শুরু থেকে**************************************************
১.
পাশাপাশি একসাথে চলতে চলতে দুজনে ভাবছিল কিভাবে একে অপরের কাছে আসবে। সেদিন দুজনেই আগে থেকে ফোনে ঠিক করে নিয়েছিল যে আজ তারা চুমু খাবে একে অপরকে। সম্পর্কের পর পাঁচ বছর হতে চলল, সৌম্য আর নূপুর শুধু হাতে হাত ধরে চলা ছাড়া আর কিছুই করেনি। তাতেই দুজনের সুখের শেষ ছিল না।
বয়স কত হবে? বারো পার হয়েছে সবে, নবম শ্রেণীতে পড়ছে সৌম্য, তখন নূপুরের সাথে তার আবার দেখা হয় টিউশান ব্যাচে। প্রথম দিনই নূপুরকে দেখে সৌম্য যেন ফিরে পায় তার ফেলে আসা প্রাইমারী স্কুলের দিনগুলোকে। ফুটফুটে ফর্সা একটা মেয়ে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে, কাঁধে একটা স্টাইলিশ ব্যাগ লাল কালো রঙের, গায়ে কালো রঙের শার্টের ওপর সাদা রঙের বুটিক দেওয়া কাজ আর পরনে ফুল স্কারট।
নূপুর এসে সৌম্যর সামনে বসল। একটু মুচকি হাসি হাসল দুজনেই। অঙ্ক করার ফাঁকে দুজনই একে অপরকে লুকিয়ে দেখছিল, এমনভাবে দেখছিল যাতে দুজনের কেউই সেটা জানতে না পারে। কিন্তু বারেবারে চোখে চোখ পড়তেই দুজনে মনে মনে হাসছিল আবার চোখে চোখে বিরক্তি প্রকাশ করছিল। দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত টান ছিল। অনেকে অনেকভাবে দুজনকে আটকানোর চেষ্টা করেছে, যাতে ওরা একে অপরের সাথে না মেশে। কেউ কিছু করতে পারেনি। সৌম্য একটু ভীতু আর নূপুর ছিল পুরো উল্টো, এক ডাকাবুকো মেয়ে। তের বছর বয়সের একটা মেয়ে নূপুর, যে বয়সে মেয়েরা পরিনত হয়না, পুতুল খেলে কাটায়, নূপুর তখন সুজুকি ফিওরো গাড়ি চালায়, ছেলেদের সাথে টক্কর নেয়, ছেলেদের সাথে গাড়ির রেস দেয়, ক্যারাম খেলাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেদের হারিয়ে দেয়, ক্রিকেট খেলে। আর সৌম্য তখন একবারে বাচ্চা ছেলে। হাফ প্যান্ট পরে পড়তে আসে, ভীষণ দুষ্টু, ছোটাছুটি করে বেড়ায়। মাথাতে সবসময় দুষ্টু বুদ্ধি ঘোরে। সৌম্যকে হাফ প্যান্ট ছাড়ানোর জন্য নূপুরকে অনেক সাধ্য সাধনা করতে হয়েছে, মুখের ওপর অপমানও করেছে ব্যাচের সামনে যাতে সৌম্য লজ্জা পেয়ে ফুল প্যান্ট পরে।
*** (গল্প থেকে বেরিয়ে কিছুটা এই সময়ের কথা বলছি। আজ ২৯ শে আগস্ট, ২০১৬। সকাল ১১ টা ৪১ মিনিট। আই.এস.আই তে বসে লিখছি। আত্মজীবনীর এই খণ্ডটা শুরু করার প্রথমেই বিতর্কে জড়ালাম। গতকাল ২৮ শে আগস্ট, রাত সাড়ে ন’টাতে আমার ফোনে একটা ফোন আসে। ফোন জিনিসটা এমনিতেই আমার কাছে এক বিরক্তিকর বস্তু। তবু প্রয়োজনে রাখতে হয়। ফোনটা যিনি করেন, উনি নিজের পরিচয় দিলেন করিমপুর থানার এক পুলিশ। পদ জানিনা। বলেননি। কয়েকটা কথা যা বললেন, সেগুলো এমন –
তুই সৌম্যজিৎ দত্ত বলছিস? বাপ – শঙ্কর দত্ত? তোর নামে জি.ডি হয়েছে। তুই একটা মেয়েকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে উত্যক্ত করছিস। সাইবার ক্রাইম। শোন বাড়াবাড়ি করছিস ..
ব্যস, এটুকু বলতেই আমার খারাপ লাগল, আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। একেতে আমি কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করিনি, কোনো সাইবার ক্রাইম করিনি, তার ওপর আমার সাথে তুই তুই করে কথা বলছে। সে যেই হোক, তুই তুই করে এভাবে কথা বলছে আমার সাথে? মানুষের কাছে এত সম্মান পেয়েছি, কোনো অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত নই, আর এক লোক পুলিশের পরিচয়ে এভাবে কথা বলবে? না, সেটা ভয় পেয়ে আর যেই মানুক, আমি সৌম্যজিৎ দত্ত, আমি মানবো না। অপরাধ, অন্যায়কে ভয় পাইনা। সত্যের পথে চলি। সত্যের পথে মানবতাবাদি লেখক তসলিমা নাসরিন’কে আদর্শ মেনে চলি, সম্মানজনক জায়গাতে কাজ করি, সেখানে আমি এমন মিথ্যে আর অন্যায় হুমকি কখনই মানবো না। আমি ফোন রেখে দিলাম। ক্রাইম করেছি কি করিনি সেটা প্রমাণ সাপেক্ষ। সৌম্যজিৎ দত্ত এত দুর্বল নয় যে বাজে হুমকিতে ভয় পেয়ে হুশ হারাবে। ঘটনাটা আমার কাছে যথেষ্ট বিরক্তিকর মনে হল। রাতে এক বন্ধু মারফৎ নূপুরের কিছু কথা জানতে পারলাম। আমার লেখালেখিতে নূপুরের কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমি যেন তার নাম এখানে ব্যবহার না করি। ঝামেলা পছন্দ করিনা আমি। লেখা শুরু করার আগে অনেক চিন্তা করেছি, বারবার ভেবেছি এভাবে একটা আসল নাম তুলে ধরবো, সেটা মেয়েটার জন্য ঠিক হবে? কিন্তু মন থেকে একটাই উত্তর পেয়েছি, আমি যদি নাম পাল্টে অন্যকোনো নাম লিখি, তবে সত্যিকে কি অপমান করা হবেনা? পাঠকদের কি আমি সত্যি থেকে বঞ্চিত করবো না? আর আমি তো বানিয়ে বানিয়ে কোনো মিথ্যে গল্প লিখছিনা, আমি সত্য লিখছি। মানুষের জীবনের প্রতি মুহূর্তে একটা করে সত্যি তৈরী হয়, সেই সত্যিটা যদি কাগজের পাতাতে জমা হয়, তাতে তো কোনো লজ্জা নেই, কোনো অপরাধও নেই। অপরাধ, লজ্জা মানুষের মনে থাকে। মানুষ যেটাকে মনে মনে ভাবে ভুল, অথচ জেনে শুনেও একটু আনন্দ পেতে সেই ভুলটা করে, সেটাকে মানুষ প্রকাশ করতে লজ্জা পায়, ভয় পায়, সেটাকে অন্যায় ভাবে। তাছাড়া আমি মনে করিনা যে নূপুর জেনেশুনে সম্পর্কে কোনো ভুল করেছিল বলে। অজান্তে মানুষের অনেক ভুল হয়ে থাকে, যেটা হয়ত সময়সাপেক্ষে বড় আকার ধারন করে, কিন্তু এই গল্পের নায়িকা ছিল আদর্শ প্রেমিকা। হ্যাঁ, সেও কিছু ভুল করেছিল, কিন্তু সেটা ছিল ভুল বোঝাবুঝি। আর গল্পের নায়ক সেই ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে জর্জরিত হয়ে স্থির বুদ্ধির অভাবে অন্যায় পথে চলতে শুরু করেছিল। লেখকেরা যখন কিছু লেখে, তখন তারা শুধু নিজের জন্য লেখেনা, তারা মানুষের জন্য লেখে, পাঠকদের জন্য লেখে। সমাজকে একটা বার্তা দিতে চায়। আমিও সমাজকে একটা বার্তা দিতেই এই লেখা শুরু করেছি। ভুল বোঝাবুঝি থেকে একটা মানুষ বা কিছু মানুষকে সারাজীবন যে শাস্তি বয়ে বেড়াতে হয়, মানুষ যদি সময় থাকতে সেই ভুল বোঝাবুঝিকে চিনতে পারে, তবে মানুষ অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে অগ্রসর হতে পারবে। শুধু এটুকুর জন্যই আমার এই লেখা “শুরু থেকে” শুরু করেছি।)
(২৯শে আগস্ট, ২০১৬। নূপুর আমাকে সন্ধ্যায় ফোন করল। আমাকে ও বুঝিয়ে বলল। শান্তভাবে বলল আসল নামটা দিলে ওর অসুবিধা হতে পারে, তাছাড়া আসল নাম ব্যবহার করলে ও কখনো লেখাটা পড়তে পারবেনা খোলামেলাভাবে। আমি ওকে কথা দিলাম, আমি ওর আসল নাম ব্যবহার করবো না। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করি, আমার কাছ থেকে অনেক আগেই ও চলে গেছে, অন্তত আমার গল্পের এই অন্যতম চরিত্রের নামটুকু বলে দিয়ে যাক। ও তখন আমায় বলল নূপুর নাম দিতে।)
২.
যখন দেখি তোমাকে, এক অজানা ভালোলাগা ছুঁয়ে যায়, পাশে চম্পা, সীমাদের সাথে গল্প করো, হাসো, আমি আড় চোখে তোমাকে বারেবারে দেখি। তোমার প্রতিটা নজর আমার চোখকে কখনও এড়িয়ে যায়নি। এক অদ্ভুতরকম হাসি হাসতাম দাঁত বার করে, তুমি মুগ্ধ হয়ে দেখতে। তোমার মুগ্ধ চোখ আমার চোখে ঝিলিক খেলাত। লাজুক ছিলাম, লজ্জা পেতাম, হাসিতে লজ্জা ঝরে পড়ত।
আগে আগে চলে আসতাম, তোমার অপেক্ষা করতাম। আমার পরপরই তুমি ঢুকতে। খুব ইচ্ছা করত তোমার খুব কাছে যাই, হাত দিয়ে ধরি তোমার গালদুটো, নাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাসকে আমার নাকে, মুখে, ঠোঁটে মাখি। ইচ্ছা করত দরজার পাশে তোমাকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ি, আমার ঠোঁটদুটো বুলিয়ে দিই তোমার ঠোঁটে, গলাতে। তোমাকে হাল্কা করে চেপে ধরি, একটু জড়িয়ে ধরি। বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরি তোমাকে। ছুটির সময় যখন অন্ধকার হয়ে যেত, আমি যেন সেই অন্ধকারেরই অপেক্ষা করতাম। সবার নজর এড়িয়ে তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। ইচ্ছা করত তোমাকে চুমু খাই, সাহস আর হয়ে উঠত না। তোমার শরীরে সবসময় যে ঘামের গন্ধ থাকত, আমি সবার অজান্তেই সেই গন্ধটাকে পান করতাম। কখনো বুঝেছ?
