুরে খাদ,
আমি চলবো এক আদর্শের লক্ষ্যে। 

Wednesday, 14 September 2016




আজ হঠাৎ তোমাকে খুঁজে পাওয়া,
অনেক অনেক প্রতীক্ষার পর তুমি আসলে আবার,
চারিদিকে মৃত্যুখেলা চলছে,
বিভীশিখাময় এই খেলায় আমি ভীত! না, ভীত হতে বড় মানা,
সব ওলট পালট হলেও আমাকে ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতে হয় রক্ত চোখে মৃত্যুখেলা দেখতে।
শরীটাও বড় দুর্বল আজ। গায়ে গতরে নিজেকে সামলে, তীব্র মনের জোরে হাসপাতাল আর বাড়ি,
কখন কি হয়ে যায়!। 
এই বুঝি একটা ফোন, আর আমার কানে বেজে উঠল মৃত্যু ধ্বনি,
"পেশেন্ট হ্যাজ এক্সপায়ারড।"
মৃত্যু বড় অসহায় লাগে, এই একটু আগে মানুষটা হেসেছে, কথা বলেছে,
এখন এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল। ভয়!
ভয়কে ভয় পাওয়ার অভ্যাস অনেক আগেই ছেড়ে এসেছি যখন তোমার আদর্শকে 
শিরোধার্য করে নিয়েছি। 
এবার শুধু প্রতীক্ষা। 


আজ দিন ছিল আমার মত্ততার,
সুরার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে আজকের দিনটাকেই স্থির করে নিয়েছিলাম,
আজ দিন ছিল বহু অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তোমার ফিরে আসার আনন্দ, 
শুধু আমারই জন্য।
হোক না সে উপলক্ষ অন্যকেউ,
তবু তো আজ আমার তুমিকে আমি ফিরে পেয়েছিলাম,
সমস্ত আনন্দ মাটিতে মিশে আমাকে স্থির করেদিল ফোনটা,
"অবস্থা খারাপ। হাসপাতালে যাচ্ছি।"
অসহায় লাগছে বড়,
না, কোনো জাদুর ছড়ি আমার হাতে থাকলে বোধ হয় এত অসহায় হয়ে যেতাম না।
কান্নায় ভেঙে পড়তে ইচ্ছা করছে, তবু কাঁদতে মানা,
আমাকে সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, কর্তব্য করে যেতে হবে সবাইকে ভরসা দিয়ে,
আমায় কি ভাংলে চলে? 


********** সৌম্যজিৎ **********

Tuesday, 13 September 2016

তুমিহীন, স্নেহহীন।
সৌম্যজিৎ।


আমার সমস্ত শ্বাস প্রশ্বাসে
শুধু তোমার নামের জয়ধ্বনি ওঠে,
আমার সমস্ত এগিয়ে যাওয়া পথে
আমি দেখতে পাই তোমার চলা জীবন, অনুভব করি তোমারই স্পর্শ।
শেষ হয়ে যাওয়া জীবন লাগে তখন
যখন কেটে যায় অনেক মুহূর্ত তোমার স্নেহ বিহীন,
অন্ধকার লাগে প্রতিটা মুহূর্ত অনেক আলোর মাঝেও,
যেন অনেক পাওয়ার মধ্যেও নিঃসঙ্গতা গ্রাস করছে সমস্ত বিবেক জুরে,
অসহায় হয়ে উঠছি প্রতিটা মুহূর্তে যেন জেতার মাঝেও আমি হেরে যাচ্ছি,
শক্তিহীন হয়ে পড়ছি, ভঙ্গুর হয়ে পড়ছি ভিতর থেকে,
ঝাঁজরা বুকটার বাইরে এক শক্ত আবরন শুধু লড়াই করছে উদ্দেশ্যহীন
জেতার পথে, ক্লান্ত পথিকের মতো।


ফিরিয়ে দাও সেই স্নেহ যা
শুধু তোমার প্রতি আমারই, কেবল আমারই অধিকার তুলে ধরে,
আমাকে একটু শক্ত করে ধরো যেন
ক্লান্ত হয়ে কখনো হেরে না যাই।
কতদিন কেটে গেছে আমি ব্রাত্য আছি তোমার স্নেহে,
আমাকে ফুরিয়ে যেতে দিওনা।
তুমি আমার সাহস, তুমি আমার উৎসাহ,
সকল ভালোবাসাতেও আমি অপূর্ণ থেকে যাই যখন
হয়ে যাই তুমিহীন, স্নেহহীন।























Saturday, 10 September 2016

উতল প্রেম।
সৌম্যজিৎ।

প্রতি মুহূর্তের ছটপটানি আর
ভালোবাসার তীব্র আগুন স্পর্শে জ্বলে পুড়ে খাঁক হচ্ছে মন,
কি এক অদ্ভুত নেশার দোলাচলে বইছি, আমি আমার মধ্যেই যেন নেই আর।
ইচ্ছা করছে ওই জানালাতে পিছন ঘুরে থাকা মানুষটাকে জড়িয়ে ধরি পিছন থেকে,
ইচ্ছা করছে গালে, ঠোঁটে, মুখে, গলাতে চুমু ছুঁইয়ে দিই আমার ঠোঁটের স্পর্শে,
আঙ্গুলগুলোতে আঙ্গুল ছুঁইয়ে দিই,
হারিয়ে যাই এক অন্য পৃথিবীতে প্রেমে মত্ত হয়ে।
বিছানার সাদা চাদরটা একলা পড়ে আছে, নিঃসঙ্গ,
মাখতে চাইছে দুটো শরীরে জড়াজড়ি করে,
সাবানের শুখনো গন্ধটা মেখে আছে একাকী,
শরীরী গন্ধে তৃষ্ণা মেটাতে চাইছে।
লজ্জা নামের বস্তুটা হারিয়ে ফেলেছি দুজনেই,
দুজনের মাঝে আর লুকোনোরও নেই কিছু,
এখন শুধু বাকি সেই মিলন স্পর্শ,
শরীরে, মনে, আবেগে একাকার হয়ে যাওয়া।
দাড়ির খোঁচা খোঁচা স্পর্শ তোমার শরীরে শিহরন তুলছে,
শিহরিত তোমার প্রাণও,
ভালোবেসে আমি ছুঁয়ে গেছি তোমাকে আমাদের ভালোবাসার গভীর মত্ততায়,
দূরও আর দূর নয়, ইঞ্চি দূরত্বও মুছে গেছে মধ্যেখানে।
শরৎ শুধু তোমারই, শুধুই ভালোবাসার। 

Friday, 9 September 2016

খোলা হাওয়ায় একলা বসে ভাবি, সীমাহীন পথে যখন আমি দিশাহীন, এক আদর্শের যোদ্ধা আমাকে পথ দেখায়।  যুদ্ধ ঘটে প্রতিনিয়ত, জীবনের প্রতিক্ষেত্রে। ভাঙা গড়া দিয়ে মিলে মিশে ওঠে জীবন, আর ভেঙে পড়ার পর যখন উঠে দাঁড়ানোর শক্তি খুঁজি, দেখি সামনে এক আলোর জ্যোতি আমাকে স্মরণ করাচ্ছে জীবন বিভীশিখার পরও একাকী লড়ে গড়ে ওঠার বাস্তব রূপ। লড়াই সে লড়েছে সত্য প্রতিষ্ঠা করতে, সমাজবুকে আদর্শ নিয়ে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, লড়াই সে লড়েছে অধিকার ছিনিয়ে নিতে,
ছোট বড় বিভেদ সে মানেনি। সে লড়াই করেছে নির্ভীক খোলাখুলি, লড়াই করেছে বহুযুগের হয়ে আসা, ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা রাজনীতি, ধর্মনীতি ও বৃহৎ মস্তিষ্কের দার্শনিক চিন্তাতে গড়া একছত্র
আধিপত্য নিয়ে থাকা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। সুখের জীবন সে চাইনি, আদর্শের খাতিরে ডাক্তারির চাকরি ত্যাগ করেছে, সামাজিক মর্যাদা ত্যাগ করেছে, ত্যাগ করেছে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার সাধারন জীবন। মিথ্যে কলঙ্ককে মাথা পেতে নেয়নি, পাল্টা লড়াই করেছে গায়ে লাগা কলঙ্কের বিরুদ্ধে,
আদর্শের খাতিরে ভেঙে পড়েও মাথা নত করেনি ভণ্ড পুরুষতন্ত্রের সামনে। নিজেকে কখনো বিকিয়ে দেয়নি খোলা বাজারে। মৃত্যুর সামনে মাথা নত করেনি, মৃত্যু থেকে বাঁচতে কোনো ছদ্মবেশী রূপে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে লড়েছে মিথ্যে কলঙ্ককে নির্মূল করতে। দেশ ছাড়া হয়েছে, পররাষ্ট্রে এসে অপমানিত হয়েছে রাজনৈতিক শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে, দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ভারত রাষ্ট্রের কাছে। তারপরেও সে নিজের গতিমুখ পাল্টায়নি। আজও সে লড়ছে সমাজে প্রতিটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আজও সে নির্ভীক। বিতর্ক পদে পদে তাকে অনুসরন করেছে, তার পরেও সে নিজের জায়গায় অটল। এমন মানসিক সাহস সে শুধু নিজেই ধরে রাখেনি, আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। জীবনময় যুদ্ধ করেও যদি সে এখনও লড়াই করে বাঁচতে ও এগোতে পারে, তবে আমরা কেন পারবো না? আমি কেন পারবো না? ধৈর্য, আদর্শ, সততা, আত্মবিশ্বাসকে শক্তি করে আমরাও যেকোনো লড়াই লড়তে পারি নির্ভীক। এই আদর্শ তসলিমা নাসরিনের। অন্যায়ের সামনে আমরা কখনো মাথা নত করব না। লড়াই আসবে পদে পদে, লড়াই থেকে পিঠ বাঁচিয়ে পালাবো না। জিতবো। জিতবোই। 

