Friday, 4 March 2016



গেরন। 
সৌম্যজিৎ।




ছোট্ট আদর মাখা মুখটা চাইত সব নিয়ম ভাঙতে,
ছিল স্বপ্ন চোখে, ঘর পেরিয়ে বাইরে যেতে,
নিয়ম শুধু নিয়মই ছিল বাবার ধমকানিতে। 

.....................................................................


বাড়ির দেওয়াল প্রাচীর ভয়ে কাঁপে,
শৃঙ্খলা পরায়নের শেকল বাঁধা পায়ে,
সমাজ ব্যবস্থার রীতিনীতি, আত্মসম্মান, বংশগৌরবের ইমারত বহন করে,
ধর্মের রক্ষাকবজ ঘিরে থাকে প্রতিটি ইঁটে। 
ছোট্ট মেয়েটি লজ্জা পায়। 

....................................................................



বয়স তখন চোদ্দ কি পনের,
মেট্রিক পরীক্ষার হাতছানি, সেকি ভীষণ রকম পড়াশোনা!!!
বাবার তৈরি নিয়ম, "শুধু খাও, পড়ো। ভোররাতে উঠে পড়ো, সারাদিন পড়ো,
গোটা বই বারবার করে পড়ো, প্রতিটা পাতা, প্রতিটা লাইন ঠোঁটস্থ করে ফেলো।
বাড়িতে কেউ টু-শব্দটি করবেনা, করলেও ফিসফিস করে কথা বলবে।
সবার চোখের নজরবন্দি করে রাখ, ঘন্টায় ঘন্টায় খাবার খাওয়া চায় পড়তে পড়তে।"
এমনসব কড়া নিয়মে মেয়েটি হাসফাঁস করে ওঠে, তবু চুপ থেকে সব কথা শোনে। 



পরীক্ষার সময় উপস্থিত হলে বাবা এনে দেয় কোনো মন্ত্রপুত রক্ষা কবজ,
পরীক্ষার সময় পরে থাকলে নাকি, "সমস্ত পড়া মনে থাকবে, পরীক্ষা ভালো হবে।" 
মেয়েটি প্রতিবাদ জানিয়ে ওঠে, "পড়া মনে থাকলে এমনিই থাকবে, যা পড়েছি,
তাই লিখেদিয়ে আসবো।
বরং সেটি থাকলেই সব ভুল হয়ে যাবে।" 
বাবার জেদের সামনে হেরে গিয়ে তাকে কবজ পরতেই হয়। 
মাথার চুলের সাথে তাকে কবজ বেঁধে নিতে হয়। 
সে যে কি ভীষণ লজ্জার!!!
"চুলের সাথে কবজ পরে বাইরে বেরোবো, পরীক্ষা দেবো!!
বন্ধুরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে, সবাই দেখবে, হাসবে।" 
পরীক্ষা দিতে দিতেও মেয়েটির মন বারবার চলে যায় চুলে বাঁধা কবজটার দিকে,
বারবার কপালের সামনে এসে পড়ছে, খুব সাবধানে সে আড়াল করছে সেটা।  
সে ঠিক করে, "যত যাই হোক, কবজ আমি পরবো না।" 
বাড়িতে এসে বায়না ধরে, "কবজ বাঁধবো না, তাতে পরীক্ষা খারাপ হয়, হোক।" 
বাবার জোর জবরদস্তিতে তাকে আবারও সেটা বাঁধতে হয়। 

.......................................................................


মেয়েটির মনে অনেক প্রশ্ন। 
"আমার জন্ম কবে হয়েছে? কখন হয়েছে?
দাদা'দের জন্ম তারিখ, সময় সবকিছু বাবা লিখে রেখেছে,
আমারটা কোথাও লেখা নেই কেন?"
মেয়েটি জানতে চায় তার জন্মের তারিখ, সময়।
মা'কে জিজ্ঞাসা করে, পরিচিত মানুষদের জিজ্ঞাসা করে, নানিকে জিজ্ঞাসা করে,
বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন উত্তরে সে অস্থির হয়ে ওঠে। 
কেউ বলে "অমুকের জন্মের মাসে তোর জন্ম,
তো কেউ বলে মাথা উঁচিয়েছে তালগাছের মত, কুড়ি-বাইশ হবি।"
মেয়েটি ভাবতে থাকে, "ছেলেদের জন্ম তারিখ লেখা হয়, মেয়েদের কেন হয়না?"

.........................................................................


মেয়েটি অনেক অনেক নিয়ম ভাঙতে চায়, নিয়ম ভাঙতে তার ভালোলাগে। 
জিন্সপ্যান্ট পরতে চায়, গিটার বাজাতে চায়, প্রেম করতে চায়। 
নারীর প্রতি গড়া সমাজের সব নিয়ম ভেঙে গুড়িয়ে দিতে চায়। 
পরিবারের বাধা উপেক্ষা করেই সে প্রথম নিয়ম ভেঙে ফেলে,
বাড়িতে প্রথম গিটার এনে। 
ধ্যান, জ্ঞান সব গিটারটাই হয়ে ওঠে। 
গিটার কিনে বাজানো, নিজের শখ পালন করার অনুমতি পেয়ে সে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়। 


.........................................................................


ধম্মটম্ম'কে কখনই সে তোয়াক্কা করেনা,
স্বপ্ন তখন আকাশ ছোঁয়া। 
খোলা আকাশে সে উড়তে চায়, বাতাসের ঘ্রাণ নিতে চায়,
গলি পেড়িয়ে বড়রাস্তার মাথায় সে একাই হাঁটতে চায়,
দৃষ্টান্ত হতে চায় সমাজ শৃঙ্খলে আবদ্ধ নারীজাতির সামনে। 
উঁচিয়ে সে উঠবেই, ভরা যৌবনের রক্তের তেজ, মনে অদম্য সাহস'কে সে তুলে ধরবে,
বাঁচার মত করে বাঁচবে, পরাধীনতার দেওয়াল চুরমার  করে দেবে। 

No comments:

Post a Comment