Thursday, 2 February 2017



প্রতিমুহূর্তের অসহায়তার মধ্যেও পড়াশোনার যুদ্ধ।


আমার পড়াশোনার জীবনে প্রতিমুহূর্তে ভিন্ন ভিন্ন রকমের বাধা পেয়েছি। চব্বিশ বছর পড়াশোনা করছি, চব্বিশ বছরের পড়াশোনার জীবনে প্রতিবছর পরীক্ষা আসে, নিচু ক্লাসে পড়তে বছরে দুবার করে পরীক্ষা দিতাম, একটু উঁচুতে উঠতে পড়াশোনার চাপও বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে নানান বাধা বিপত্তিও। সারাবছরই বাধা বিপত্তি চলতে থাকে, পরীক্ষার মুহূর্তেও প্রচুর অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়। অসুবিধাগুলো পরীক্ষার মুহূর্তে অসহনীয় হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তে যে প্রধান বাধা এসে উপস্থিত হয়েছে সেটা হল একটা নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি কিনতে গিয়ে একরকমের প্রতারণার ফাঁদে পড়েছে আমার পাপা ও মা। আর পাপা যতরকম ঝামেলার মধ্যে পড়ে, সেসবের মধ্যে আমাকেও জড়িয়ে ফেলে, বা কোনো না কোনো কারণে আমি জড়িয়েই যাই। ২০১২ এর শেষের দিকে কলকাতাতে একটা ফ্ল্যাট বাড়ি কিনি। নগদ কুড়ি লক্ষ টাকাতে কিনেছিলাম বাড়িটা। সেবার আমার মাস্টার ডিগ্রীর পরীক্ষা চলছে, তার মধ্যেই টানা চার পাঁচ মাস এদিক ওদিক ঘুরে ফ্ল্যাট খুঁজে, টাকা জোগাড় করে রেজিস্ট্রি করেছিলাম। পাপার টাকাতেই কেনা হয়েছিল বাড়িটা, কিন্তু টাকা জোগাড় করতে খুব হয়রানি হতে হয়। পাপার ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসা, আর এই ব্যবাবসায় টাকা এহাত ওহাত হয়, মুখের কথাতে ব্যাবসা চলে, বাইরে টাকা ছড়িয়ে থাকে লোকের কাছে, নাম ও অভিজ্ঞতায় এই ব্যাবসা চলে মূলত। যে ফ্ল্যাট বাড়িটা কিনেছিলাম, সেটা ছিল নিচতলা। তাই নানান অসুবিধার মধ্যে পড়তে হতো। ওপর থেকে নোংরা যাকিছু সব আমাদের ঘরের সামনে পড়ত, কুকুর বেড়াল ঘরের সামনে এসে পেচ্ছাপ, পায়খানা করে চলে যেত। ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দিল পাপা ২০১৬ এর শেষের দিকে। কুড়ি লক্ষ টাকার ফ্ল্যাট চব্বিশ লক্ষ টাকায় বিক্রি হল। পাশের বাড়ির একটা ফ্ল্যাট পছন্দ হল, চার তলায়। সেখানে নগদ দশ লক্ষ টাকা দিয়ে বাইনানামা কাগজ করলো পাপা। এই ফ্ল্যাট বাইনা করার সময় আমি জানতাম না, আমি আইএসআই তে ছিলাম, ক্লাস নিচ্ছিলাম, সেই মুহূর্তে পাপা ও মা গিয়ে বাইনা করে এসেছে। বাইনানামা কাগজ বিল্ডার নিজের ইচ্ছামত করে লিখে পাপা ও মাকে দিয়ে সই করিয়ে নেয়। সবই প্রায় ঠিক আছে, দশ লক্ষ টাকা নগদে ও বাকি পনের লক্ষ টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ করিয়ে রেজিস্ট্রি করে দেবে বিল্ডার, কিন্তু এই সমস্তটার জন্য সময় লিখে দিয়েছে মাত্র তিন মাস। আর এই তিন মাসের মধ্যে যদি পনের লক্ষ টাকার ব্যাঙ্ক ঋণের কাজ সম্পূর্ণ করে রেজিস্ট্রি না হয়, তবে বিল্ডার পঁচিশ শতাংশ অর্থাৎ আড়াই লক্ষ টাকা কেটে বাকি সাড়ে সাত লক্ষ টাকা ফেরত দেবে। কাগজে এই শর্ত লিখে দিয়েছে। ইংরাজিতে লেখা, আমার পাপা, মা অতটা বুঝতে পারেনি। সই করে দিয়েছে।


          বিল্ডারের এই শর্তটা এক পাক্ষিক। আর একটা ফ্ল্যাট বাড়ি কলকাতার মতন জায়গায় কিনতে গেলে তিন মাস যথেষ্ট হয়না যদি সেটা ব্যাঙ্ক ঋণের মাধ্যমে কেনা হয়। ব্যাঙ্কের কাজে সময় লেগে যায় অনেকটা। তাই একটু বেশি সময় রাখতে হয় হাতে। সেটা মা ও পাপা বুঝতে পারেনি শুরুতে। বিল্ডার যেভাবে বুঝিয়েছে, সেভাবেই বুঝেছে তখন। পাপার আরও দুটো বাড়ি আছে, কিন্তু যেহেতু সেই বাড়িগুলো নগদ টাকায় করা, তাই পাপার বাড়ির জন্য ব্যাঙ্ক ঋণ সম্পর্কে কোনো ধারনা ছিলনা। ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসা, পাপার দশটা ট্রাক আছে, পাঁচটা ছোট গাড়ি আছে যেগুলোর বেশিরভাগই ব্যাঙ্ক ঋণ করেই কেনা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কখনো পাপার সমস্যা হয়নি, মুখের কথাতে ও সাধারন কিছু নিয়মাবলীতে পাপা যখন তখন গাড়ি কিনে নিতে পারে আবার বিক্রিও করে দিতে পারে। তাই পাপা ভেবেছিল বাড়ির জন্যও হয়ত সেই একই হবে। তাই পাপা ঝামেলা না বুঝেই বাইনানামাতে সই করে ফেলে।  