Thursday, 8 September 2016


ভালোবাসার ভালোবাসাকে।

কোথায় সে ছবিওয়ালি বা বাঁশিওয়ালি বা গানওয়ালি,
একটু ভালোবাসা ছুঁইয়ে দিয়ে যাও,
বড় অগোছালো আমিটাকে একটু সাজিয়ে দাও,
বেশি তো নয়, একটুখানি প্রেম দিয়ে যাও।
কবিতার রাজ্যে বড় আকাল পড়েছে, মাঠে ঘাটে খাঁ খাঁ করছে মাটি,
ফাটল ধরেছে বড় বড়,
একটুখানি ভূমি আবাদ করে দিয়ে যাও।

কোথায় আছে তোমার সেই রঙ তুলি,
রঙ তুলি তোমার হাতে সে আমার মনে কোনো এক জাদুর ছড়ি,
রঙে রঙে কবিতা এঁকে দাও আমার শূন্য মনে,
শুধু একটুখানি প্রেম দিয়ে যাও।

ফাঁকে ফাঁকে শরৎ স্পর্শে ছাতিম ফুলের মালা গেঁথে দাও,
বুকে বড় শূন্যতা জুরে আছে,
একটা ছাতিম মালা পরিয়ে দিয়ে যাও,
শুধু একটুখানি প্রেম বিলিয়ে দাও।

********** সৌম্যজিৎ (শরৎ) ********** 

Sunday, 4 September 2016

সে বলেছিল শরিয়তি নিয়মের সংশোধন প্রয়োজন, তবেই নারী মর্যাদা পাবে। সে কখনোই বলেনি ইসলামের সংশোধন প্রয়োজন। মিথ্যে কলঙ্ক দিয়ে তাকে মারার চেষ্টা করা হল। অপদস্ত করা হল রাস্তাতে তার বৃদ্ধ বাবার গায়ে হাত তুলে,  ডাক্তারখানাতে ভাংচুর করে, তাকে দেশ ছাড়া করে। গোটা মানুষজাতির লজ্জা। আর পশ্চিমবঙ্গ যেটা করেছিল বা করছে, সেটা আমার ভারতের লজ্জা, দেশবাসীর কলঙ্ক। এরা শুধু অমানুষই হতে পেরেছে, শিক্ষার আলোকে মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। "লজ্জা" লেখা হয়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষয়ে মানুষের মনে চেতনার উন্মেষ ঘটাতে,  বাংলাদেশকে অপদস্ত করতে নয় বা মুসলিম জাতিকে নিচু করতে লেখা হয়নি। তবু তার দিকে অভিযোগ তোলা হল যে সে ভারতের হয়ে দালালি করে বাংলাদেশের সম্মানহানি করেছে। মৌলবাদরা কি এতটাই অন্ধ! দেশের সাধারন নাগরিকরা কি এতটাই বোকা বা সম্মহিত! অনেক প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে, তোমরা নিজেদের মানসিকতাকে জিজ্ঞাসা কর। ভারত আর বাংলাদেশ নামেই আলাদা, সীমানা তৈরি করে আলাদা করা হয়েছে, রাজনৈতিক হিংসা, আক্রোশ, একে অপরকে নিচু দেখানোর চেষ্টা করছে সাধারন মানুষ। প্রশ্ন কর নিজেদের মানসিকতাকে, মানুষ হয়ে আমরা কি শুধু সীমানাভিত্তিক হিংসাকেই প্রশ্রয় দেব? নাকি একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হব?

"মানুষ হয়ে জন্মেছ, মানুষ জন্মকে বৃথা যেতে দিওনা।
ভালোবাসো, ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসাকে অমর করে তোলো।
মনুষ্যত্বকে দৃষ্টান্ত করে তোলো।"

বীর যোদ্ধা।
সৌম্যজিৎ।

ওই দ্যাখ এক বীর, মানুষ হয়ে এসেছে মানুষ গড়তে,
সবাই তাকে বলেছিল নারী,
নারী তাই তাকে দুর্বল হতে হবে, নারী তাই তাকে পরনির্ভর হতে হবে,
নারী তাই তাকে আটকা পড়তে হবে শেকল বাঁধা পায়ে ...

নারীই, তবে নারীবীর, নারী শ্রেষ্ট যোদ্ধা,
নারীত্ব তার দুর্বলতা নয়, বরং সে নারীত্বের অহংকার।
কত কিই না করেছে, কত কিই না সয়েছে সে,
রাতের পর রাত, দিনের পর দিন
মৃত্যু তাকে ধাওয়া করেছে পিছন পিছন,
সে ভেঙেছে, ভয় পেয়েছে মনে মনে,
আবার উঠে দাঁড়িয়েছে একাই সব ভয়কে পিছনে ঠেলে,
সে দাঁড়িয়েছে আদর্শকে হাতিয়ার করে,
সততা, নিষ্ঠা আর ভালোবাসাকে প্রাণে ধরে।
সর্বকালের শ্রেষ্ট যোদ্ধা সে আমার চোখে,
সর্বকালের সেরা আদর্শবিদ।
আদর্শ যার শিরায়, মজ্জায় প্রবাহিত,
তাকে তোরা মারবি কি?

শোন মৌলবাদের দল,
তোরা অনেক মিলে তাকে মারতে চেয়েছিস, কাটতে চেয়েছিস,
সে একাই তোদের দিয়েছে লজ্জা,
আঘাত হেনেছে তোদের পুরুষত্বে,
আজ তোরা কলঙ্কিত।
কলঙ্ক তোদের ললাটে লেগে আছে,
তোদের দেখে হাসি পায়, তোদের দেখে করুণা জাগে মনে,
মানুষ রূপে অমানুষই হয়েছিস,
কলঙ্কিত করেছিস ধরণী বুক।

মুসলিম বলে গর্ববোধ করিস মিছেই,
তোরা জানিসই না শরিয়তি আর ইসলাম,
মিথ্যে কলঙ্কের কালি লেপে-
অসভ্যের মতো অস্ত্রহাতে রাস্তায় বেরিয়েছিলিস,
তবে ধর্ম করলি কোথায়?
ধর্ম হল মনুষ্যত্বকে নিজমধ্যে ধারন করা,
ধর্ম মানে মানুষ মারা নয়,
ধর্ম মানে গালাগালি বা কোনো জাত নয়,
ধর্ম আসে কর্মে, সম্মানে, ভালোবাসাতে।
তোরা ধার্মিক হতে শিখিসইনি।

গর্ব করি আমি মানুষ জন্ম নিয়ে,
গর্ব করি তার আদর্শে আলোকিত হয়ে,
আদর্শ আর শিক্ষা দেখেছি তার জ্ঞানের আলোকে,
তোদের দেখি শুধুই অন্ধকারের রাজত্বে।

হিংসা, হানাহানি সব ডুবেছে ভালোবাসাতে,
ভালোবাসতে শিখেছি, ভালোবাসাকে জেনেছি, উপলব্ধি করেছি,
ভালোবাসাতে মর্যাদা খুঁজে পাই গর্ব করার,
মিথ্যে কে নিয়ে অহঙ্কার কখনো আদর্শ হতে পারেনা।
বীর যোদ্ধা। 
সৌম্যজিৎ। 

ওই দ্যাখ এক বীর, মানুষ হয়ে এসেছে মানুষ গড়তে,
সবাই তাকে বলেছিল নারী,
নারী তাই তাকে দুর্বল হতে হবে, নারী তাই তাকে পরনির্ভর হতে হবে,
নারী তাই তাকে আটকা পড়তে হবে শেকল বাঁধা পায়ে ...


নারীই, তবে নারীবীর, নারী শ্রেষ্ট যোদ্ধা,
নারীত্ব তার দুর্বলতা নয়, বরং সে নারীত্বের অহংকার। 
কত কিই না করেছে, কত কিই না সয়েছে সে,
রাতের পর রাত, দিনের পর দিন 
মৃত্যু তাকে ধাওয়া করেছে পিছন পিছন, 
সে ভেঙেছে, ভয় পেয়েছে মনে মনে,
আবার উঠে দাঁড়িয়েছে একাই সব ভয়কে পিছনে ঠেলে,
সে দাঁড়িয়েছে আদর্শকে হাতিয়ার করে,
সততা, নিষ্ঠা আর ভালোবাসাকে প্রাণে ধরে। 
সর্বকালের শ্রেষ্ট যোদ্ধা সে আমার চোখে,
সর্বকালের সেরা আদর্শবিদ।
আদর্শ যার শিরায়, মজ্জায় প্রবাহিত,
তাকে তোরা মারবি কি?


