"সত্য" আমাদের অধিকার। আমি সত্য ও আদর্শ শিখেছি তসলিমা নাসরিনের জীবন দর্শনে।
সৌম্যজিত দত্ত।
দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়তাম, প্রেমের ভূত মাথাচারা দিয়ে উঠেছিল। প্রেম, প্রেম আর শুধুই প্রেম। পড়তে বসে ঠিকমত পড়তে পারতামনা। প্রেমিকার কথা মনে হত। প্রেম ছাড়া যেন বাকি সব অন্ধকার। এমনকি পড়াশোনাতে এতটাই অমনোযোগী হয়ে উঠেছিলাম যে, ইংলিশ কোচিং ক্লাস বন্ধ করে সেই সময় প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করতাম বাইরে। সত্য বলার সাহস ছিলনা আমার। তাই বাড়িতে বলতে পারতামনা যে, আমি পড়তে যাচ্ছিনা। ৩ মাস পড়তে যাইনি। মাসের প্রথমে টিউশন-এর বেতন আমার হাত দিয়েই পাঠাত মা। আমি মা'কে বলতে পারতামনা যে, টাকা লাগবেনা, আমি পড়তে যাইনি। টাকা খরছ করতে জানতামনা। টাকা আমার ব্যাগেই থেকে যেত। ওয়ালেট ব্যবহার করতামনা। বইয়ের ব্যাগেই থাকত। একদিন মা টাকা দেখে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, কিসের টাকা? আমি উত্তর দিতে পারিনা। চুপ করে থাকি, এড়িয়ে যাই। মা আমার স্যারের সাথে দেখা করতে যায়, জানতে পারে আমি ৩ মাস পড়তে যাইনি। আমি দূর থেকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। মা ঘরে ঢুকে সোফায় বসল, কাঁদছিল। আমি চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে পা ধরে ক্ষমা চাইলাম। বললাম, "আর কখনো এমন কাজ করবোনা। আমি ভুল করেছি।" যদিও টিউশন ছাড়াই আমি উচ্চমাধ্যমিকে ইংলিশে ৬০% নাম্বার পেয়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংলিশ অনার্স পেয়ে গেছিলাম প্রথম সুযোগেই। টিউশন ব্যাপারটা মোটেই আমার ভালোলাগতনা কখনো। দীর্ঘ প্রাই ২৪ বছরের পড়াশোনার জীবনে আমি কখনই ধারাবাহিক ভাবে, নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে পড়াশোনা করতে পারিনি। যখন ইচ্ছা হয়েছে পড়েছি, আবার কখনো পড়িনি। কিন্তু এই পড়া, না পড়ার মাঝে আমি আজ পর্যন্ত কখনই বই ছাড়া থাকিনি। কষ্ট হয় থাকতে। পরে, ইংলিশ অনার্স পড়তে পড়তে আবার মন ঘুরে যায় কম্পিউটার সায়েন্সের দিকে। কম্পিউটার সায়েন্সে গ্র্যাজুয়েশান ও মাস্টার্স করি। সরকারী চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশন নিয়ে পরীক্ষা দিতাম, সেখানেও একঘেয়ে ধরে গেছিল। পরে আবার সরকারী চাকরির প্রস্তুতি ছেড়ে দিয়ে রিসার্চ করতে শুরু করি।
আমি মানুষটা অন্যরকম ছিলাম। নারীবাদী, মানবতাবাদী চিন্তাভাবনা আমার মধ্যে কখনো ছিলনা। অমানবিক একজন মানুষ ছিলাম। তবে, নিজের কাজের প্রতি কখনো অসৎ ছিলামনা। সময় আমাকে পরিবর্তন করেছে। আমার পরিবর্তনের শুরু হয় পায়েলের সাথে ব্রেক আপ হওয়ার পর থেকে। আমি নিজে থেকে নিজেকে কিছুটা পাল্টানোর চেষ্টা করেছিলাম। সত্যকে মুখের ওপর বলতে শুরু করি। কখনো ভয় করত সত্যকে স্বীকার করতে, কিন্তু ভয়কে জয় করে নিয়েছিলাম খুব সহজে। আমার জীবনের পরিবর্তনের পিছনে যে ঘটনাগুলো কাজ করেছে, সেগুলো:
১) পায়েলের সাথে ব্রেক আপ হওয়া। যেটা আমি মন থেকে মেনে নিতে পেরেছিলামনা।
২) আমার দিদির মৃত্যু আমাকে কঠিন করে দিয়েছিল।
৩) মেয়েমা তসলিমা নাসরিনের জীবন দর্শন সব থেকে বড় অংশে দায়ী, এই আজকের সৌম্যজিত দত্ত হওয়ার জন্য।
তসলিমা নাসরিনের জীবনকে, ওনার প্রতিটা কথা, প্রতিটা চিন্তাগুলোকে নিজের মনের মধ্যে এমন ভাবে এত পরিমানে ভেবেছি যে, আমার নিজের মধ্যে ওনাকে এখন অনুভব করতে পারি। যেন তসলিমা নাসরিন আলাদা কোনো মানুষ নয়, আমার মধ্যেই তসলিমা নাসরিন আছে। আর ওনার ওই ডাকাবুকো সত্য বলার সাহস, কোনো ভাবনা চিন্তা না করেই সত্য বলার সাহস আমার মধ্যে চলে এসেছে।
এখন আমি জানি, বিশ্বাস করি, উপলব্ধি করতে পারি, যে অবস্থাতেই থাকিনা কেন, সত্য আমি সবসময় বলবো। সত্যে কোনো দ্বিধা থাকেনা, লজ্জা থাকেনা। থাকে সততা, সাহস, মানুষ হওয়ার লক্ষণ, ভালো হওয়ার লক্ষণ, বিশ্বাস, ভরসা, গাম্ভির্যতা। সত্য বললে, তুমি কাউকে ভয় পাবেনা, কিন্তু অসৎ মানুষরা তোমাকে ভয় পেয়ে চলবে। আবার মানুষের ভালবাসা, সম্মানও পাবে।
No comments:
Post a Comment