পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কাছে আজ এই চিঠিটা পাঠিয়েছি। মানবিক অধিকারের উদ্দেশ্যে, লেখিকা তসলিমা নাসরিনের নির্বাসন দন্ড প্রত্যাহারের উদ্দেশ্যে এই আবেদন।
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মহাশয়া,
পশ্চিমবঙ্গ।
২০১৬।
বিষয়- মানবিক অধিকার।
মহাশয়া,
আমি সৌম্যজিত দত্ত, পশ্চিমবঙ্গ নাগরিক, ভোটার আইডি- SRA ১২৯৭৫৫৫। ২০১০ সালে আমি প্রথম ভোটাধিকার পাই। আমার পছন্দের নেত্রী হিসেবে আমি তৃনমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়'কে ২০১১ বিধানসভা ভোট থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত সমস্ত ভোট দিয়ে এসেছি। পশ্চিমবঙ্গে আমার পছন্দের নেতা বা নেত্রীদের মধ্যে একমাত্র আপনাকেই আমি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছি, এখনও চাই। এর পেছনে শুধুমাত্র আমার আবেগ জড়িয়ে আছে। আপনার কাছে এই চিঠি লেখার কারণ নিচে বর্ণনা করছি। আপনি সাধারণের নেত্রী, আমার পুরো বিশ্বাস আছে আপনি এই চিঠিখানি পড়বেন ও মানবতার খাতিরে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।
মহাশয়া, আমার এই চিঠি লেখার মূল বিষয় মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন'কে নিয়ে। বিগত ২২ বছর ধরে এই লেখিকা নিজের জন্মভূমি থেকে বঞ্চিত হয়ে আছেন। ১৯৯৪ সালে তার লেখা "লজ্জা" গ্রন্থে উনি ধর্ম নিরপেক্ষতার বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার, ধর্মীয় গোড়ামিতে বিশ্বাসকারী মৌলবাদগন উনার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে, উনার মাথার মূল্য ধার্য করে। বাধ্য হয়ে উনাকে পশ্চিমবঙ্গে এসে আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু এখানেও তার লেখা "দ্বিখন্ডিত" নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় ও তত্কালীন বাম সরকারের রাজত্বে রাজনৈতিক টানাপোড়েনে প্রায় দু-বছরের লড়াই চলে, ও "দ্বিখন্ডিত"-এর কিছু অংশ বাদ দিয়ে বইটাকে মুক্ত করা হয়। বইটা আইনিভাবে মুক্তি পেলেও তত্কালীন সরকার পক্ষ বিষয়টাকে ভালোভাবে নেয়নি। নানারকম রাজনৈতিক অরাজকতা, হুমকি, রাজনৈতিক তামাশা তৈরী করে ২০০৮ এ তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তারপর থেকে লেখিকা এই বাংলার মাটিতে আর প্রবেশ করতে পারেননি।
একজন লেখক বা লেখিকা, সমাজ চিন্তক, বুদ্ধিজীবি সমাজের অগ্রগতির বাহক। আমাদের দেশে বাকস্বাধীনতার পক্ষে আইন আছে। নিজস্ব চিন্তাকে তুলে ধরার পক্ষে আইন আছে। আমাদের দেশ গণতান্ত্রিক। তবে কোন আইনে তসলিমা নাসরিন আজও বাংলা থেকে নির্বাসিতা দিদি? তসলিমা নাসরিন এর লেখা বই মানুষ ইচ্ছা হলে বা জানতে চায়লে পড়বে, নাহলে পড়বেনা। তাইবলে বইতে নিজস্ব মত দেওয়ার জন্য তাকে একেবারে নির্বাসন দন্ড দেওয়া হবে? এটা অমানবিক। এটা দেশের সংবিধান বিরুদ্ধ। দিদি অনুগ্রহ করে চিন্তা করুন। আমি বা আমরা সত্যকে জানতে চায়, উপলব্ধি করতে চায়, সমাজকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। তসলিমা নাসরিনকে আমাদের প্রয়োজন। ওনার চিন্তাভাবনা সে ভালো হোক বা খারাপ, আমাদের জানা প্রয়োজন। আমরা বিচার করে ঠিক করব যে আমরা কোন আদর্শের পথে চলব। এভাবে আমাদের চিন্তার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে রাখবেননা দিদি। আজ বাংলাতে অনেক অগ্রগতি যেমন হয়েছে অনেকদিক থেকে, তেমন কিছুকিছু দিকে সমাজে এখনও অবক্ষয় হয়ে চলেছে। যেটা সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা দেখেও না দেখার মত করে এড়িয়ে যায়। আমি আমার চিন্তাভাবনা গুলো কবিতার মধ্যে দিয়ে তুলে ধরি। কিছুদিন আগে সমাজের একপ্রকার অবক্ষয় দেখে আমার অভিব্যক্তি এমন হয়েছিল:
