কিছু চিন্তা এখন মাথাতে। কিছু স্মৃতি উঁকি দিচ্ছে। মেয়েমাকে নিয়েও দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
পাপার চোখে আমি ভীষণ সৎ, আদর্শবান একটা ছেলে, নিপাট ভদ্র মানুষ যাকে বলে। পাপা সবাইকে আমার জন্য গর্ব করে বলে, "আমার ছেলে খুব সৎ, খুব আদর্শবান। টাকা পয়সার অপব্যবহার করেনি কখনো। খরচ করার আগে জিজ্ঞাসা করে খরচ করে। ছোটথেকে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই পড়াশোনা করেছে। আই এস আই তে যখন ভর্তি হয়, এইরকম একটা হাই প্রোফাইল প্রতিষ্টানে ভর্তির সময় মাত্র ৩০০ টাকা এডমিশান ফি জমা করে ভর্তি হয়েছে।" এইসব কথা মানুষকে বলার সময় যেমন গর্ববোধ করে, তেমনি নিজের উদ্বেগও প্রকাশ করে। "ছেলে বড্ড বেশি রাজনীতির চিন্তা করে, এত বেশি আদর্শ নিয়ে কথা বলে, এত লেখালেখি করে, ওর কপালে বিশাল দুঃখ আছে। ওই মুসলিমরাই ওর সর্বনাশ করবে।" এইসব কথাগুলো বিভিন্ন লোক মারফৎ আমার কানে পৌঁছয়। চৌদ্দ বছর বয়সে ছয় জন ডাকাতের দিকে বন্দুক তাক করে তাড়িয়ে ছিলাম আমি, সেই কথাটাও তার মুখে বারবার চলে আসে। আমি গালাগালি দিইনা, তবে আমার জীবনে যে আমি একেবারে কখনো গালাগালি দিইনি, এটা বলা ভুল। আমি মুখ দিয়ে ঐসব ভাষা বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করেছি আমার ১৮ বছর বয়স থেকে ২২ বছর বয়স পর্যন্ত। একবার পাপার সামনেই উচ্চারণ করে ফেলেছিলাম। করিমপুর হাসপাতালটার উন্নতি তখন খুব একটা হয়নি। সাল ২০০৯। বড় ডাক্তার নেই, সব ট্রেইনি। এমনকি যন্ত্রপাতিও তেমন নেই চিকিত্সার জন্য। পাপার গলাতে মাছের কাঁটা বিঁধে যায়। শ্বাসনালিতে। কিছুতেই, কোনো ভাবেই বের হচ্ছিলনা। পাপাকে নিয়ে আমি হাসপাতালে নিয়ে যায়। ও.টি. স্ট্রেচারে পাপাকে শুইয়ে দেয় সাপোর্ট স্টাফরা। কিন্তু ডাক্তার বলতে ট্রেইনি ও যন্ত্রপাতি না থাকায় ওরা পাপাকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে বহরুমপুরে রেফার করে। এদিকে পাপা শ্বাস নিতে পারছেনা, কষ্ট পাচ্ছে, শ্বাস আটকে মরার মত অবস্থা। আমি ওই ট্রেইনি ডাক্তারকে বলি, এখন ৮০ কিলোমিটার যাওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে। শ্বাস নিতে পারবেনা। ওরা বলে, "এখানে কিছুই করতে পারবনা। চেষ্টা করতে গিয়ে খারাপ কিছু হলে আমাদের দোষ হয়ে যাবে। ওনাকে এখুনি নিয়ে যান।" আমার যেমন রাগ হল, তেমন কষ্ট হল। ওই স্ট্রেচারে শোয়ানো অবস্থায় আমি পাপার মুখের মধ্যে দিয়ে গলাতে তর্জনি ও মধ্যমা ঢুকিয়ে কাঁটা বার করার চেষ্টা করতে শুরু করলাম। পাপা আমার হাতে বমি করে দিল। তবু কাঁটা বেরয়না। আমি বাঁ হাত দিয়ে পাপার কপালে হালকা করে হাত রেখে আবারও ওই দুটো আঙুল ঢুকিয়ে চেষ্টা করতে থাকলাম, আর পাপাকে বললাম, "ভরসা রাখো, নিজেকে একটু ধরে রাখো। আমি আছি তো।" এভাবে কিছুক্ষণ চেষ্টা করতে