Tuesday, 17 May 2016

২০১১ এর জানুয়ারীতে ঘর থেকে বেরিয়ে ক্লাসে যাওয়ার পথে বাসের মধ্যে হঠাৎ আমার শরীর খারাপ লাগতে থাকে। ভিড় বসে দাঁড়িয়ে যেতে যেতে চারিদিকটা খুব অন্ধকার মনেহয়। চারিদিকে বাস, ট্রামের আওয়াজ প্রথমে খুব জোরে কানে আসতে থাকে ও পরে একেবারে সেই আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে যায়। বাসের লোকজনদের কথাবার্তাও ক্ষীণ হয়ে যায়। মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। ওই অবস্থাতেই আমি কলেজে পৌঁছোই। ক্লাসরুমে ঢুকতে গিয়ে দরজার সামনে টাল খেয়ে যেতেই প্রফেসর সামনে থেকে ধরে ফেলে। উনি বুঝতে পারেন আমার শরীর ঠিক নেই। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আমি ঘরে ফিরে আসি। ফেরার সময় সরু গলির ভিতরে দেওয়াল গুলোতে ধাক্কা খাচ্ছিলাম বারবার। শরীরে কোনো শক্তি পাচ্ছিলামনা। টাল খেয়ে পড়ছিলাম। ওইভাবেই ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়তেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ওইসময় দুটো কানের একটাতেও আমি শুনতে পাচ্ছিলামনা। ৫ ঘণ্টা মত ওভাবেই পড়েথাকি বিছানায়। জ্ঞান ফিরতেই লক্ষ্য করলাম, আমার ডান কান দিয়ে আমি আস্তে আস্তে শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু বাঁ কানে কিছু শুনতে পাচ্ছিনা। একা থাকতাম। শরীরে শক্তি তখন একেবারেই ছিলনা যে উঠে ডাক্তারের কাছে যাবো। আস্তে আস্তে আমার ডানকান পুরো ঠিক হয়ে ওঠে, কিন্তু বাঁ কানে শোনা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। আমি ভাবি একটু সুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পনের দিন দেরি হয়ে যায়, আমি বাইরে বেরোতে পারিনি শক্তিহীনতার জন্য। পনের দিন পর চিকিৎসা শুরু হলে ডাক্তার অনেক রকম টেস্ট দেয়। এম আর আই টেস্ট করেও কিছু ধরা পরেনা। শেষে অডিওমেট্রি টেস্টে ধরা পরে হেয়ারিং লস (লেফ্ট ইয়ার) . কলকাতার অনেক জায়গাতে চিকিৎসা করিয়েও কিছু হয়নি। চেন্নাইতে যাই এপোলো হসপিটালে। ওখানকার ডায়াগনোসিস রিপোর্ট একই আসে। শেষে ডাক্তার বলেন এটা খুবই দুর্ভাগ্য জনক যে একুশ বছর বয়সে একটা কান নষ্ট হয়েগেল। পাশে মা ছিল, কেঁদে ফেলল। আমি শুধু হালকা একটা হাসি হাসলাম। ভাবলাম, ও কিছুনা, আমি বেঁচে আছি এখনও। প্রতিবন্ধকতা আমাকে আটকাতে পারবেনা।

প্রতিবন্ধকতা যেমনই হোক, শারীরিক বা মানসিক, নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতায় কাওকে দমিয়ে দিতে পারেনা। আমিও দমে যায়নি। সেবার ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট এন্ট্রান্স কম্পিউটার এপ্লিকেশন এ আমি ২৬৮ র‍্যাঙ্ক করি। এগিয়ে যাওয়ার মত জোশ আমার মধ্যে সবসময় ছিল। আমি বরং একটু আলাদা ভাবে ভেবেছিলাম, আমি ফিজিক্যালি ডিজেবেল্ড নই বরং আমি একজন ডিফারেন্টলি এবল্ড পারসন। সাহস নিয়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। কিন্তু মাঝপথে আই এস আই আমাকে রিসার্চের সূযোগ করে দেওয়াই আমি সেটা আর হাতছাড়া করিনি। নিজে এক প্রতিবন্ধী হয়েও কোথাও শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে অ্যাপ্লাই করিনি। কারণ আমি জানি, আমার ভেতর সেই শক্তি আছে যে আমি কোনো রিজার্ভেশান ক্যাটেগরী তে না গিয়েও নিজের লক্ষ্যে পৌছতে পারি।

তোমরা যারা প্রতিবন্ধী, নিজেদের কখনো দুর্বল ভেবনা। হতেপারে রাস্তা অনেক কঠিন স্বাভাবিকের থেকে, কিন্তু তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই সেই রাস্তাতে চলার ক্ষমতা আছে। শুধু নিজের ওপরে ভরসা ও বিশ্বাস রাখবে। জানবে, লক্ষ্যের ভীত তৈরি হয় মনের মধ্যে। প্রতিবন্ধকতা তোমাদের শরীরে, মনের জোরে তোমরা তোমাদের লক্ষ্যকে ঠিক ছুঁতে পারবে।

প্রতিবন্ধকতার অনেক শ্রেণী। যারা জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী, বিশেষ করে দেখতে পাওনা, শুনতে পাওনা, তোমাদের জন্য আলাদা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ আছে। যেভাবে স্বাভাবিক শিশুরা বলতে শেখে, শুনতে শেখে, দেখতে শেখে, ঠিক তোমরাও তোমাদের সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের দ্বারা সবকিছুকে বুঝতে ও অনুভব করতে শিখবে। একটু নিজেদেরকে বিশ্বাস করলে, ভরসা করে এগিয়ে গেলে তোমরাও অনেক ভালো, বড় ও মহৎ কাজ করতে পারবে। আর তোমাদের সেইসব কাজ পরবর্তী প্রতিবন্ধী মানুষকে প্রেরনা দেবে। 

No comments:

Post a Comment