Sunday, 28 May 2017







ও জ্যোতির্ময়ী খেলবে কি বলো, কাছে তবে এসো না,
- আজকে থাক না খেলাটা, দুষ্টুমিটা কোরো না।

ও জ্যোতির্ময়ী তোমার চোখের কোণেতে কাজল কাজলে আজ সেজেছে,
- সাজুক চোখ কাজলে, কাজল আমায় আজ পেয়েছে।

ও জ্যোতির্ময়ী তাকিয়ে থেক, তোমার চোখ প্রাণ কেড়েছে,
- চোখ কি কারো প্রাণ কাড়ে! মিথ্যেটি আর বোলো না।

জ্যোতির্ময়ী লক্ষ্মীটি, একবার এসে দেখোই না,
আর কতখানি আবদারে মানবে তুমি বলো না।


- সৌম্যজিৎ।

Saturday, 27 May 2017

আমি অন্ধকারে একদানা চাল খুঁজেছি,
ক্ষুধার্ত থেকেছি,
ভেবেছি কোনো অলৌকিক মায়া এসে আমায় জড়িয়ে ধরবে,
পেট ভরাবে,
সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে, ক্লান্ত হয়ে যখন সময় শেষ করেছি, তখন
নিজমধ্যে এক সম্বিত পেলাম,
ধানের গোলা আমার মস্তিষ্কেই লুকানো, অলৌকিক মায়ার প্রার্থনা ছেড়ে
আমি চেষ্টা করি ধান ভেঙে চাল করতে।
নির্বোধের মত আমি সাফল্যকে তাড়া করেছি,
সাফল্য যে আমার অন্তরেই লুকানো,
সেটাকে তো বেরিয়ে আসতে দিইনি আগে।

-সৌম্যজিৎ।

Friday, 26 May 2017




এ তুমি কোন বাংলাকে ভালবেসে এসেছ আজীবন!
কোন বাংলা উচ্চারণের জন্য হাহুতাশ করেছ! 
সুইডিশ রেসিডেন্সটা তো পাকাপাকিভাবেই পেয়েছিলে,
কোনো বাধা ছিল না, ছিল না পরাধীনতা, ছিল না কোনো অপমান,
সুখের জীবন ছেড়ে কেন আগুনে ঝাঁপ দিতে চাও! 
জানো না বাংলা তোমাকে নিয়ে রকে রকে মজা করে!
বাংলা তোমাকে সম্মান করে না মেয়ে,
আঠারো থেকে আশি, তুমি শুধুই তাদের কটু দৃষ্টি আর গালাগালির বিষয়।
কথায় কথায় ওরা তোমার বাপ মা তুলে কথা বলে,
কথায় কথায় ওরা তোমাকে লাঞ্ছিত করে, ধর্ষণ করে, বেশ্যা বলে।
এসবের পরও তুমি কোন মোহে বাংলাকে নিজের গায়ে, মনে মেখে থাকতে চাও! 
তুমি তো এ ভারত দেশে স্বাধীনভাবে জলটাও খেতে পারো না,
স্বাধীনভাবে ঘুমোতে পারো না, বাস করতে পারো না, ঘুরতেও পারো না,
তবু তুমি ভেবে রেখেছ- ভারতে আছি মানে আমি বাংলাতেই আছি,
অন্তত এটুকুই আমার শান্তনা যে আমি বাংলার কয়েকটা মানুষের সাথে বাংলাতে মিশতে পারছি।
মেয়ে, তুমি বড্ড পাগল,
তোমার সাজানো পুরস্কারে তুমি বাংলাকে চিরকাল গর্বিত করেছ, কিন্তু
বাংলা তোমায় নিয়ে কখনো গর্ব করেনি।
বড্ড বোকা তুমি মেয়ে। 
যারা তোমাকে মাথার তাজ বানাতে চায়, 
তাদের দিকে তুমি ফিরেও তাকাও না,
যারা তোমাকে প্রতিমুহূর্তে দংশন করে, 
তুমি তাদের জন্য হাজারটা কথা বলো, লড়াই করো।


