Monday, 28 December 2015

অগ্নি উত্স তুমি তসলিমা নাসরিন।
সৌম্যজিত দত্ত।


তোমার আপসহীন আগুন কত মানুষ দেখেছে,
পদে পদে তোমার পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে সরকার, মৌলবী, ধর্মান্ধ ভক্ত।
যখন লড়েছ, ভয় তোমারও হয়েছে, তুমি ভেবেছো এই বুঝি কেউ এসে তোমার মুন্ডপাত করে। 
ভয় সবাই পায়। সেই ভয়তেও তুমি আপসহীন।
যত দেখি, ততই মুগ্ধ হয়ে যাই। 
শরীরের প্রতিটা লোম খাড়া হয়ে যায়, যখন তোমাকে বাংলা নির্বাসনের সময়গুলোতে অনুভব করি। 
রক্তের মধ্যে গরম স্রোত বয়ে যায়।

অগ্নি কন্যাকে নতুন কি আর ভাষা দেবো?
যে নিজে জ্বলন্ত আগুন, তাকে ভাষার আগুনে উজ্বল করার ভাষা কম হয়ে যাবে।

যখন গোটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল, মৌলবী, রাষ্ট্রীয় মানুষ মূর্খামি করে তোমার 
রক্তের স্বাদ পেতে চেয়েছে,
তুমি তখন সদ্য যৌবনের একজন মানবিক লেখক, ধর্ম বিদ্রুপাত্মক।
সাহস করে সত্যিটা তুলে ধরেছিলে, কিন্তু এত মনের জোর তোমার ছিলনা।
ছিলনা, কারণ পরিবারের টান, প্রানের ভয়। সংসার, ভবিষ্যত তুমিও চেয়েছিলে।

আস্তে আস্তে সমাজের ভয়ঙ্কর রূপটা সবে প্রকট হচ্ছে, 
রাতের অন্ধকারে তোমাকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। কেউ আশ্রয় দিতেও ভয় পাচ্ছে।
অন্ধকূপের মধ্যেও জীবন কাটিয়েছো, বাইরের জগতের আলো তোমার চোখে পড়েনি।
সত্যি বলার শাস্তি। তুমি ভাবোনি কখনো, সত্যি বলার শাস্তি এত ভয়ঙ্কর।
দেশের দু একজন বুদ্ধিজীবি তোমার সাথ হয়ত দিতে চেয়েছে,
কিন্তু পরে তারাও পিছিয়ে আসে পরিবারের চিন্তা করে। 
তাদেরই বা দোষ দিই কি করে?
দেশের সংবিধানের অসংবিধানিক নীতি তোমাকে দেশ ছাড়া করে দিল। 
মা, তুমি ঘুমের মধ্যেও রক্ত চোখ দেখতে তাইনা?
হয়ত ঘুমোতে, ক্লান্ত হয়ে। তোমার বুকের মধ্যে প্রতিটা মুহুর্তে কেঁপে উঠেছে,
"এই বুঝি ঘরে ঢুকে এল ওরা, এই বুঝি ছিন্নভিন্ন করে দিল চাপাতির আঘাতে।
এই বুঝি সব থামিয়ে দিল, শেষ করে দিল আমাকে, এই বুঝি সত্যের পরাজয় হয়েগেল। "


সেই দেশ কখনো দেশ হয়ে উঠতেই পারেনি মা,
সেই দেশ কখনো সত্যের মুখোমুখি হতে চায়নি।
সেই দেশ ধর্মের কারাগার।
সেই দেশে মুক্ত চিন্তা নয়, সম্মোহনের খেলা চলে। 
সেই দেশ খুনিদের দেশ। 
সেই দেশ শুধু একটা রাষ্ট্র মাত্র।


নিরাপত্তার খোঁজে চলে এলে ভারতে।
আশ্রয় পশ্চিমবাংলা।
উস্ক-খুস্ক মুখে তুমি ভেবেছিলে এখান থেকে লড়াই শুরু করবে দেশে ফেরার।
কিন্তু এখানেও তোমার ভাষা থামিয়ে দিতে উঠে আসলো বজ্জাত সরকার,
সরকার নয়, ওরা মাওবাদী।
তোমার লেখা "দ্বিখন্ডিত"কে খন্ড খন্ড করে জলে ভাসাতে চেয়েছিল।
পুলিশ কমিশনারকেও  রাজনীতির দালাল বানিয়ে তোমাকে হুমকি দিয়েছে।
রিজওয়ান ঘটনার সুযোগ নিয়ে মুসলিম জাতিকে তোমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে।
আরও কত কি করেছে!!! মনে করতে পারো সেসব মেয়েমা?
বাংলা এখনো মানুষ হয়নি। বাংলা আজও রাজনীতির একটা মঞ্চ মাত্র।

তোমার বেশ কিছু প্রানের বন্ধু হয়েছিল, কি যেন নাম মানুষটার,
যার বক্তৃতা, ভাষণে তুমি বারবার মুগ্ধ হয়েছো?
ভেবেছো এমন প্রতিবাদী বক্তা তোমার সাথে আছে, তো কিসের ভয়?
কি হলো তার? সেও তো রাজনীতির দালাল হয়ে গেল। 
তুমি তাকে বিশ্বাস করে, ভরসা করে তোমার বাসস্থানের অংশীদার করেছিলে,
আজ তো সে তোমার সেই বাসস্থানটাই কব্জা করে বসে আছে। 


পুরুষতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র, সরকারতন্ত্র বারেবারে তোমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। 
অগ্নিউত্স বলেই তুমি আজও সত্য প্রতিষ্ঠানের লড়াই লড়ে যাচ্ছো।
আজ আর তোমার লড়াইকে ওরা থামাতে পারবেনা, কারণ তুমি এখন 
সম্পূর্ণ ভিন্ন "তসলিমা নাসরিন" মেয়েমা।
এই বাংলাতেও তোমার প্রত্যাবর্তন হবে। 
বঙ্গকন্যা ফিরবেই, আমি বাজপাখির দৃষ্টিতে সেদিন দেখতে পাচ্ছি।
তোমার আবিস্কার আমি, তোমার আদর্শে গড়া সেই অগ্নিদূত হয়ে ফেটে পরবো।
ফিরিয়ে আনবো তোমাকে এই বাংলায়, সম্মানের সাথে, নৈতিকতা দিয়ে।

No comments:

Post a Comment