Monday, 1 August 2016

এক বছর নয়, দশ বছর নয়, শত বছর নয়,
আমি চাই যত বছর তুমি থাকো, তত বছর যেন আমি থাকি তোমার সাথে।

আগস্ট ২, ২০১৫। সকালে পায়েল আমাকে অপমান করেছিল, বলেছিল আমার কোনো যোগ্যতা নেই ওর সাথে কথা বলার। পিছিয়ে পড়া, সবার পিছনে থাকা মানুষদের মধ্যে আমি একজন। আমি কষ্ট পেয়েছিলাম, সকালে ঘুম থেকে উঠে এমন কথা শুনে সহ্য করতে পারিনি। কাওকে কিছু বলেছিলাম না। সারাদিন ভীষণ কষ্ট পেয়ে সেদিন তোমাকে মেসেজ করেছিলাম। আমার শরীর, মন থেকে শুধু কষ্ট ঠিকরে বেরোচ্ছিল সেদিন। তোমাকে দিদি বলে ডাকতাম তখন, আপনি ডাকতাম।  কষ্ট পেয়ে সেদিন আমি তোমাকে মেসেজ করে বলেছিলাম, "আমি ভালো নেই দিদি। আপনার কি? আপনি তো আর কথা বলবেন না। কেউ নেই আমার।" হঠাৎ দেখি রাত দশটার সময় তুমি আমাকে ফলো করছো। তারপর ১১:৩০ পি.এম এ আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে। আমি চমকে উঠেছিলাম। আমি কি করবো কিছু বুঝতে পারছিলাম না তখন। সাথে সাথে আমি অ্যাকসেপ্ট করি। অনেকে তোমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টের স্ক্রিনশট করে সেটা পোস্ট করে, অনেককিছু লেখে। আমি কিছুই করিনি সেসব। আমার মাথাতে আসেনি। আসত কিভাবে? আমি তো যেন স্বপ্ন দেখছিলাম সেদিন। সব কষ্টগুলো কোথায় হারিয়ে গেছিল, কিছু বুঝতে পারিনি আর।

আমি যখন খুব খারাপ একটা মানুষে পরিণত হচ্ছিলাম, খারাপ হয়েগেছিলাম, তখন নিজেকে সামলানোর অনেক চেষ্টা করছিলাম, পারছিলাম না নিজেকে সামলাতে। আই এস আই তে রিসার্চের সুযোগ পেয়ে আমি তখন থেকে নিজের মনকে যেন চেপে ধরেছিলাম, আর কোনো অন্যায় করবো না ভেবে। একের পর এক আমার মেয়েবেলা, ব্রম্মপুত্রের পাড়ে, নারীর কোনো দেশ নেই, আমি ভালো নেই - তুমি ভালো থেকো আমার প্রিয় দেশ আমার জীবন পাল্টাতে শুরু করে।  একটা আদর্শ, আদর্শের বেড়াজাল আমাকে ঘিরে ধরে। বেড়ার ওপারে খারাপ, এপারে ভালো। এই আদর্শ আমাকে বেড়ার ওপারে যেন খারাপকে স্পর্শ করতে দেবেনা। আমাকে সমাজের মূল্যবোধ শেখাতে শুরু করে। লজ্জা পড়েছিলাম ২০০৮ সালে। পড়েছিলাম কিছু জানার জন্য, কিন্তু বয়স কম থাকায় বিশেষ কিছু শিখতে পারিনি। কিন্তু আমি শিখেছি যখন মন থেকে শিখতে চেয়েছি, যখন আমার শেখার প্রয়োজন ছিল, আমি শিখেছি। এরপর যখন সেইসব অন্ধকার পড়লাম, আমি যেন পুরোপুরি মিশেগেলাম তোমার আদর্শের সাথে। প্রতিটা মুহূর্তে আমি অনুভব করতে শুরু করি তোমাকে, প্রতিটা মুহূর্তে আমি ভেবেছি যদি আমি তোমার সাথে থাকতে পারতাম সেইসময়। তুমি আমাকে সবসময় মনের জোর দিয়েছ, কথা বলে আমার উৎসাহ বাড়িয়েছ। আজ যত খারাপ, যত প্রলোভন আছে সব যদি আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, আমি বেছে নেবো আমার আদর্শের পথকেই। সেই আদর্শ যা আমি তোমার থেকে প্রতি মুহূর্তে শিখেছি।