শোন মৌলবাদের দল, 
তোরা অনেক মিলে তাকে মারতে চেয়েছিস, কাটতে চেয়েছিস,
সে একাই তোদের দিয়েছে লজ্জা, 
আঘাত হেনেছে তোদের পুরুষত্বে,
আজ তোরা কলঙ্কিত। 
কলঙ্ক তোদের ললাটে লেগে আছে,
তোদের দেখে হাসি পায়, তোদের দেখে করুণা জাগে মনে,
মানুষ রূপে অমানুষই হয়েছিস,
কলঙ্কিত করেছিস ধরণী বুক। 


মুসলিম বলে গর্ববোধ করিস মিছেই,
তোরা জানিসই না শরিয়তি আর ইসলাম,
মিথ্যে কলঙ্কের কালি লেপে-
অসভ্যের মতো অস্ত্রহাতে রাস্তায় বেরিয়েছিলিস,
তবে ধর্ম করলি কোথায়?
ধর্ম হল মনুষ্যত্বকে নিজমধ্যে ধারন করা,
ধর্ম মানে মানুষ মারা নয়,
ধর্ম মানে গালাগালি বা কোনো জাত নয়,
ধর্ম আসে কর্মে, সম্মানে, ভালোবাসাতে। 
তোরা ধার্মিক হতে শিখিসইনি।


গর্ব করি আমি মানুষ জন্ম নিয়ে,
গর্ব করি তার আদর্শে আলোকিত হয়ে,
আদর্শ আর শিক্ষা দেখেছি তার জ্ঞানের আলোকে,
তোদের দেখি শুধুই অন্ধকারের রাজত্বে। 


হিংসা, হানাহানি সব ডুবেছে ভালোবাসাতে,
ভালোবাসতে শিখেছি, ভালোবাসাকে জেনেছি, উপলব্ধি করেছি, 
ভালোবাসাতে মর্যাদা খুঁজে পাই গর্ব করার,
মিথ্যে কে নিয়ে অহঙ্কার কখনো আদর্শ হতে পারেনা। 

Saturday, 3 September 2016

ভালোবাসার পাশে এক আগুন জ্বলছে বুকে,
অতৃপ্তি নিয়ে ঘোরা এক নিঃসঙ্গতা,
গলার তৃষ্ণা আজ বুকে, চোখে, ঠোঁটে, পুরুষাঙ্গে, গোটা শরীরে,
যেন একটু ছোঁয়াতে, একটু জড়িয়ে ধরাতে,
অন্ধকারে আলো আবছায়াতে বিছানায় জেগে ওঠা প্রেমে সে তৃপ্ত হতে পারে।
মনের ভালোবাসা আর আসেনা,
আগুন স্পর্শে মোমের পরিনতি গলিত ভালোবাসার রূপ নিয়েছে,
আজ শুধুই উত্তপ্ততা আছে বুকে, শরীরের ঘর্মবিন্দুতে ওষ্ঠ স্পর্শে পান করার।

ভালোবাসার পাশে এক আগুন জ্বলছে বুকে,
থার্মোমিটারে পারদ চড়ছে,
উতলে ওঠা ঢেউয়ের মতো বা উত্তপ্ত উতলে ওঠা দুধের মতো
উতলে উঠতে চাইছে।

ভালোবাসার পাশে এক আগুন জ্বলছে বুকে।


********** সৌম্যজিৎ **********

Friday, 2 September 2016


প্রাত্যহিক।
সৌম্যজিৎ।


সকালবেলার স্বপ্ন ভাঙে ঘুম ভেঙে ওঠা হুমকিতে,
গালাগালিতে কান ভরে,
জমা হয় রাগ আর অভিমান। 
সারাদিন না খাওয়ার পন সকালের হুঙ্কারেই নিশ্চিৎ হয়ে যায়,
গালাগালি আসেনা মুখে, তাই উপোসে থেকেই প্রাণ প্রতিবাদ জানায়। 
বেরিয়ে যাওয়া গন্তব্যের লক্ষ্যে, পথে মেলে পথচারীরা,
মুখে তাদের নানান প্রশ্ন, নানান জিজ্ঞাসা।
-কেউ বলে "কেমন চলছে, দেশ পেরোনোর স্বপ্ন দ্যাখো?"
-কেউ টানে রাজনীতি, বলে "তোমাদেরই পোয়াবারো।
-দেশ যায় যাক, মানুষ শুষে যাক, লুটে যাক, 
তোমরা ভোগ করে নাও। নিজে বাঁচলেই বাপের নাম।"
কথা বলিনা, চুপ করে হেঁটে যাই, 
শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।


রোজ দেখি ইনস্টিটিউটে সিকিউরিটিদের অপমান, 
ওরা করে নিজেদের কাজ, ঠাই দাঁড়িয়ে থাকে কাঠ ফাটা রোদে,
বিজ্ঞজনেদের পরিচয়পত্র ভুল করে দেখতে চাইলেই, মেলে অহঙ্কারের অপমান -
"রোজ রোজ পরিচয়পত্র দেখতে পারবোনা। আমি এখানে প্রফেসর।"
দেখি, আর মনে মনে একটু হাসি,
হাসি প্রকাশ পায় ঠোঁটের কোণা জুরে,
নিঃশব্দে পরিচয়পত্রটুকু দেখিয়ে ভিতরে চলে যাই।


কেবিনে ঢুকে যেন স্বস্তির ছোঁয়া, কেবিনটা'ই যেন ঘর বাড়ি,
নিশ্চিন্তে এসির হাওয়ায় ছবি তুলি মনের খুশিতে,
মাঝে মাঝে আসে মোহনা ম্যাম, ছবিতে তার এলার্জি, 
তার হোক এলার্জি আমার তো নয়, তাকে দিয়েই তাই ছবি তোলাই,
দু-তিনটে হাসির কথাতে মনটা যেন ভুলিয়ে দিয়ে যায়। 


মাথায় চলছে নতুন চিন্তা, "মোবাইল কম্পিউটিং আর ওয়ার্লেস কমিউনিকেশন,
ইন্টারনেট ছাড়া কিভাবে করা যায় ভিডিও চ্যাট।"
বই ঘাঁটাঘাঁটি আর ক্লাস নেওয়া, মাঝে মাঝে মোহনা ম্যামের ঘুরে ফিরে এসে খোঁজ নিয়ে যাওয়া,
একলা কেবিনের চুপচাপ পরিবেশে হালকা মেজাজের ছোঁয়া দিয়ে যাওয়া। 
দিব্যি কাটে সময়টা তখন, মাঝে মাঝেই ঢু মারি ফেসবুকের পাতায়,
খুলেই সোজা মেয়েমার পেজে,
নতুন কোনো লেখার আশায়। 
আশা আরও থাকে মনে, বারবার মনের মধ্যে একটা সাধ জেগে ওঠে,
আবারও যদি আমার কোনো লেখা ঠাই পায় তার প্রোফাইলে,
জীবন তখন ভরে উঠবে আচমকা আসা অন্য খুশিতে।
রোজ রোজ ভাবি আজ পাবে ঠাই,
অপেক্ষা শেষ হয় অভিমান আর মন খারাপে। 


বাড়ি ফিরেই আবার চেনা অস্বস্তিকর, ভ্যাপসা পরিবেশ,
চিৎকার, চেঁচামেচি, হুমকি - ধমকি,
ভুলিয়ে দেয় সমস্ত দিনের আনন্দ আর খুশি।
সেই এক ঘেয়েমি, ভর সন্ধ্যায় স্নান - খাওয়া, 
বই খুলে, পড়ার তীব্র ইচ্ছাতেও পড়তে না পারা,
লেখালেখি করা বা জেগে জেগে অপ্রয়োজনীয় সব কাজের ফাঁকেও স্বপ্ন দেখা আর
হাসার চেষ্টা, এভাবেই কাটে জীবন। 
তবু একদিন আমি স্বাধিন হবো,
ভেঙেচুরে বেরোবো সেদিন,
একদিন আমি গোটা দেশে ঠিক পরিচয় পাবো। 
একদিন আমি সেরা হবো। 


আবাদ করো আমায়।
সৌম্যজিৎ।

প্রকৃতি ওই মেঘের দেশে গভীর কালোছায়াতে আবৃত,
শুধু একটু নজর কাড়ার আশায় স্বপ্ন বাঁধে হাজারো,
প্রকাশ করে গর্জনে,
বুক কাঁপানো হুঙ্কার তুলে,
এক ফোঁটা বৃষ্টিতে তৃপ্ত হতে পারে ধরণী,
ধরণী আজ কাঠ ফাটা রৌদ্রে শুস্ক ধুলোতে খাঁ খাঁ করছে,
বড় অভিমান নিয়ে আছে বুকে।
একটু বৃষ্টির ফোঁটা দাও আমায়,
আমি তৃষ্ণা মেটাবো,
কত দুপুর আমার ওপর দিয়ে লু বইয়ে নিয়ে যায়,
কত দুপুর আমি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি এক বুক বাঞ্জার জমি,
আবাদ নাই,
নরম তৃন নাই,
নাই এক ফোঁটা ভালোবাসা।

একটু বৃষ্টির ফোঁটা দাও আমায়,
আমি তৃষ্ণা মেটাবো।


Thursday, 1 September 2016



#শুরু_থেকে এখনও পর্যন্ত যতটা লেখা হয়েছে।
আমি সৌম্যজিৎ বলছি ...



শুরু থেকে**************************************************
১.