বাংলা তোমায় প্রণাম।
ছোটবেলাতে আমার বলা প্রথম ভাষা তুমি,
আমি যখন ব্যথা পেতাম, আমার কান্নাতে ঝরে পড়ত তোমার অক্ষর,
আমি যখন হাসতাম, হাসিতেও তোমার ছোঁয়া লেগে থাকত।
আমি যখন প্রথম অঙ্ক শিখি, সেখানেও তোমার সংখ্যা গুনতাম,
আমি যখন প্রথম ডাকে মা'কে গর্বিত করেছিলাম, সেটাও তোমারই শব্দ।
যে ভাষায় আদর্শ শিখেছি তা, শুধু তোমারই।
আমার বাংলা, তোমায় শত কোটি প্রণাম।
বাংলা, আজ আমি ভালো নেই।
আমার আদর্শ আজ অপমানিত।
অপমানিত আমার লেখিকা, অপমানিত তার প্রিয় ভাষার লেখা।
আজ তোমার ভাষার অপব্যবহার হয়, তোমার ভাষায় কটুক্তি ভেসে আসে,
তোমার ভাষায় লেখা বই'তে আগুন জ্বলে, জ্বালায় তারাই যারা তোমার ভাষা'কে নিয়ে গর্ববোধ করে।
আসলে তারা গর্ব করে নিজেদের অজ্ঞানতার পরিভাষা নিয়ে।
তাদের গর্ব তুমি নও, তারা গর্ব করে ইসলামি হেফাজতে,
তারা গর্ব করে গোড়া হিন্দুত্ব নিয়ে। তুমি শুধুই তাদের কথা বলার বস্তু।
আমার সোনার বাংলা, ওরা তোমাকে কলঙ্কিত করে ফেলেছে,
চাঁদের স্নিগ্ধ আলোতে যেমন কালো দাগগুলো স্পষ্ট দেখি,
তোমার গায়ে লাগা কালিটাও আমি স্পষ্ট দেখতে পাই।
চোখের সামনে দেখি তোমার ভাষা বহনকারী মানুষগুলো তোমাকে ভরা বাজারে নিলাম করছে,
চোখের সামনে দেখি তারা তোমার ভাষাতে মেয়েদের অশ্লীল করছে,
চোখের সামনে দেখি তোমার ভাষায় আমার লেখিকা নির্বাসিত,
চোখের সামনে দেখি ওরা তোমার ভাষা'কেই ধর্ষণ করছে দিনে রাতে।
অনুভব করি আমার লেখিকা তোমার ভাষায় ফুঁপিয়ে উঠছে,
অনুভব করেছি সে তোমার ভাষাতে কথা বলতে আকুল চিত্তে ঘরে এপাশ ওপাশ করছে,
বুক ফেটে চৌঁচির হয়ে যাচ্ছে তবু, তোমার ভাষায় দুটো লাইন কাউকে বলতে পারছেনা।
এত নিষ্ঠা, এত প্রেম বুকে নিয়ে যে আজও তোমার ভাষাকে অঞ্জলি দেয়,
সেই কিনা তোমার ভাষা'তে নির্বাসিত!!!??
আজ তুমি সত্যিই কলঙ্কিত।
আমি ভালো নেই আমার প্রিয় বাংলা ভাষা,
তুমি ভালো থেকো। দিদি এই লেখার মধ্যে দিয়ে আমি সমাজের একপ্রকার অবক্ষয়ের রূপটা তুলে ধরেছি। আপনি আমাদের সবার সম্মানীয়, পূজনীয়। আপনিই বিচার করুন। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে, দেশের সংবিধান অনুযায়ী, তসলিমা নাসরিনকে নির্বাসন দন্ডে দন্ডিত করা সমাজের পিছিয়ে পড়ার ইঙ্গিত। শুধু তসলিমা নাসরিন বলেই নয়, যেকোনো মানুষকেই নির্বাসন দন্ড দেওয়া সমাজের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার সমান। বরং তাকে সমাজে রেখে পরিস্থিতিকে অনুকূলে রাখার চেষ্টা করা সমাজের ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ উপযোগী। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ওপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে যে, আপনি এই বিষয়টাকে নিয়ে চিন্তা করবেন ও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। ফিরিয়ে আনবেন লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে।
এই চিঠিটি পড়লে ও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে, আমি বাধিত থাকবো। ভালো থাকবেন মহাশয়া ও দিদি।
ধন্যবাদ।
সৌম্যজিত দত্ত।
No comments:
Post a Comment