আজ সমাজ এত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, বর্তমান প্রজন্ম মূল্যবোধ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নয়, তোমাকে গালাগালি দেয়, তোমাকে খুন করার কথা ভাবে, তোমাকে ধর্ষণ করার কথা ভাবে, ওরা আসলে তোমার আদর্শকে কখনো বোঝার চেষ্টা করেনি। করেনি কারণ, এই আদর্শকে বোঝার আগেই ধর্মের গোঁড়ামি ওদের ঘিরে ধরেছে সমস্ত চেতনা জুরে। ওরা সেই গোঁড়ামিতে এতটাই বুঁদ হয়ে আছে, যে খুন, ধর্ষণ করার মতো অমানুষিক চিন্তাগুলো ওদের কাছে জলভাত হয়েগেছে। তোমার আদর্শ খুন করা শেখায় না, তোমার আদর্শ ধর্ষণ করতে শেখায় না। তোমার আদর্শ শেখায় মুক্ত চেতনা, ভালোবাসা। তোমার আদর্শ শেখায় যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করতে, মানুষ খুনের জন্য অস্ত্র ওঠাতে নয়।

যত সময় গেছে, আমি আমার মন থেকে তোমার আরও কাছে চলে গেছি, যেন চুম্বকের তীব্র আকর্ষনে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে গেছি। আদর্শের নেশায় ছুটে গেছি। দিদি থেকে একদিন তোমাকে মেয়েমা বলে ডাকি, আপনি থেকে তুমি  ডাকতে শুরু করি। আমি যেন একাত্ম হতে শুরু করি তোমার সাথে। তুমি কখনোই আমাকে দূরে ঠেলে দাওনি, তোমার মনের কাছে পৌঁছতে আমাকে কোনো বাধা দাওনি। অবাধে আমি তোমার কাছে যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা পৌঁছেছি, বিনা দ্বিধায়। মেয়েমা ডাকার পিছনে আমার যে অনুভূতিটা ছিল তোমাকে নিয়ে, সেটা এই ছোট বাচ্চাটাকে উপলব্ধি করে এসেছিল। তাই তোমাকে মেয়েমা ডাকি।


ছোট্ট আদর মাখা মুখটা চাইত সব নিয়ম ভাঙতে,
ছিল স্বপ্ন চোখে, ঘর পেরিয়ে বাইরে যেতে,
নিয়ম শুধু নিয়মই ছিল বাবার ধমকানিতে। 

.....................................................................


বাড়ির দেওয়াল প্রাচীর ভয়ে কাঁপে,
শৃঙ্খলা পরায়নের শেকল বাঁধা পায়ে,
সমাজ ব্যবস্থার রীতিনীতি, আত্মসম্মান, বংশগৌরবের ইমারত বহন করে,
ধর্মের রক্ষাকবজ ঘিরে থাকে প্রতিটি ইঁটে। 
ছোট্ট মেয়েটি লজ্জা পায়। 

....................................................................



বয়স তখন চোদ্দ কি পনের,
মেট্রিক পরীক্ষার হাতছানি, সেকি ভীষণ রকম পড়াশোনা!!!
বাবার তৈরি নিয়ম, "শুধু খাও, পড়। ভোররাতে উঠে পড়, সারাদিন পড়,
গোটা বই বারবার করে পড়, প্রতিটা পাতা, প্রতিটা লাইন ঠোটস্থ করে ফেল।
বাড়িতে কেউ টু-শব্দটি করবেনা, করলেও ফিসফিস করে কথা বলবে।
সবার চোখের নজরবন্দি করে রাখ, ঘন্টায় ঘন্টায় খাবার খাওয়া চায় পড়তে পড়তে।"
এমনসব কড়া নিয়মে মেয়েটি হাসফাঁস করে ওঠে, তবু চুপ থেকে সব কথা শোনে। 



পরীক্ষার সময় উপস্থিত হলে বাবা এনে দেয় কোনো মন্ত্রপুত রক্ষা কবজ,
পরীক্ষার সময় পরে থাকলে নাকি, "সমস্ত পড়া মনে থাকবে, পরীক্ষা ভালো হবে।" 
মেয়েটি প্রতিবাদ জানিয়ে ওঠে, "পড়া মনে থাকলে এমনিই থাকবে, যা পড়েছি,
তাই লিখেদিয়ে আসবো।
বরং সেটি থাকলেই সব ভুল হয়ে যাবে।" 
বাবার জেদের সামনে হেরে গিয়ে তাকে কবজ পরতেই হয়। 
মাথার চুলের সাথে তাকে কবজ বেঁধে নিতে হয়। 
সে যে কি ভীষণ লজ্জার!!!
"চুলের সাথে কবজ পরে বাইরে বেরোবো, পরীক্ষা দেবো!!
বন্ধুরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে, সবাই দেখবে, হাসবে।" 
পরীক্ষা দিতে দিতেও মেয়েটির মন বারবার চলে যায় চুলে বাঁধা কবজটার দিকে,
বারবার কপালের সামনে এসে পড়ছে, খুব সাবধানে সে আড়াল করছে সেটা।  
সে ঠিক করে, "যত যাই হোক, কবজ আমি পরবো না।" 
বাড়িতে এসে বায়না ধরে, "কবজ বাঁধবো না, তাতে পরীক্ষা খারাপ হয়, হোক।" 
বাবার জোর জবরদস্তিতে তাকে আবারও সেটা বাঁধতে হয়। 