পাশাপাশি একসাথে চলতে চলতে দুজনে ভাবছিল কিভাবে একে অপরের কাছে আসবে। সেদিন দুজনেই আগে থেকে ফোনে ঠিক করে নিয়েছিল যে আজ তারা চুমু খাবে একে অপরকে। সম্পর্কের পর পাঁচ বছর হতে চলল, সৌম্য আর নূপুর শুধু হাতে হাত ধরে চলা ছাড়া আর কিছুই করেনি। তাতেই দুজনের সুখের শেষ ছিল না।
বয়স কত হবে? বারো পার হয়েছে সবে, নবম শ্রেণীতে পড়ছে সৌম্য, তখন নূপুরের সাথে তার আবার দেখা হয় টিউশান ব্যাচে। প্রথম দিনই নূপুরকে দেখে সৌম্য যেন ফিরে পায় তার ফেলে আসা প্রাইমারী স্কুলের দিনগুলোকে। ফুটফুটে ফর্সা একটা মেয়ে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে, কাঁধে একটা স্টাইলিশ ব্যাগ লাল কালো রঙের, গায়ে কালো রঙের শার্টের ওপর সাদা রঙের বুটিক দেওয়া কাজ আর পরনে ফুল স্কার্ট।

নূপুর এসে সৌম্যর সামনে বসল। একটু মিচকি হাসি হাসল দুজনেই। অঙ্ক করার ফাঁকে দুজনই একে অপরকে লুকিয়ে দেখছিল, এমনভাবে দেখছিল যাতে দুজনের কেউই সেটা জানতে না পারে। কিন্তু বারেবারে চোখে চোখ পড়তেই দুজনে মনে মনে হাসছিল আবার চোখে চোখে বিরক্তি প্রকাশ করছিল। দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত টান ছিল। অনেকে অনেক ভাবে দুজনকে আটকানোর চেষ্টা করেছে, যাতে ওরা একে অপরের সাথে না মেশে। কেউ কিছু করতে পারেনি। সৌম্য একটু ভীতু আর নূপুর ছিল পুরো উল্টো, এক ডাকাবুকো মেয়ে। তের বছর বয়সের একটা মেয়ে নূপুর। যে বয়সে মেয়েরা পরিনত হয়না, পুতুল খেলে কাটায়, নূপুর তখন সুজুকি ফিওরো গাড়ি চালায়, ছেলেদের সাথে টক্কর নেয়, ছেলেদের সাথে গাড়ির রেস দেয়, ক্যারাম খেলাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেদের হারিয়ে দেয়, ক্রিকেট খেলে। আর সৌম্য তখন একবারে বাচ্চা ছেলে। হাফ প্যান্ট পরে পড়তে আসে, ভীষণ দুষ্টু, ছোটাছুটি করে বেড়ায়। মাথাতে সবসময় দুষ্টুমি বুদ্ধি ঘোরে। সৌম্যকে হাফ প্যান্ট ছাড়ানোর জন্য নূপুরকে অনেক সাধ্য সাধনা করতে হয়েছে, মুখের ওপর অপমানও করেছে সে ব্যাচের সামনে যাতে সৌম্য লজ্জা পেয়ে ফুল প্যান্ট পরে।


*** (গল্প থেকে বেরিয়ে কিছুটা এই সময়ের কথা বলছি। আজ ২৯ শে আগস্ট, ২০১৬। সকাল ১১ টা ৪১ মিনিট। আই.এস.আই তে বসে লিখছি। আত্মজীবনীর এই খণ্ডটা শুরু করার প্রথমেই বিতর্কে জড়ালাম। গতকাল ২৮ শে আগস্ট, রাত সাড়ে ন’টাতে আমার ফোনে একটা ফোন আসে। ফোন জিনিসটা এমনিতেই আমার কাছে এক বিরক্তিকর বস্তু। তবু প্রয়োজনে রাখতে হয়। ফোনটা যিনি করেন, উনি নিজের পরিচয় দিলেন করিমপুর থানার এক পুলিশ। পদ জানিনা। বলেননি। কয়েকটা কথা যা বললেন, সেগুলো এমন –
তুই সৌম্যজিৎ দত্ত বলছিস? বাপ – শঙ্কর দত্ত? তোর নামে জি.ডি হয়েছে। তুই একটা মেয়েকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে উত্যক্ত করছিস। সাইবার ক্রাইম। শোন বাড়াবাড়ি করছিস ..

ব্যস, এটুকু বলতেই আমার খারাপ লাগল, আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। একেতে আমি কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করিনি, কোনো সাইবার ক্রাইম করিনি, তার ওপর আমার সাথে তুই তুই করে কথা বলছে। সে যেই হোক, তুই তুই করে এভাবে কথা বলছে আমার সাথে? মানুষের কাছে এত সম্মান পেয়েছি, কোনো অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত নই, আর এক লোক পুলিশের পরিচয়ে এভাবে কথা বলবে? না, সেটা ভয় পেয়ে আর যেই মানুক, আমি সৌম্যজিৎ দত্ত, আমি মানবো না। অপরাধ, অন্যায়কে ভয় পাইনা, সত্যের পথে চলি। সত্যের পথে মানবতাবাদি লেখক তসলিমা নাসরিন’কে আদর্শ মেনে চলি, সম্মানজনক জায়গাতে কাজ করি, সেখানে আমি এমন মিথ্যে আর অন্যায় হুমকি কখনই মানবো না। আমি ফোন রেখে দিলাম। ক্রাইম করেছি কি করিনি সেটা প্রমাণ সাপেক্ষ। সৌম্যজিৎ দত্ত এত দুর্বল নয় যে বাজে হুমকিতে ভয় পেয়ে হুশ হারাবে। ঘটনাটা আমার কাছে যথেষ্ট বিরক্তিকর মনে হল। রাতে এক বন্ধু মারফৎ নূপুরের কিছু কথা জানতে পারলাম। আমার লেখালেখিতে নূপুরের কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমি যেন তার নাম এখানে ব্যবহার না করি। ঝামেলা পছন্দ করিনা আমি। লেখা শুরু করার আগে অনেক চিন্তা করেছি, বারবার ভেবেছি এভাবে একটা আসল নাম তুলে ধরবো, সেটা মেয়েটার জন্য ঠিক হবে? কিন্তু মন থেকে একটাই উত্তর পেয়েছি, আমি যদি নাম পাল্টে অন্যকোনো নাম লিখি, তবে সত্যিকে কি অপমান করা হবেনা? পাঠকদের কি আমি সত্যি থেকে বঞ্চিত করবো না? আর আমি তো বানিয়ে বানিয়ে কোনো মিথ্যে গল্প লিখছিনা, আমি সত্যি লিখছি। মানুষের জীবনের প্রতি মুহূর্তে একটা করে সত্যি তৈরী হয়, সেই সত্যিটা যদি কাগজের পাতাতে জমা হয়, তাতে তো কোনো লজ্জা নেই, কোনো অপরাধও নেই। অপরাধ, লজ্জা মানুষের মনে থাকে। মানুষ যেটাকে মনে মনে ভাবে ভুল, অথচ জেনে শুনেও একটু আনন্দ পেতে সেই ভুলটা করে, সেটাকে মানুষ প্রকাশ করতে লজ্জা পায়, ভয় পায়, সেটাকে অন্যায় ভাবে। তাছাড়া আমি মনে করিনা যে নূপুর জেনেশুনে সম্পর্কে কোনো ভুল করেছিল বলে। অজান্তে মানুষের অনেক ভুল হয়ে থাকে, যেটা হয়ত সময়সাপেক্ষে বড় আকার ধারন করে, কিন্তু এই গল্পের নায়িকা ছিল আদর্শ প্রেমিকা। হ্যাঁ, সেও কিছু ভুল করেছিল, কিন্তু সেটা ছিল ভুল বোঝাবুঝি। আর গল্পের নায়ক সেই ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে জর্জরিত হয়ে স্থির বুদ্ধির অভাবে অন্যায় পথে চলতে শুরু করেছিল। লেখকেরা যখন কিছু লেখে, তখন তারা শুধু নিজের জন্য লেখেনা, তারা মানুষের জন্য লেখে, পাঠকদের জন্য লেখে। সমাজকে একটা বার্তা দিতে চায়। আমিও সমাজকে একটা বার্তা দিতেই এই লেখা শুরু করেছি। ভুল বোঝাবুঝি থেকে একটা মানুষ বা কিছু মানুষকে সারাজীবন যে শাস্তি বয়ে বেড়াতে হয়, মানুষ যদি সময় থাকতে সেই ভুল বোঝাবুঝিকে চিনতে পারে, তবে মানুষ অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে অগ্রসর হতে পারবে। শুধু এটুকুর জন্যই আমার এই লেখা “শুরু থেকে” শুরু করেছি।)




২.

যখন দেখি তোমাকে, এক অজানা ভালোলাগা ছুঁয়ে যায়, পাশে চম্পা, সীমাদের সাথে গল্প করো, হাসো, আমি আড় চোখে তোমাকে বারেবারে দেখি। তোমার প্রতিটা নজর আমার চোখকে কখনও এড়িয়ে যায়নি। এক অদ্ভুতরকম হাসি হাসতাম দাঁত বার করে, তুমি মুগ্ধ হয়ে দেখতে। তোমার মুগ্ধ চোখ আমার চোখে ঝিলিক খেলাত। লাজুক ছিলাম, লজ্জা পেতাম, হাসিতে লজ্জা ঝরে পড়ত।

আগে আগে চলে আসতাম, তোমার অপেক্ষা করতাম। আমার পরপরই তুমি ঢুকতে। খুব ইচ্ছা করত তোমার খুব কাছে যাই, হাত দিয়ে ধরি তোমার গালদুটো, নাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাসকে আমার নাকে, মুখে, ঠোঁটে মাখি। ইচ্ছা করত দরজার পাশে তোমাকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ি, আমার ঠোঁটদুটো বুলিয়ে দিই তোমার ঠোঁটে, গলাতে। তোমাকে হাল্কা করে চেপে ধরি, একটু জড়িয়ে ধরি। বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরি তোমাকে। ছুটির সময় যখন অন্ধকার হয়ে যেত, আমি যেন সেই অন্ধকারেরই অপেক্ষা করতাম। সবার নজর এড়িয়ে তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। ইচ্ছা করত তোমাকে চুমু খাই, সাহস আর হয়ে উঠত না। তোমার শরীরে সবসময় যে ঘামের গন্ধ থাকত, আমি সবার অজান্তেই সেই গন্ধটাকে পান করতাম। কখনো বুঝেছ?