                       এরপর থেকে শুরু হয় ঝামেলা। ব্যাঙ্ক ঋণ করতে গিয়ে দেখা যায় আর্থিক বর্ষে পাপার আয় দেখানো আছে তিন লক্ষ ষাট হাজার টাকা। অর্থাৎ মাসে ত্রিশ হাজার করে। কিন্তু পাপার দশটা ট্রাকের মধ্যে তিনটে ট্রাকের ব্যাঙ্ক ঋণ চলছে মাসে বাহান্ন হাজার টাকা করে, যা এখনও সাত মাস চলবে। অর্থাৎ হিসাব মতো ত্রিশ হাজারের মাসিক আয়ে পাপা বাহান্ন হাজার টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ পরিশোধ করে, যেটা বাস্তবে কখনো সম্ভব নয়। এর ওপর ফ্ল্যাটের জন্য ব্যাঙ্ক ঋণের কোনো প্রশ্নই আসেনা। তাই ব্যাঙ্ক ফ্ল্যাটের ঋণের জন্য আবেদনপত্র বাতিল করে দেয়। বিল্ডার এখানে সুযোগ পেয়ে যায়, একেতে বাইনানামা কাগজে তিন মাসের সময়, অর্থাৎ ওই সীমা পার হলেই আড়াই লক্ষ টাকা এমনি এমনি সে পেয়ে যাবে এবং চুক্তিপত্র বাতিল হয়ে যাবে। বিল্ডারের সাথে পরামর্শ করতে চাইলে সে প্রতারণার ফাঁদ পাতে, পঁচাত্তর হাজার টাকার বিনিময়ে ব্যাঙ্ক ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে। পাপা তখন উকিলের সাথে কথা বলে ও সরকারকে গত তিন বছরে বার্ষিক সতের লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা করে সর্বমোট বাহান্ন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা আয় দেখিয়ে আয়কর জমা করে। এতে সমস্ত সমস্যা সমাধান হওয়ার পরেও পাপার কাছে বার্ষিক ছয় লক্ষ টাকা করে সঞ্চয়ের খাতায় জমা পড়ছে সরকারি হিসাবে। এক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক ঋণেও আর কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই পুরো কাজটা করতে গিয়ে চুক্তিপত্রের তিন মাস সময় পার হয়ে যায়। এই মুহূর্তে সাড়ে চার মাস চলছে। চুক্তিপত্র অনুযায়ী বিল্ডার সময়সীমা বাড়িয়ে না দিলে ব্যাঙ্ক ঋণ দিতে পারবে না, আর যত ঝামেলা আমার ও মায়ের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। পাপা নিজের কাজে ব্যস্ত, বিল্ডারের সাথে দেখা করেনা, আর আমাকে ও মাকে বারেবারে বিল্ডারের কাছে পাঠায় বিল্ডারকে বুঝিয়ে মীমাংসার পথে আসার জন্য। বিল্ডার না নিজে দেখা করে, না ফোন করলে ফোন তোলে। যে দু-তিনবার দেখা হয়েছে, বিল্ডার এই কাজটা করে দেওয়ার জন্য একেকবার একেক রকম টাকা চাইছে অনৈতিকভাবে। এবং সেই টাকার পরিমাণ নেহাতই কিছু কম নয়, লাখের কাছাকাছি। এই মুহূর্তে পাপার দশ লক্ষ টাকা অন্যের হাতে পড়ে আছে বলে পাপার মেজাজ বাড়ছে, ভাড়া বাড়িতে থাকতে হচ্ছে জন্যে মার মাথা খারাপ হয়ে আছে, আর সব তেজ মেজাজের প্রভাব এসে পড়ছে আমার ওপর। এতসব ঝামেলার মধ্যে আমার পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে সেসব নিয়ে আমার পাপার দুশ্চিন্তা নেই। বরং আমার পড়াশোনা করা ও পরীক্ষা দেওয়া নিয়ে হাজারটা বাজে বাজে কথা বলে দিচ্ছে। আবার পাপার কাজগুলো ঠিক ভাবে না করতে পারলে তো আর রক্ষা নেই। নিজে তো প্রতারণার ফাঁদে পা বাড়িয়ে ফেঁসে গেছে, আমাকেও টেনে নিয়ে গেছে, আবার পরীক্ষা দেওয়া নিয়েও ঝামেলা করে অত্যাচার করে যাচ্ছে। 


                  আমি বলবো না পাপার ভুল। পাপা ফেঁসে আছে, তাই তার মাথার ঠিক নেই। আর পাপা এতকিছু পড়াশোনা নিয়ে বোঝে না, তাই আদর্শগতভাবে পড়াশোনার পরিবেশ কেমন হয়, সেটা সে জানেনা। কিন্তু এসবের মধ্যে আমি কি করি!!! আমাকে তো ঠিক করে পড়তে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে ভালো করে, কিন্তু বাজে কথাগুলো তো সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়। পড়তে পারিনা, রাগ হয়, সব ভেঙে ফেলতে ইচ্ছা করে তখন। মরে যেতে ইচ্ছা করে। এখন হয়ত পাপাকে আদালতের পথেই হাঁটতে হবে, এবং সেখানে আমার ওপর দিয়েও কম ঝক্কি যাবে না।

No comments:

Post a Comment