.......................................................................


মেয়েটির মনে অনেক প্রশ্ন। 
"আমার জন্ম কবে হয়েছে? কখন হয়েছে?
দাদা'দের জন্ম তারিখ, সময় সবকিছু বাবা লিখে রেখেছে,
আমারটা কোথাও লেখা নেই কেন?"
মেয়েটি জানতে চায় তার জন্মের তারিখ, সময়।
মা'কে জিজ্ঞাসা করে, পরিচিত মানুষদের জিজ্ঞাসা করে, নানিকে জিজ্ঞাসা করে,
বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন উত্তরে সে অস্থির হয়ে ওঠে। 
কেউ বলে "অমুকের জন্মের মাসে তোর জন্ম,
তো কেউ বলে মাথা উঁচিয়েছে তালগাছের মত, কুড়ি-বাইশ হবি।"
মেয়েটি ভাবতে থাকে, "ছেলেদের জন্ম তারিখ লেখা হয়, মেয়েদের কেন হয়না?"

.........................................................................


মেয়েটি অনেক অনেক নিয়ম ভাঙতে চায়, নিয়ম ভাঙতে তার ভালোলাগে। 
জিন্সপ্যান্ট পরতে চায়, গিটার বাজাতে চায়, প্রেম করতে চায়। 
নারীর প্রতি গড়া সমাজের সব নিয়ম ভেঙে গুড়িয়ে দিতে চায়। 
পরিবারের বাধা উপেক্ষা করেই সে প্রথম নিয়ম ভেঙে ফেলে,
বাড়িতে প্রথম গিটার এনে। 
ধ্যান, জ্ঞান সব গিটারটাই হয়ে ওঠে। 
গিটার কিনে বাজানো, নিজের শখ পালন করার অনুমতি পেয়ে সে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়। 


.........................................................................


ধম্মটম্ম'কে কখনই সে তোয়াক্কা করেনা,
স্বপ্ন তখন আকাশ ছোঁয়া। 
খোলা আকাশে সে উড়তে চায়, বাতাসের ঘ্রাণ নিতে চায়,
গলি পেড়িয়ে বড়রাস্তার মাথায় সে একাই হাঁটতে চায়,
দৃষ্টান্ত হতে চায় সমাজ শৃঙ্খলে আবদ্ধ নারীজাতির সামনে। 
উঁচিয়ে সে উঠবেই, ভরা যৌবনের রক্তের তেজ, মনে অদম্য সাহস'কে সে তুলে ধরবে,
বাঁচার মত করে বাঁচবে, পরাধীনতার দেওয়াল চুরমার  করে দেবে।



যত সময় গেছে, আমি তোমাকে আরও ভালোবেসে ফেলেছি। ভালোবাসার কোনো সীমা হয়না, ভালোবাসার কোনো হিসেবে থাকেনা।

তুমি কোন সাগরের জল বয়েছ আমার হৃদয় মনে,
বিবশ করেছ আমায়, আমি নাই আমার অন্তরে,
চেতনা জুরে শুধু দেখি তোমার ঢেউয়ের উতলে ওঠা, যা আছে সব
ঠেলে নিয়ে যাও, আবার ফিরে আসো সময় গুনে,
নাই কোনো বিরাম বয়ে চলো অবিরাম, উথালপাথাল করে।
চেয়ে থাকি সারাদিন, মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি,
মনে মনে তোমার গভীরতা মাপি,
ভুল হয়ে যায় সমস্ত হিসাব,
অক্লান্তিতে গুনে যাই।

পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব মাপাও সম্ভব,
পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বও মাপা সম্ভব,
যা আছে এই মহাজাগতিক বিশ্বে-
সবই এখন হাতের নাগালে,
শুধু মাপা যায়না তোমার মন,
তোমার গভীরতা।