করতে আমার আঙুল গিয়ে পরে কাঁটার ওপরে। দুটো আঙুলের মাঝে কাঁটাটা আটকে আস্তে আস্তে টানতে থাকি। কাঁটাটা বেরিয়ে আসে। আমার চোখ দিয়ে তখন জল পড়ছে, শরীরে ভীষণ রাগ তখন, সাপোর্ট স্টাফরা দাঁড়িয়ে সবটা দেখল, আমি ওদের দিকে তাকিয়ে জোরে একটা চিত্কার করে একটা গালি দিয়ে কাঁটাটা ওদের দিকে ছুঁড়ে ফেললাম। ওরা একটাও কথা বললনা। আমি পাপাকে নিয়ে বাড়ি চলে আসলাম। পাপা সেদিন কতটা খুশি হয়েছিল আমি জানিনা, তবে আমার ওই গালি দেওয়ার জন্য ভীষণ রেগে গেছিল। আমি গালি দিতে চাইনি। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল ডাক্তার ও কাঁটাটাকে উদ্দেশ্য করে। আমি সেদিন সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, সাহস থাকলে অনেককিছুই করা সম্ভব হয়। মানুসিক তৃপ্তি পেয়েছিলাম সেই রাতে ভীষণ।
তারপর বাইশ বছর বয়সের পরথেকে আমার জীবনে আমি অনেক পরিবর্তন এনেছি। এখন আমি গালাগালি দিইনা, মানবপ্রেমি মানুষ একজন। বা এমনও বলা যেতে পারে, এখন আমি সেই একজন মানুষ যে তসলিমা নাসরিনের আদর্শে তৈরী। আমি আমার এই জীবনটা অনেক উপভোগ করছি। আদর্শ নিয়ে বাঁচি, আদর্শের জন্য লড়াই করি। অতিরিক্ত আবেগ থাকার জন্য অনেক কষ্ট পাই, সবথেকে বেশি কষ্ট তখন হয় যখন মেয়েমার সাথে কথা হয়না একটুও। এই তিনদিন ধরে আমি আমার মেয়েমাকে খুব মিস করছি। মাঝেমাঝে ভেঙে পড়ছি। যত সময় পার হচ্ছে, আমি যেন ততই মেয়েমার প্রতি ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ছি। আর তার একটু ভালবাসা পাওয়ার জন্য পাগলের মত ছটপট করছি, চিন্তাভাবনা করছি। মেয়েমার সাইকোলোজিটা কিছুটা বুঝি। যখন কোনো ব্লগারের মৃত্যু সংবাদ আসে, মেয়েমা খুব কষ্ট পায়। নিজেকে অনেকটা একা করে বিছানায় পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে আত্কে ওঠে, এই বুঝি ওরা এসে মেয়েমাকে মেরে ফেলে। সামাদের মৃত্যু সংবাদেও হয়ত কদিন ধরে মেয়েমার এমনই অবস্থা। কিন্তু যেটা সত্যি, সেটা আমাদের সবাইকেই মেনে নিয়ে হয় সামনে এগোনোর কথা ভাবতে হয়। আমি তিনদিন ধরে মেয়েমাকে মেসেজ করেও একটাও রিপ্লাই পাচ্ছিনা। হয়ত আবারও মেয়েমা নিজেকে একা করে ফেলেছে তাই। শুধু একটা পার্থক্য দেখছি অন্যান্য বারের তুলনায়, অন্যান্য বার গুলোতে মেয়েমা অন্তত অনলাইনে লেখালেখি করে। এবার তো কিছুই লিখছেনা। সে ভালো আছে তো? জানিনা। বুঝতে পারছিনা। শুধু এটুকু জানি, আমি অস্থির হয়ে উঠছি প্রতিটা মুহুর্তে। বা এমনও হতে পারে, হয়ত লেখালেখি নিয়ে অনেক ব্যস্ত আছে সে, লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত হলে, লেখার টুকরো টুকরো অংশগুলো মেয়েমা অনলাইনে লেখে। এসব ভেবে ভেবে বড্ড দুশ্চিন্তাতে ভুগছি আমি। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায়ও দেখছিনা।
No comments:
Post a Comment