সেই সময় তুমি দিল্লি গেছিলে। দু’সপ্তাহ যে কি ভীষণ কষ্ট আর অপেক্ষা নিয়ে দিনগুলো কেটেছে, যেন হাহাকার! রুমা বারেবারে আমার কাছে ছুটে আসে। রুমাকে আমি খুব কাছথেকে চিনতাম। ও আমার সাথে সবসময় লেগে থাকত, জুড়ে থাকত। বারবার আমার ঘরে আসে, বারবার আমার জানালায় এসে আমার সাথে কথা বলে। ভালবাসতাম ওকে, নিজের থেকেও বেশি ভালবাসতাম। ওর কষ্ট সহ্য করতে পারিনা। ওর কষ্ট হলে আমি কষ্ট পাই খুব। কান্না পায় আমার। বাসবোই না কেন? মেয়েটা আমাকে পাগল করে দিত সবসময়। কথা নেই বার্তা নেই, রাত নেই দিন নেই বারেবারে ছুটে আসে, একটু দেখে বা হাসে, মা’র সাথে কথা বলে আর আমার ঘরে উঁকি মারে, আবার পালায়। ও বুঝতে পেরেছিল মনেহয় যে আমি তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি, আমাকে খুব বেশিই চিনত ও। একসময় দেখতাম ও আমার জানালায় এসে বারবার তোমার নামে আমাকে দু-চার কথা শুনিয়ে যেত। বলত তুমি অহংকারী, দিদি তোমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দেয় বা করে দেয়। তুমি ছেলেদের সাথে ঝামেলা করো রাস্তাঘাটে। আরও কত কি বলত! আমি প্রতিবাদ করে উঠতাম, বুঝতাম আমার সেই প্রতিবাদ করে ওঠাটা ওকে খুব কষ্ট দিত। কিন্তু তোমার নামে ও কিছু বলুক, আমি সহ্য করতে পারতাম না। তুমি হঠাৎ করেই ফিরে এলে দিল্লি থেকে। প্রথমে রুমাদের বাড়িতে গেছিলে। তোমার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বাড়িতে আসা, আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু ভয় হোক বা লজ্জা, তুমি পারোনি সেদিন। তবু সাহস করে বাড়ির সামনে এসে সাইকেলে বেল বাজিয়ে ছিলে। তোমার ওই হাঙ্ক স্ট্রেট হ্যান্ড সাইকেলের বেল আমি কোটি কোটি সাইকেলের বেলের থেকে আলাদা করতে পারি, না দেখেই। বেল শুনে বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল। ছুটে আসলাম, দেখি তুমি গেটের বাইরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। খুব কালো হয়ে ফিরেছিলে, তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। তবু আমাকে দেখে যেন তোমার চোখ থেকে ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। আমাকে বললে, তোর অঙ্ক খাতাটা দে। বাহানা খুঁজে বার করতে তোমার জুড়ি মেলা ভার। দিদিকে বলেছিলে অঙ্কে পিছিয়ে পড়েছ, দিদি তোমাকে বলেছিল রুমার কাছ থেকে খাতা নিতে। তুমি বলেছিলে সৌম্যর কাছ থেকে নিই? দিদি জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন ও পড়াশোনাতে ভালো নাকি যে ওর কাছথেকে নিবি? তুমি বলেছিলে ভালোই তো।
৩.
আমি হেরে যাচ্ছি সবকিছুতে। তুমি পাপ্পুর সাথে ক্যারাম খেলছ, পড়া শেষে পাপ্পুর সাথে কোথায় একটা যাচ্ছ। পাপ্পুর সাথে বেশি কথা বলছ। স্যার বারেবারে কেমন ইঙ্গিত করছে তোমাকে আর পাপ্পুকে নিয়ে। ব্যাচে দিনগুলো খুব অসহায় কাটছে। বাড়ি ফিরছি রাস্তা থেকে একবুক আগুন নিয়ে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করছে। দিনেরপর দিন আমি ভেঙে পড়ছি, শুকিয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ছি, বই সামনে খুলে শুধু মনে মনে তোমার সাথে কথা বলছি, অনেক অনেক অভিযোগ করছি আর কাঁদছি। রাতগুলো দীর্ঘ কাটছে। রুমাকে একেবারে সহ্য হচ্ছেনা, বারবার আমার কাছে আসছে, আমাকে কেমন ভাবে দেখছে। পাশে এসে বসছে। ওর উপস্থিতি আমাকে বিরক্ত করছে, যেন গোটা ঘরে আমি আমার কান্নার শব্দের থেকে বেশি করে রুমার শ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ পাচ্ছি আর দেওয়াল ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটা ঘোরার খচখচ শব্দ আমার কানদুটো ঝালাপালা করে দিচ্ছে। রুমা আমাকে বারেবারে জিজ্ঞাসা করছে, কি হয়েছে তোর? আমি কোনো কথা বলছিনা। শুধু ইচ্ছা করছে দেওয়াল ঘড়িটাতে ঘুসি মেরে ভেঙে ফেলি আর রুমার গলা টিপে ওর প্রশ্নগুলো বন্ধ করে দিই। দুটোর একটাও করিনা। আমি চুপ করে থাকি।
“হঠাৎ আসা মেঘ আর উতলে ওঠা ঢেউয়ে
প্রাণ চঞ্চল হয়ে ওঠে কোনো এক গভীর ক্ষতকে অনুভব করে।
রক্তের সাথে দানা বেঁধে আছে যে স্পর্শ,
অস্পর্শেই তা ক্ষত করে হৃৎপিণ্ডকে বারে বারে।”
পড়াশোনা দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিনের অনুশীলন ঠিকমত করতে পারছিনা। ইতিহাস, ভূগোল, বাংলা, জীবন বিজ্ঞান পাতার পর পাতা পড়া জমে থাকছে। ইংরাজি সহজাত, অঙ্ক ও ভৌতবিজ্ঞান ভালোবাসি। কোনোরকমে এই তিনটে বিষয় পড়ছি। তাও সেভাবে চিন্তাভাবনা না করেই পড়ছি। পড়ছি, যেন মন নেই। বাকি বিষয়গুলোতে একেবারেই পড়া হচ্ছেনা। এই তিনটেতে যদিও বা একটু পড়ি, চিন্তাভাবনাহীন। পাতার পর পাতা বীজগণিতের অঙ্ক কষছি, যেন মাথা কাজ করছে না। অঙ্ক মুখস্থ হয়ে গেছে। বই না দেখেই অঙ্কগুলোর প্রশ্ন খাতাতে লিখছি, আর সমাধান করছি। কিন্তু ওই একই রকমের অন্য অঙ্ক করতে গেলে চার, পাঁচবার ভুল করে সমাধান করতে পারছি। বিশ্বাস, ভরসা আমার সবথেকে বড় শক্তি। এতদিন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করেছি মনের তীব্র জোরে। এখন সেই বিশ্বাস বড় ঠুনকো মনে হচ্ছে। নিজেকে একেবারে নিয়ন্ত্রন করতে পারছিনা। বারেবারে ভাবছি ভুলে যাবো সব, আমি কেন ভালোবাসবো। তুমি তো আমাকে ভালোই বাসোনি। শুধু আমিই বেসেছি আর আমিই কষ্ট পাচ্ছি। খেতে পারছিনা, ঘুমোতে পারছিনা। সবসময় দেবদাসের মতো মন খারাপ নিয়ে পড়ে আছি। তুমি তো পাপ্পুর সাথে গল্প করো, ছুটির শেষে পাপ্পুর সাথে যাও কোথায় একটা। আমার কি? তোমার ইচ্ছায় তুমি ঘুরছ। কিন্তু তবু আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি ভুলতে পারছিনা। পারছিনা কিছু। আমি হেরে যাচ্ছি।
“এক মহাকাশ ভালোবাসা আমি বুকে ধরেছি,
আলো আছে, অন্ধকার আছে, ঘূর্ণাবর্ত আছে, বৃষ্টিও আছে,
জোর করে ধরিনি।
কক্ষপথের তীব্র আকর্ষণে ছুটে গেছি তোমার কাছে,
গা ঘেসে ভালোবাসা দিতে চেয়েছি,
বাইরে কত সুন্দর আরও উপগ্রহদের আমি দেখিনি,
শুধু দেখেছি তোমায় অপ্রতিম।”
আচ্ছা তুমিও মণ্ডল, পাপ্পুও মণ্ডল। আমি দত্ত। তাই বুঝি আমাকে ভালোবাসো না? কিন্তু আমি দত্ত তাতে কি? সবাই তো বলে আমরা চাঁদসওদাগর বংশ। বনিক জাতি। আমরা তো নিচু নই। কোনোভাবেই তোমাদের থেকে নিচু নই, বরং আমাদের বংশের সাথে ইতিহাস জুরে আছে। তাহলে কি শুধু পদবি আলাদা বলেই আমাকে ভালবাসবেনা??
আচ্ছা। তোমরা বিয়ে কর। সুখে সংসার কর। আমি সারাজীবন একাই থাকবো। শুধু তোমাদের যখন মেয়ে হবে, আমাকে সেই মেয়েটা দিও। আমি ওকে নিয়ে বাঁচবো। ওকেই ভালবাসবো। বড় করবো। ও আমার মেয়ে হবে। আচ্ছা নূপুর, সত্যিই কি তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি। সবটাই কি শুধুই আমিই বেসেছি?
“কতদিন, কতরাত পার হয়ে যায় হাহাকারে,
বুক ফেটে চৌচির হয়,
কত প্রশ্ন দরজা, জানলা দিয়ে প্লাবন বইয়ে দেয়,
আমি অসহায়।
ঘুম হারিয়েছি, খিদে হারিয়েছি, ভরসা হারিয়েছি নিজের,
যেটুকু চলছি,
তলিয়ে যাচ্ছি সমুদ্রের তলদেশে।”
৪.
জীবন বারেবারে সুযোগ দেয়। প্রতিটা মুহূর্তে প্রতিটা চিন্তা ও চিন্তার পিছনে ব্যর্থতা একটা করে নতুন রাস্তা খুলে দেয় লড়াই করার। লড়াইকে লড়ার মানসিকতা, সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করার নামও জীবন। আবার সময়কে সময়ের মতো করে বইতে দিয়ে নিজেকে স্রোতের টানে ভাসতে দেওয়াটাও জীবন। উপভোগ দুটোই করা যায়। আমি সৌম্য, একদিকে আমার সারল্য, ভালোবাসা, সবকিছুর মধ্যে থেকে হাসিকে খুঁজে বার করা, আবেগে ভেসে যাওয়া আমার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে আমি সময় বিশেষে চরম প্রতিহিংসা পরায়ন, বিজয় অভিলাসি, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে যেকোনো বাধা, দুর্গম পথ পেরোতে দ্বিধাহীন।
একটা মেয়ে ও। আমি কেন নিজেকে শেষ করে ফেলছি একটা মেয়ের জন্য? আমি তো অপরাজেয়। হ্যাঁ, সৌম্য অপরাজেয়। মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিশিং, সল্ভ ফ্যাক্টর, দুটো থিওরেম, দুটো ইংরাজি কবিতা, বাংলাতে দেনা পাওনা, তাসের ঘর, ফিজিক্সের ভেক্টরের দশটা অঙ্ক সমাধান করে ফেললাম। সৌম্য অপরাজেয়, আমি হেরে যাবো না। আজ মন ভীষণ চনমনে লাগছে। হ্যাঁ, আমি আমার পুরোনো বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছি। স্কুলে পরপর দুবার ক্লাস নাইনে ফেল করা তরুন ও বিকাশ, রীতিমত সেকশানের গুন্ডা হয়ে উঠেছে। ওদের কেউ ঘাঁটতে যায়না। অঙ্কের ক্লাসে কেউ কথা বললে মাথা গরম হয়ে যায় আমার। সেদিন শেষ বেঞ্চে বসে আছি, থিওরেম বোঝার চেষ্টা করছি অঙ্কের ক্লাসে। হঠাৎ তরুন আমার খাতাটা নিয়ে নিল, কাগজ ছিঁড়ে নোংরা কথা লিখে এর ওর দিকে ছুঁড়ে মারবে।
আমার খাতাতে হাত দিয়েছে? আমার খাতাতে নোংরা কথা লিখবে, ছিঁড়বে নোংরা হাতে? আমি তখন খাতাটা কেড়ে নিলাম। স্যার সামনে আছে, তাই ওরা তখন কিছু বলল না। স্যার চলে যেতেই তরুন আর বিকাশ এসে আমার জামার কলার চেপে ধরল। আমি বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে তরুন ও বিকাশের গলা টিপে ধরেছি দুহাতে দুজনের, ওদের শরীরে আর জোর নেই উঠে দাঁড়ানোর। সবাই অবাক। সৌম্য কখনো কারোর সাথে ঝামেলা করেনা, আজ ওই দুই গুণ্ডার গলা টিপে ধরেছে দু হাত দিয়ে।
দিনেশ বাবুর ডাক পড়ল। মানিক মনে হয় দিনেশ বাবুকে ডেকে ছিল। দিনেশ বাবুর ভয়ে গোটা স্কুল কাঁপে। আর মানিক আমাদের ক্লাসের এক বন্ধু। আমি মানিক ও শ্রীকান্তকে খুব সম্মান করি। দুজনেই ভীষণ সাহসী ও সৎ। আমি দুজনকে খুব ভরসা করি, ওরা সত্যের সাথে থাকে সবসময়। মানিক দিনেশ বাবুকে জানাল, সৌম্য দুহাতে তরুন আর বিকাশের গলা টিপে ধরেছিল, এটাও বলল তরুন আর বিকাশ ক্লাসে খুব ঝামেলা করে। দিনেশ বাবু আমাদের তিনজনকেই বোর্ডের কাছে ডাকলেন, বললেন কি হয়েছে শুনতে চাইনা, তিনজনেই কান ধরে ওঠবোস কর দশবার। তিনজনেই তাই করলাম। তরুন, বিকাশ সেদিনের পর আর ঝামেলা করেনি আমার সাথে।
৫.
