ফারজানার গল্প। না, গল্প নয়, একটা অসহায় মেয়ের কথা।
সৌম্যজিত দত্ত।
ফারজানার সাথে আমার পরিচয় পাঁচ মাস আগে। ফেসবুকে। একটা অসহায় মেয়ে। আমাকে দাদা বলে ডাকে। আমার সাথে পরিচয় করেছিল কারণ ও ভেবেছিল ওর জন্য আমি কিছু করতে পারি। মেয়েটার পরিচয় দিই। ফারজানা আক্তার। বাড়ি বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। ওর একটা মেয়ে আছে। নাম সাইফা। বয়স মনে হয়, ১ বছরের কিছু বেশি হবে। প্রতিবন্ধী। ফারজানার বয়স ২৩ কি তার একটু বেশি হবে। কুড়ি বছর বয়সে ফারজানার বিয়ে হয়। বাড়ি থেকে দেখাশোনা করেই বিয়ে দিয়েছিল ওর বাবা। ছেলের বয়স তখন পয়ত্রিশ। ফারজানা তখন পড়াশোনা করছিল, হঠাত বিয়ের প্রস্তাবে সে প্রথমে রাজি হয়নি। পরে ছেলে ফারজানাকে পড়াশোনা করানোর প্রতিশ্রুতি দিলে, ফারজানা বিয়েতে মত দেয়। ওদের বিয়ের পর ছেলেটা জানায় যে সে পড়াতে পারবেনা ফারজানাকে।
বিয়ের পর থেকেই অশান্তি শুরু হয় পরিবারে, ছেলের বড়দাদা ও দাদার শ্যালিকা মিলে সংসারে অশান্তি ঢোকায় ও নানাভাবে ফারজানাকে শারীরিক ও মানুসিক অত্যাচার করতে থাকে। ফারজানা বলে, "বাড়িতে বিয়ের আগে খুব আদরের ছিলাম, বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে ১০-২০ দিনের বেশি থাকতে পারিনি, তারা নির্যাতন করত। বেশিরভাগ সময়টাতে বাবার কাছে ছিলাম, তখন আমাকে ওরা নিতে আসেনি কেউ। এখন ওরা বলে, আমি নাকি বাবার বাড়ি থাকার জন্য পাগল ছিলাম। আটমাসের গর্ভবতী অবস্থায় ঈদ করতে তাদের বাড়ি যাই, ওরা আমাকে একটা আলমারীর জন্য অমানুষিক অত্যাচার করে। অত্যাচার বাড়তে থাকে। পেটে বাচ্চার নড়াচড়া একদিন বন্ধ ছিল, ওরা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়নি। প্রতিবন্ধী বাচ্চার জন্ম হয়। জন্মানোর পর বাচ্চার কান্না বন্ধ ছিল। চট্টগ্রাম মেডিক্যালে একমাস ভর্তি ছিল। ওরা কেউ দেখতে আসেনি। শিশুটি প্রতিবন্ধী জন্মানোর জন্য আমাকেই দায়ী করা হয়। শিশুটিকে চিকিত্সাহীন ভাবে মারতে চেয়েছিল। আমার জন্য মারতে পারেনি। তারা বলে, প্রতিবন্ধী শিশুটিকে বাঁচিয়ে রেখে টাকা নষ্ট করে কি হবে? এখন আমার বাবাও শিশুটির চিকিত্সার টাকা দিচ্ছেনা, বলছে মামলা করে বাড়ি থেকে বার করে দেবে। শ্বশুর বাড়ি থেকে এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে, তারাও কোনো টাকা দেবেনা, এভাবে বিনা চিকিত্সায় শিশুটি মারা যাবে। চেয়ারম্যান কিছু করছেনা। এখন বলুন আমি কি করবো? তবে যাকিছুই করি, আমার বাবা আমাকে কোনো সাহায্য করবেনা।"
