Friday, 17 February 2017

ও আসে ..
আমায় ঘিরে থাকে।

সৌম্যজিৎ।


আমি প্রায়ই আমার মৃত দিদিকে ঘুরে বেড়াতে দেখি চোখের সামনে,
কখনো অন্ধকার ঘরে, কখনো ঘর ভর্তি আলোতে যখন একা থাকি গভীর রাতে বা
কখনো স্বপ্নের মধ্যে দেখি।
দেখি আমাকে কিছু বলছে, কিছু দেখাচ্ছে,
ছটপট করছে একাকীত্বে ভুগে,
নিজের অস্তিত্ব বোঝাতে আমার সাথে কথা বলতে চায়ছে।
সেদিন যখন শেষবার আমার সাথে ও কথা বলেছিল সশরীরে,
আমায় বারবার ডেকেছিল কাছে,
অনেক কথা আমায় বলতে চেয়েছিল,
মনের কথা খুলে বলার জন্য ওর কোনো বন্ধু ছিলনা আমি ছাড়া,
ওর যা'কিছু আনন্দের,
যা'কিছু কষ্টের শুধু আমাকেই বলত।
প্রেমের প্রতারণায় যখন ও জর্জরিত,
বাড়ির চাপে যখন ওর জীবন হাঁসফাঁস করছে শান্তিতে একটু প্রশ্বাস নিতে,
আমায় বলেছিল একটুখানি সময় বার করে দেখা করার জন্য।
বেরোতে চেয়েছিল সমস্ত মানসিক যন্ত্রণা থেকে,
ইকোনমিক্স স্নাতক করেই এমবিএ পড়বে বলে ভেবে রেখেছিল,
আমাকে বলেও ছিল,
বলেছিল সময় করে যেন আমি একটু দেখা করি,
অনেক কিছু বলার,
অনেক কিছু আলোচনা করার আছে।
আমি ওর জীবনের কষ্টে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম,
বারেবারে আমাকে জেরা করা হতো ওর জন্য,
আমাকে ভয় দেখিয়ে ওর কথা জিজ্ঞাসা করত মা, মাসিরা,
ঝামেলা এড়িয়ে যেতেই ও নিজের কাজের চাপে আমি ওকে শান্তনা দিয়ে বলেছিলাম -
"দেখা করবো।"
আমি দেখা করিনি আর,
বিশ্বকর্মা পূজাতে যখন ওকে নিয়ে আমার দেশের বাড়িতে যাওয়ার কথা হয়েছিল,
ওকে না নিয়ে দুদিন আগেই আমি চলে গেছিলাম প্রেমিকার অভিমান ভাঙাতে,
বুঝতে পারিনি এভাবে ওকে একা করে চলে যাওয়াতে
মৃত্যু নেমে আসবে ওর জীবনে,
বুঝতে পারিনি আমি ওকে আর দেখতে পাবো না,
বুঝতে পারিনি আমি আর ওর গলার আওয়াজ শুনতে পাবো না,
ওকে ছুঁতে পারবো না, জড়িয়ে ধরতে পারবো না,
বুঝতে পারিনি আমি আমার দিদির আদর আর পাবো না কোনোদিন।
ছুটে এসে দেখলাম একটা কাঁচের ঘরে সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা, শুয়ে আছে,
মুখে হাসির ছোঁয়া, নিশ্চিন্ত, শান্তিতে ঘুমোচ্ছে,
এতটা শান্তিতে সে অনেক বছর ঘুমায়নি।
সবাই ওর কাছে,
অগণিত পাড়াপড়শির ভিড়,
মা, মাসিরা কাঁদছে,
একটা শান্ত বিকেলে কান্নার শব্দ যেন শূন্য বাতাস ভেদ করে
আমার কানে এসে পৌঁছতে পারছেনা,
আমি দাঁড়িয়ে আছি পাঁচতলা বাড়িটার ছাদে, একদম একা,
নিচে তাকিয়ে এক দৃষ্টে দেখছি শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা আমার দিদিকে,
আমার পৃথিবী একদম স্থির হয়ে গেছে,
শুধু দুটো মানুষ, শরীরে প্রাণ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমি আর
নিচে কাঁচের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আমার নিষ্প্রাণ দিদিটা,
আমার পৃথিবীতে যেন আর কেউ নেই তখন।
ওকে নিয়ে যখন গাড়িটা চলে যাচ্ছে শ্মশানমুখে,
তখনও আমি দাঁড়িয়ে ওর যাওয়া দেখছি,
স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি,
কোনো অনুভূতি, উপলব্ধি নেই আমার মধ্যে,
একবিন্দু কান্নার জল ফুটে বেরোচ্ছে না আমার চোখ থেকে,
আমি শুধু তাকিয়ে দেখছি।
যতদূর দেখা যায়, গাড়িটা অনেক দূরে ছোট হতে হতে মিলিয়ে গেল,
আর দেখতে পেলাম না,
ছাদের ধারটাতে একা একাই বসে পড়লাম।
এই জায়গায় আগে কতবার যে বসেছি!
একসাথে বিকেলের আলোকে সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে দেখেছি,
রাস্তার মানুষদের সামনে এটা ওটা ছুঁড়ে ভয় দেখিয়ে লুকিয়ে পড়েছি,
আর তখন সবকিছু আছে,
আমি আছি, রাস্তায় লোকেরা আছে,
শুধু আমার দিদি নেই,
দুষ্টুমি করে এটা ওটা ছুঁড়ে ভয় দেখানোও নেই ..