আমাকে যেতে হবে অনেক দূরে,
এখানেই তবে শেষ,
ফিরবো না কখনো, তুমি ভালো থেকো,
আমার চোখে প্রেমের রেশ।
অনেক দেখেছি স্বপ্নে তোমায়,
থাকতে চেয়েছি পাশে, ভালোবাসি শুধু এটুকু জানাতে চেয়েছি,
পারিনি হয়ত জানাতে।
বুকের মধ্যে গর্জায় মেঘ, অঝরে বইতে চায় প্রাণ,
চোখের কালো আবছায়াতে ভিজিয়ে দেয় ভালোবাসা।
বড় অস্থির মনে হচ্ছে। দুদিন ভালোই ছিলাম। আবার যখন তোমাকে সামনে, খুব কাছে থেকে দেখলাম, দেখলাম যেন মনের ভিতরে প্রবল বর্ষণ হয়ে গেছে, বৃষ্টি শেষে চারিদিকে ঝলমলে সবুজ আর নতুন বাতাসের গন্ধ ভেসে আসছে। সেদিন আমরা ব্যাচের মধ্যেই স্যার আসার আগে ঠিক করলাম লুকোচুরি খেলবো। বুদ্ধিটা আমারই ছিল। আমি ভেবেছিলাম লুকোনোর বাহানায় আমি তোমার কাছে যাবো, আরও কাছথেকে অনুভব করবো তোমাকে। কিন্তু রুমা বাধ সাধল। তোমাকে চোর করা হল। নিরুপায় আমি জানালার পাশে এসে লুকিয়ে পড়লাম একা, ভাবলাম ওই একা জায়গায় তুমি নিশ্চয় আমাকে খুঁজতে আসবে। কিন্তু রুমা সেটা হতে দিলনা। আমি জানালায় লুকিয়েছি, আর রুমা আমার কাছে এসে লুকোলো। আমার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে রুমা। আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাস আমার মুখের ওপর পড়ছে, ওর চোখ অন্যকিছু বলতে চাইছে, রুমার চোখ দিয়ে ভালোবাসা ঠিকরে বের হচ্ছে, আর ঠোঁট কাঁপছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে রুমার নিঃশ্বাসে। আমি বুঝতে পারি, রুমা ছোট থেকে ভীষণ জেদি, ও আমাকে ভালোবাসে, ও তোমাকে আর আমাকে কাছে আসতে দেবে না। এমনিতে মনের মধ্যে তীব্র অসহায়তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছি, আর রুমা সুযোগ খুঁজেই যাচ্ছে আমাকে পাওয়ার জন্য। সব বুঝি আমি, তবু আমাকে মনের মধ্যেই চেপে রাখতে হয়। আমার একটা ভুল পদক্ষেপ রুমার জীবনে যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে। আমি রুমাকে সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে নিজে ধরা দিই তোমার সামনে। সেদিন খুব বকা শুনতে হয়েছিল আমাদের সবাইকেই। আমরা ওভাবে পড়তে গিয়ে হৈচৈ করে খেলতে শুরু করেছিলাম বলে।
৬.
সময় কিভাবে বয়ে যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিনা। খাওয়া, ঘুম, স্কুল, টিউশান এসবে দিন কেটে যাচ্ছে। ঘরে পড়তে বসে পড়াতে কিছুতেই মন বসাতে পারছিনা। সমস্ত পরীক্ষাগুলোতে একের পর এক খারাপ রেজাল্ট হতে শুরু হয়ে গেছে, একটা করে বিষয়ে ফেলও করছি। ছোট থেকে ইংরাজির বেস ভালো হয়েছে, কিন্তু সেই ইংরাজিতেও ষাটের ঘরে নাম্বার, অন্যান্য বিষয়ে নাম্বার মুখে আনার মতো না। চল্লিশের ঘরে নাম্বার আসছে, জীবন বিজ্ঞানে ভয় তৈরি হয়ে গেছে। জীবন বিজ্ঞানে পরপর ফেল করে যাচ্ছি। ছোট থেকে রুমা আর আমি কমপিটিশন করি, শুরুটা রুমা নিজে করেছিল। কিন্তু কোনোদিন ও আমার থেকে নাম্বার বেশি পাইনি। এই প্রথম ও আমার থেকে বেশি নাম্বার পেতে শুরু করল। রুমার সাথে আমার সম্পর্ক বছরে চার মাস ভালো থাকে, আট মাস খারাপ। যখন খারাপ হয়, তখন কথা বন্ধ থাকে আমাদের দুজনের। হঠাৎ একদিন ইংরাজি পড়তে গিয়ে, পড়া ছুটি হলে আমি বাইরে এসে সাইকেল বার করতে গিয়ে রুমার ব্যাগটা পড়ে যায়, ইচ্ছা করে ফেলিনি। রুমা বাইরে এসে দেখল ওর ব্যাগ পড়ে গেছে আমার কাছথেকে। ভাবল আমি ইচ্ছা করে ফেলেছি, ওমনি পাশে পড়ে থাকা গোবর তুলে আমাকে ছুঁড়ে মারল। ভীষণ রাগ হল আমার, আমি বলে দিলাম, আমার সাথে যেন আর কথা না বলে। আসলে রাগ হলেও একটা মায়া ছিল আমার রুমার ওপরে। একবার সন্ধ্যার অন্ধকারে হ্যারিকেন জ্বলছে, আমি রুমার চুলের মুঠো চেপে ধরে ওর ঠোঁটটা হ্যারিকেনের সাথে ঠেসে ধরেছিলাম, জানিনা কেন করেছিলাম, সবসময় দুষ্টু বুদ্ধি মাথাতে ঘুরত আমার, আর দেখি রুমা কেঁদে ফেলেছে, ওর ঠোঁট পুড়ে গেছে। দাগ হয়ে গেছে ঠোঁটে। ওই দাগ দেখে খুব কষ্ট হল। তারপর থেকে আমি রুমাকে কিছু বলতে পারতাম না। খুব মায়া পড়ে গেছিল মেয়েটার ওপরে। অন্ধকারে একসাথে বাড়ি ফিরতাম, কেউ কারোর সাথে কথা বলতাম না রাগে। কিন্তু ওকে আগলে আগলে নিয়ে আসতে হতো। বিরক্ত লাগত, কিন্তু আমার স্যাররা বলে দিয়েছিল, আমি যেন রুমাকে প্রতিদিন বাড়ি পৌঁছে দিই। কে জানত, অত রাগের মধ্যেও, কথা না বললেও রুমা ভালোবাসে আমাকে। এ কথা বয়েজ স্কুল, গার্লস স্কুল, স্যার, ম্যাম সবাই জানত, রুমা জানত, শুধু আমিই জানতাম না প্রথমের দিকে, যে রুমা আমাকে ভালোবাসে। পরে আস্তে আস্তে রুমার চোখ, মুখ দেখে বুঝতে পারলাম। বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকতাম। থাকতাম, কারণ আমি নুপুরকে ভীষণ ভালোবাসি, পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম নুপুরের জন্য। রুমা একের পর এক চাল চালতে শুরু করে নুপুরের কাছথেকে আমার মন অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য। আমার কাছে এসে নুপুরের নিন্দা করে, নুপুরের মা’র কাছে গিয়ে আমার নিন্দা করে, স্যার, ম্যামদের কাছে সহানুভুতি আদায় করে আমাকে বোঝাতে বলে। আমি অসহায় হয়ে সব শুনি, শুধু শুনিই, মাথায় কিছু ঢোকেনা।
৭.
নুপুর আমাকে ভালবাসতে শুরু করেছে, কিন্তু আমাকে এই কথাটা কখনো জানতে বা বুঝতে দেয়নি। নুপুর চায় আমি যেন রুমাকে ভালোবাসি। রুমার রাগ, জেদ সবাই জানে, বোঝে। একটু রেগে গেলেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। সবাই ভয় পেয়ে বারেবারে ডাকতে শুরু করে, কিন্তু সে দরজা খোলে না। সবাই ভয় পায়, মেয়েটা আত্মহত্যা না করে ফেলে কোনো কারণে। নুপুর ভীষণ চায় যেন আমি রুমাকেই ভালোবাসি। ও নিজের ভালোবাসা ত্যাগ করতে রাজি। একদিন আমাকে জোর করে রুমার সাথে কথা বলিয়ে দিল। আমি ও রুমা কেউ কারোর সাথে কথা বলবো না, মনে মনে খুব কথা বলতে চাই দুজনেই, কিন্তু কেউ কারোর কাছে হার স্বীকার করবো না। কিন্তু যেহেতু নুপুর আমাকে বলেছে, তাই সব লজ্জা মাথায় তুলে আমি প্রথম রুমাকে ডেকে উঠি। আট মাস কথা বলিনি রুমার সাথে, মুখে একবার রুমা ডাকটা আনার জন্য প্রাণ ছটপট করছিল আমার, ওদিকে রুমাও আমার মুখ থেকে ওর নামটা শোনার জন্য মনে মনে ছটপট করছিল। সেটা আর কেউ না বুঝলেও, আমি ও রুমা একে অপরের চোখে তাকিয়ে ভালোই বুঝে ছিলাম। আমি ভীষণ খুশি। অনেকদিন পর একসাথে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরলাম অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে। একসাথে রোজই ফিরতাম, শুধু কথা বলতাম না। পাড়ার সবাই খুশি আমাদের মিল হয়েছে দেখে। পাড়ার লোক সবাই ভাবত আমি আর রুমা নায়ক, নায়িকার মতো। আমি মোটেও সুন্দর ছিলাম না কখনো, বোকা বোকা ছিলাম, দুষ্টু ছিলাম, কিন্তু রুমা দেখতে অদ্ভুত সুন্দর। রুমা আমার থেকে বয়সে বড়, নুপুরও আমার থেকে বয়সে বড়। আমি মজা করে রুমাকে মাঝে মাঝে দিদি বললেই খেপে গিয়ে বলত দিদি হবে ওই নুপুর। ইতিমধ্যে নবম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষার ফল বেরোলো। কোনো রকমে একটু সম্মানজনক ফল হল আমার। দশম শ্রেণীতে উঠলাম।
দশম শ্রেণীতে যখন উঠলাম, তখন জানতাম না, দুমাস পর থেকে আমার জীবন এত ঘটনাবহুল হতে চলেছে।
এবার থেকে গল্প সেজে উঠতে চলেছে। একের পর এক ঘটনা জীবনকে আকর্ষণীয় করে তুলতে চলেছে। গল্পের নায়কের জীবনে পরিবর্তনের শুরু।
৮.
