Monday, 11 July 2016


এক যোদ্ধার গড়ে ওঠা।
সৌম্যজিৎ।
উৎসর্গ- তসলিমা নাসরিনকে।

লড়াই, কত লড়াই তুমি দেখেছ,
এক নিষ্পাপ মেয়ে ছিলে,
ফুল, পাখি, প্রেমের স্বপ্নে গা ভাসাতে চেয়েছিলে,
সমুদ্র দেখার স্বাদ ছিল, তুমি ছোট থেকে সমুদ্র দেখেছিলেনা।
মনে পড়ে একদিন দাদাকে বলেছিলে তোমার সমুদ্র দেখার ইচ্ছা?
বলেছিলে, "দাদা গো সমুদ্র দেখতে কেমন!"
দাদা বলেছিল, "না গেলে বুঝবি না। সমুদ্র কেমন সে কথা কখনও বইলা বুঝানো যায়না,
সমুদ্রের সামনে দাঁড়াইয়া উপলব্ধি করতে হয় সমুদ্র।"
তুমি সেই মেয়ে যে এক পরিণত নারী হয়ে উঠেছিল দিনে দিনে,
অনেক স্নেহ, অনেক ভালোবাসা আর অনেক স্বপ্ন ঘিরে।
যুদ্ধ, লড়াই তোমার কি কখনো মনে এসেছিল!
ওরা তোমাকে এক নারী থেকে সরিয়ে, তোমাকে ভন্ড মুখোশধারী মানুষ ঘোষণা করেছিল।
পদে পদে তোমাকে বেশ্যার পরিচয় দিয়েছে তোমাকে না বুঝে - না জেনে,
পদে পদে তোমাকে ঘেন্নার চোখে দেখেছে ওরা,
পদে পদে তোমাকে শোষণ করতে চেয়েছে, সুজোগ খুঁজেছে তোমাকে ভোগ করার,
পদে পদে ওরা প্রতীক্ষা করেছে তোমাকে মেরে ফেলার।
কল্পিত ঈশ্বরের বাণীতে মুখরিত এই সমাজ তোমাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছে
ওদের চেনা পরিচিত সমাজ ক্ষেত্র থেকে।
চিন্তাতে, ভাবনাতে, চলাফেরাতে ওরা কখনো কোনো পরিবর্তন চাইনি,
চাইনি নতুন কিছুতে, বাস্তব কিছুতে অভ্যস্ত হতে,
ওরা চাইনি সত্যিকে বিচার করে  মেনে নিতে বা মিথ্যে কল্পনার জগৎ থেকে বেরোতে।
সত্যিকে মানার সাহস সবার থাকেনা।


আফশোষ শুধু সেখানেই হয়,
যারা বুদ্ধিজীবী, যারা সমাজের ভন্ড মুখোশের সাথে পরিচিত, তারা সাহস করে এগিয়ে আসেনি।
আফশোষ হয় কোথাও সেখানে একটা সাহসী মানুষ এগিয়ে আসেনি তোমার পাশে দাঁড়াবে বলে।
একটা মানুষ সামনে এসে চিৎকার করে,
জোর গলাতে বলেনি, "তসলিমা ভুল নয়, তসলিমা মিথ্যে নয়,
তসলিমা যা বলে ঠিক বলে। তসলিমা সত্যের আদর্শ চায়।"
আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে জানো তোমাকে সকাল বলে ডাকা মানুষটা থাকলে,
সে কি তোমার পাশে এসে দাঁড়াত না ?
হয়ত নিশ্চয় এসে দাঁড়াত, বা হয়ত সব মানুষের ভিড়ে
নিজেকে আড়াল করে রাখত অন্যদের মতোই।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি জানো, আমি কি ঐ সময় তোমার পাশে থাকতে পারতাম না!
আমি তখন তিন না হয়ে যদি তেইশ হতাম বা তেত্রিশ হতাম!
হতে পারতাম না!
তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াতাম,
ভরা বাজারে, বড় রাস্তার মোড়ে তোমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে বলতাম,
চিৎকার করে বলতাম, "তসলিমা নাসরিন সত্যের পথে চলা এক পথিক,
তসলিমা নাসরিন কখনো ভুল হতে পারেনা।"
ওদের চোখে চোখ রেখে বলতাম, "ভুল তোমরা। ভুল তোমাদের চিন্তাতে,
ভুল তোমাদের ভাবনাতে। তোমরা গোঁড়ামিতে নিজেদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছ।
তোমাদের এই ভেসে যাওয়ার পরিণতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারে ডুবিয়ে মারবে।
সমস্ত প্রজন্ম শিখবে শুধু একে ওপরের রক্ত ঝরানোর শিক্ষা।
তোমাদের গোঁড়ামি কখনো সুস্থ শিক্ষা দিতে পারেনা।
তোমাদের গোঁড়ামি শুধু সমাজের বিনাশকই হতে পারে।"

আমি বারবার ঐ মেয়েটার প্রেমে পড়ি জানো,
খুব কাছথেকে, যতটা কাছে গেলে তার প্রতিটা নিঃশ্বাস আমার চোখে মুখে এসে পড়ে,
তত কাছথেকে মেয়েটাকে অনুভব করি।
আমি বারেবারে সেই মেয়েটাকে নিজের মধ্যে অনুভব করি,
অনুভব করি তার প্রতিটা লড়াই, প্রতিটা মৃত্যু ভয়ে ছুটে বেড়ানোর দীর্ঘশ্বাস চিন্তাগুলো,
তুমি সত্যের পথের পথিক হয়ে উঠছিল আগুনে পুড়ে পুড়ে,
মানব থেকে মহামানব হয়ে উঠছিলে বিভীশিখাময় মৃত্যুর পথে পথ চলে,
আমি কল্পনার জগৎে হেঁটে গিয়ে বারবার তোমার আদর্শকে নিজের গায়ে মাখি,
আমি বারবার শুধু ঐ মেয়েটাকে নিজের পথ চলার সঙ্গী ভেবে ছুটে যেতে চাই।

বাস্তবে যখন দেখি আজ মানুষটা আমাকে এত স্নেহ করে,
মাঝে মাঝে শাসন করে, মাঝে মাঝে বকা দেয়, আবার ভালোও বাসে,
আমি যেন নেচে উঠি।
আবার হাঁপিয়ে উঠি তোমার চোখের একটু আড়াল হতেই।
আমার প্রাণ প্রতিমা তুমি,
আমি তোমাকে আমার সমস্ত স্বত্ত্বা দিয়ে পূজো করি। 

No comments:

Post a Comment