অচ্ছুততা বা অস্পৃশ্যতা।
সৌম্যজিত দত্ত।
বেশি কথাতে না গিয়ে মূল ব্যাপারগুলো তুলে ধরছি। আজ সরস্বতী পূজো গেল। সনাতন হিন্দু ধর্মে বিদ্যার দেবী হিসেবে সরস্বতীর আরাধনা করা হয়। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এই পূজো নিয়ে উন্মাদনার শেষ নেই। আমি নিজেও এই পূজোটা বেশ উপভোগ করি, তবে সবটুকুই নিজের মধ্যে রেখে।
কাল আমার এক বান্ধবী আমাকে বলল ও আজ এই পূজোতে থাকতে পারবেনা। আমি কারণ জিজ্ঞাসা করতে স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছিলনা। আমি বুঝতে পারলাম, ওর পিরিয়ড হয়েছে, বলতে পারছেনা। আমি বললাম, তোমার কি পিরিয়ড হয়েছে? ও বলল "হ্যা।" আমি বুঝতে পারলাম, মেয়েটা এখনো নিজের স্বাভাবিক কষ্ট গুলো মুখফুটে বলতে পারেনা। লজ্জার আড়ালে গুটিয়ে থাকে। অথছ সে জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন, শিক্ষিতা, স্বাবলম্বী। আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম, "পিরিয়ড ব্যাপারটা মেয়েদের শরীরের একটা অংশ। এটাতে অচ্ছুত কোথায়? শরীরের কোনো অংশ নিয়ে যদি এই অচ্ছুত ব্যাপারগুলো কাজ করে, তবে সমস্ত নারীই অচ্ছুত।" আসলে মেয়েটার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন ধারণা ছিল যে পিরিয়ড হওয়ার পর পুজোতে অংশগ্রহন করলে যদি ঠাকুর রাগ করে? একটা দ্বিধা ছিল, আমি ওর ওই দ্বিধাটা কাটিয়ে দিলাম। এটা প্রকৃতিস্থ ব্যাপার, এতে কোনো অচ্ছুততা আসতে পারেনা। যদিও মেয়েটা পুজোতে থাকতে পারেনি তার পেটে ব্যথা হচ্ছিল বলেই।
আমরা দেখি, যখন মা তার বাচ্চার জন্ম দেয়, জন্ম দেওয়ার পর তাকে আঁতুর ঘরে রাখা হয় সবার থেকে আলাদা করে। কাউকে ছুঁতে পর্যন্ত দেওয়া হয়না। সেখানেও এই অচ্ছুত ব্যাপারটা মানুষের মনের মধ্যে চলে আসে। সে কিছু ছুঁলে নাকি সব অপবিত্র হয়ে যাবে, যেখানে সে একটা নতুন প্রানের জন্ম দিয়েছে। প্রানের জন্ম দেওয়ার মত ভালকিছু তো আর হতে পারেনা। তবু তাকে অচ্ছুত করে রাখা হয়, পরে গঙ্গাস্নান করিয়ে তার দোষ কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো হয়। এখানে কিছু প্রশ্ন উঠে আসে, বাচ্চা জন্ম দেওয়া তো পবিত্র কাজ, একটা নতুন প্রানের সৃষ্টি করা। তাহলে তাকে এভাবে অস্পৃশ্য করে কেন রাখা হয়? উল্লেখ্য, মানুষ বাদে, কোনো পশু, পাখিদের মধ্যে এমন অস্পৃশ্যতা নেই।
হাসপাতাল একটা পবিত্র জায়গা, সবথেকে বেশি পবিত্র জায়গা, যেখানে প্রাণ বাঁচানো হয়। অথছ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর দেখি অনেক মানুষ গায়ে গঙ্গাজল ছেটায়, স্নান করে ঘরে ঢোকে। ঠাকুর ঘরেও সহজে ঢুকতে চায়না। হাসপাতালে যেখানে প্রাণ বাঁচানো হয়, প্রানের জন্ম দেওয়া হয়, এমন পবিত্র স্থান থেকে ফেরার পরেও মানুষের মন থেকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন অস্পৃশ্যতা যেতে চায়না। যেন তারা মানুষ খুন করে হাজারটা পাপ নিয়ে ঘরে ঢুকেছে।
রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে থাকা মলে যদি পা ঠেকে যায়, সেখানেও অচ্ছুত ব্যাপারটা মনের মধ্যে চলে আসে। মলের মত নোংরাতে পা পরলে, সেটা অবশ্যই পরিস্কার করা উচিত, কিন্তু তাকে গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধ হতে হবে, আবার সে যদি কাউকে ছুঁয়ে ফেলে, তবে ইনফ্রারেড জাতীয় পাপ ছড়িয়ে পরবে এক শরীর থেকে আরেক শরীরে। এটা কেমন অস্পৃশ্যতা? এখানে অস্পৃশ্যতা যেন মাইক্রো ফাইলেরিয়া ব্যনক্রফ্টি জাতীয় কোনো রোগ।
রাতে সেক্স করার পর সকালবেলাতে স্নান সেরে ঠাকুর ছুঁতে হয়, নাহলে নাকি পাপ হয়। সেক্স তো মানুষের শরীরের প্রয়োজনীয়তা, ভালবাসা। আবার সেক্সের মাধ্যমে নতুন প্রাণ সৃষ্টি হয়, তবে কেন সেক্সের পর স্নান করে তাকে শুদ্ধ হতে হবে? এটা কোন প্রজাতির অস্পৃশ্যতা?
একটা সময় অস্পৃশ্যতা জাতবিভাজনেও ছিল। উচু জাতের মানুষ নিচু জাতের মানুষদের অস্পৃশ্য করে রাখত। সেসবকে বি.আর.আম্বেদকার, বিদ্যাসাগর মহাশয়েরা ভুল প্রমাণ করে, জাতের অস্পৃশ্যতা দূর করেছিলেন। আজ মানুষের চোখে জাতের অস্পৃশ্যতা কেবলই গোড়ামি। তবে কেন আজও সাধারণ জীবনের সাধারণ ব্যাপারগুলোতে অস্পৃশ্যতা কাজ করে? কেন এগুলোকে গোড়ামি বলে মানুষ দূরে ঠেলে দিতে পারেনা? পিরিয়ডের কারণে কেন নারী আজও অস্পৃশ্য? যদি তাইই হবে, তবে কেন নারীর পিরিয়ড হওয়ার পরও তার হাতের তৈরি খাবার আমরা সেবন করি? তাহলে কি ব্যাপারটা এমনই দাড়ায় যে, পিরিয়ডের নামে নারী স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হোক, কিন্তু আমরা যেন তার সেবা থেকে বঞ্চিত না হই? পিরিয়ড হলেও তো তাকে সেক্সে অচ্ছুত করে রাখিনা। তাহলে ঠিক যে যে ব্যাপার গুলো থেকে আমরা সুযোগ নিতে পারি, ঠিক সেই সেই ব্যাপার গুলোতে নারী অচ্ছুত নয়, বরং যে যে ব্যাপারগুলোতে নারী উপভোগ করতে পারে, সেই সেই ব্যাপারেই কেবল তারা অচ্ছুত।
অচ্ছুততা মানুষের শরীরে নয়, অচ্ছুততা আমাদের মনে, বিচারে।
No comments:
Post a Comment