সেই সময় তুমি দিল্লি গেছিলে। দু’সপ্তাহ যে কি ভীষণ কষ্ট আর অপেক্ষা নিয়ে দিনগুলো কেটেছে, যেন হাহাকার! রুমা বারেবারে আমার কাছে ছুটে আসে। রুমাকে আমি খুব কাছথেকে চিনতাম। ও আমার সাথে সবসময় লেগে থাকত, জুরে থাকত। বারবার আমার ঘরে আসে, বারবার আমার জানালায় এসে আমার সাথে কথা বলে। ভালোবাসতাম ওকে, নিজের থেকেও বেশি ভালবাসতাম। ওর কষ্ট সহ্য করতে পারিনা। ওর কষ্ট হলে আমি কষ্ট পাই খুব। কান্না পায় আমার। বাসবোই না কেন? মেয়েটা আমাকে পাগল করে দিত সবসময়। কথা নেই বার্তা নেই, রাত নেই দিন নেই বারেবারে ছুটে আসে, একটু দেখে বা হাসে, মা’র সাথে কথা বলে আর আমার ঘরে উঁকি মারে, আবার পালায়। ও বুঝতে পেরেছিল মনেহয় যে আমি তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি, আমাকে খুব বেশিই চিনত ও। একসময় দেখতাম ও আমার জানালায় এসে বারবার তোমার নামে আমাকে দু-চার কথা শুনিয়ে যেত। বলত তুমি অহংকারী, দিদি তোমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দেয় বা করে দেয়। তুমি ছেলেদের সাথে ঝামেলা করো রাস্তাঘাটে। আরও কত কি বলত! আমি প্রতিবাদ করে উঠতাম, বুঝতাম আমার সেই প্রতিবাদ করে ওঠাটা ওকে খুব কষ্ট দিত। কিন্তু তোমার নামে ও কিছু বলুক, আমি সহ্য করতে পারতাম না। তুমি হঠাৎ করেই ফিরে এলে দিল্লি থেকে। প্রথমে রুমাদের বাড়িতে গেছিলে। তোমার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বাড়িতে আসা, আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু ভয় হোক বা লজ্জা, তুমি পারোনি সেদিন। তবু সাহস করে বাড়ির সামনে এসে সাইকেলে বেল বাজিয়ে ছিলে। তোমার ওই হাঙ্ক স্ট্রেট হ্যান্ড সাইকেলের বেল আমি কোটি কোটি সাইকেলের বেলের থেকে আলাদা করতে পারি না দেখেই। বেল শুনে বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল। ছুটে আসলাম, দেখি তুমি গেটের বাইরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। খুব কালো হয়ে ফিরেছিলে, তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। তবু আমাকে দেখে যেন তোমার চোখ থেকে ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। আমাকে বললে, তোর অঙ্ক খাতাটা দে। বাহানা খুঁজে বার করতে তোমার জুরি মেলা ভার। দিদিকে বলেছিলে অঙ্কে পিছিয়ে পড়েছ, দিদি তোমাকে বলেছিল রুমার কাছথেকে খাতা নিতে। তুমি বলেছিলে সৌম্যর কাছথেকে নিই? দিদি জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন ও পড়াশোনাতে ভালো নাকি যে ওর কাছথেকে নিবি? তুমি বলেছিলে ভালোই তো।


৩.

আমি হেরে যাচ্ছি সবকিছুতে। তুমি পাপ্পুর সাথে ক্যারাম খেলছ, পড়া শেষে পাপ্পুর সাথে কোথায় একটা যাচ্ছ। পাপ্পুর সাথে বেশি কথা বলছ। স্যার বারেবারে কেমন ইঙ্গিত করছে তোমাকে আর পাপ্পুকে নিয়ে। ব্যাচে দিনগুলো খুব অসহায় কাটছে। বাড়ি ফিরছি রাস্তা থেকে একবুক আগুন নিয়ে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করছে। দিনেরপর দিন আমি ভেঙে পড়ছি, শুকিয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ছি, বই সামনে খুলে শুধু মনে মনে তোমার সাথে কথা বলছি, অনেক অনেক অভিযোগ করছি আর কাঁদছি। রাতগুলো দীর্ঘ কাটছে। রুমাকে একেবারে সহ্য হচ্ছেনা, বারবার আমার কাছে আসছে, আমাকে কেমন ভাবে দেখছে। পাশে এসে বসছে। ওর উপস্থিতি আমাকে বিরক্ত করছে, যেন গোটা ঘরে আমি আমার কান্নার শব্দের থেকে বেশি করে রুমার শ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ পাচ্ছি আর দেওয়াল ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটা ঘোরার খচখচ শব্দ আমার কানদুটো ঝালাপালা করে দিচ্ছে। রুমা আমাকে বারেবারে জিজ্ঞাসা করছে, কি হয়েছে তোর? আমি কোনো কথা বলছিনা। শুধু ইচ্ছা করছে দেওয়াল ঘড়িটাতে ঘুসি মেরে ভেঙে ফেলি আর রুমার গলা টিপে ওর প্রশ্নগুলো বন্ধ করে দিই। দুটোর একটাও করিনা। আমি চুপ করে থাকি।


“হঠাৎ আসা মেঘ আর উতলে ওঠা ঢেউয়ে
প্রাণ চঞ্চল হয়ে ওঠে কোনো এক গভীর ক্ষতকে অনুভব করে।
রক্তের সাথে দানা বেঁধে আছে যে স্পর্শ,
অস্পর্শেই তা ক্ষত করে হৃৎপিণ্ডকে বারে বারে।”


পড়াশোনা দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিনের অনুশীলন ঠিকমত করতে পারছিনা। ইতিহাস, ভূগোল, বাংলা, জীবন বিজ্ঞান পাতার পর পাতা পড়া জমে থাকছে। ইংরাজি সহজাত, অঙ্ক ও ভৌতবিজ্ঞান ভালোবাসি। কোনোরকমে এই তিনটে বিষয় পড়ছি। তাও সেভাবে চিন্তাভাবনা না করেই পড়ছি। পড়ছি, যেন মন নেই। বাকি বিষয়গুলোতে একেবারেই পড়া হচ্ছেনা। এই তিনটেতে যদিও বা একটু পড়ি, চিন্তাভাবনাহীন। পাতার পর পাতা বীজগণিতের অঙ্ক কষছি, যেন মাথা কাজ করছে না। অঙ্ক মুখস্থ হয়ে গেছে। বই না দেখেই অঙ্কগুলোর প্রশ্ন খাতাতে লিখছি, আর সমাধান করছি। কিন্তু ওই একই রকমের অন্য অঙ্ক করতে গেলে চার, পাঁচ ভুল করে সমাধান করতে পারছি। বিশ্বাস, ভরসা আমার সবথেকে বড় শক্তি। এতদিন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করেছি মনের তীব্র জোরে। এখন সেই বিশ্বাস বড় ঠুনকো মনে হচ্ছে। নিজেকে একেবারে নিয়ন্ত্রন করতে পারছিনা। বারেবারে ভাবছি ভুলে যাবো সব, আমি কেন ভালোবাসবো। তুমি তো আমাকে ভালোই বাসোনি। শুধু আমিই বেসেছি আর আমিই কষ্ট পাচ্ছি। খেতে পারছিনা, ঘুমোতে পারছিনা। সবসময় দেবদাসের মতো মন খারাপ নিয়ে পড়ে আছি। তুমি তো পাপ্পুর সাথে গল্প করো, ছুটির শেষে পাপ্পুর সাথে যাও কোথায় একটা। আমার কি? তোমার ইচ্ছায় তুমি ঘুরছ। কিন্তু তবু আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি ভুলতে পারছিনা। পারছিনা কিছু। আমি হেরে যাচ্ছি।


“এক মহাকাশ ভালোবাসা আমি বুকে ধরেছি,
আলো আছে, অন্ধকার আছে, ঘূর্ণাবর্ত আছে, বৃষ্টিও আছে,
জোর করে ধরি নি।
কক্ষপথের তীব্র আকর্ষণে ছুটে গেছি তোমার কাছে,
গা ঘেঁষে ভালোবাসা দিতে চেয়েছি,
বাইরে কত সুন্দর আরও উপগ্রহদের আমি দেখি নি,
শুধু দেখেছি তোমায় অপ্রতিম।”



আচ্ছা তুমিও মণ্ডল, পাপ্পুও মণ্ডল। আমি দত্ত। তাই বুঝি আমাকে ভালোবাসো না? কিন্তু আমি দত্ত তাতে কি? সবাই তো বলে আমরা চাঁদসওদাগর বংশ। বনিক জাতি। আমরা তো নিচু নই। কোনোভাবেই তোমাদের থেকে নিচু নই, বরং আমাদের বংশের সাথে ইতিহাস জুরে আছে। তাহলে কি শুধু পদবি আলাদা বলেই আমাকে ভালবাসবেনা??


আচ্ছা। তোমরা বিয়ে কর। সুখে সংসার কর। আমি সারাজীবন একাই থাকবো। শুধু তোমাদের যখন মেয়ে হবে, আমাকে সেই মেয়েটা দিও। আমি ওকে নিয়ে বাঁচবো। ওকেই ভালবাসবো। বড় করবো। ও আমার মেয়ে হবে। আচ্ছা নূপুর, সত্যিই কি তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি। সবটাই কি শুধুই আমিই বেসেছি?


“কতদিন, কতরাত পার হয়ে যায় হাহাকারে,
বুক ফেটে চৌচির হয়,
কত প্রশ্ন দরজা, জানলা দিয়ে প্লাবন বইয়ে দেয়,
আমি অসহায়।
ঘুম হারিয়েছি, খিদে হারিয়েছি, ভরসা হারিয়েছি নিজের,
যেটুকু চলছি,
তলিয়ে যাচ্ছি সমুদ্রের তলদেশে।”



৪.