বাড়িতে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। জীবন অসহনীয়। একদিকে পিছিয়ে পড়া পড়াশোনাতে এগিয়ে আসার চেষ্টা, অন্যদিকে পাপার শৃঙ্খলহীন আচরণ আমাকে, মা’কে অস্থির করে তুলছে। মা অসুস্থ হয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে। পাড়ার সবাই মিলে একটা পিকনিক করবো ঠিক হল। পিকনিকে এত আনন্দের মাঝে, পাপা অন্য একটা পিকনিকে গিয়ে বন্ধুদের সাথে প্রচুর মদ পান করেছিল, উঠে আসতে পারছিল না। বমি করছিল। মা পাড়ার সবার সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে তখন। পাড়ার সবাই আমাদের খুব ভালবাসত। আমাকে ভীষণ ভালবাসত। আমাকে সবাই আগলে আগলে রাখত, আমার কিছু হওয়া মানে গোটা পাড়া এক জায়গায় হয়ে আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যেত। আমার মনে আছে, ক্লাস ফাইভে যখন পড়ি, মা’র একবার খুব জ্বর হয়েছিল। মা আমাকে ফ্রিজ থেকে একটা বেদানা নিয়ে আসতে বলেছিল। আমি বেদানাটা কেটে খাওয়াতে চেয়েছিলাম, বটি নাড়াচাড়া করা অভ্যাস ছিল না। আমি বটিতে বেদানা কাটতে গিয়ে, বটির পাত আমার হাতে গেঁথে যায়। আমি চিৎকার করে উঠি, সাথে সাথে পাড়ার সবাই জড় হয়ে গিয়ে আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছিল। সবাই যে যা রান্না করত সবার বাড়িতে, সেখান থেকে সবাই আমার জন্যও রেখে দিত খাবার। এভাবেই সবার ভালোবাসা পেয়েছি। মুচি, জেলে, চাষি থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ বাড়ির লোক, সবার ভালোবাসা পেয়েছি, সবার আদর পেয়েছি। পাপা তখন ব্যবসাতে উঠতির পথে, ব্যবসা বাড়ছে, ক্ষমতা বাড়ছে, ততোই উদ্ধত হয়ে উঠছে। রাস্তাঘাটে মানুষের হিংসা, ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে, পুলিশি ঝামেলাতে জড়াচ্ছে। পাপা ভীষণ বদমেজাজি। কাউকে ছেড়ে দেয়না রেগে গেলে। আর মদ্যপ অবস্থায় তো একেবারেই নয়। পাপার সাথে সবসময় অনেক লোক থাকে, গুন্ডা প্রকৃতির লোক। ওরা পাপাকে মদত যোগায়। পাপা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। করিমপুরের এক ক্ষমতাবান গুন্ডা প্রকৃতির লোকের একমাত্র ছেলেকে দোলের দিন রাস্তাতে পাপার লোকেরা মেরেছিল। সেই ছেলে বাড়ি গিয়ে পাপার নাম করে। বাড়িতে পাপা ছিলনা, তার বাবা গুন্ডা ধরে এনে আমাদের বাড়ির সামনে ভাংচুর শুরু করে, আমাকে বাড়ি থেকে বার করে মারতে আসে, আমাদের ড্রাইভার আমাকে লুকিয়ে রেখে সব মার নিজে খায়। ড্রাইভারের মুখ ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। আমি তখন ছোট হলেও, ড্রাইভারকে বাঁচাতে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। মা আমাকে পিছন থেকে চেপে ধরে রাখে। চোখের সামনে দেখি ওরা ড্রাইভারকে মারতে মারতে জামা, প্যান্ট ছিঁড়ে দিয়ে উলঙ্গ করে রাস্তা দিয়ে নিয়ে চলে গেল। আমি খুব কাঁদছিলাম। খুব কষ্ট হচ্ছিল ড্রাইভারের জন্য। পাপা পা টলতে টলতে রাতে বাড়ি ফিরে দেখে সব ভাংচুর হয়ে পড়ে আছে বাড়ির সামনে। তখনই পাপার নেশা ছেড়ে যায়। আরও এক মারাত্মক ভুলটা তখন থেকে শুরু হয়। পাপা পুলিশকে খবর দেয়, ও পরে করিমপুর থানার আন্ডারে সমস্ত ছোট, বড় পুলিশের সাথে তখন থেকে পাপার পরিচয় ও পরে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এবার পাপা থানাতে গিয়ে পুলিশদের সাথে বসে মদ পান করতে শুরু করে, কখনো থানাতে বসে, কখনো পুলিশদের কোয়ার্টারে বসে। পাপাকে খুব কম সময়ে দেখতে পাওয়া যায়। ব্যবসাতে অমনোযোগের কারণে কিছু ক্ষতি হয়ে যায়। সেই ক্ষতি পূরণ করতে মা’র নামে একটা জায়গা ছিল, যেখানে মা স্বপ্নের একটা বাড়ি তৈরি করবে ভেবেছিল, সেই জমি জোর করে মা’র সই নিয়ে ছিনিয়ে নেয়। মা অসহায় হয়ে পড়েছিল, সই না করে কোনো উপায় ছিলনা তখন মা’র কাছে। অনেক টাকাতে বিক্রি হওয়ার ফলে সেই টাকা পাপা ব্যবসাতে কাজে লাগিয়ে, বাকি টাকা দিয়ে একটা বিশাল বাড়ি কেনে। মা অপমান সহ্য করতে না পেরে ভেবেছিল ওই বাড়িতে যাবেনা। এদিকে আমার এক দাদু এই সুযোগে মা, পাপার সম্পর্ক ডিভোর্সের জায়গায় নিয়ে যায়। তার অভিসন্ধি ছিল তার মেয়ের সাথে পাপার বিয়ে দেবে। এসব কথা পাপা জানত না। পাপাকে বুঝতে দেয়নি দাদুটা কিছু। দোকান ও বাড়িতে একটাই ফোনের দুটো রিসিভার করা ছিল। মা, দিদা, আমি দাদুর ফোনের সব কথা শুনে নিয়েছিলাম। যদিও পাপা এসব বিশ্বাস করেনি। মা’র হেপাটাইটিস বি ধরা পড়ে। এবার পাপা একটু নরম হয়। মা’কে নিয়ে সেই রাতে একাই পাপা কলকাতাতে চলে আসে। বাঁচার আশা ছিলনা। পাপা তখন খুব কেঁদে ফেলেছিল। পিয়ারলেস হসপিটালে টানা সাত দিনের চিকিৎসার পর মা সুস্থ হয়, তারপর মা’কে নিয়ে পাপা বাড়ি ফেরে।
৯.
কিছুদিন যাওয়ার পর বাড়িতে তুমুল অশান্তি শুরু হয়। দাদু ষড়যন্ত্র করছে, পাপা নেশার মধ্যে থাকার জন্য কিছু বুঝতে পারছে না। মা এসব নিয়ে চিন্তাতে অস্থির হয়ে উঠছে। এদিকে পাপা মা’কে নতুন বাড়িতে যাওয়ার জন্য জোর করছে। আমার ক্লাস টেনের প্রিটেস্টের আর একমাস বাকি। পড়াশোনা কিছু হচ্ছেনা। এর মধ্যে দাদু আরও কিছু ষড়যন্ত্র করে বসে। নতুন বাড়িতে আমরা ঢোকার আগে, দাদু, পাপা ও আমার এক মামা গেছিল। পাপা টেবিলে বসে মদ পান করছিল, দাদু সেই সুযোগে কিছু কাগজে পাপার সই নেওয়ার চেষ্টা করে। মামা পিছন থেকে দেখতে পেয়ে যায় ও কাগজগুলো কেড়ে নিয়ে দেখে ট্রান্সপোর্টের পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি, লেখা আছে পাপা সুস্থ মস্তিষ্কে, সজ্ঞানে ট্রান্সপোর্ট বিজনেসের পাওয়ার দাদুর হাতে তুলে দিচ্ছে। মামা কাগজ ফিরিয়ে দেয়না, নতুন বাড়িতে তালা লাগিয়ে, পাপাকে গাড়িতে তুলে পুরোনো বাড়িতে নিয়ে আসে ও আমাদের সেই কাগজ দেখিয়ে সব খুলে বলে। ঘণ্টাখানিকের মধ্যে সেই কাগজ হারিয়ে যায় আমাদের বাড়ি থেকে, পরে পাপাকে যখন সব খুলে বলি যা হয়েছে, পাপা কিছু বিশ্বাস করেনা। দাদুর সামনে বললে দাদু পাপাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে এবং পাপা উল্টে আমাদের ওপরেই রেগে যায়। পাপা বাড়িতে আসা বন্ধ করে দেয়। উপায় না দেখে, মা সবকিছু নিয়ে নতুন বাড়িতে ওঠে। নতুন বাড়িটা বিশাল একটা বাড়ি, সবাই বলেছিল প্রাসাদ। বাড়ির ভিতরে সবকিছু সাজানো, নতুন জিনিসে ভর্তি। ওসব জিনিসের মধ্যে আমাদের পুরোনো বাড়ির পুরোনো জিনিসগুল বেমানান। তাছাড়া এতসব আধুনিক জিনিসের অভ্যাস আমাদের নেই। পুরোনো বাড়িতে আমরা চাপা কলের জল খেতাম, ঘর বলতে দুটো ছোট ছোট ঘর ছিল, একটা ছোট ডাইনিং ছিল, সিঁড়ি ঘরের ছাদ ছিল টিনের, আর ছিল অগনিত মানুষের স্নেহ, ভালোবাসা। নতুন বাড়িতে এসে সবকিছু অন্যরকম। বাড়ির সামনে বিশাল জমি পড়ে আছে, বাড়ির ভিতরে বড় শান বাঁধানো উঠান, বাড়িতে নিচ তলা, ওপর তলা মিলিয়ে চোদ্দটা ঘর, মানুষ মাত্র তিনজন। তারমধ্যে পাপা বাড়িতে ফেরেনা প্রায় তিনমাস। অত বড় বাড়িটাতে আমি আর মা দুজন। পাড়ার লোক তখন কথা বলেনা বিশেষ। আমরা অসহায় হয়ে দিন কাটাতে থাকি, দম বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে প্রিটেস্টের পরীক্ষার রেজাল্ট যাচ্ছেতাই খারাপ হয়, কোনোরকমে পাশ করি।
১০.
অনেকদিন পর পাপা বাড়ি ফিরল। কোলে একটা ফুটফুটে বাচ্চা কুকুর। বাড়ি গিয়েই আমার কোলে ওকে দেয়। আমার কোলে এসে বমি করে দিল। পাপা বলল ওর নাম রাজেশ। আজ থেকে এখানেই থাকবে। আমি বলে উঠি, ওর নাম ভুটো। মা কুকুরকে ভয় পেত, জোর করে মা’র হাতে ওকে দিলাম। বললাম ওর নাম ভুটো। ভুটো মানে পাপা জানেনা, বোঝে না। পাপার রাজেশ নামটাই বেশি পছন্দ। নাম রাখা নিয়ে মা, পাপার মধ্যে চিৎকার চেঁচামেচি করে ঝগড়া হয়ে গেল। খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। মা বলল ভুটো নামটাই বেশি ভালো। তাছাড়া ছেলে ওর নাম ভুটো রেখেছে, তাই ওর নাম ভুটোই থাকবে। পাপা মেনে নিল। ওর নাম তখন থেকে ভুটো হয়ে গেল। এখানে আমার মুখ থেকে ওর নাম ভুটো বেরিয়ে আসার কারণ আছে। ছোট থেকেই আমি ঝগড়া, ঝামেলা পছন্দ করিনা। কিন্তু কোথাও অপমানিত হলে, সেটা মনে রেখে দিই। সময়ের অপেক্ষা করি। একবার স্কুলে টিফিনের সময় আমার এক বন্ধু আমাকে বলে, চল বাবার অফিসে যাই, টাকা নিয়ে এসে একসাথে টিফিন করবো। আমাকে নিয়ে যায় ও ওর বাবার অফিসে। ওর বাবা ওকে পাঁচ টাকা দেয়, ও বলে দুজন আছি, দশ টাকা দাও। ওর বাবা ওকে দশ টাকায় হাতে দিল। বাইরে বেরিয়ে এসে ছেলেটা আমার হাতে এক টাকা দিয়ে বলে কিছু খেয়ে নিস। আমি টাকার অপচয় করিনা, বাড়ি থেকে টিফিনের জন্য দুটাকা করে আনতাম, পঞ্চাশ পইসার খেতাম, পঞ্চাশ পইসা বাস ভাড়া দিতাম ও একটাকা ভাঁড়ে জমাতাম। টাকার ওপরে লোভও কখনো হয়নি তেমন। বন্ধুটা সেদিন নিয়ে যেতে চাইল, তাই গেছিলাম ওর বাবার কাছে। কিন্তু ওর ওই একটাকা দেওয়াটা আমাকে খুব অপমান করে। ওর নাম ছিল ভুটো। আমি ওকে বলেছিলাম, তোর নামে আমি কুকুর পুষবো। তাই ভুটো নামটা রেখেছিলাম। নতুন বাড়ি এসে ওকে নিমন্ত্রন করেছিলাম, খাবার সাজিয়ে ভুটো বলে যেই ডেকেছি, দুই ভুটোই হাজির। তখন আমি আমার বন্ধু ভুটোকে জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু মনে পড়ছে কিনা ওর। ও বুঝতে পারে ও আমাকে স্যরি বলে। সেদিন ও ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল।
১১.