এতকিছু শোনার পর, আমি মেয়েটাকে ভরসা দেওয়ার চেষ্টা করি। ইতু বাংলাদেশের মেয়ে, যদিও সামাজিক বিশৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে তাকেই দেশ ছাড়া হতে হয়েছে। তবু ভেবেছিলাম, যদি ইতুর পরিচিত কেউ যদি চট্টগ্রামে থাকে, তবে মেয়েটাকে সাহায্য করতে পারবে পাশে থেকে। ইতু খোঁজ খবর নিয়ে বলে, সেখানে পরিচিত কেউ নেই যে সাহায্য করবে। আমি বাংলাদেশ মানবাধিকার কল্যাণ ট্রাস্টে ব্যাপারটা জানাই, মানবাধিকার কল্যাণ ট্রাস্টের একজন কর্মী ফারজানার সাথে ফোন মারফত যোগাযোগ করেন ও ভরসা দেন। আইনি স্টেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আজ একমাস মত পরে, মানবাধিকার কল্যাণ ট্রাস্ট জানায়, দূরত্বের কারণে তারা কোনো সাহায্য করতে পারবেনা ফারজানাকে। ফারজানা এখন ভীষণ সংকটে। তার অসুস্থ শিশুটির অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। আমি কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে, আজ ঘটনাটা মেয়েমা তসলিমা নাসরিনকে লিখে পাঠাই। এখন যদি কিছু কেউ করতে পারে, একমাত্র উনিই পারেন ওনার পরিচিত মহলের মাধ্যমে। জানিনা, ফারজানার কি হবে শেষ পর্যন্ত। শিশুটিকে আদৌ চিকিত্সা করানো সম্ভব হবে কিনা। তবে আজ বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা দেখে আমার করুণা হচ্ছে। এখানে অনেকগুলো ব্যাপার সামনে চলে আসছে। ১) বধু নির্যাতন, ২) পনপ্রথা ও যৌতুক, ৩) সন্তানের প্রতিবন্ধকতার জন্য শুধুমাত্র মা'কে দায়ী করে সমস্ত দায় এড়িয়ে যাওয়া, ৪) রাজনৈতিক মহলের সাধারণ মানুষের পাশে না থাকা, ৫) কন্যাদায় এড়াতে অনেক বয়সের ব্যবধানে মেয়েকে বয়স্ক ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া, ৬) ছেলেদের শিরদাঁড়া এতটাই বাঁকা যে, স্ত্রী-সন্তানের বিপদে পাশে থাকতে নাপারা, ৭) সমাজের অবস্থা এতটাই খারাপ যে মেয়েটার পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য কেউ নেই। এমন একটা নড়বড়ে সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে কোনো রাষ্ট্রের কখনই গৌরব করা উচিত নয়।
আমার বাংলাদেশের ভাই, বোনদের কাছে একটাই অনুরোধ, তোমরা যদি দেশকে ভালোবেসে থাক, দেশ হল মানুষ, তবে মানুষকে ভালবাস। মানবতাকে জাতির ও জাতের উর্ধে স্থান দাও। ভেদাভেদ কোরনা। ও হিন্দু, আমি মুসলিম, ওর এক পা ভারতে, এই কথাগুলো একটা দেশের জন্য ভীষনই খারাপ। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাশে থাক, সাহায্য কর একে অপরকে।
আমি ফারজানার ঠিকানা ও ফোন নম্বর দিচ্ছি, তোমরা কেউ ওর সাথে থাকতে চায়লে, সাহায্য করতে হলে যোগাযোগ কোরো।
ফারজানা আক্তার।
পিতা)-ফয়েজ অাম্মদ
মাতা - সাহেনা
জেলা -চট্রগ্রাম,
থানা -মিরসরাই, জোরারগজ্ঞ
ডাকঘর -১নং করের হাট
ওদের ঠিকানা
নাম -সাইফুল
পিতা -হোছেনূর জামান
মাতা -মরিয়ম নেছা
বড় ভাই)-মোস্তফা
থানা -একই
ডাকঘর -এছাকডাইবার হাট, পূর্ব ইছাখালি।
কাজ করে -বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাহাড়তলি, ( S L M) পদে।
ফোন নম্বর - ০১৮৩৭৮৮৯৬৭৭।