জীবন বারেবারে সুযোগ দেয়। প্রতিটা মুহূর্তে প্রতিটা চিন্তা ও চিন্তার পিছনে ব্যর্থতা একটা করে নতুন রাস্তা খুলে দেয় লড়াই করার। লড়াইকে লড়ার মানসিকতা, সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করার নামও জীবন। আবার সময়কে সময়ের মতো করে বইতে দিয়ে নিজেকে স্রোতের টানে ভাসতে দেওয়াটাও জীবন। উপভোগ দুটোই করা যায়। আমি সৌম্য, একদিকে আমার সারল্য, ভালোবাসা, সবকিছুর মধ্যে থেকে হাসিকে খুঁজে বার করা, আবেগে ভেসে যাওয়া আমার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে আমি সময় বিশেষে চরম প্রতিহিংসা পরায়ন, বিজয় অভিলাসি, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে যেকোনো বাধা, দুর্গম পথ পেরোতে দ্বিধাহীন।


একটা মেয়ে ও। আমি কেন নিজেকে শেষ করে ফেলছি একটা মেয়ের জন্য? আমি তো অপরাজেয়। হ্যাঁ, সৌম্য অপরাজেয়। মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিশিং, সল্ভ ফ্যাক্টর, দুটো থিওরেম, দুটো ইংরাজি কবিতা, বাংলাতে দেনা পাওনা, তাসের ঘর, ফিজিক্সের ভেক্টরের দশটা অঙ্ক সমাধান করে ফেললাম। সৌম্য অপরাজেয়, আমি হেরে যাবো না। আজ মন ভীষণ চনমনে লাগছে। হ্যাঁ, আমি আমার পুরোনো বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছি। স্কুলে পরপর দুবার ক্লাস নাইনে ফেল করা তরুন ও বিকাশ, রীতিমত সেকশানের গুন্ডা হয়ে উঠেছে। ওদের কেউ ঘাঁটতে যায়না। অঙ্কের ক্লাসে কেউ কথা বললে মাথা গরম হয়ে যায় আমার। সেদিন শেষ বেঞ্চে বসে আছি, থিওরেম বোঝার চেষ্টা করছি অঙ্কের ক্লাসে। হঠাৎ তরুন আমার খাতাটা নিয়ে নিল, কাগজ ছিঁড়ে নোংরা কথা লিখে এর ওর দিকে ছুঁড়ে মারবে।


আমার খাতাতে হাত দিয়েছে? আমার খাতাতে নোংরা কথা লিখবে, ছিঁড়বে নোংরা হাতে? আমি তখন খাতাটা কেড়ে নিলাম। স্যার সামনে আছে, তাই ওরা তখন কিছু বলল না। স্যার চলে যেতেই তরুন আর বিকাশ এসে আমার জামার কলার চেপে ধরল। আমি বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে তরুন ও বিকাশের গলা টিপে ধরেছি দুহাতে দুজনের, ওদের শরীরে আর জোর নেই উঠে দাঁড়ানোর। সবাই অবাক। সৌম্য কখনো কারোর সাথে ঝামেলা করেনা, আজ ওই দুই গুণ্ডার গলা টিপে ধরেছে দু হাত দিয়ে।
দিনেশ বাবুর ডাক পড়ল। মানিক মনে হয় দিনেশ বাবুকে ডেকে ছিল। দিনেশ বাবুর ভয়ে গোটা স্কুল কাঁপে। আর মানিক আমাদের ক্লাসের এক বন্ধু। আমি মানিক ও শ্রীকান্তকে খুব সম্মান করি। দুজনেই ভীষণ সাহসী ও সৎ। আমি দুজনকে খুব ভরসা করি, ওরা সত্যের সাথে থাকে সবসময়। মানিক দিনেশ বাবুকে জানাল, সৌম্য দুহাতে তরুন আর বিকাশের গলা টিপে ধরেছিল, এটাও বলল তরুন আর বিকাশ ক্লাসে খুব ঝামেলা করে। দিনেশ বাবু আমাদের তিনজনকেই বোর্ডের কাছে ডাকলেন, বললেন কি হয়েছে শুনতে চাইনা, তিনজনেই কান ধরে ওঠবোস কর দশবার। তিনজনেই তাই করলাম। তরুন, বিকাশ সেদিনের পর আর ঝামেলা করেনি আমার সাথে।





#শুরু_থেকে এখনও পর্যন্ত যতটা লেখা হয়েছে।
আমি সৌম্যজিৎ বলছি ...



শুরু থেকে**************************************************
১.

পাশাপাশি একসাথে চলতে চলতে দুজনে ভাবছিল কিভাবে একে অপরের কাছে আসবে। সেদিন দুজনেই আগে থেকে ফোনে ঠিক করে নিয়েছিল যে আজ তারা চুমু খাবে একে অপরকে। সম্পর্কের পর পাঁচ বছর হতে চলল, সৌম্য আর নূপুর শুধু হাতে হাত ধরে চলা ছাড়া আর কিছুই করেনি। তাতেই দুজনের সুখের শেষ ছিল না।
বয়স কত হবে? বারো পার হয়েছে সবে, নবম শ্রেণীতে পড়ছে সৌম্য, তখন নূপুরের সাথে তার আবার দেখা হয় টিউশান ব্যাচে। প্রথম দিনই নূপুরকে দেখে সৌম্য যেন ফিরে পায় তার ফেলে আসা প্রাইমারী স্কুলের দিনগুলোকে। ফুটফুটে ফর্সা একটা মেয়ে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে, কাঁধে একটা স্টাইলিশ ব্যাগ লাল কালো রঙের, গায়ে কালো রঙের শার্টের ওপর সাদা রঙের বুটিক দেওয়া কাজ আর পরনে ফুল স্কারট।

নূপুর এসে সৌম্যর সামনে বসল। একটু মিচকি হাসি হাসল দুজনেই। অঙ্ক করার ফাঁকে দুজনই একে অপরকে লুকিয়ে দেখছিল, এমনভাবে দেখছিল যাতে দুজনের কেউই সেটা জানতে না পারে। কিন্তু বারেবারে চোখে চোখ পড়তেই দুজনে মনে মনে হাসছিল আবার চোখে চোখে বিরক্তি প্রকাশ করছিল। দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত টান ছিল। অনেকে অনেক ভাবে দুজনকে আটকানোর চেষ্টা করেছে, যাতে ওরা একে অপরের সাথে না মেশে। কেউ কিছু করতে পারেনি। সৌম্য একটু ভীতু আর নূপুর ছিল পুরো উল্টো, এক ডাকাবুকো মেয়ে। তের বছর বয়সের একটা মেয়ে নূপুর, যে বয়সে মেয়েরা পরিনত হয়না, পুতুল খেলে কাটায়, নূপুর তখন সুজুকি ফিওরো গাড়ি চালায়, ছেলেদের সাথে টক্কর নেয়, ছেলেদের সাথে গাড়ির রেস দেয়, ক্যারাম খেলাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেদের হারিয়ে দেয়, ক্রিকেট খেলে। আর সৌম্য তখন একবারে বাচ্চা ছেলে। হাফ প্যান্ট পরে পড়তে আসে, ভীষণ দুষ্টু, ছোটাছুটি করে বেড়ায়। মাথাতে সবসময় দুষ্টুমি বুদ্ধি ঘোরে। সৌম্যকে হাফ প্যান্ট ছাড়ানোর জন্য নূপুরকে অনেক সাধ্য সাধনা করতে হয়েছে, মুখের ওপর অপমানও করেছে ব্যাচের সামনে যাতে সৌম্য লজ্জা পেয়ে ফুল প্যান্ট পরে।


*** (গল্প থেকে বেরিয়ে কিছুটা এই সময়ের কথা বলছি। আজ ২৯ শে আগস্ট, ২০১৬। সকাল ১১ টা ৪১ মিনিট। আই.এস.আই তে বসে লিখছি। আত্মজীবনীর এই খণ্ডটা শুরু করার প্রথমেই বিতর্কে জড়ালাম। গতকাল ২৮ শে আগস্ট, রাত সাড়ে ন’টাতে আমার ফোনে একটা ফোন আসে। ফোন জিনিসটা এমনিতেই আমার কাছে এক বিরক্তিকর বস্তু। তবু প্রয়োজনে রাখতে হয়। ফোনটা যিনি করেন, উনি নিজের পরিচয় দিলেন করিমপুর থানার এক পুলিশ। পদ জানিনা। বলেননি। কয়েকটা কথা যা বললেন, সেগুলো এমন –
তুই সৌম্যজিৎ দত্ত বলছিস? বাপ – শঙ্কর দত্ত? তোর নামে জি.ডি হয়েছে। তুই একটা মেয়েকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে উত্যক্ত করছিস। সাইবার ক্রাইম। শোন বাড়াবাড়ি করছিস ..