ভুটোকে নিয়ে, ক্রিকেট নিয়ে খেলাতে মেতে আছি। সময় বেশ কাটছে নতুন বাড়িতে এসে। ফুরফুরে মেজাজে। একদিন পুরোনো বাড়িতে গেলাম, দেওয়ালগুলো ছুঁয়ে দেখছিলাম, চোখে জল চলে আসলো। রুমা দূর থেকে ওদের বাড়ির ছাদ থেকে তাকিয়ে দেখছিল। কাঁদছিল। ওকে দেখে আমার আরও কষ্ট হল। আমি হাতে ইশারা করে বললাম, আমি ঠিক আছি, তুই কষ্ট পাসনা। পড়তে গিয়ে আমি নুপুরের দিকে চেয়ে থাকি। নুপুরকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছা করে, ওর সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছা করে, গল্প করতে ইচ্ছা করে। এর মধ্যে একটা পাগলামি ঢুকেছে মাথাতে। আয়নার কাঁচে নিঃশ্বাসের বাষ্প ফেলে আমি নূপুরের নাম লিখছি মাঝে মাঝেই, একদিন মা পিছন থেকে দেখে ফেলল। আমাকে কিছু বলল না। মা তখনও আমাকে স্নান করিয়ে দিত, খাইয়ে দিত। আমাকে বলল বাথরুমে যেতে। আমি গেলাম, ওই সুযোগে মা আয়নার কাঁচে নিঃশ্বাসের বাষ্প ফেলতেই নূপুরের নাম ফুটে উঠল। মা’র চোখ তখন রাগে ফেটে যাচ্ছে। এমনিতেই মা মায়েশ্য বংশকে সহ্য করতে পারেনা, আর আমি সেই বংশের মেয়ের নাম আয়নাতে লিখছি, মানে প্রেম করছি!!! মা বাথরুমে আমাকে স্নান করাচ্ছে আর খুব মারছে। গায়ে, পিঠে দাগ বসিয়ে দিল মেরে মেরে। আমি একটুও কিছু বললাম না। আমি ভয় পেয়ে ছিলাম, জানতাম, এখন কিছু বলা ঠিক হবেনা। একদিন আমি রুমাকে দিয়ে নূপুরের কাছে বলে পাঠালাম, যে করিমপুরে একটা ছেলে আছে যে নূপুরকে খুব ভালোবাসে। রুমা এই কথা নূপুরকে বলতেই নূপুর তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। আমি নিজেও কথাটা বলতে পারতাম, কিন্তু সরাসরি কথাটা বলার মতো সাহস আমার ছিলনা, তাই রুমাকে দিয়ে বলে পাঠাই। নূপুর আমাকে পড়তে যাওয়ার পর শুরু থেকে জিজ্ঞাসা করছে, বল ছেলেটা কে। কার এত সাহস?
আমি বললাম, অপেক্ষা কর, আমি ঠিক বলবো সামনের দিন পড়তে এসে। পরের দিন পড়তে যাওয়ার পরও নূপুর আমাকে জিজ্ঞাসা করছে, আমি বলি সময় আসলে জানাবো। পড়া ছুটির শেষে আমাকে নূপুর ঘিরে ধরে। আমি ভয় পাই। বলি আর একটা দিন অপেক্ষা কর। নূপুর মানেনা, আমি সাইকেলে সন্ধ্যাবেলাতে চলে আসছি, হঠাৎ আমাদের দোকানের কাছে আসতেই দেখি আমার পাশে নূপুর। খুব জোরে হেঁটে এসেছে। ওর চোখে মুখে তীব্র রাগ। পাশেই দোকান। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। আমি বলি, তুই আজ ফিরে যা। চিন্তা করিস না। আমি কথা দিচ্ছি সামনের দিন ছুটির শেষে আমি তোকে জানিয়ে দেবো নিজেই। নূপুর ফিরে যায়। পরের দিন পড়া ছুটি হলে, সন্ধ্যার অন্ধকারে নূপুর আমার পাশে হাঁটতে থাকে জানার জন্য। আমি সুযোগ খুঁজি, রাস্তার মোড়ে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, এবার বল, আমি বলি তোকে একজন খুব ভালোবাসে এই করিমপুরের। বলল, আমি জানি। নামটা বল।
আমি কেঁপে উঠি, মাথা ঘামছে, আমি ভাবছি বলেই চলে যাবো। আমি বলি,
“ছেলেটা… ছেলেটা…” আবার চুপ হয়ে যাই। নূপুর বলে, “ছেলেটা কে? এখুনি বল, নাহলে..” আমি বলি, “ছেলেটা আমি।” আমি আর কিছু না দেখেই ওখান থেকে বেরিয়ে যাই। একটু দূরে গিয়ে দেখি নূপুর সেখানেই দাঁড়িয়ে। আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে। ও হাসছে মাথা একটু নিচু করে। আমার মনে স্বস্তি আসে একটু। পরের দিন পড়তে গিয়ে দেখি রুমা আমার পরেই ঢুকল। আর কেউ নেই। ও এসেই আমার সামনে দিয়ে রাগ দেখিয়ে ছুটে বারান্দায়। আমি বারান্দায় যাওয়ার সাহস পাইনা। তারপর নূপুর আসে, এসে ঔ রুমার কাছে যায়। রুমাকে ফিরিয়ে আনে। পড়া শেষে রুমা আমাকে বলে, “তোর এত বড় সাহস!! তুই আমাকে দিয়ে ওই হতচ্ছারিকে প্রপোজ করলি!!” রুমা বলে, “এই রুমা তোকে ভালোবাসে। তুই কি চাস বল? আমাকে চাস? কিভাবে চাস? যা চাইবি সব পাবি। আমি সবটা দেবো তোকে। তুই শুধু আমাকেই ভালবাসবি।” রুমা এতবছর আমাকে ভালোবেসে, লুকোচুরির বাধ ভেঙে সরাসরি আমাকে এভাবে বলছে। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। আমি চিনি রুমাকে। ও যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। সবাই ভয়ে কাঁপে রুমাকে দেখে। রুমা কি এখনই আমাকে সবার সামনে কিছু করে দেবে!!! আমি ভয় পেয়ে সরে যাই। পিছনে নূপুরকে আসতে দেখেই আমি নূপুরের কাছে চলে যাই। নূপুর আমাকে উত্তর দেয়নি প্রপোজালের। কিন্তু ওর চোখ, মুখ দেখে বুঝতে পারছি ও আমাকেই ভালোবাসে। নূপুর বলে, “তুই এটা ঠিক করিস নি। সবাই জানে রুমা তোকে পাগলের মতো ভালোবাসে। আমি প্রেম করার জন্য না। আমাকে বাবা ছোট থেকে ছেলেদের মতো করে গড়ে তুলেছে। আমি এসব করতে পারবো না। তুই আর এসব করবি না।” আমি বাধ্য ছেলের মতো শুনি, উত্তর না দিয়ে চলে যাই। মন মানেনা, বুক ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। রুমা পাগলামি শুরু করেছে। গোটা ব্যাচের সবার সামনে, স্যারদের বলে বেড়াচ্ছে, আমার সামনেই বলছে, “শান্ত আমাকে ঠকিয়েছে।” কিন্তু আমি তো রুমাকে ঠকাইনি। আমি কিছু বলতে পারিনা। চুপ থাকি। একদিন রুমাকে দিয়েই একটা চিঠি লিখে নূপুরকে পাঠাই। রুমা নূপুরকে চিঠিটা দেয় ঠিকই, কিন্তু ও আরও খেপে ওঠে। স্যাররা হাসাহাসি করে, বলে, “ত্রিকোণ প্রেম!!! এই গল্পে একটা নায়ক, দুটো নায়িকা।” আমি পড়াশোনা করতে পারিনা। একদিন একটা স্যার মাকে বাড়িতে ডেকে সব জানাই। মা বাড়ি এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে। আমি বলি আমি কিছু করিনি। শুধু নূপুরকে বলেছি ওকে আমার ভালো লাগে। মা কিছু বলেনা। আমি খুব অসহায় হয়ে উঠেছি। নূপুরকে ভালোবাসার যন্ত্রণা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে, আর আশেপাশের পরিস্থিতি আমাকে ভেঙে দিচ্ছে। একদিন নূপুরকে দেখি পড়তে গিয়ে হঠাৎ সিঁড়িতে চলে যেতে একা। আমি সবাইকে বলি তোরা দাঁড়া। আমি দেখছি। আমি গিয়ে নূপুরের মাথায় হাত রেখে বলি, “কি হয়েছে?” দেখি ও কাঁদছে। ও বলছে, “তুই রুমাকে ভালবাস। ও তোকে খুব ভালোবাসে। আমি তোদের মাঝে এসেগেছি।” আমি বলি ধুর পাগল। আমি তোকে ভালোবাসি। দশ পাওয়ারের একটা বাল্বের আলোতে আমি আর নূপুর পাশাপাশি বসে, এই প্রথম এত কাছে। আমাদের দুজনের শরীর একে অপরের সাথে ঠেকে যাচ্ছে। আমাদের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে এসে পড়ছে। দু মিনিট এভাবে কাটতেই সীমা এসে নূপুরকে নিয়ে যায়। আমি ঘরে যেতেই আমাকে রুমা বলে, “ওই হতচ্ছারি তোকে কি বলছিল? সত্যি করে বল। নিশ্চয় আমার নামে উল্টোপাল্টা বলেছে?” আমি চুপ থাকি। কিছুই বলিনা। জানি বললে রুমা খারাপ কিছু করতে পারে। আমার মাথা নিচু হয়ে যায়।
হঠাৎ খেয়াল করিনি, একদিন আমার পেনের নিব আমি রুমা ও নূপুরের সামনেই আমার হাতের মধ্যে ঢুকিয়ে দিই। রুমা আঁতকে ওঠে। নূপুর খেপে যায়। নূপুর আমার বাড়িতে ওর এক বান্ধবীকে নিয়ে আসে। কেন এসেছে আমি জানিনা। তবে যেমন ভয় পেয়ে আছি, তেমন খুশিও। মা রেগে না খুশি হয়ে আছে বুঝিনা। মা ফল কেটে ওদের দুজনকে খেতে দেয়। নূপুর চুপ করে থাকে। মা নূপুরকে জিজ্ঞাসা করে, “কিছু বলবি?” নূপুরের মাথা নিচু। ওর বান্ধবী নূপুরকে বলে, সবটা বলতে। মা বলে, “শান্ত কি কিছু করেছে? আমাকে বল।” নূপুর বলে, “আজ শান্ত হাত ফুটো করেছে। ওকে এসব করতে নিষেধ করো। আমি এসব করতে চাইনা।” মা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “ও কি বলছে? এটা কি সত্যি?” আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে বলে উঠি, “না। ও মিথ্যে বলছে। আমি এসব করিনি।” মা নূপুরকে বলে, “শান্ত মিথ্যে বলবে না। তুই মিথ্যে বলছিস তাহলে। বেশ আমি কথা দিচ্ছি শান্ত আর তোর সাথে কথা বলবে না।” মা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “বলবি না তো?” আমি বলি, “ঠিকাছে। আমি বলবো না।” নূপুর লজ্জায়, ঘেন্নায় কিছু না খেয়ে বেরিয়ে যায়। পরের দিন পড়তে গিয়ে আমাকে বলে “কাপুরুষ।” আমি চুপ থাকি। মা ওকে কথা দিয়েছে আমি কথা বলবো না বলে। তাই আমি কথা বলতে পারবো না। কিন্তু একটু কথা বলার জন্য আমি অস্থির হয়ে উঠছি। আমি চিঠি লেখা শুরু করি নূপুরকে। মুখে কথা বলতে পারিনা, চিঠি তো লিখতেই পারি। আমি চমকে যাই, যখন দেখি নূপুর স্বর নরম করে, সহানুভূতির সাথে আমাকে চিঠির উত্তর দিয়েছে সবাইকে লুকিয়ে। আমাকে ও বলেছিল চিঠিতে, আমি যেন এই চিঠির কথা কাউকে না জানাই। কিন্তু আমি আনন্দ ধরে রাখতে না পেরে সবাইকেই চিঠি পড়ে শুনিয়ে দিই। ব্যস। নূপুর চিঠি লেখা বন্ধ করে দিল। আমি অসহায় হয়ে উঠলাম। রেজাল্ট এসবে খারাপ হতে হতে মাধ্যমিকে আমার কপালে জুটল ৪৭৪। ছয় নাম্বারের জন্য ফার্স্ট ডিভিশন হাত ছাড়া হয়ে গেল। অথচ এই আমিই সব থেকে প্রমিসিং স্টুডেন্ট ছিলাম। স্কুলের স্যাররা অবাক। আমার কেমিস্ট্রির স্যার ভেবেছিল খুব খারাপ হলেও আমি অন্তত ৬০০ তো পেয়েই যাবো। আত্মীয়রা ভেবেছিল আমি দুর্দান্ত রেজাল্ট করবো। স্টার মার্ক্স!!! আমার কপালে ফার্স্ট ডিভিশনও জুটল না। যে ইংরাজিতে আমি এত নাম্বার পাই, সেই ইংরাজিতে আমি পেলাম ৪৪। অঙ্কে ৪২। লজ্জায় মাথা হেট হয়ে গেল আমার। আমি ঘরেই আটকা থাকলাম। কেমিস্ট্রির স্যার এসে বলল, “এটা কি হয়ে গেল শান্ত!! তোর খাতা কি ভুল দেখা হল! আমি কি তোর খাতা চেক করতে বলবো?” আমি মাথা নিচু করে বলি, না থাক। আমি পরীক্ষা খারাপ দিয়েছিলাম। স্যার বলল, “তুই এই নাম্বারে সায়েন্স পাবিনা। আর তুই যদি সায়েন্স না পাস, তোর কেরিয়ার শেষ হয়ে যাবে। কারণ তুই অন্য সাবজেক্টে ততটা ভালনা, যতটা সায়েন্সে ভালো।” আমি বলি, “আমাকে সায়েন্স নিতেই হবে। অঙ্ক ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না।” স্যার বলল আমি দেখছি কি করা যায়। স্যারের অনেক ক্ষমতা। একসময় কেমিস্ট্রির লেকচারার ছিল কলেজে, পরে হাইস্কুলের টিচার ছিল। এ বি টি এ এর খাতা দেখে। কনফারেন্স করে। স্যারের বলাতে আমি শিকারপুরে সায়েন্স পেয়ে গেলাম। খুব খুশি হলাম। ভাবলাম আমি আর পিছনে তাকাবো না ফিরে। অঙ্ক, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি নিয়ে মেতে থাকি। এভাবেই দু মাস কেটে গেল।
এবার পালা বন্ধুদের। বন্ধুরা আমাকে নূপুর নূপুর করে খেপাতে শুরু করে। আমি পড়া ছুটির শেষে দেখি নূপুর রোজ আমাকে একটু দেখার জন্য বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি আবার দুর্বল হয়ে পড়ি। আমার মন পড়াশোনা থেকে উঠে যায় আবারও। খুব কষ্ট হয় সব মনে করে। কিন্তু আমি তো কথা বলতে পারবোনা। মা নিষেধ করেছিল। তাই ওভাবেই থাকি। আমরা দূর থেকে একে অপরকে দেখি আর পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাই রোজ। জীবন বড় অসহায় হয়ে উঠছে। আমি বুঝতে পারছিনা নূপুর কি চাইছে। ও কেন রোজ আমার জন্য অপেক্ষা করে, আমাকে দেখে! কিছুই বুঝতে পারছিনা।
১.