- সৌম্যজিৎ।
এক নারীকে আমি পূজা করেছি,
এক নারীকে আমি অন্তরে অনেক গভীরে নিজের সততা সঁপেছি,
এক নারীকে কেন্দ্র করে আমি ঘুরে ফেলেছি গোটা পৃথিবীটাই,
অন্তত একজন নারীকে আমি আমার সমস্ত সত্তা দিয়ে সম্মান করেছি।
জনে জনে ধরে ধরে সম্মান করার প্রয়োজন হয়না,
একজন নারীর কাছেই তুমি সৎ থেকো,
সমস্ত নারীকেই তুমি সম্মান জানাতে পারবে।


- সৌম্যজিৎ। 



আমি তোমাকে অন্তর থেকে চিনেছি, উপলব্ধি করেছি,
ভালবেসেছি।
ঠিক যতটা চিনলে, যতটা উপলব্ধি করলে,
যতটা ভালবাসলে প্রবল অধৈর্য হয়েও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে
একটু ধৈর্য ধরা যায়,
আমি আজও তোমারই অপেক্ষায় বসে আছি,
তুমি ভালবাসবে ভেবে,
একটু স্নেহ দেবে বলে।

- সৌম্যজিৎ। 

Thursday, 25 May 2017

আমি এক বন্য প্রেমিক।
সৌম্যজিৎ। 


দুচোখের প্রথম তাকিয়ে দেখাটা ছিল বিস্ফারিত,
তোমাকে দেখতে দেখতে চোখ, মুখের যে ক্লান্তির ছাপ তা
নিমেষে উধাও হয়ে যায়,
মন হারিয়ে যায় এক অচেনা জগতে। 
আমি বরাবরের এক বন্য প্রেমিক,
সাদামাটা প্রেম আমাকে কখনোই আচ্ছন্ন করতে পারেনা,
আমার প্রেমে শরীর বাধ মানেনা,
মন অবলীলায় শরীরকে ছুঁয়ে যায়।
আমিও ছুঁয়ে গেছি বারেবারে তোমাকে,
কোনো দ্বিধা ছাড়াই। 
আমার প্রেমের গভীরতা মাপতে হলে তোমাকে 
শরীরী লজ্জার জাল ছিন্ন করে বেরোতে হবে,
ওই শরীরের ছোঁয়াতেই প্রেমের পূর্ণ প্রকাশ আমি ঘটাতে পারি। 
জঙ্গল ভেদ করে জঙ্গলের আরও গভীরে
যখন তোমাকে দেখি আমার কল্পনাকে প্রসারিত করে,
এক বিশাল বটবৃক্ষের দেওয়ালে তোমাকে চেপে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু খেতে থাকি, 
সময় ভুল হয়ে যায়, সময় থমকে যায়,
জীবন্ত শুধু তুমি আর আমি
একে অপরকে জড়িয়ে সভ্যতার চরম অসভ্যতাকেও ছিন্ন করে মেতে থাকি, 
সিন্দুকের প্রতিটা বিন্দুতে তৃষ্ণা মেটে চুমুতে চুমুতে,
নাভিতে খামচে ধরার পর তোমার মুখের অস্ফুট অভিব্যক্তিটুকুও
আমাকে চরম সুখে নিমজ্জিত করে।
আমি বরাবরের এক বন্য প্রেমিক,
যদি গভীরতা মাপতে চাও
বনে তোমাকে স্বাগত। 

Wednesday, 24 May 2017

প্রতিদিন একটু একটু করে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে,
জীবন ডুবতে চলেছে অন্ধকারের অতল গভীরে, 
লড়াই করার মত চার আঙুল জায়গা এখনও বেঁচে আছে,
দেওয়ালে পিঠ ঠেকার থেকে চার আঙুল দূরত্বে দাঁড়িয়ে,
নিঃশ্বাস পড়ছে ঘন ঘন,
সারাদিনের ক্লান্ত বেলার পরও অদেখা ঘুম,
তবু তো চার আঙুল জায়গা এখনও বাকি আছে লড়াই করার। 
কিছু আশা এখনও বেঁচে আছে প্রাণের সমস্ত জোরকে একত্রিত করে,
সমস্ত কালো মেঘকে ধাক্কা দিয়ে পিছনে, অনেক দূরে সরিয়ে দিই,
এখনও চার আঙুল দূরত্ব বাকি আছে প্রাণকে নতুন করে ভরসার জায়গায় অটুট করে তুলতে। 