ব্যস, এটুকু বলতেই আমার খারাপ লাগল, আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। একেতে আমি কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করিনি, কোনো সাইবার ক্রাইম করিনি, তার ওপর আমার সাথে তুই তুই করে কথা বলছে। সে যেই হোক, তুই তুই করে এভাবে কথা বলছে আমার সাথে? মানুষের কাছে এত সম্মান পেয়েছি, কোনো অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত নই, আর এক লোক পুলিশের পরিচয়ে এভাবে কথা বলবে? না, সেটা ভয় পেয়ে আর যেই মানুক, আমি সৌম্যজিৎ দত্ত, আমি মানবো না। অপরাধ, অন্যায়কে ভয় পাইনা, সত্যের পথে চলি। সত্যের পথে মানবতাবাদি লেখক তসলিমা নাসরিন’কে আদর্শ মেনে চলি, সম্মানজনক জায়গাতে কাজ করি, সেখানে আমি এমন মিথ্যে আর অন্যায় হুমকি কখনই মানবো না। আমি ফোন রেখে দিলাম। ক্রাইম করেছি কি করিনি সেটা প্রমাণ সাপেক্ষ। সৌম্যজিৎ দত্ত এত দুর্বল নয় যে বাজে হুমকিতে ভয় পেয়ে হুশ হারাবে। ঘটনাটা আমার কাছে যথেষ্ট বিরক্তিকর মনে হল। রাতে এক বন্ধু মারফৎ নূপুরের কিছু কথা জানতে পারলাম। আমার লেখালেখিতে নূপুরের কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমি যেন তার নাম এখানে ব্যবহার না করি। ঝামেলা পছন্দ করিনা আমি। লেখা শুরু করার আগে অনেক চিন্তা করেছি, বারবার ভেবেছি এভাবে একটা আসল নাম তুলে ধরবো, সেটা মেয়েটার জন্য ঠিক হবে? কিন্তু মন থেকে একটাই উত্তর পেয়েছি, আমি যদি নাম পাল্টে অন্যকোনো নাম লিখি, তবে সত্যিকে কি অপমান করা হবেনা? পাঠকদের কি আমি সত্যি থেকে বঞ্চিত করবো না? আর আমি তো বানিয়ে বানিয়ে কোনো মিথ্যে গল্প লিখছিনা, আমি সত্যি লিখছি। মানুষের জীবনের প্রতি মুহূর্তে একটা করে সত্যি তৈরী হয়, সেই সত্যিটা যদি কাগজের পাতাতে জমা হয়, তাতে তো কোনো লজ্জা নেই, কোনো অপরাধও নেই। অপরাধ, লজ্জা মানুষের মনে থাকে। মানুষ যেটাকে মনে মনে ভাবে ভুল, অথচ জেনে শুনেও একটু আনন্দ পেতে সেই ভুলটা করে, সেটাকে মানুষ প্রকাশ করতে লজ্জা পায়, ভয় পায়, সেটাকে অন্যায় ভাবে। তাছাড়া আমি মনে করিনা যে নূপুর জেনেশুনে সম্পর্কে কোনো ভুল করেছিল বলে। অজান্তে মানুষের অনেক ভুল হয়ে থাকে, যেটা হয়ত সময়সাপেক্ষে বড় আকার ধারন করে, কিন্তু এই গল্পের নায়িকা ছিল আদর্শ প্রেমিকা। হ্যাঁ, সেও কিছু ভুল করেছিল, কিন্তু সেটা ছিল ভুল বোঝাবুঝি। আর গল্পের নায়ক সেই ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে জর্জরিত হয়ে স্থির বুদ্ধির অভাবে অন্যায় পথে চলতে শুরু করেছিল। লেখকেরা যখন কিছু লেখে, তখন তারা শুধু নিজের জন্য লেখেনা, তারা মানুষের জন্য লেখে, পাঠকদের জন্য লেখে। সমাজকে একটা বার্তা দিতে চায়। আমিও সমাজকে একটা বার্তা দিতেই এই লেখা শুরু করেছি। ভুল বোঝাবুঝি থেকে একটা মানুষ বা কিছু মানুষকে সারাজীবন যে শাস্তি বয়ে বেড়াতে হয়, মানুষ যদি সময় থাকতে সেই ভুল বোঝাবুঝিকে চিনতে পারে, তবে মানুষ অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে অগ্রসর হতে পারবে। শুধু এটুকুর জন্যই আমার এই লেখা “শুরু থেকে” শুরু করেছি।)




২.

যখন দেখি তোমাকে, এক অজানা ভালোলাগা ছুঁয়ে যায়, পাশে চম্পা, সীমাদের সাথে গল্প করো, হাসো, আমি আড় চোখে তোমাকে বারেবারে দেখি। তোমার প্রতিটা নজর আমার চোখকে কখনও এড়িয়ে যায়নি। এক অদ্ভুতরকম হাসি হাসতাম দাঁত বার করে, তুমি মুগ্ধ হয়ে দেখতে। তোমার মুগ্ধ চোখ আমার চোখে ঝিলিক খেলাত। লাজুক ছিলাম, লজ্জা পেতাম, হাসিতে লজ্জা ঝরে পড়ত।

আগে আগে চলে আসতাম, তোমার অপেক্ষা করতাম। আমার পরপরই তুমি ঢুকতে। খুব ইচ্ছা করত তোমার খুব কাছে যাই, হাত দিয়ে ধরি তোমার গালদুটো, নাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাসকে আমার নাকে, মুখে, ঠোঁটে মাখি। ইচ্ছা করত দরজার পাশে তোমাকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ি, আমার ঠোঁটদুটো বুলিয়ে দিই তোমার ঠোঁটে, গলাতে। তোমাকে হাল্কা করে চেপে ধরি, একটু জড়িয়ে ধরি। বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরি তোমাকে। ছুটির সময় যখন অন্ধকার হয়ে যেত, আমি যেন সেই অন্ধকারেরই অপেক্ষা করতাম। সবার নজর এড়িয়ে তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। ইচ্ছা করত তোমাকে চুমু খাই, সাহস আর হয়ে উঠত না। তোমার শরীরে সবসময় যে ঘামের গন্ধ থাকত, আমি সবার অজান্তেই সেই গন্ধটাকে পান করতাম। কখনো বুঝেছ?

সেই সময় তুমি দিল্লি গেছিলে। দু’সপ্তাহ যে কি ভীষণ কষ্ট আর অপেক্ষা নিয়ে দিনগুলো কেটেছে, যেন হাহাকার! রুমা বারেবারে আমার কাছে ছুটে আসে। রুমাকে আমি খুব কাছথেকে চিনতাম। ও আমার সাথে সবসময় লেগে থাকত, জুরে থাকত। বারবার আমার ঘরে আসে, বারবার আমার জানালায় এসে আমার সাথে কথা বলে। ভালোবাসতাম ওকে, নিজের থেকেও বেশি ভালবাসতাম। ওর কষ্ট সহ্য করতে পারিনা। ওর কষ্ট হলে আমি কষ্ট পাই খুব। কান্না পায় আমার। বাসবোই না কেন? মেয়েটা আমাকে পাগল করে দিত সবসময়। কথা নেই বার্তা নেই, রাত নেই দিন নেই বারেবারে ছুটে আসে, একটু দেখে বা হাসে, মা’র সাথে কথা বলে আর আমার ঘরে উঁকি মারে, আবার পালায়। ও বুঝতে পেরেছিল মনেহয় যে আমি তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি, আমাকে খুব বেশিই চিনত ও। একসময় দেখতাম ও আমার জানালায় এসে বারবার তোমার নামে আমাকে দু-চার কথা শুনিয়ে যেত। বলত তুমি অহংকারী, দিদি তোমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দেয় বা করে দেয়। তুমি ছেলেদের সাথে ঝামেলা করো রাস্তাঘাটে। আরও কত কি বলত! আমি প্রতিবাদ করে উঠতাম, বুঝতাম আমার সেই প্রতিবাদ করে ওঠাটা ওকে খুব কষ্ট দিত। কিন্তু তোমার নামে ও কিছু বলুক, আমি সহ্য করতে পারতাম না। তুমি হঠাৎ করেই ফিরে এলে দিল্লি থেকে। প্রথমে রুমাদের বাড়িতে গেছিলে। তোমার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বাড়িতে আসা, আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু ভয় হোক বা লজ্জা, তুমি পারোনি সেদিন। তবু সাহস করে বাড়ির সামনে এসে সাইকেলে বেল বাজিয়ে ছিলে। তোমার ওই হাঙ্ক স্ট্রেট হ্যান্ড সাইকেলের বেল আমি কোটি কোটি সাইকেলের বেলের থেকে আলাদা করতে পারি না দেখেই। বেল শুনে বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল। ছুটে আসলাম, দেখি তুমি গেটের বাইরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। খুব কালো হয়ে ফিরেছিলে, তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। তবু আমাকে দেখে যেন তোমার চোখ থেকে ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। আমাকে বললে, তোর অঙ্ক খাতাটা দে। বাহানা খুঁজে বার করতে তোমার জুরি মেলা ভার। দিদিকে বলেছিলে অঙ্কে পিছিয়ে পড়েছ, দিদি তোমাকে বলেছিল রুমার কাছথেকে খাতা নিতে। তুমি বলেছিলে সৌম্যর কাছথেকে নিই? দিদি জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন ও পড়াশোনাতে ভালো নাকি যে ওর কাছথেকে নিবি? তুমি বলেছিলে ভালোই তো।


৩.