পাশাপাশি একসাথে চলতে চলতে দুজনে ভাবছিল কিভাবে একে অপরের কাছে আসবে। সেদিন দুজনেই আগে থেকে ফোনে ঠিক করে নিয়েছিল যে আজ তারা চুমু খাবে একে অপরকে। সম্পর্কের পর পাঁচ বছর হতে চলল, সৌম্য আর নূপুর শুধু হাতে হাত ধরে চলা ছাড়া আর কিছুই করেনি। তাতেই দুজনের সুখের শেষ ছিল না।
বয়স কত হবে? বারো পার হয়েছে সবে, নবম শ্রেণীতে পড়ছে সৌম্য, তখন নূপুরের সাথে তার আবার দেখা হয় টিউশান ব্যাচে। প্রথম দিনই নূপুরকে দেখে সৌম্য যেন ফিরে পায় তার ফেলে আসা প্রাইমারী স্কুলের দিনগুলোকে। ফুটফুটে ফর্সা একটা মেয়ে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে, কাঁধে একটা স্টাইলিশ ব্যাগ লাল কালো রঙের, গায়ে কালো রঙের শার্টের ওপর সাদা রঙের বুটিক দেওয়া কাজ আর পরনে ফুল স্কারট।
নূপুর এসে সৌম্যর সামনে বসল। একটু মুচকি হাসি হাসল দুজনেই। অঙ্ক করার ফাঁকে দুজনই একে অপরকে লুকিয়ে দেখছিল, এমনভাবে দেখছিল যাতে দুজনের কেউই সেটা জানতে না পারে। কিন্তু বারেবারে চোখে চোখ পড়তেই দুজনে মনে মনে হাসছিল আবার চোখে চোখে বিরক্তি প্রকাশ করছিল। দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত টান ছিল। অনেকে অনেকভাবে দুজনকে আটকানোর চেষ্টা করেছে, যাতে ওরা একে অপরের সাথে না মেশে। কেউ কিছু করতে পারেনি। সৌম্য একটু ভীতু আর নূপুর ছিল পুরো উল্টো, এক ডাকাবুকো মেয়ে। তের বছর বয়সের একটা মেয়ে নূপুর, যে বয়সে মেয়েরা পরিনত হয়না, পুতুল খেলে কাটায়, নূপুর তখন সুজুকি ফিওরো গাড়ি চালায়, ছেলেদের সাথে টক্কর নেয়, ছেলেদের সাথে গাড়ির রেস দেয়, ক্যারাম খেলাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেদের হারিয়ে দেয়, ক্রিকেট খেলে। আর সৌম্য তখন একবারে বাচ্চা ছেলে। হাফ প্যান্ট পরে পড়তে আসে, ভীষণ দুষ্টু, ছোটাছুটি করে বেড়ায়। মাথাতে সবসময় দুষ্টু বুদ্ধি ঘোরে। সৌম্যকে হাফ প্যান্ট ছাড়ানোর জন্য নূপুরকে অনেক সাধ্য সাধনা করতে হয়েছে, মুখের ওপর অপমানও করেছে ব্যাচের সামনে যাতে সৌম্য লজ্জা পেয়ে ফুল প্যান্ট পরে।
*** (গল্প থেকে বেরিয়ে কিছুটা এই সময়ের কথা বলছি। আজ ২৯ শে আগস্ট, ২০১৬। সকাল ১১ টা ৪১ মিনিট। আই.এস.আই তে বসে লিখছি। আত্মজীবনীর এই খণ্ডটা শুরু করার প্রথমেই বিতর্কে জড়ালাম। গতকাল ২৮ শে আগস্ট, রাত সাড়ে ন’টাতে আমার ফোনে একটা ফোন আসে। ফোন জিনিসটা এমনিতেই আমার কাছে এক বিরক্তিকর বস্তু। তবু প্রয়োজনে রাখতে হয়। ফোনটা যিনি করেন, উনি নিজের পরিচয় দিলেন করিমপুর থানার এক পুলিশ। পদ জানিনা। বলেননি। কয়েকটা কথা যা বললেন, সেগুলো এমন –
তুই সৌম্যজিৎ দত্ত বলছিস? বাপ – শঙ্কর দত্ত? তোর নামে জি.ডি হয়েছে। তুই একটা মেয়েকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে উত্যক্ত করছিস। সাইবার ক্রাইম। শোন বাড়াবাড়ি করছিস ..
ব্যস, এটুকু বলতেই আমার খারাপ লাগল, আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। একেতে আমি কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করিনি, কোনো সাইবার ক্রাইম করিনি, তার ওপর আমার সাথে তুই তুই করে কথা বলছে। সে যেই হোক, তুই তুই করে এভাবে কথা বলছে আমার সাথে? মানুষের কাছে এত সম্মান পেয়েছি, কোনো অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত নই, আর এক লোক পুলিশের পরিচয়ে এভাবে কথা বলবে? না, সেটা ভয় পেয়ে আর যেই মানুক, আমি সৌম্যজিৎ দত্ত, আমি মানবো না। অপরাধ, অন্যায়কে ভয় পাইনা। সত্যের পথে চলি। সত্যের পথে মানবতাবাদি লেখক তসলিমা নাসরিন’কে আদর্শ মেনে চলি, সম্মানজনক জায়গাতে কাজ করি, সেখানে আমি এমন মিথ্যে আর অন্যায় হুমকি কখনই মানবো না। আমি ফোন রেখে দিলাম। ক্রাইম করেছি কি করিনি সেটা প্রমাণ সাপেক্ষ। সৌম্যজিৎ দত্ত এত দুর্বল নয় যে বাজে হুমকিতে ভয় পেয়ে হুশ হারাবে। ঘটনাটা আমার কাছে যথেষ্ট বিরক্তিকর মনে হল। রাতে এক বন্ধু মারফৎ নূপুরের কিছু কথা জানতে পারলাম। আমার লেখালেখিতে নূপুরের কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমি যেন তার নাম এখানে ব্যবহার না করি। ঝামেলা পছন্দ করিনা আমি। লেখা শুরু করার আগে অনেক চিন্তা করেছি, বারবার ভেবেছি এভাবে একটা আসল নাম তুলে ধরবো, সেটা মেয়েটার জন্য ঠিক হবে? কিন্তু মন থেকে একটাই উত্তর পেয়েছি, আমি যদি নাম পাল্টে অন্যকোনো নাম লিখি, তবে সত্যিকে কি অপমান করা হবেনা? পাঠকদের কি আমি সত্যি থেকে বঞ্চিত করবো না? আর আমি তো বানিয়ে বানিয়ে কোনো মিথ্যে গল্প লিখছিনা, আমি সত্য লিখছি। মানুষের জীবনের প্রতি মুহূর্তে একটা করে সত্যি তৈরী হয়, সেই সত্যিটা যদি কাগজের পাতাতে জমা হয়, তাতে তো কোনো লজ্জা নেই, কোনো অপরাধও নেই। অপরাধ, লজ্জা মানুষের মনে থাকে। মানুষ যেটাকে মনে মনে ভাবে ভুল, অথচ জেনে শুনেও একটু আনন্দ পেতে সেই ভুলটা করে, সেটাকে মানুষ প্রকাশ করতে লজ্জা পায়, ভয় পায়, সেটাকে অন্যায় ভাবে। তাছাড়া আমি মনে করিনা যে নূপুর জেনেশুনে সম্পর্কে কোনো ভুল করেছিল বলে। অজান্তে মানুষের অনেক ভুল হয়ে থাকে, যেটা হয়ত সময়সাপেক্ষে বড় আকার ধারন করে, কিন্তু এই গল্পের নায়িকা ছিল আদর্শ প্রেমিকা। হ্যাঁ, সেও কিছু ভুল করেছিল, কিন্তু সেটা ছিল ভুল বোঝাবুঝি। আর গল্পের নায়ক সেই ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে জর্জরিত হয়ে স্থির বুদ্ধির অভাবে অন্যায় পথে চলতে শুরু করেছিল। লেখকেরা যখন কিছু লেখে, তখন তারা শুধু নিজের জন্য লেখেনা, তারা মানুষের জন্য লেখে, পাঠকদের জন্য লেখে। সমাজকে একটা বার্তা দিতে চায়। আমিও সমাজকে একটা বার্তা দিতেই এই লেখা শুরু করেছি। ভুল বোঝাবুঝি থেকে একটা মানুষ বা কিছু মানুষকে সারাজীবন যে শাস্তি বয়ে বেড়াতে হয়, মানুষ যদি সময় থাকতে সেই ভুল বোঝাবুঝিকে চিনতে পারে, তবে মানুষ অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে অগ্রসর হতে পারবে। শুধু এটুকুর জন্যই আমার এই লেখা “শুরু থেকে” শুরু করেছি।)
(২৯শে আগস্ট, ২০১৬। নূপুর আমাকে সন্ধ্যায় ফোন করল। আমাকে ও বুঝিয়ে বলল। শান্তভাবে বলল আসল নামটা দিলে ওর অসুবিধা হতে পারে, তাছাড়া আসল নাম ব্যবহার করলে ও কখনো লেখাটা পড়তে পারবেনা খোলামেলাভাবে। আমি ওকে কথা দিলাম, আমি ওর আসল নাম ব্যবহার করবো না। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করি, আমার কাছ থেকে অনেক আগেই ও চলে গেছে, অন্তত আমার গল্পের এই অন্যতম চরিত্রের নামটুকু বলে দিয়ে যাক। ও তখন আমায় বলল নূপুর নাম দিতে।)
২.