- সৌম্যজিৎ। 

Tuesday, 23 May 2017



আমার বাংলার মেয়ে তুমি।
উৎসর্গে- লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
সৌম্যজিৎ।


আমার বাংলার মেয়ে তুমি,
আমার প্রাণের আলো তুমি,
আমার ভালবাসা, আমার আশা জুড়ে
শুধু তুমি, শুধু তুমি।

আমার চেতনা শুধু তুমি,
আমার বিশ্বাসজুড়ে তুমি,
আমার শিক্ষা, আমার জ্ঞান
শুধু তুমি, শুধু তুমি।

আমি তোমাকে সঁপেছি প্রাণ,
আমি তোমাতে মেতেছি উল্লাসে,
আমার ভাষা আমার আশা জুড়ে
আমি তোমারই করি নাম।
আমি চিরদিন রবো তোমার,
আমার দৃষ্টিও রবে তোমার,
শুধু দিও তুমি অপার স্নেহ, ভালবাসা -
কিছুই চাইনা আর।

আমার বাংলার মেয়ে তুমি,
আমার ভাষাতে শুধু তুমি,
আমার স্পর্শে স্পর্শে, প্রতিটি শ্বাসে,
ওগো তুমি,
শুধু তুমি। 

Sunday, 21 May 2017


দুঃসময়ের চাঁদ।
সৌম্যজিৎ।

ছবির শিল্পী - মইন চৌধুরী।


দিগন্ত পার করে দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদটা দেখেছে রক্ত ঝরা লাশ,
বাতাসে বাতাসে ভেসে গেছে পোড়া বারুদের গন্ধ,
কালো ধোঁয়ার লক্ষ্যবিন্দু সে -
রাতের পূর্ণিমায় এক ছায়া মূর্তি তারই দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।
ধ্বংস খেলায় যখন পৃথিবী লাশের শ্মশান,
চাঁদটা তখন বারবরিকের মত হিসেব কষছে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা কে!
শুধু ভূমিই বুঝেছে প্রতিটা রক্তবিন্দুর ভার,
শুধু বাতাস শুনেছে মৃত্যুকালীন যোদ্ধার তীব্র যন্ত্রণার হাহাকার,
যুদ্ধকালীন দুঃসময়েও চাঁদটা থেকেছে সাক্ষীর প্রতীক হয়ে,
কালির কলঙ্ক তো তার গায়েই লেগে।


