তসলিমা নাসরিনের জীবন থেকে, চেতনার পথে।
সাম্প্রদায়িকতা কি? ভিন্ন সম্প্রদায় গোষ্ঠী দন্দ্ব। সম্প্রদায় যেমন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ বা জৈন প্রমুখ নিজ নিজ ধর্মের ভিত্তিতে যেসব গোষ্ঠী গঠন করে, তাদের মধ্যে নিজ গোষ্ঠী, নিজ ধর্মকে সামনে তুলে ধরতে অন্য গোষ্ঠিগুলোকে ছোট করা বা ধ্বংস করার নীতিই হল সাম্প্রদায়িকতা।
তসলিমা নাসরিন লিখিত লজ্জা গ্রন্থটি ছিল বাংলাদেশের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। ধর্ম নিয়ে মাথা ব্যথা উনার কখনই ছিলনা। যে মানুষটা কোনদিন ধর্মে বিশ্বাসই করেননি, সেই মানুষটা খামোকা ধর্ম নিয়ে কেনই বা মাথা ব্যথা করতে যাবেন? কিন্তু লজ্জা'কে বাংলাদেশের মানুষজন বিশেষ করে মৌলবাদ্গন অন্যরকম একটা চাদরে মুড়ে দিয়ে বিবৃতি দেয় যে লজ্জা মানুষের ইসলামীয় অনুভুতিতে আঘাত করছে। অবিলম্বে গ্রন্থটি নিষিদ্ধ করা হোক ও লেখিকার সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। ধর্ম অপরাধী বলে ঘোষণা করা হয় লেখিকাকে। আরও প্রচার চলতে থাকে যে ভারতের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক নীতি পালনকারী ইসলাম বিরোধী বিজেপি নাকি "লজ্জা" লিখতে লেখিকাকে মোটা অঙ্কের মূল্য চোকায়। কথাটার সত্যতা সম্পর্কে কোনো সঠিক প্রমাণ না থাকার সত্বেও এটাই প্রচার হতে থাকে। যেহেতু লজ্জা সম্পর্কে মানুষের মনে একটা ভুল ধারণা তৈরী হয়, মানুষ তসলিমা বিরোধী যেকোনো মন্তব্যকেই বিশ্বাস করতে থাকে। ইতিমধ্যে ভারতের স্টেটসম্যান এর এক সাংবাদিকের সাথে লেখিকার একটা ইন্টারভিউতে শরিয়া আইন নিয়ে কথা হয়। লেখিকা মন্তব্য দেন শরিয়া আইনের সংশোধন চান, কিন্তু ওই সাংবাদিক শরিয়া আইনের সাথে কুরআনকে গুলিয়ে ফেলে এবং কাগজে ছাপিয়ে দেন লেখিকা নাকি মন্তব্য করেছেন কুরআনের সংশোধন চান বলে। আদৌ লেখিকা কুরআন সম্পর্কে এমন কোনো মন্তব্য করেনি সেটা তিনি বারবার প্রকাশ করেছেন। এই একটা ভুল মন্তব্য থেকে গোটা বাংলাদেশ জুরে লেখিকার নামে ফতোয়া জারি হয়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়, জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। মৌলবাদ্গন দেশজুরে মিছিল করে তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি চায় দাবি তুলে। নানারকম হুমকি আসতে থাকে লেখিকার কাছে, এবং পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হতে থাকে যে লেখিকাকে আত্মগোপন করতে হয় বিভিন্ন্ জায়গাতে। সেসব আত্মগোপনে থাকার ভয়াবহ দিনগুলো যে লেখিকার কিভাবে কেটেছে, সেসব জানলে সাধারণ জীবনে যেকোনো মানুষই শিউরে উঠবে। "অন্ধকার সেইসব" গ্রন্থটিতে লেখিকা সেইসময় লেখা ডায়েরিটা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের মত ইসলাম প্রধান দেশে, যেখানে ইসলামই আইন, ইসলামই কানুন সেখানে যদি মানুষের মনের ইসলামীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগে, সেটা মুছতে যে কি ভয়ঙ্কর দমননীতি তারা গ্রহণ করে, লেখিকা তাতে চরম ভুক্তভুগী। আসলে এটা ওদের কাছে ইগোর লড়াই, নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিতে। ইসলামকে আঘাত হানাটা বড় কোনো ব্যাপার নয় বরং বড় ব্যাপারটা হল তাদের অস্তিত্ব বোঝানো। স্বাধীন চিন্তাবিদ, স্বাধীনতা ইসলামে হারাম। এসব করতে গেলে গোটা ইসলাম সাম্রাজ্যের মৌলবীগণ কেটে টুকরো টুকরো করতে বা মুন্ডপাত করতে দ্বিধাবোধ করবেনা তবু এই খুনোখুনির স্পর্শেই ইসলাম তাদের শ্রেষ্ট ও পবিত্র ধর্ম। এটা ভিন্ন আর সবই অপবিত্র। তসলিমা নাসরিন বলেছিলেন, কুরআন মানুষের সৃষ্টি। এই নিয়ে বিতর্ক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। আমি বলছি, কুরআন কি আকাশ থেকে পড়েছিল বা মাটি ভেদ করে বেরিয়েছিল? কুরআন, গীতা, বাইবেল সহ সমস্ত ধর্মগ্রন্থই মানুষেরই সৃষ্টি। কোনো অদৃশ্য শক্তি এসে তৈরী করে দিয়ে যায়নি। তসলিমা নাসরিন বলেছিলেন শরিয়ার সংশোধন প্রয়োজন, কুরআন কে সংশোধন করা সম্ভব নয়। আমি বলছি, যদি প্রয়োজন পড়ে, মানুষের স্বার্থে যেকোনো ধর্মগ্রন্থকেই পরিবর্তন করা যায়। মৌলবীগণ দাবি তুলেছিল তসলিমা নাসরিন মানুষের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করছে, তরুণ সমাজে নাশকতা ছড়াচ্ছে। আমি বলছি মানুষের মনে আজ নাশকতা ছড়াচ্ছে ধর্মগ্রন্থগুলো। কারণ সাম্প্রদায়িকতার উৎস ধর্মগ্রন্থ। অনেকেই বলছেন তসলিমা নাসরিন নাকি মৌলবাদদের উস্কানি দিয়েছেন লজ্জা লিখে। লজ্জা লেখা নাকি উচিৎ হয়নি। লেখক কি লিখবে না লিখবে সেটা কি তোমাদের ধর্ম ঠিক করে দেবে? ৭১ এর আগে কি তোমাদের মধ্যে মৌলবাদ ছিলনা? মৌলবাদ কে তোমরা অহংকার ভাব। দেশদ্রোহী রাজাকারগুলো মৌলবাদদের সাথে মিলে গেল, গোটা দেশ জুরে এক নিরীহ লেখকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করল, হিংসা তৈরী করল, খুনোখুনি করল, হতাহত হল, আবার তারাই পরবর্তীকালে রাজনীতির আড়ালে চলেগেল, এগুলো কি তসলিমা নাসরিন তৈরী করে দিয়েছিল? যেখানে রাজাকার খুনিগুলো বছরের পর বছর বেঁচে থেকেছে, এখনও অনেকে বেঁচে আছে, তারা যুদ্ধপরাধী। সেইসব বেইমান গুলোর দোষের থেকে একজন সত্যি লেখা, সত্যিকে তুলে ধরা লেখিকার দোষ কি এতটাই বেশি যে মৌলবাদী, রাজাকার মিশে মিছিল করল আর তোমরা গোটা দেশ মিলে সেটাকে সমর্থন করে গেলে! ইসলাম সত্যিই শান্তির ধর্ম। এখনও খুনোখুনি হচ্ছে। সজাগ হও। মানুষ মারতে প্রতিবাদ নয়, প্রতিবাদ কর মানুষ বাঁচাতে। ওটাই প্রকৃত ধর্ম। বাকি রইল মানুষ সৃষ্ট ঐসব ধর্মগ্রন্থ! জানবে, ওসব মানুষেরই তৈরী। মানুষের স্বার্থে, প্রয়োজনে ওগুলোকে ধ্বংসও করা যায়। ধর্ম তোমাদের মনে, কোনো ধর্মগ্রন্থে নয়। মানুষ ধর্ম গ্রহন কর। ধর্ম মানে অলৌকিক কিছু নয়। ধর্মের অর্থ মনুষত্ব ধারণ।
সৌম্যজিৎ।
No comments:
Post a Comment