যখন দেখি তোমাকে, এক অজানা ভালোলাগা ছুঁয়ে যায়, পাশে চম্পা, সীমাদের সাথে গল্প করো, হাসো, আমি আড় চোখে তোমাকে বারেবারে দেখি। তোমার প্রতিটা নজর আমার চোখকে কখনও এড়িয়ে যায়নি। এক অদ্ভুতরকম হাসি হাসতাম দাঁত বার করে, তুমি মুগ্ধ হয়ে দেখতে। তোমার মুগ্ধ চোখ আমার চোখে ঝিলিক খেলাত। লাজুক ছিলাম, লজ্জা পেতাম, হাসিতে লজ্জা ঝরে পড়ত।
আগে আগে চলে আসতাম, তোমার অপেক্ষা করতাম। আমার পরপরই তুমি ঢুকতে। খুব ইচ্ছা করত তোমার খুব কাছে যাই, হাত দিয়ে ধরি তোমার গালদুটো, নাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাসকে আমার নাকে, মুখে, ঠোঁটে মাখি। ইচ্ছা করত দরজার পাশে তোমাকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ি, আমার ঠোঁটদুটো বুলিয়ে দিই তোমার ঠোঁটে, গলাতে। তোমাকে হাল্কা করে চেপে ধরি, একটু জড়িয়ে ধরি। বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরি তোমাকে। ছুটির সময় যখন অন্ধকার হয়ে যেত, আমি যেন সেই অন্ধকারেরই অপেক্ষা করতাম। সবার নজর এড়িয়ে তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। ইচ্ছা করত তোমাকে চুমু খাই, সাহস আর হয়ে উঠত না। তোমার শরীরে সবসময় যে ঘামের গন্ধ থাকত, আমি সবার অজান্তেই সেই গন্ধটাকে পান করতাম। কখনো বুঝেছ?
সেই সময় তুমি দিল্লি গেছিলে। দু’সপ্তাহ যে কি ভীষণ কষ্ট আর অপেক্ষা নিয়ে দিনগুলো কেটেছে, যেন হাহাকার! রুমা বারেবারে আমার কাছে ছুটে আসে। রুমাকে আমি খুব কাছথেকে চিনতাম। ও আমার সাথে সবসময় লেগে থাকত, জুড়ে থাকত। বারবার আমার ঘরে আসে, বারবার আমার জানালায় এসে আমার সাথে কথা বলে। ভালবাসতাম ওকে, নিজের থেকেও বেশি ভালবাসতাম। ওর কষ্ট সহ্য করতে পারিনা। ওর কষ্ট হলে আমি কষ্ট পাই খুব। কান্না পায় আমার। বাসবোই না কেন? মেয়েটা আমাকে পাগল করে দিত সবসময়। কথা নেই বার্তা নেই, রাত নেই দিন নেই বারেবারে ছুটে আসে, একটু দেখে বা হাসে, মা’র সাথে কথা বলে আর আমার ঘরে উঁকি মারে, আবার পালায়। ও বুঝতে পেরেছিল মনেহয় যে আমি তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি, আমাকে খুব বেশিই চিনত ও। একসময় দেখতাম ও আমার জানালায় এসে বারবার তোমার নামে আমাকে দু-চার কথা শুনিয়ে যেত। বলত তুমি অহংকারী, দিদি তোমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দেয় বা করে দেয়। তুমি ছেলেদের সাথে ঝামেলা করো রাস্তাঘাটে। আরও কত কি বলত! আমি প্রতিবাদ করে উঠতাম, বুঝতাম আমার সেই প্রতিবাদ করে ওঠাটা ওকে খুব কষ্ট দিত। কিন্তু তোমার নামে ও কিছু বলুক, আমি সহ্য করতে পারতাম না। তুমি হঠাৎ করেই ফিরে এলে দিল্লি থেকে। প্রথমে রুমাদের বাড়িতে গেছিলে। তোমার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বাড়িতে আসা, আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু ভয় হোক বা লজ্জা, তুমি পারোনি সেদিন। তবু সাহস করে বাড়ির সামনে এসে সাইকেলে বেল বাজিয়ে ছিলে। তোমার ওই হাঙ্ক স্ট্রেট হ্যান্ড সাইকেলের বেল আমি কোটি কোটি সাইকেলের বেলের থেকে আলাদা করতে পারি, না দেখেই। বেল শুনে বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল। ছুটে আসলাম, দেখি তুমি গেটের বাইরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। খুব কালো হয়ে ফিরেছিলে, তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। তবু আমাকে দেখে যেন তোমার চোখ থেকে ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। আমাকে বললে, তোর অঙ্ক খাতাটা দে। বাহানা খুঁজে বার করতে তোমার জুড়ি মেলা ভার। দিদিকে বলেছিলে অঙ্কে পিছিয়ে পড়েছ, দিদি তোমাকে বলেছিল রুমার কাছ থেকে খাতা নিতে। তুমি বলেছিলে সৌম্যর কাছ থেকে নিই? দিদি জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন ও পড়াশোনাতে ভালো নাকি যে ওর কাছথেকে নিবি? তুমি বলেছিলে ভালোই তো।
৩.
আমি হেরে যাচ্ছি সবকিছুতে। তুমি পাপ্পুর সাথে ক্যারাম খেলছ, পড়া শেষে পাপ্পুর সাথে কোথায় একটা যাচ্ছ। পাপ্পুর সাথে বেশি কথা বলছ। স্যার বারেবারে কেমন ইঙ্গিত করছে তোমাকে আর পাপ্পুকে নিয়ে। ব্যাচে দিনগুলো খুব অসহায় কাটছে। বাড়ি ফিরছি রাস্তা থেকে একবুক আগুন নিয়ে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করছে। দিনেরপর দিন আমি ভেঙে পড়ছি, শুকিয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ছি, বই সামনে খুলে শুধু মনে মনে তোমার সাথে কথা বলছি, অনেক অনেক অভিযোগ করছি আর কাঁদছি। রাতগুলো দীর্ঘ কাটছে। রুমাকে একেবারে সহ্য হচ্ছেনা, বারবার আমার কাছে আসছে, আমাকে কেমন ভাবে দেখছে। পাশে এসে বসছে। ওর উপস্থিতি আমাকে বিরক্ত করছে, যেন গোটা ঘরে আমি আমার কান্নার শব্দের থেকে বেশি করে রুমার শ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ পাচ্ছি আর দেওয়াল ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটা ঘোরার খচখচ শব্দ আমার কানদুটো ঝালাপালা করে দিচ্ছে। রুমা আমাকে বারেবারে জিজ্ঞাসা করছে, কি হয়েছে তোর? আমি কোনো কথা বলছিনা। শুধু ইচ্ছা করছে দেওয়াল ঘড়িটাতে ঘুসি মেরে ভেঙে ফেলি আর রুমার গলা টিপে ওর প্রশ্নগুলো বন্ধ করে দিই। দুটোর একটাও করিনা। আমি চুপ করে থাকি।
“হঠাৎ আসা মেঘ আর উতলে ওঠা ঢেউয়ে
প্রাণ চঞ্চল হয়ে ওঠে কোনো এক গভীর ক্ষতকে অনুভব করে।
রক্তের সাথে দানা বেঁধে আছে যে স্পর্শ,
অস্পর্শেই তা ক্ষত করে হৃৎপিণ্ডকে বারে বারে।”
পড়াশোনা দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিনের অনুশীলন ঠিকমত করতে পারছিনা। ইতিহাস, ভূগোল, বাংলা, জীবন বিজ্ঞান পাতার পর পাতা পড়া জমে থাকছে। ইংরাজি সহজাত, অঙ্ক ও ভৌতবিজ্ঞান ভালোবাসি। কোনোরকমে এই তিনটে বিষয় পড়ছি। তাও সেভাবে চিন্তাভাবনা না করেই পড়ছি। পড়ছি, যেন মন নেই। বাকি বিষয়গুলোতে একেবারেই পড়া হচ্ছেনা। এই তিনটেতে যদিও বা একটু পড়ি, চিন্তাভাবনাহীন। পাতার পর পাতা বীজগণিতের অঙ্ক কষছি, যেন মাথা কাজ করছে না। অঙ্ক মুখস্থ হয়ে গেছে। বই না দেখেই অঙ্কগুলোর প্রশ্ন খাতাতে লিখছি, আর সমাধান করছি। কিন্তু ওই একই রকমের অন্য অঙ্ক করতে গেলে চার, পাঁচবার ভুল করে সমাধান করতে পারছি। বিশ্বাস, ভরসা আমার সবথেকে বড় শক্তি। এতদিন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করেছি মনের তীব্র জোরে। এখন সেই বিশ্বাস বড় ঠুনকো মনে হচ্ছে। নিজেকে একেবারে নিয়ন্ত্রন করতে পারছিনা। বারেবারে ভাবছি ভুলে যাবো সব, আমি কেন ভালোবাসবো। তুমি তো আমাকে ভালোই বাসোনি। শুধু আমিই বেসেছি আর আমিই কষ্ট পাচ্ছি। খেতে পারছিনা, ঘুমোতে পারছিনা। সবসময় দেবদাসের মতো মন খারাপ নিয়ে পড়ে আছি। তুমি তো পাপ্পুর সাথে গল্প করো, ছুটির শেষে পাপ্পুর সাথে যাও কোথায় একটা। আমার কি? তোমার ইচ্ছায় তুমি ঘুরছ। কিন্তু তবু আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি ভুলতে পারছিনা। পারছিনা কিছু। আমি হেরে যাচ্ছি।
“এক মহাকাশ ভালোবাসা আমি বুকে ধরেছি,
আলো আছে, অন্ধকার আছে, ঘূর্ণাবর্ত আছে, বৃষ্টিও আছে,
জোর করে ধরিনি।
কক্ষপথের তীব্র আকর্ষণে ছুটে গেছি তোমার কাছে,
গা ঘেসে ভালোবাসা দিতে চেয়েছি,
বাইরে কত সুন্দর আরও উপগ্রহদের আমি দেখিনি,
শুধু দেখেছি তোমায় অপ্রতিম।”
আচ্ছা তুমিও মণ্ডল, পাপ্পুও মণ্ডল। আমি দত্ত। তাই বুঝি আমাকে ভালোবাসো না? কিন্তু আমি দত্ত তাতে কি? সবাই তো বলে আমরা চাঁদসওদাগর বংশ। বনিক জাতি। আমরা তো নিচু নই। কোনোভাবেই তোমাদের থেকে নিচু নই, বরং আমাদের বংশের সাথে ইতিহাস জুরে আছে। তাহলে কি শুধু পদবি আলাদা বলেই আমাকে ভালবাসবেনা??
আচ্ছা। তোমরা বিয়ে কর। সুখে সংসার কর। আমি সারাজীবন একাই থাকবো। শুধু তোমাদের যখন মেয়ে হবে, আমাকে সেই মেয়েটা দিও। আমি ওকে নিয়ে বাঁচবো। ওকেই ভালবাসবো। বড় করবো। ও আমার মেয়ে হবে। আচ্ছা নূপুর, সত্যিই কি তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি। সবটাই কি শুধুই আমিই বেসেছি?
“কতদিন, কতরাত পার হয়ে যায় হাহাকারে,
বুক ফেটে চৌচির হয়,
কত প্রশ্ন দরজা, জানলা দিয়ে প্লাবন বইয়ে দেয়,
আমি অসহায়।
ঘুম হারিয়েছি, খিদে হারিয়েছি, ভরসা হারিয়েছি নিজের,
যেটুকু চলছি,
তলিয়ে যাচ্ছি সমুদ্রের তলদেশে।”
৪.