Monday, 15 May 2017

স্কুল শব্দটা দেশের মত। দেশের জন্য যেমন আমাদের আবেগ, দেশপ্রেম থাকে, তেমনই স্কুলের প্রতিও থাকে। একটা স্কুলের আসল গর্ব তখন হয় যখন সেই স্কুলের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ছাত্র, ছাত্রীরা সমাজের সামনে সেই শিক্ষা, আদর্শকে তুলে ধরে, স্কুলকে গৌরবান্বিত করে। আমার জীবনে চলার পথে ছোট থেকে এমন কিছু শিক্ষকের সাথ পেয়েছি যাদের থেকে আমি প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে পেরেছি। কেন জানিনা তবে যে সমস্ত শিক্ষককে সবাই বেশি করে ভয় পেত, আমি তাদের কাছে ভীষণ স্নেহের, ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠতাম। শাস্তি খুব কম পেয়েছি আমি, মার তো একেবারেই খাইনি। জগন্নাথ হাইস্কুলে পড়তে দীনেশ বাবু ও নিশিথ বাবুকে দেখে সবাই হাড়ে কাঁপত। অথচ আমার ক্ষেত্রে দেখেছি আমি ওদের কাছ থেকে ভীষণ আদর পেয়েছি, দীনেশ বাবু এখনও আমি করিমপুরে গেলেই আমাকে বাড়িতে ডেকে স্নেহ করেন। নিশিথ বাবুর কথা আলাদা করে কি বলবো! মানুষটা আমার দিন রাতের বন্ধু হয়ে গেছিলেন অতগুলো বছরে। আমাকে সবসময় নিজের বাড়িতেই রেখে দিতেন। নিজের বাড়িতে কম থেকেছি, স্যারের বাড়িতেই বেশি থেকেছি আমি। আমার কলকাতাতে ভর্তির সময়ও নিশিথ বাবু নিজে দাঁড়িয়ে আমাকে গাইড করেছেন সবসময়। স্যার মারা যাওয়ার মুহূর্তে আমার কোলে মাথা রেখে শুয়েছিলেন। আমি অসহায় হয়ে উঠেছিলাম। জ্যেঠিমা ও পিউ দিদি ভীষণ কাঁদছিলেন, আমাকে বারবার বলছিলেন "শান্ত স্যারকে বাঁচা।" আমি অসহায় হয়ে হাত, পা মালিশ করছিলাম। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে বললেন স্যার মারা গেছে। আমি চুপ হয়ে যায়। উঠে বেরিয়ে এসে বাথরুমে ঢুকে চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। স্যার আমাকে বারবার বলতেন, "সৌম্য কখনো তোর ভিতরের মানুষটাকে বিক্রি করে দিবিনা। তুই পারবি অনেককিছু পাল্টে দিতে।" শিকারপুর হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমাকে দুজন শিক্ষক অভিভাবকের মত সবসময় আগলে রাখতেন। শনৎ বাবু ও দিপক বাবু। শনৎ বাবু আমার ইংরাজি পরীক্ষার খাতা দেখে একটা কথা বলেছিলেন, যেটা আমার মনের জোর অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। গোটা ক্লাসের মধ্যে উনি বলেছিলেন, "এই সৌম্য কোনো নোট মুখস্থ করে লেখেনা। সৌম্য নিজের থেকে ইংরাজি লেখে, নিজের ভাষায়। ভুল হয়, কিন্তু এভাবেই শিখবে।" দিপকবাবু যেমন ভালবাসতেন, তেমনই আমাকে যেন একটু বেশিই শাসন করতেন। আমি বুঝি, দিপকবাবুর অনেক প্রত্যাশা ছিল আমার ওপরে। উনি লক্ষ্য রাখতেন আমি যেন কিছু ভুল না করে ফেলি দুষ্টুমি করে। কল্যানবাবু! উনি বেশি পড়াননি। কিন্তু আমি যখনই সিলেবাস সম্পর্কিত সমস্যায় পড়েছি, উনি ভীষণ সাহায্য করেছেন। আমি তো অনেক ভরসা করতে শুরু করেছিলাম ওনার ওপরে। তাছাড়া আমরা সমস্ত ছাত্র, ছাত্রী ও শিক্ষকেরা কল্যানবাবুকে অনেক শ্রদ্ধা করি। সত্যিকার অর্থে উনি একজন কিংবদন্তি। আমি আইএসআই তে পড়ার সুযোগ পেয়ে, লেকচারার হওয়ার সুযোগ পেয়ে আমার স্কুলকে গর্বিত করতে পেরেছি। এটা আমার কাছে অহঙ্কারের।  কলকাতা একাডেমী অফ ফাইন আর্টস আমাদের দেশের ঐতিহ্য। যেখানে একসময় আমার আদর্শ লেখিকা তসলিমা নাসরিন কবিতা পাঠ করেছিলেন, ভালোবাসার সহায়তায় সেখানে দাঁড়িয়ে আমি আমারই লেখা কবিতা "বাংলা তোমায় প্রণাম" পাঠ করেছি। আমি আমার স্কুল শিকারপুর উচ্চ (উচ্চতর মাধ্যমিক) বিদ্যালয়কে গর্বিত করতে পেরেছি। আমি যেমন আমার স্কুল, শিক্ষকদের কাছথেকে অনেককিছু শিখেছি, অনেক স্নেহ পেয়েছি, তেমনই লেখিকা তসলিমা নাসরিনের থেকেও আমি অনেক শিখেছি ও স্নেহ পেয়েছি। উনিও আমার শিক্ষক। সবাইকে আমার প্রণাম জানাই।

Saturday, 13 May 2017

হৃদয়ের দুপাশ জুড়ে, মধ্যিখানে, 
সারাটা স্থানে শুধু তুমি,
শুধু তুমি। 
তোমায় নিয়ে করি খেলা, সাজাই মেলা, 
কত কথার জাল বুনি, 
একা আমি একার মাঝে হারিয়ে গিয়ে 
দুটি হয়ে খেলা করি,
তোমায় নিয়ে স্বপ্ন গড়ি। 
হৃদয়ের দুপাশ জুড়ে, মধ্যিখানে, 
সারাটা স্থানে শুধু তুমি  ..

