Friday, 27 May 2016

আঁধারে আলো।
উৎসর্গ- তসলিমা নাসরিনকে।
সৌম্যজিৎ।

মুহূর্তে নিঃশ্বাস পড়ে ঘন ঘন,
বইছে সময়, ঘুরছে কাঁটা বড় দ্রুত,
বুক দুরুদুরু কম্পনে সারা শরীরে শিহরন,
চিন্তাজুরে শুধু সময়কে অনুরোধের সুর আরেকটু পিছিয়ে চলো তোমরা -
আমি বাঁচতে চাই।
আমি বাঁচতে চাই প্রাণ খুলে ব্রম্মপুত্র তীরে,
আমি বাঁচতে চাই আমার মায়ের আঁচল বিছান কোলে,
আমি বাঁচতে চাই।
ক্লান্ত মনের ক্লান্তিতে আমি ঘুমাইনি কত রাত!!
শরীর জুরে অচলতা আমি চলছি শুধু চলতেই,
নাই খিদে, নাই ঘুম, নাই হাজারও সে স্বপ্ন,
সব আজ ওই একটু বাঁচতে চাওয়াতেই ফুরিয়ে গেছে ।
দ্রুত বয়ে যাচ্ছে ঘড়ির কাঁটা আমার নাই সাধ্য তাকে থামানোর।
কি দোষ ছিল আমার?
হাজারও নারীর প্রতি হওয়া, হয়ে যাওয়া, করে যাওয়া অত্যাচার-অন্যায়তে
আমি চেয়েছিলাম নারী জাগরন।
আমি চেয়েছিলাম নারী হোক নিজের স্পর্ধায় চলা সেই পথিক যে -
নিজেই নিজের অবলম্বন,
আমি চেয়েছিলাম নারী যেন দাস হয়ে না থাকে,
আমি চেয়েছিলাম নারী যেন সূর্যদিকে বা অন্ধকারে চলে দ্বিধাহীন,
নারী চেতনা!! - নারীর বিস্ময় না হয়ে বাস্তব হোক,
প্রার্থনা নয় চেয়েছিলাম অধিকার ছিনিয়ে নিতে।
প্রতিবাদ মুখর হয়েছিলাম লেখা দিয়ে,
লড়তে চেয়েছিলাম শরিয়তির নিয়ম পাল্টাতে,
আমি লড়েছিলাম একটা সমাজের মত সমাজ গড়তে,
ওরা উস্কে দিল সেই সমাজকেই আমার পিছনে।

ওরা আমাকে ঘর ছাড়া করে দিল,
আমিই যে আমি প্রাণ চঞ্চল ছোটাছুটি করে বেড়াতাম,
আমিই আজ ঘরছাড়া উস্কখুস্ক চুলে, দিনের পর দিন নাই স্নান,
খাওয়া জোটে - জোটেনা, শুধু পথ চেয়ে থাকি একটু মুক্তির আশায়।
একটু ভরসা, কেউ এসে বলবে, কেউ বলুক, "তসলিমা, -
তুমি মুক্ত। ছুটে যাও ওই বাজার খোলা রাস্তা দিয়ে, দৌঁড়ে ডিঙিয়ে পার করো -
এক এক ধাপ। জড়িয়ে ধরো মার গলা, বাবার বুকে আশ্রয় নাও,
দাদা'দের জড়িয়ে ধরো, চিৎকার করে কাঁদো বোনকে চেপে ধরে,
পরমা, ভালোবাসাকে বুকের মধ্যে নিয়ে প্রাণ ভরে শ্বাস নাও তসলিমা।
আজ যে তুমি মুক্ত!"
দিন যায়, রাত যায়, আমাকে শুধু নিরাপদ আশ্রয়ে আশ্রয় খুঁজে -
দান গ্রহন করে, পরনির্ভর হয়েই বাঁচতে হয়।
তসলিমা- যে আমিই নারীমুক্তি ঘটাতে চেয়েছি,
স্বনির্ভরতার বিশ্বাস জোগাতে চেয়েছি,
আমিই সেই তসলিমা আজ দিন কাটাচ্ছি পরনির্ভরে, প্রাণ বাঁচাতে।
ওরা কেন আমাকে নির্ভরতা দেবে?
ওরা তো আমার কখনো কেউ ছিলনা।
ওরা শুধু কেউ কেউ আমার কোথাও পরিচিত মাত্র।
আত্মীয়-বন্ধু যা ছিল সবাই তো সরে গেছে,
ওরা সরেনি। কখনো কেউ না হয়েও ওরাই আজ আমার সব,
আমার রক্ষা কর্তা।
আমার বিপদ যেন ওদেরই বিপদ,
ওরা যেন নিজেদের বাঁচাতেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রাণপণে।
লক্ষাধিক মৌলবাদের সশস্ত্র আন্দোলনকে পাত্তা না দিয়েই ওরা লড়ছে।
দিনের আলোতে, রাতের অন্ধকারে সন্তর্পণে আমাকে রক্ষার লড়াই লড়ছে।

একটু মুক্তির আশা,
জামিন মুক্ত হওয়ার আশা -
দরজাতে কড়া নাড়তেই আমি যেন অন্ধকার থেকে জেগে উঠি,
মুহূর্তেই আমাকে থামিয়ে দিতে চাই সেই মুক্তি আবার অন্ধকারে।
শর্তাধীন জামিন!
আমাকে আমারই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে!
এই দেশ আমার,
এই দেশকে ঘিরেই আমি নারী চেতনা জাগাতে চেয়েছি,
এই দেশেই আমি বড় হয়েছি, পরিচয় পেয়েছি,
এই দেশেরই মাটির গন্ধ আমার শিরায় শিরায় বইছে,
এই দেশেরই নাম আমার রক্তস্রোতে বইছে,
এই দেশকেই কিনা ছেড়ে যেতে হবে!
কেন? কি অপরাধ করেছি আমি?
কেন এই শাস্তি!

আদালতে উপস্থিতিতেই আমাকে জামিন মুক্ত হতে হবে,
বুকের মধ্যে টিপটিপ, ঢিপঢিপ।
মৃত্যু শুধু ওৎ পেতে বসে আছে, আমার পানে চেয়ে হাসছে,
জিজ্ঞাসা করছে, "কোথায় মরবি?"
আমি জানি আমার মৃত্যু হবেই।
সাদা টুপিওয়ালারা রাস্তা ঘিরে আছে, হাজারও, লাখো।
ওরা আমাকে বাঁচতে দেবেনা।
তবু যদি একটা সুযোগ পাই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে!

মাথা, চুল ঢাকা -
আমার কাছে যেন মাথা শরীর থেকে নেমে পড়ার সমান,
আমি পুরো ঢাকা।
আদালত চত্বর লাখে লাখে সাদা টুপিওয়ালারা ঘিরে রেখেছে,
চিল-শকুনের মতো তসলিমাকে ছিঁড়ে খাবে।
আমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো,
একটুও নড়বো না।
ওরা আমার শরীর ক্ষত, বিক্ষত করে শেষ করে ফেলুক,
ওরা আমার বিশ্বাসকে মারতে পারবে না।
এই বিশ্বাসেই মানুষ জেগে উঠবে,
আমি আজ হেরে যাবো,
হেরে গিয়েও আমিই জিতবো।
জিতবে আমার আদর্শ।

No comments:

Post a Comment