অনুভূতিতে শুধু উপলব্ধি করতে পারি
তুমি আছ হৃদয়ের প্রতিটা কোষে,
তুমি আছ আমার চেতনা ছুঁয়ে,
আদর্শে আদর্শে।
প্রতিটা শিরাতে, ধমনীতে বয়ে চলেছ আমার রক্তবহে,
প্রতিটা প্রশ্বাসে তোমায় গ্রহণ করি অক্সিজেনে,
ভিতরে আমার যত আছে ভয়, বেরিয়ে যায় নিঃশ্বাসে।
তুমি শোধন করো আমায়, বেড়াজালে বেঁধে রাখো,
বেড়ার ওপারে ভয়-
আমি ছুঁতে পারিনা।

কি এমন মায়া-
তোমার গভীরে মেয়েমা!


সারাজীবন, যতদিন বাঁচি, আমি তোমার অনুভূতিতে বাঁচতে চাই।  সারাজীবন আমি তোমার স্নেহের ছোঁয়াতে বাঁচতে চাই। 


সারাক্ষণ তোমাকে ছুঁয়ে থাকি, 
অনেক দূরে থেকেও তুমি কি বুঝতে পারো আমার অনুভুতি?
গোটা পৃথিবী জুরে তুমি দাপিয়ে বেড়াও, স্বমহিমায় তুমি মুগ্ধ করো অগণিত মানুষকে,
অনেক দূরে থেকে একটা মানুষ, তোমাকে যারা ভালবাসে তাদের পিছনের সারিতে পড়ে থাকা,
এক নিতান্ত সাধারন কেও তোমাকে নিয়ে রোজ নতুন নতুন স্বপ্ন বাঁধে,
তোমাকে অনুভব করে, গায়ে মেখে, মনে মেখে একটু একটু করে গড়ে ওঠে রোজ,
তুমি কি বুঝতে পারো এই মানুষটার ভালোবাসার অনুভুতি?


বড্ড অধিকারবোধ গড়ে উঠেছে আজকাল,
মনের ভিতরে সমস্ত কুঠুরিতে শুধু স্নেহের ছোঁয়া অনুভব করি নিরন্তর,
বড্ড পাগল পাগল লাগে নিজেকে,
আমি বেঁচে থাকি শুধু স্বপ্নগুলো নিয়ে।
বারবার তোমাকে কথা ছুঁইয়ে দিই, অপেক্ষা করি রোজ তোমার একটু কিছু বলার জন্য,
যখন তোমার সেই স্নেহ ভরা কথা দেখতে পাই,
আমি ভরে উঠি কোনো অমৃত সুখে। 

যেদিন তোমাকে সামনে পাবো,
আমি জানিনা, ঠাওর করতে পারিনা সেদিন কিভাবে নিজেকে প্রকাশ করবো,
বুকের দেওয়ালগুলো এখনই কেঁপে ওঠে সেদিনের কথা যখন কল্পনাতে ভাসে,
আমি কি লাফাবো! আমি কি তোমার চারিদিকে গোল গোল হয়ে ঘুরতে থাকবো!
আমি কি নেচে উঠবো নাকি তোমাকে ছুঁয়ে, জরিয়ে ধরে বা কোলে তুলে নিয়ে
খুব জোরে জোরে হাসবো! 
এখনও বিস্ময় লাগে ভাবলে, সেদিন আমি কি করবো! 
তোমাকে কাছথেকে দেখা, কাছে গিয়ে ছোঁয়াতেই যেন পৃথিবীর সব সুখ সব প্রাচুর্য,
তোমার স্নেহ পাওয়াতেই যেন সব পাওয়া,
চাওয়া পাওয়ার কোনো হিসেব থাকতে নেই আর কোথাও কখনো,
তোমার বাইরে আমার সব চাওয়া, পাওয়া শেষ হয়ে যায়। 
আমি তোমাকে শুধু একটু প্রাণ ভরে ছুঁতে চাই,
দূর থেকে অনুভব করি, একটু কাছে গিয়ে তোমাকে ধরে অনুভব করতে চাই,
তোমার নাড়ির স্পন্দনের সাথে আমার নাড়ির স্পন্দন মিশিয়ে দিতে চাই যেন
প্রবাহিত হোক আমাদের রক্ত একই গতিতে,
আর আমার চাওয়ার কিছু নাই।

ভালো থেকো মেয়েমা। সুস্থ থেকো সবসময়। আমার জন্য সবসময় স্নেহ ধরে রেখো। 

No comments:

Post a Comment