তোমার ডাকে সাড়া ওঠে
হৃদয়ে ওঠা কম্পনে,
তোমার পানে চেয়ে থাকে হৃদয় আমার 
প্রহর গুনে,
মলিন মনে প্রেম জাগে আজ
প্রেমের মোহ বন্ধনে,
তোমারই দিকে চেয়ে থেকে। 

হৃদয়ের দুপাশ জুড়ে, মধ্যিখানে, 
সারাটা স্থানে শুধু তুমি,
শুধু তুমি ..


-সৌম্যজিৎ।

Wednesday, 10 May 2017


সাতাশে বৈশাখ।
সৌম্যজিৎ।

সেদিন ছিল সাতাশে বৈশাখ,
ভীষণ ঝড় আর আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে থৈথৈ করছিল রাস্তাঘাট, খরে নদী, পুকুর,
মুখ ভার করে সবাই দুশ্চিন্তায় মগ্ন ছিল,
ডাক্তার বলেছিল, "অবস্থা ভালো নয়, মায়ের শরীর ভীষণ খারাপ,
সন্তান আর আলো দেখতে নাও পারে,
নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই সন্তানকে বার করে আনতে হবে,
আপনারা শক্ত হন।"

রাত এগারোটার সময় সন্তানের জন্ম হল,
কোনো সাড়া নেই, শব্দ নেই, চোখ বন্ধ,
মায়ের চোখে তখন শরীরের যন্ত্রণা ছাপিয়ে মনের যন্ত্রণা ঠিকরে বেরোচ্ছে।
ডাক্তাররা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করে দেয়, নতুন প্রাণটাকে বাঁচাতে।
আটচল্লিশ ঘণ্টার চিকিৎসার পর প্রথম সে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে,
সকলের মুখে হাসি ফুটিয়ে জানান দেয় সে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে।

শিশুটি বাঁচল, বড় হল, কৈশোর পার করে
ভরা যৌবনে এসে এক আদর্শের মানুষের লড়াইয়ে মুগ্ধ হল,
নিজের জীবনের প্রতিটা পর্বে সে কাটা ছেঁড়া বিশ্লেষণ করে,
ভুল সংশোধন করে সেই আদর্শের মানুষটার আদর্শকেই
নিজের জীবনের একমাত্র দর্শন ভেবে পথ এগোতে শুরু করলো।
প্রতিটা প্রশ্বাসে, প্রতিটা চিন্তাতে, প্রতিটা আওয়াজে, প্রতিটা কথায় তার কাছে শুধু একটাই নাম, -
"তসলিমা নাসরিন" যেন ধমনী, শিরাতে রক্তের গরম স্রোত বইয়ে দেয়,
"তসলিমা নাসরিন" এই একটা নাম তাকে দূর করে রাখে
সমস্ত অন্যায় থেকে লক্ষ কোটি মাইল দূরে,
"তসলিমা নাসরিন" এই একটা নাম তাকে মাতিয়ে রাখে সমস্ত প্রেমে, ভালবাসায়।

এক সাতাশে বৈশাখ যখন সে তার আদর্শের মানুষটার কাছ থেকে
শুভ জন্মদিনের শুভেচ্ছা পেয়েছিল,
পূর্ণতা পেয়েছিল সেদিন তার জন্ম।
আমি সারাজীবন সেই আদর্শের মানুষটার স্নেহ, ভালবাসায় থাকতে চাই,
সমস্ত দিনগুলোতে আমি মানুষটার ছোঁয়া পেতে চাই,
সমস্ত সাতাশে বৈশাখ সেই ভালবেসে বলা "সুস্থ, সুন্দর বেঁচে থাকো" কথাটার স্বাদ পেতে চাই।


তোমার শুভেচ্ছা, ভালবাসা ছাড়া আমার জন্মদিন কখনো পূর্ণ হবেনা,
মনে রেখো মেয়েমা। 

Saturday, 6 May 2017

এই লেখাটা লিখেছিলাম একসময়। এরপর আরও পাঁচটা প্রেম হয়েছে আমার। সবশেষে পেলাম ভালোবাসাকে। আমি ভীষণ খুশি। কিন্তু অতীত আমাকে তাড়া করা এখনও ছাড়েনি। অন্যায়টা হয়ত খুব বেশিই করে ফেলেছি। এমন অকপট স্বীকারোক্তি আমাকে অনেক বেশি সাহস দেয়।


