চিন্তা আমার, চিন্তার মালিক হতে চায় ওরা।
সৌম্যজিত দত্ত।
আমি এক গোড়া হিন্দু পরিবারে জন্মেছি। আমার পরিবারের মানুষেরা, আমার মা, বাবা গোড়া হিন্দু। এই গোড়া হিন্দুত্বের মধ্যে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। কোথাও কোনো দাঙ্গা হলে, যদি মুসলিমরা দাঙ্গা করে, পরিবারের মানুষেরা বলে মুসলিমরা সব নষ্টের গোড়া। আবার যদি কোনো মুসলিমকে হিন্দুরা খুন করে তখন, ওরা বলে, "ওদের কুপিয়ে মারা উচিত।"
এইসব গল্পগুলো আমার সামনে করে, আমাকে শুনিয়ে করে। করে কারণ আমি লেখালেখি করি। আমি যাতে না লিখি, তাই আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে। যখন সহ্য করতে পারিনা, যদি কখনো দু-একটা কথা বলে ফেলি, "যা হচ্ছে, ভুল হচ্ছে। মুসলিম, হিন্দু কেউ ঠিক করছেনা। মুসলিম হিন্দুকে মারছে, তাই হিন্দু মুসলিমকে মারছে। আবার হিন্দু মুসলিমকে মারছে বলেই, মুসলিম হিন্দুকে মারছে। এভাবে মারামারী কখনো থামবেনা। যুগযুগ ধরে চলতে থাকবে।"
হ্যা, আমি এটাই বলেছিলাম আমার বাবাকে, মাকে। ওরা আমার কথা বোঝেনি, সেইদিন থেকে আমাকে প্রতিটা মুহুর্তে বাজে কথা শোনায়। প্রতিটা কথার মধ্যে অপমান করে। আমাকে বলে, "তস্লিনা কে খুন করা হবে। তারপর আমাকে খুন করবে। আমাকে কেটে ফেলবে। সবার আগে আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করবে। আমার বেতনের টাকা ছুঁয়েও দেখবেনা।"
মেয়েমাকে তসলিমা না বলে, ওরা "তস্লিনা, ফস্লিনা" এসব বলে ডাকে। এই কথাগুলো প্রতিটা মুহুর্তে আমাকে যতটা অপমান করে, তার থেকে অনেক বেশি মানুসিকভাবে অত্যাচার করে। আমার গায়ের মধ্যে জ্বালাপোড়া ধরে যায়। সারাদিনে, যেকোনো কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে এসব কথা বারবার করে শুনতে হয়। আমার আদর্শকে এভাবেই সবসময় অপমান করা হয়। তাও আমি লিখি। আমি যা বলার, মুখের ওপরেই বলি। ভাবি কখনো যদি ওরা আমার কথা বোঝে, কখনো যদি আমার আদর্শকে সম্মান করে।
আদর্শ, আমার আদর্শগুলো খুব সোজাসাপ্টা কিছু চিন্তাভাবনা। হিন্দু-মুসলিম জাত বিভেদ আমি মানিনা। ইশ্বরে বিশ্বাস করি, কিন্তু ধর্মের অতিবাহারে, কুসংস্কারে বিশ্বাস করিনা। এখানে আমি সম্পূর্ণ আস্তিক বা সম্পূর্ণ নাস্তিক নই। ইশ্বরে বিশ্বাস করলেই যে ধর্মে বিশ্বাস করতে হবে, আবার ধর্ম মানেই যে ইশ্বর, এমন কোনো মতে আমার বিশ্বাস নেই। কিছু গল্প আছে, রামায়ন, মহাভারতে। কিছু চরিত্র আছে যেগুলো আমার ভালো লাগে। ওখানে কিছু ভালো ও আদর্শের নিদর্শন আছে, সেই আদর্শগুলোতে আমি বিশ্বাস করি। আদর্শগুলো সংসারের উন্নতির জন্য, সত্যের জয়ের জন্য। কিন্তু বর্তমানে ধর্ম ব্যাপারটা এমনই যে সেটা মানতেই হবে। মানলে সুরক্ষিত, না মানলে মৃত্যু দন্ড বা স্বতস্ফুর্ততা থেকে বঞ্চিত হওয়া। এটাকে ধর্ম না বলে দাদাগিরি বলা ভালো। আমি এমন ধর্মে বিশ্বাস করিনা যেখানে নিজস্ব মত দেওয়া যায়না, শুধু পুতুলের মতো হয়ে থাকতে হয়। আদর্শ, চিন্তাভাবনার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও কর্মের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আর এই কথাগুলোই বারবার নানারকম যুক্তি দিয়ে তুলে ধরি। কিন্তু আমার পরিবারের মানুষেরা আমার এইসব যুক্তিগুলোকে, চিন্তাগুলোকে বুদ্ধিহীনতা বলে কটাক্ষ করে।
সমাজের মানুষজনের কথাতে আসি। সমাজের কিছু মানুষজন আমার চিন্তাভাবনা গুলোকে, লেখালেখি গুলোকে যুক্তিহীন, অবাস্তব বলে ঘোষণা করেছে। তারা আমার ভবিষ্যত বিচার করেছে, আমি নাকি কিছুকালের মধ্যেই পাগল হয়ে যাবো, যদিনা এইসব চিন্তাভাবনা ও লেখালেখি ছাড়ি। কিছু মানুষ আমাকে মেরেফেলার হুমকি দেয়। আবার কেউকেউ নোংরা ভাষায় গালাগালি দেয়।
এতকিছুর মধ্যেও আমি আমার আদর্শকে ছেড়ে দিইনি, দেবোনা। আমি সবসময় যেমন জাতিভেদে অবিশ্বাস করি, এভাবেই অবিশ্বাস করে যাবো। তাতে যদি আমার পরিবার ত্যাগ করে আমাকে, করুক। শুধু সেইসব মানুষরা যারা, আমাকে মেরে ফেলার কথা বলে বা স্বপ্ন দেখে, তাদের একটা কথা বলবো, তোমরা তোমাদের মত সবরকম চেষ্টা করে দেখতে পার। এসব বলে তোমরা আমার চিন্তা ভাবনা থামাতে পারবেনা। আমাকে আমার আদর্শগুলোর চিন্তা থেকে বিরত রাখতে পারবেনা। আমার মধ্যে জাতের গোড়ামী সৃষ্টি করতে পারবেনা। আর যদি মারতে আসো, মারতেও পারবেনা। যদি আমার বাবা, মা আমাকে মেরে ফেলে, তবে সেটা তারা করতেই পারে। আমি বাধা দেবোনা। কিন্তু যদি অন্যরা মারতে আস, তোমরা বেঁচে ফিরবেনা। আমি সেইসব ব্লগারদের মধ্যে পরিনা যে শুধু মার খেয়ে মরবো, বরং পাল্টা আঘাত হানতেও আমি জানি।
No comments:
Post a Comment