Sunday, 27 December 2015

২৭ শে জানুয়ারী, ২০১১।
বাঁ কানের মৃত্যু।
সৌম্যজিত দত্ত।

চিন্তা ২৫ শে জানুয়ারী তে,
"গত এক সপ্তাহ ধরে পেটটা খুব সমস্যায় ভুগছে।
কোনো কাজ ঠিক করে হয়ে উঠছেনা। ভাবছি একটা অর্নিও খেয়ে কাজগুলো সামাল দিই আগে।"


২৭ শে জানুয়ারী সকালে কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে,
কিন্তু অর্নিও খেয়ে দুদিন ধরে পেটের মধ্যে যেন হাসফাস করছে।
ক্লাশটা ভীষণ জরুরি, করতে হবে। 
বেরিয়ে পড়লাম জামা প্যান্ট পরে,
বাস ছুটছে, রাস্তার ট্রাফিক সিগনালগুলো এড়োতে সাইসাই করে ছুটছে,
বাগমারি থেকে মানিকতলা, মানিকতলা থেকে সাইন্স কলেজ, রাজাবাজার।


"হঠাত বাসে দাড়িয়ে থাকতে থাকতে আমি যেন কেঁপে উঠলাম,
কি জোরে ধামধাম করে শব্দ!!! আমাকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে,
চারিদিকে বাস-ট্রামের আওয়াজ, আমি পারছিনা নিতে। গা গুলিয়ে আসছে,
মাথা ঝিমঝিম করছে। ভিড় বাসে কেউ একটু বসার জায়গা দিচ্ছেনা।
উফ: আমি কি করি?
আমি কি মরে যাচ্ছি?
না, আমি মরতে পারিনা, আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্লাশ। আমাকে পৌঁছতেই হবে।"


পৌঁছলাম মৌলালীতে।
"কিন্তু সূর্যের এত তেজ কেন আজ?
আমি তো সূর্যের দিকে একদৃষ্টে তাকাতে অভ্যস্ত। কখনো তো আমার চোখ সরিয়ে নিইনি।
আজ সূর্যের আলো এত অস্বস্তি লাগছে কেন?"


পৌঁছলাম ক্লাসের দরজায়।
হঠাত দেওয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে পরতে যাচ্ছি,
স্যার এসে ধরে ফেললেন।
আমাকে ক্লাশ করতে হয়নি, ছুটি দিয়ে দেয় আমাকে।
আবার সেই বাসে করে বাগমারিতে পৌঁছলাম।
বাস থেকে নেমে হাঁটতে গিয়ে দেখি আমার কোনো শক্তি নেই। 
হাঁটছি, যেন মাতালের মতো টাল খেয়ে পরছি।
একবার এই দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছি, একবার ওই দেওয়ালে।



কোনরকমে ঘরে ঢুকে, জুতো-মোজা পরাই থাকল,
আমি বিছানার ওপর পরেগেলাম।
তখন আমি আসে পাশে কিছু শুনতে পাচ্ছিনা, কোনো শক্তি নেই শরীরে।
বিছানায় পরতেই জ্ঞান হারাই, যখন জ্ঞান ফেরে, তখন অনেক রাত, অন্ধকার।
আমি আস্তে আস্তে শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ডান কান দিয়ে। বাঁ কানে কোনো শব্দ ঢুকছেনা।
উঠে দাড়াতেও পারছিনা। সাথে কেউ নেই। 
মনের জোরে দেওয়াল ধরে ধরে কোনরকমে ক্যান্টিনে যেতাম, খেতাম।
বাঁ কানে শোনা একেবারে বন্ধ হয়েগেছিল। শুধু ২৪ ঘন্টা ধরে শশশশ শব্দ সহ্য করতে হয়। 
যখন শরীরে শক্তি পেলাম ডাক্তার দেখানোর জন্য,
পনেরোটা দিন পার হয়েগেছে।



ডাক্তারের অনুমান ছিল ব্রেন ক্যান্সার।
পরে স্ক্যানে সেসব কিছু আসেনি, কানে না শুনতে পাওয়ারও কারণ স্পষ্ট নয়। 
অডিওমেট্রি টেস্টে ১২৬ ডেসিবল শব্দেও কান কোনো সাড়া পায়নি।
ডাক্তাররা বুঝতে পারেন এটা হিয়ারিং প্রোফাউন্ড, হিয়ারিং লস।  
কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা "মস্তিষ্কে ঘটিত আক্রমন বশত, বাঁ কান সংলগ্ন স্নায়ু কার্য-ক্ষমতা হারিয়েছে।"
মেডিকেল শাস্ত্রে যার কোনো চিকিত্সা নেই।
এমন একটা কথা আমি শুনলাম, শুনে হাসলাম, সত্যিটা মেনে নিলাম।
ভাবলাম, যেটুকু আছে, সেটা দিয়ে আমি আবার নতুন করে সব শুরু করবো।



এখনও আমার বাঁ-কানে শশশশ করে শব্দ হয়,
মাথার মধ্যে এই শব্দটা সবসময় আমাকে সহ্য করতে হয়,
ব্লাড প্রেসার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পরেছে। তাও, এই সত্যিটাকে স্বীকার করে আমি চলছি,
বেঁচে আছি, লড়াই করছি। করবও। হেরে যাবোনা কখনো।

No comments:

Post a Comment