**********************************************************************************************************************


পায়েল আমার জীবনে প্রথম প্রেমিকা হয়ে এসেছিল। আমরা অনেক ছোট থেকে একে অপরকে চিনতাম। ২০০৩ এ আমি বারো বছর বয়স এর একটু বেশি হবো, ক্লাস নাইনে পড়ি, আমি পায়েলকে ভালোবেসে ফেলি। ওই সময় অন্য একটা মেয়ে আমাকে পছন্দ করত বা ভালবাসত কিছু একটা হবে যার জন্য পায়েল আমার কাছে আসতে চায়নি। অনেক টানাপোড়েন, অনেক মান অভিমান ও বিতর্কের পর ২০০৬ তে পায়েল আমাকে প্রপোজ করে। আমরা অনেক খুশি ছিলাম। দুজনের বাড়ি থেকে আমাদের সম্পর্ক কেউ মেনে নেয়নি। আমার ওপর অনেক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হত, পায়েলের ওপরেও মানসিক অত্যাচার হত। তবু ভালোবেসে আমরা অনেক খুশি ছিলাম। ২০০৯ তে আমার দিদি মারা যাওয়ার পর থেকে আমি ভীষণ উশৃঙ্খল জীবনযাপন শুরু করি। বিতর্ক আমার জীবনে সবসময়ই ছিল, আমি নিজেও ভীষণ খারাপ একটা মানুষ হয়েগেছিলাম, পায়েলকে ভালবাসার সত্ত্বেও ওর ওপরে আমি অনেক মানসিক অত্যাচার করেছি। পায়েল আমাকে শোধরানোর অনেক চেষ্টা করেও যখন কিছু করতে পারল না, ২০১৩ এর শেষের দিকে আমার জীবন থেকে হঠাৎই সরে গেল। ও চলে গেছিল অভিমান করে, দূরে গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। এই কথাটা ও আমাকে কিছুদিন আগে জানিয়েছে। কিন্তু আমি ওকে আটকানোর চেষ্টা করিনি, করিনি বললেও ভুল হবে। আমি সেই সময় প্রচন্ড ভেঙে পড়েছিলাম। একেতে বয়স অল্প, মাথাতে ভারি বুদ্ধি ছিলনা। বুঝতে পারছিলামনা কি করা উচিৎ। তবে আমি নিজেকে শোধরাতে শুরু করেছিলাম। একটা শৃঙ্খল জীবনে আসতে চাইছিলাম। সমস্ত নেশা ছাড়তে শুরু করেছিলাম। সত্যি কথা বলা একটা অভ্যাস, আমি খুব আস্তে আস্তে থেমে থেমে কথা বলতে শুরু করেছিলাম যাতে কোনো মিথ্যে কথা না বলি মুখ দিয়ে, কারণ মিথ্যে কথা বলা আমার মধ্যে সহজাত ছিল। আমি আস্তে আস্তে মিথ্যে কথা বলা একেবারেই ছেড়ে দিই। পায়েল যাওয়ার পরে আমার জীবনে আরো বারোটা মেয়ে আসে। কিন্তু কারোর সাথেই সম্পর্ক টেকেনি, কারণ শান্তি পেতামনা কারোর কাছে। পায়েল কে খুব মনে পড়ত। এইসব কথা লুকোনোর নয়, এগুলো আমার জীবনে ঘটেছে, এগুলো ভীষণ রকমই সত্যি। আমি কখনো কারোর কাছে লুকোইওনা। এখনও হয়ত পায়েলের জন্য আমার মনে কোথাও কোনো জায়গা আছে, কিন্তু ওকে আমি আর হয়ত মেনে নিতে পারবোনা। ওউ আমাকে আর মেনে নিতে পারবেনা। আমার না মানার কারণ আমি পায়েলকে চিনতাম একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে, এখনকার পায়েল বড্ড গুটিয়ে থাকা, হিসেব কষা একটা মেয়ে। আর এমন হিসেব কষা মানুষের জীবনে আদর্শ যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা শুধুই নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। আমার আদর্শের সাথে এটা কখনই মিলবেনা। এতগুলো কথা বললাম, কারণ আজ আমি এক বোনের কাছথেকে শুনলাম পায়েলকে যে আমি ভীষণ ভালোবেসেছি, এটা মিথ্যে। সে আমাকে হয়ত ভুল বুঝেই কথাটা বলেছে। আমি ভীষণ সাহস আর গর্বের সাথে বলতে পারি, গত তিনবছরে আমি যে সত্যি বলার অভ্যাস করতে শিখেছি, সেখানে আর কোনো মিথ্যে নেই। আমার আদর্শের রাস্তাতেও কোনো মিথ্যে থাকতে পারেনা। ছোট থেকে একটা ভয়ানক উশৃঙ্খল জীবনে পা রাখলেও, আজকের সৌম্যজিৎ দত্ত সম্পূর্ণ আলাদা একটা মানুষ। নিজের করা ভুলগুলো থেকে আমি শিখেছি, আদর্শের জীবনে চলতে শুরু করেছি তসলিমা নাসরিনের আদর্শকে দেখে, তার সততাকে দেখে।