বিকেলটা নিয়ম করে সন্ধ্যার কোলে গিয়ে মুখ লুকিয়ে ফেলল,
অন্ধকার নেমে এল,
আমি স্থির হয়ে বসে ছাদের মেঝেতে।
হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠেছে,
আমি নিচে নামতে গেলাম, অন্ধকার সিঁড়িতে নামতে গিয়ে খেপা কুকুরটার গায়ে পা উঠে গেল,
কুকুরটা একবার চিৎকার করে উঠল,
তখনই একবার মনে হল কেউ যেন ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলল পিছন থেকে,
কুকুরটা চুপ হয়ে গেল, সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেল,
আমিও নিচে চলে গেলাম অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে।
আমি প্রায়ই ওকে দেখি আমার আশেপাশে, যখন একা থাকি,
প্রায়ই যখন স্বপ্নে দেখি, -
দেখি ও আমার সাথে কথা বলছে, হাসছে,
হাসিতেও ওর মুখে যন্ত্রণা ফুটে উঠছে,
দেখি অতৃপ্তি নিয়ে ও পাগলের মতো কথা বলছে।
অতৃপ্তি আমি বুঝি,
আমি আমার মধ্যে অতৃপ্তিকে প্রবলভাবে উপলব্ধি করতে পারি,
যতক্ষণ না লক্ষ্যে পৌঁছই, আমার মধ্যে একরকম অতৃপ্তি ভীষণভাবে কাজ করে,
আমাকে অস্থির করে তোলে,
সেই একইরকম অতৃপ্তি, একইরকম অস্থিরতা আমি ওর মধ্যেও দেখতে পাই,
অবচেতন বা স্বপ্ন হলেও,
হোক না সে কাল্পনিক কোনোকিছু,
আমি ছবির মতো স্পষ্ট দেখতে পাই ওর মৃত্যুর দৃশ্য,
আমাকে বলছে শেষ লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে।
বলছে ও ভীষণ একা হয়ে আছে,
ছটপট করছে, কথা বলার কেউ নেই, আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাবে।


আমি হাসি,
সত্যিই কি ও পারবে আমাকে ওর কাছে নিয়ে যেতে!
আমার যে কাজ ফুরোইনি,
জীবন এখনো ঢের বাকি,
আমাকে ও এখনই নিয়ে যেতে পারবে না। 

No comments:

Post a Comment