আমার নির্বাসিত লেখিকাকে।
সৌম্যজিৎ।
প্রতিটা শ্বাসে আজ দুর্গন্ধ, মর্গের পচা গন্ধ,
বমি ঠেলে আসে,
বাংলার হাওয়াতে সতেজতার কোনো ছোঁয়া আমি পাইনা,
যেদিকেই যাই আমি পাই এক দম বন্ধ করা প্রশ্বাস,
আমার কথা বলার স্বাধীনতা নাই।
গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নামে এখানে চলে দালালি, খুনোখুনি, হানাহানি,
নামেই গনতন্ত্র, এখানে আমার লেখিকাই আজ নির্বাসিত,
নির্বাসিত শুধু মানুষটাই নয়,
নির্বাসিত আজ সত্য, নির্বাসিত আজ স্বাধীনতা, নির্বাসিত বাকস্বাধীনতা,
নির্বাসিত আজ লেখকের সত্যলেখা।
চারিদিকে শুধু দেখি সেইসব লেখকেরা ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠে,
যারা পায়ের তলানি চাটে,
দেওয়ালে, কাগজে যারা নেতা মন্ত্রীদের গায়ে প্রশংসার চাদর চাপায়,
মন্ত্রী দালালদের মাথাতে তুলে রাখে,
দু'বেলা দাদা দিদি করে সেলাম ঠোকে,
আবার গাড়ির দরজা খুলেও জায়গাও করে দেয়,
সেইসব লেখকেরাই আজ বড় বড় লেখকসিদ্ধ তকমা নিয়ে ঘোরে।
নির্বাসিত আজ শুধুই তুমি নও আমার লেখিকা,
নির্বাসিত আজ আমিও,
নির্বাসিত আজ সত্যের আদর্শ।
আমরা শুধু গায়ে পরে, বা কিছু খেয়ে দেয়ে বাংলাই বেঁচে আছি মেরুদণ্ডহীন নামে,
আসলে আমরা পারিনি ওদের পায়ে তেল দিতে।
তেল দিতে পারিনি তাই আমরা মেরুদণ্ডহীন,
সত্য আদর্শের পথ দেখানো লেখিকাকে আমরা এই বাংলায় আশ্রয় দিতে পারিনি,
তাই আমরা মেরুদণ্ডহীন।
আমার লেখিকা তুমি আমাদের ক্ষমা কোরোনা,
ক্ষমা কোরোনা আমাদের ব্যর্থতাকে,
ক্ষমা কোরোনা আমাদের ভেঙে পড়াকে, হারিয়ে যাওয়াকে।
মানুষ হিসেবে মানুষকে আমরা আশ্রয় দিতে পারিনি,
মানুষ হিসেবে মানুষকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি,
শুধুই জাতের নামে জাতির কলঙ্ককে গায়ে মেখেছি,
এ আমাদের লজ্জা।
এ কখনোই তোমার লজ্জা নয়,
মানুষ জন্মে তুমি কখনোই লজ্জার সামনে হার মানোনি,
ভয় পাওনি সত্যের হয়ে লড়াই করতে,
মাথা নত করোনি মিথ্যের সাথে আপোষ করে স্বচ্ছন্দের জীবন পেতে,
পদে পদে তুমি কঠিন লড়াইয়ের পাথুরে রাস্তাকেই নির্বাচন করেছ,
তবু তুমি হার মানোনি,
মানুষের মনে নৈতিকতা দিয়ে নৈতিক জয় পেয়েছ,
শুধু শরীরেই তুমি আজ নির্বাসিত।
মানুষের মন থেকে তোমার নির্বাসন হয়নি।
এই নির্বাসন তোমার লজ্জা নয়, এই নির্বাসন আমাদের লজ্জা।
এই নির্বাসনের পরাধীনতাকে আমরা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি আজ।
আমি আজও প্রতিমুহূর্তে মনে করি আমাদের পরাধীনতা ঘুচবেই,
উঠে দাঁড়াবেই এই বাংলা সমস্ত পরাধীনতার শেকল ছিন্ন করে,
উঠে দাঁড়াবেই তরুণ সমাজের হাত ধরে।
আমি একদৃষ্টে সেই দিনের প্রতি চেয়ে আছি যেদিন আবার
আমাদের লেখিকা নজরুল মঞ্চে কবিতা পাঠ করবে,
যেদিন নন্দনে বসে চা-এর আড্ডা দেবে পুরোনো বন্ধুদের সাথে,
যেদিন কফি হাউজে বসে কফির সাথে সমাজ, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করবে,
যেদিন আবার রওডন স্ট্রিটের বাড়িটা ভালোবাসার মানুষটাকে ফিরে পাবে।
আমি দেখতে পাই আমার লেখিকা সেদিন আমার হাতে হাত রেখে
খোলা আকাশের নিচে ঘ্রাণ নিচ্ছে,
সেদিন বাংলা মুক্ত হবে।
ছাই পড়বে সেদিন বাংলার পুরুষতান্ত্রিক পুরুষগুলোর পুরুষত্বে,
নারী সেদিন নৈতিক জয় পাবে,
সাহসে গর্জে উঠবে নারী,
তাদের প্রতি হওয়া অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগঠন গড়বে,
নারী সেদিন সমাজে চালিত নয়, চালকের আসন পাবে।
তুমি ফিরবেই আমার লেখিকা,
তুমি ফিরে আসবেই।
No comments:
Post a Comment