Monday, 1 May 2017


১৩.

প্রেমের নেশা ভূত হয়ে চেপে বসেছে মাথায়। খাওয়া, ঘুম সব উড়ে গেছে। একাদশ শ্রেণীর পরীক্ষা ভীষণ খারাপ হল। পাশ করতে পারবো কিনা সেই বিষয়ে মনের মধ্যে সন্দেহের মেঘ জমা হয়েছে। সবার থেকে নিজেকে একেবারে আলাদা করে ফেলেছি। কারোর সাথে মিশিনা, কথা বলিনা, চুপ হয়ে থাকি, খেলিনা। একেতে দুশ্চিন্তা পরীক্ষার ফল নিয়ে, তার ওপর প্রেমকে না পাওয়ার মন খারাপ। আমি বেশ বুঝতে পারি, নুপুর ভালবাসে আমাকে। অনুভব করতে পারি। কিন্তু তারপরও যেন মনে হতে থাকে আমি ভালবাসা পাওয়ার স্বাদ পেলাম না। নিজেকে ভীষণ হারিয়ে যাওয়া একজন মনে হতে থাকে। অঙ্ক পড়তে যাই, অঙ্ক পড়ার সময় একটু মন শান্ত থাকে, কিন্তু পড়া হয়ে গেলেই আবার মন অশান্ত হয়ে যায়। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি একদমই পড়তে পারছিনা। একদিন দেবালয়ে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলাম, একাকী। মনে মনে ঠিক করলাম, আর এসব একদম মাথায় আসতে দেবো না। আমি মন দিয়ে পড়াশোনা করবো। আর প্রেম নিয়ে ভাববো না। আমি যেখানেই যাই, সবসময় আমার সাথে ব্যাগ ও ব্যাগ ভর্তি বই থাকে। দেবালয়ে বসে এসব ভাবতে ভাবতে ফিজিক্স বইটা ব্যাগ থেকে বার করে পাতা ওলটাতে থাকলাম। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের একটা চ্যাপ্টার। ভাবলাম আজ বাড়ি ফিরে এই চ্যাপ্টারটাই পড়বো। নুপুরের কথা একদম মনে আসতে দেবো না। পরীক্ষায় পাশ করি বা ফেল করি, সেই দুশ্চিন্তাও একদম মাথাতে আসতে দেবো না। আমার কাজ শুধু পড়া, ভাবা আর প্রস্তুতি নেওয়া উচ্চমাধ্যমিকের জন্য। বাড়ি ফিরে এলাম। আমার তখন নিচতলায় একটা বড় পড়ার ঘর। গোটা ঘরে বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কাউকে ঢুকতে দিইনা। শুধু ভুটো ঢোকে ঘরটাতে। আমি ঘরে ঢুকেই মন দিয়ে পড়তে শুরু করে দিই। বেশ ভালো পড়া হয়। তারসাথে ক্যাল্কুলাস থেকে বেশ কয়েকটা অঙ্কও সমাধান করে ফেলি। খুব ভালো লাগে।