আমি হেরে যাচ্ছি সবকিছুতে। তুমি পাপ্পুর সাথে ক্যারাম খেলছ, পড়া শেষে পাপ্পুর সাথে কোথায় একটা যাচ্ছ। পাপ্পুর সাথে বেশি কথা বলছ। স্যার বারেবারে কেমন ইঙ্গিত করছে তোমাকে আর পাপ্পুকে নিয়ে। ব্যাচে দিনগুলো খুব অসহায় কাটছে। বাড়ি ফিরছি রাস্তা থেকে একবুক আগুন নিয়ে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করছে। দিনেরপর দিন আমি ভেঙে পড়ছি, শুকিয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ছি, বই সামনে খুলে শুধু মনে মনে তোমার সাথে কথা বলছি, অনেক অনেক অভিযোগ করছি আর কাঁদছি। রাতগুলো দীর্ঘ কাটছে। রুমাকে একেবারে সহ্য হচ্ছেনা, বারবার আমার কাছে আসছে, আমাকে কেমন ভাবে দেখছে। পাশে এসে বসছে। ওর উপস্থিতি আমাকে বিরক্ত করছে, যেন গোটা ঘরে আমি আমার কান্নার শব্দের থেকে বেশি করে রুমার শ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ পাচ্ছি আর দেওয়াল ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটা ঘোরার খচখচ শব্দ আমার কানদুটো ঝালাপালা করে দিচ্ছে। রুমা আমাকে বারেবারে জিজ্ঞাসা করছে, কি হয়েছে তোর? আমি কোনো কথা বলছিনা। শুধু ইচ্ছা করছে দেওয়াল ঘড়িটাতে ঘুসি মেরে ভেঙে ফেলি আর রুমার গলা টিপে ওর প্রশ্নগুলো বন্ধ করে দিই। দুটোর একটাও করিনা। আমি চুপ করে থাকি।


“হঠাৎ আসা মেঘ আর উতলে ওঠা ঢেউয়ে
প্রাণ চঞ্চল হয়ে ওঠে কোনো এক গভীর ক্ষতকে অনুভব করে।
রক্তের সাথে দানা বেঁধে আছে যে স্পর্শ,
অস্পর্শেই তা ক্ষত করে হৃৎপিণ্ডকে বারে বারে।”


পড়াশোনা দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিনের অনুশীলন ঠিকমত করতে পারছিনা। ইতিহাস, ভূগোল, বাংলা, জীবন বিজ্ঞান পাতার পর পাতা পড়া জমে থাকছে। ইংরাজি সহজাত, অঙ্ক ও ভৌতবিজ্ঞান ভালোবাসি। কোনোরকমে এই তিনটে বিষয় পড়ছি। তাও সেভাবে চিন্তাভাবনা না করেই পড়ছি। পড়ছি, যেন মন নেই। বাকি বিষয়গুলোতে একেবারেই পড়া হচ্ছেনা। এই তিনটেতে যদিও বা একটু পড়ি, চিন্তাভাবনাহীন। পাতার পর পাতা বীজগণিতের অঙ্ক কষছি, যেন মাথা কাজ করছে না। অঙ্ক মুখস্থ হয়ে গেছে। বই না দেখেই অঙ্কগুলোর প্রশ্ন খাতাতে লিখছি, আর সমাধান করছি। কিন্তু ওই একই রকমের অন্য অঙ্ক করতে গেলে চার, পাঁচ ভুল করে সমাধান করতে পারছি। বিশ্বাস, ভরসা আমার সবথেকে বড় শক্তি। এতদিন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করেছি মনের তীব্র জোরে। এখন সেই বিশ্বাস বড় ঠুনকো মনে হচ্ছে। নিজেকে একেবারে নিয়ন্ত্রন করতে পারছিনা। বারেবারে ভাবছি ভুলে যাবো সব, আমি কেন ভালোবাসবো। তুমি তো আমাকে ভালোই বাসোনি। শুধু আমিই বেসেছি আর আমিই কষ্ট পাচ্ছি। খেতে পারছিনা, ঘুমোতে পারছিনা। সবসময় দেবদাসের মতো মন খারাপ নিয়ে পড়ে আছি। তুমি তো পাপ্পুর সাথে গল্প করো, ছুটির শেষে পাপ্পুর সাথে যাও কোথায় একটা। আমার কি? তোমার ইচ্ছায় তুমি ঘুরছ। কিন্তু তবু আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি ভুলতে পারছিনা। পারছিনা কিছু। আমি হেরে যাচ্ছি।


“এক মহাকাশ ভালোবাসা আমি বুকে ধরেছি,
আলো আছে, অন্ধকার আছে, ঘূর্ণাবর্ত আছে, বৃষ্টিও আছে,
জোর করে ধরিনি।
কক্ষপথের তীব্র আকর্ষণে ছুটে গেছি তোমার কাছে,
গা ঘেসে ভালোবাসা দিতে চেয়েছি,
বাইরে কত সুন্দর আরও উপগ্রহদের আমি দেখিনি,
শুধু দেখেছি তোমায় অপ্রতিম।”



আচ্ছা তুমিও মণ্ডল, পাপ্পুও মণ্ডল। আমি দত্ত। তাই বুঝি আমাকে ভালোবাসো না? কিন্তু আমি দত্ত তাতে কি? সবাই তো বলে আমরা চাঁদসওদাগর বংশ। বনিক জাতি। আমরা তো নিচু নই। কোনোভাবেই তোমাদের থেকে নিচু নই, বরং আমাদের বংশের সাথে ইতিহাস জুরে আছে। তাহলে কি শুধু পদবি আলাদা বলেই আমাকে ভালবাসবেনা??


আচ্ছা। তোমরা বিয়ে কর। সুখে সংসার কর। আমি সারাজীবন একাই থাকবো। শুধু তোমাদের যখন মেয়ে হবে, আমাকে সেই মেয়েটা দিও। আমি ওকে নিয়ে বাঁচবো। ওকেই ভালবাসবো। বড় করবো। ও আমার মেয়ে হবে। আচ্ছা নূপুর, সত্যিই কি তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি। সবটাই কি শুধুই আমিই বেসেছি?


“কতদিন, কতরাত পার হয়ে যায় হাহাকারে,
বুক ফেটে চৌচির হয়,
কত প্রশ্ন দরজা, জানলা দিয়ে প্লাবন বইয়ে দেয়,
আমি অসহায়।
ঘুম হারিয়েছি, খিদে হারিয়েছি, ভরসা হারিয়েছি নিজের,
যেটুকু চলছি,
তলিয়ে যাচ্ছি সমুদ্রের তলদেশে।”



৪.



জীবন বারেবারে সুযোগ দেয়। প্রতিটা মুহূর্তে প্রতিটা চিন্তা ও চিন্তার পিছনে ব্যর্থতা একটা করে নতুন রাস্তা খুলে দেয় লড়াই করার। লড়াইকে লড়ার মানসিকতা, সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করার নামও জীবন। আবার সময়কে সময়ের মতো করে বইতে দিয়ে নিজেকে স্রোতের টানে ভাসতে দেওয়াটাও জীবন। উপভোগ দুটোই করা যায়। আমি সৌম্য, একদিকে আমার সারল্য, ভালোবাসা, সবকিছুর মধ্যে থেকে হাসিকে খুঁজে বার করা, আবেগে ভেসে যাওয়া আমার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে আমি সময় বিশেষে চরম প্রতিহিংসা পরায়ন, বিজয় অভিলাসি, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে যেকোনো বাধা, দুর্গম পথ পেরোতে দ্বিধাহীন।


একটা মেয়ে ও। আমি কেন নিজেকে শেষ করে ফেলছি একটা মেয়ের জন্য? আমি তো অপরাজেয়। হ্যাঁ, সৌম্য অপরাজেয়। মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিশিং, সল্ভ ফ্যাক্টর, দুটো থিওরেম, দুটো ইংরাজি কবিতা, বাংলাতে দেনা পাওনা, তাসের ঘর, ফিজিক্সের ভেক্টরের দশটা অঙ্ক সমাধান করে ফেললাম। সৌম্য অপরাজেয়, আমি হেরে যাবো না। আজ মন ভীষণ চনমনে লাগছে। হ্যাঁ, আমি আমার পুরোনো বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছি। স্কুলে পরপর দুবার ক্লাস নাইনে ফেল করা তরুন ও বিকাশ, রীতিমত সেকশানের গুন্ডা হয়ে উঠেছে। ওদের কেউ ঘাঁটতে যায়না। অঙ্কের ক্লাসে কেউ কথা বললে মাথা গরম হয়ে যায় আমার। সেদিন শেষ বেঞ্চে বসে আছি, থিওরেম বোঝার চেষ্টা করছি অঙ্কের ক্লাসে। হঠাৎ তরুন আমার খাতাটা নিয়ে নিল, কাগজ ছিঁড়ে নোংরা কথা লিখে এর ওর দিকে ছুঁড়ে মারবে।


আমার খাতাতে হাত দিয়েছে? আমার খাতাতে নোংরা কথা লিখবে, ছিঁড়বে নোংরা হাতে? আমি তখন খাতাটা কেড়ে নিলাম। স্যার সামনে আছে, তাই ওরা তখন কিছু বলল না। স্যার চলে যেতেই তরুন আর বিকাশ এসে আমার জামার কলার চেপে ধরল। আমি বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে তরুন ও বিকাশের গলা টিপে ধরেছি দুহাতে দুজনের, ওদের শরীরে আর জোর নেই উঠে দাঁড়ানোর। সবাই অবাক। সৌম্য কখনো কারোর সাথে ঝামেলা করেনা, আজ ওই দুই গুণ্ডার গলা টিপে ধরেছে দু হাত দিয়ে।
দিনেশ বাবুর ডাক পড়ল। মানিক মনে হয় দিনেশ বাবুকে ডেকে ছিল। দিনেশ বাবুর ভয়ে গোটা স্কুল কাঁপে। আর মানিক আমাদের ক্লাসের এক বন্ধু। আমি মানিক ও শ্রীকান্তকে খুব সম্মান করি। দুজনেই ভীষণ সাহসী ও সৎ। আমি দুজনকে খুব ভরসা করি, ওরা সত্যের সাথে থাকে সবসময়। মানিক দিনেশ বাবুকে জানাল, সৌম্য দুহাতে তরুন আর বিকাশের গলা টিপে ধরেছিল, এটাও বলল তরুন আর বিকাশ ক্লাসে খুব ঝামেলা করে। দিনেশ বাবু আমাদের তিনজনকেই বোর্ডের কাছে ডাকলেন, বললেন কি হয়েছে শুনতে চাইনা, তিনজনেই কান ধরে ওঠবোস কর দশবার। তিনজনেই তাই করলাম। তরুন, বিকাশ সেদিনের পর আর ঝামেলা করেনি আমার সাথে।