পরের দিন স্কুলে গিয়ে দেখি রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। আমি পাশ করে গেছি। কিন্তু রেজাল্ট খুবই খারাপ। যদিও সেই খারাপ রেজাল্ট আমাকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে পারেনা। কারন আমি মনস্থির করে ফেলেছি যে আমি এবার খুব ভালো করে পড়াশোনা করবো। নুপুর কোথাও থেকে আমার রেজাল্টের কথা জানতে পারে। নুপুর ভয় পেয়ে যায়, ভাবে এমন চলতে থাকলে আমি উচ্চমাধ্যমিকে ফেল করবো। আমি বাড়ি ফিরে একটু বিশ্রাম নিই। কিছুক্ষণের মধ্যেই পড়তে যেতে হবে। ইংরাজির টিউশন আছে। আমি একটু শুই। বাড়িতে পপি দিদিরা এসেছে। আমি বিছানায় দশ মিনিট একটু শুতেই হঠাৎ একটা থাপ্পড় খেয়ে চোখ খুলি। পাপা আমাকে থাপ্পড় মেরেছে, পাপা ভেবেছে আমি স্কুলে না গিয়ে ঘুমাচ্ছি। ঘরে ঢুকেই আমাকে শুয়ে থাকতে দেখে মেরেছে। আমার খুব রাগ হয়ে যায়। আমি পড়তে বেরিয়ে যায়। ভাবি আজ আমি বাসের তলায় পড়বো। খুব রাগে আমি তখন ফুটছি। সেইসময় নুপুর হঠাৎ আমার সাইকেলের পাশে এসে আমাকে বলে দেবালয়ে দেখা করতে। আমার মাথায় কিছু ঢোকে না। আমি ভাবতে পারিনা সেদিন  কি হতে যাচ্ছে! সেদিন যা হতে যাচ্ছে সেটা সেইসময় হোক আমি চাইনি, আমি চেয়েছিলাম যাকিছু হওয়ার বা না হওয়ার সব যেন উচ্চমাধ্যমিকের পর হোক। আমি এখন শুধু পড়তে চাই ভালো করে। কিন্তু নুপুর এতটাই ভয় পেয়েছিল, ও ভেবেছিল ওর মনের কথা খুলে বললে হয়ত আমি ভালো করে পড়তে পারবো, ভালো রেজাল্ট করবো। একটা বড় ভুল করে বসল ও সেদিন আমাকে দেবালয়ে ডেকে নিয়ে গিয়ে। আমি দেবালয়ে পৌঁছে ওকে জিজ্ঞাসা করি, কি হয়েছে! সব ঠিকাছে তো!

নুপুরঃ সব ঠিক আছে। কিছু হয়নি।

আমিঃ তাহলে ডাকলি!

নুপুরঃ আমি তোর রেজাল্টের কথা শুনেছি।

আমিঃ আচ্ছা।

নুপুরঃ ভালো করে পড়। তুই শুধু মন দিয়ে পড়াশোনা কর। আর কিছু ভাবিস না। আমার তোকে ভালো লাগে।

আমিঃ ভালো লাগে! আমাকে তো সবারই ভালো লাগে। এটা আর নতুন কি!

নুপুরঃ আমি তোকে ভালবাসি। আমি ভেবেছিলাম তোকে জানাবো না। কিন্তু তোর রেজাল্ট খারাপ হয়েছে দেখে আমি না বলে আর থাকতে পারলাম না।


আমি চুপ হয়ে গেলাম। বেরিয়ে গেলাম দেবালয় থেকে। নুপুর চুপ হয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকল। আমি ভাবলাম এই একটা কথা শোনার জন্য আমি এতোগুলো বছর অপেক্ষা করে আছি, কিন্তু এখন আমি এই কথাটা শোনার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমি এখন ভালো করে পড়তে চেয়েছিলাম, কিন্ত আমি আবারও দুর্বল হয়ে পড়ছি। আমি সাইকেল চালিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে পড়তে চলে গেলাম।

আমি নুপুরকে ভীষণ ভালবাসি। কিন্তু এইসময় আমি ওর থেকে প্রেমের প্রস্তাব নিতে একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। যে কথাটা শোনার জন্য এত অপেক্ষা করেছি, সেটা তখন শুনলাম যখন আমি শুনতে চাইনি। একদিকে প্রেম আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছে, একদিকে আমি পড়াশোনা করতে চেয়েও আর পড়তে পারছিনা।