জীবন বারেবারে সুযোগ দেয়। প্রতিটা মুহূর্তে প্রতিটা চিন্তা ও চিন্তার পিছনে ব্যর্থতা একটা করে নতুন রাস্তা খুলে দেয় লড়াই করার। লড়াইকে লড়ার মানসিকতা, সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করার নামও জীবন। আবার সময়কে সময়ের মতো করে বইতে দিয়ে নিজেকে স্রোতের টানে ভাসতে দেওয়াটাও জীবন। উপভোগ দুটোই করা যায়। আমি সৌম্য, একদিকে আমার সারল্য, ভালোবাসা, সবকিছুর মধ্যে থেকে হাসিকে খুঁজে বার করা, আবেগে ভেসে যাওয়া আমার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে আমি সময় বিশেষে চরম প্রতিহিংসা পরায়ন, বিজয় অভিলাসি, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে যেকোনো বাধা, দুর্গম পথ পেরোতে দ্বিধাহীন।
একটা মেয়ে ও। আমি কেন নিজেকে শেষ করে ফেলছি একটা মেয়ের জন্য? আমি তো অপরাজেয়। হ্যাঁ, সৌম্য অপরাজেয়। মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিশিং, সল্ভ ফ্যাক্টর, দুটো থিওরেম, দুটো ইংরাজি কবিতা, বাংলাতে দেনা পাওনা, তাসের ঘর, ফিজিক্সের ভেক্টরের দশটা অঙ্ক সমাধান করে ফেললাম। সৌম্য অপরাজেয়, আমি হেরে যাবো না। আজ মন ভীষণ চনমনে লাগছে। হ্যাঁ, আমি আমার পুরোনো বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছি। স্কুলে পরপর দুবার ক্লাস নাইনে ফেল করা তরুন ও বিকাশ, রীতিমত সেকশানের গুন্ডা হয়ে উঠেছে। ওদের কেউ ঘাঁটতে যায়না। অঙ্কের ক্লাসে কেউ কথা বললে মাথা গরম হয়ে যায় আমার। সেদিন শেষ বেঞ্চে বসে আছি, থিওরেম বোঝার চেষ্টা করছি অঙ্কের ক্লাসে। হঠাৎ তরুন আমার খাতাটা নিয়ে নিল, কাগজ ছিঁড়ে নোংরা কথা লিখে এর ওর দিকে ছুঁড়ে মারবে।
আমার খাতাতে হাত দিয়েছে? আমার খাতাতে নোংরা কথা লিখবে, ছিঁড়বে নোংরা হাতে? আমি তখন খাতাটা কেড়ে নিলাম। স্যার সামনে আছে, তাই ওরা তখন কিছু বলল না। স্যার চলে যেতেই তরুন আর বিকাশ এসে আমার জামার কলার চেপে ধরল। আমি বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে তরুন ও বিকাশের গলা টিপে ধরেছি দুহাতে দুজনের, ওদের শরীরে আর জোর নেই উঠে দাঁড়ানোর। সবাই অবাক। সৌম্য কখনো কারোর সাথে ঝামেলা করেনা, আজ ওই দুই গুণ্ডার গলা টিপে ধরেছে দু হাত দিয়ে।
দিনেশ বাবুর ডাক পড়ল। মানিক মনে হয় দিনেশ বাবুকে ডেকে ছিল। দিনেশ বাবুর ভয়ে গোটা স্কুল কাঁপে। আর মানিক আমাদের ক্লাসের এক বন্ধু। আমি মানিক ও শ্রীকান্তকে খুব সম্মান করি। দুজনেই ভীষণ সাহসী ও সৎ। আমি দুজনকে খুব ভরসা করি, ওরা সত্যের সাথে থাকে সবসময়। মানিক দিনেশ বাবুকে জানাল, সৌম্য দুহাতে তরুন আর বিকাশের গলা টিপে ধরেছিল, এটাও বলল তরুন আর বিকাশ ক্লাসে খুব ঝামেলা করে। দিনেশ বাবু আমাদের তিনজনকেই বোর্ডের কাছে ডাকলেন, বললেন কি হয়েছে শুনতে চাইনা, তিনজনেই কান ধরে ওঠবোস কর দশবার। তিনজনেই তাই করলাম। তরুন, বিকাশ সেদিনের পর আর ঝামেলা করেনি আমার সাথে।
৫.
আমাকে যেতে হবে অনেক দূরে,
এখানেই তবে শেষ,
ফিরবো না কখনো, তুমি ভালো থেকো,
আমার চোখে প্রেমের রেশ।
অনেক দেখেছি স্বপ্নে তোমায়,
থাকতে চেয়েছি পাশে, ভালোবাসি শুধু এটুকু জানাতে চেয়েছি,
পারিনি হয়ত জানাতে।
বুকের মধ্যে গর্জায় মেঘ, অঝরে বইতে চায় প্রাণ,
চোখের কালো আবছায়াতে ভিজিয়ে দেয় ভালোবাসা।
বড় অস্থির মনে হচ্ছে। দুদিন ভালোই ছিলাম। আবার যখন তোমাকে সামনে, খুব কাছে থেকে দেখলাম, দেখলাম যেন মনের ভিতরে প্রবল বর্ষণ হয়ে গেছে, বৃষ্টি শেষে চারিদিকে ঝলমলে সবুজ আর নতুন বাতাসের গন্ধ ভেসে আসছে। সেদিন আমরা ব্যাচের মধ্যেই স্যার আসার আগে ঠিক করলাম লুকোচুরি খেলবো। বুদ্ধিটা আমারই ছিল। আমি ভেবেছিলাম লুকোনোর বাহানায় আমি তোমার কাছে যাবো, আরও কাছথেকে অনুভব করবো তোমাকে। কিন্তু রুমা বাধ সাধল। তোমাকে চোর করা হল। নিরুপায় আমি জানালার পাশে এসে লুকিয়ে পড়লাম একা, ভাবলাম ওই একা জায়গায় তুমি নিশ্চয় আমাকে খুঁজতে আসবে। কিন্তু রুমা সেটা হতে দিলনা। আমি জানালায় লুকিয়েছি, আর রুমা আমার কাছে এসে লুকোলো। আমার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে রুমা। আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাস আমার মুখের ওপর পড়ছে, ওর চোখ অন্যকিছু বলতে চাইছে, রুমার চোখ দিয়ে ভালোবাসা ঠিকরে বের হচ্ছে, আর ঠোঁট কাঁপছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে রুমার নিঃশ্বাসে। আমি বুঝতে পারি, রুমা ছোট থেকে ভীষণ জেদি, ও আমাকে ভালোবাসে, ও তোমাকে আর আমাকে কাছে আসতে দেবে না। এমনিতে মনের মধ্যে তীব্র অসহায়তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছি, আর রুমা সুযোগ খুঁজেই যাচ্ছে আমাকে পাওয়ার জন্য। সব বুঝি আমি, তবু আমাকে মনের মধ্যেই চেপে রাখতে হয়। আমার একটা ভুল পদক্ষেপ রুমার জীবনে যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে। আমি রুমাকে সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে নিজে ধরা দিই তোমার সামনে। সেদিন খুব বকা শুনতে হয়েছিল আমাদের সবাইকেই। আমরা ওভাবে পড়তে গিয়ে হৈচৈ করে খেলতে শুরু করেছিলাম বলে।
৬.
সময় কিভাবে বয়ে যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিনা। খাওয়া, ঘুম, স্কুল, টিউশান এসবে দিন কেটে যাচ্ছে। ঘরে পড়তে বসে পড়াতে কিছুতেই মন বসাতে পারছিনা। সমস্ত পরীক্ষাগুলোতে একের পর এক খারাপ রেজাল্ট হতে শুরু হয়ে গেছে, একটা করে বিষয়ে ফেলও করছি। ছোট থেকে ইংরাজির বেস ভালো হয়েছে, কিন্তু সেই ইংরাজিতেও ষাটের ঘরে নাম্বার, অন্যান্য বিষয়ে নাম্বার মুখে আনার মতো না। চল্লিশের ঘরে নাম্বার আসছে, জীবন বিজ্ঞানে ভয় তৈরি হয়ে গেছে। জীবন বিজ্ঞানে পরপর ফেল করে যাচ্ছি। ছোট থেকে রুমা আর আমি কমপিটিশন করি, শুরুটা রুমা নিজে করেছিল। কিন্তু কোনোদিন ও আমার থেকে নাম্বার বেশি পাইনি। এই প্রথম ও আমার থেকে বেশি নাম্বার পেতে শুরু করল। রুমার সাথে আমার সম্পর্ক বছরে চার মাস ভালো থাকে, আট মাস খারাপ। যখন খারাপ হয়, তখন কথা বন্ধ থাকে আমাদের দুজনের। হঠাৎ একদিন ইংরাজি পড়তে গিয়ে, পড়া ছুটি হলে আমি বাইরে এসে সাইকেল বার করতে গিয়ে রুমার ব্যাগটা পড়ে যায়, ইচ্ছা করে ফেলিনি। রুমা বাইরে এসে দেখল ওর ব্যাগ পড়ে গেছে আমার কাছথেকে। ভাবল আমি ইচ্ছা করে ফেলেছি, ওমনি পাশে পড়ে থাকা গোবর তুলে আমাকে ছুঁড়ে মারল। ভীষণ রাগ হল আমার, আমি বলে দিলাম, আমার সাথে যেন আর কথা না বলে। আসলে রাগ হলেও একটা মায়া ছিল আমার রুমার ওপরে। একবার সন্ধ্যার অন্ধকারে হ্যারিকেন জ্বলছে, আমি রুমার চুলের মুঠো চেপে ধরে ওর ঠোঁটটা হ্যারিকেনের সাথে ঠেসে ধরেছিলাম, জানিনা কেন করেছিলাম, সবসময় দুষ্টু বুদ্ধি মাথাতে ঘুরত আমার, আর দেখি রুমা কেঁদে ফেলেছে, ওর ঠোঁট পুড়ে গেছে। দাগ হয়ে গেছে ঠোঁটে। ওই দাগ দেখে খুব কষ্ট হল। তারপর থেকে আমি রুমাকে কিছু বলতে পারতাম না। খুব মায়া পড়ে গেছিল মেয়েটার ওপরে। অন্ধকারে একসাথে বাড়ি ফিরতাম, কেউ কারোর সাথে কথা বলতাম না রাগে। কিন্তু ওকে আগলে আগলে নিয়ে আসতে হতো। বিরক্ত লাগত, কিন্তু আমার স্যাররা বলে দিয়েছিল, আমি যেন রুমাকে প্রতিদিন বাড়ি পৌঁছে দিই। কে জানত, অত রাগের মধ্যেও, কথা না বললেও রুমা ভালোবাসে আমাকে। এ কথা বয়েজ স্কুল, গার্লস স্কুল, স্যার, ম্যাম সবাই জানত, রুমা জানত, শুধু আমিই জানতাম না প্রথমের দিকে, যে রুমা আমাকে ভালোবাসে। পরে আস্তে আস্তে রুমার চোখ, মুখ দেখে বুঝতে পারলাম। বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকতাম। থাকতাম, কারণ আমি নুপুরকে ভীষণ ভালোবাসি, পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম নুপুরের জন্য। রুমা একের পর এক চাল চালতে শুরু করে নুপুরের কাছথেকে আমার মন অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য। আমার কাছে এসে নুপুরের নিন্দা করে, নুপুরের মা’র কাছে গিয়ে আমার নিন্দা করে, স্যার, ম্যামদের কাছে সহানুভুতি আদায় করে আমাকে বোঝাতে বলে। আমি অসহায় হয়ে সব শুনি, শুধু শুনিই, মাথায় কিছু ঢোকেনা।
৭.
নুপুর আমাকে ভালবাসতে শুরু করেছে, কিন্তু আমাকে এই কথাটা কখনো জানতে বা বুঝতে দেয়নি। নুপুর চায় আমি যেন রুমাকে ভালোবাসি। রুমার রাগ, জেদ সবাই জানে, বোঝে। একটু রেগে গেলেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। সবাই ভয় পেয়ে বারেবারে ডাকতে শুরু করে, কিন্তু সে দরজা খোলে না। সবাই ভয় পায়, মেয়েটা আত্মহত্যা না করে ফেলে কোনো কারণে। নুপুর ভীষণ চায় যেন আমি রুমাকেই ভালোবাসি। ও নিজের ভালোবাসা ত্যাগ করতে রাজি। একদিন আমাকে জোর করে রুমার সাথে কথা বলিয়ে দিল। আমি ও রুমা কেউ কারোর সাথে কথা বলবো না, মনে মনে খুব কথা বলতে চাই দুজনেই, কিন্তু কেউ কারোর কাছে হার স্বীকার করবো না। কিন্তু যেহেতু নুপুর আমাকে বলেছে, তাই সব লজ্জা মাথায় তুলে আমি প্রথম রুমাকে ডেকে উঠি। আট মাস কথা বলিনি রুমার সাথে, মুখে একবার রুমা ডাকটা আনার জন্য প্রাণ ছটপট করছিল আমার, ওদিকে রুমাও আমার মুখ থেকে ওর নামটা শোনার জন্য মনে মনে ছটপট করছিল। সেটা আর কেউ না বুঝলেও, আমি ও রুমা একে অপরের চোখে তাকিয়ে ভালোই বুঝে ছিলাম। আমি ভীষণ খুশি। অনেকদিন পর একসাথে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরলাম অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে। একসাথে রোজই ফিরতাম, শুধু কথা বলতাম না। পাড়ার সবাই খুশি আমাদের মিল হয়েছে দেখে। পাড়ার লোক সবাই ভাবত আমি আর রুমা নায়ক, নায়িকার মতো। আমি মোটেও সুন্দর ছিলাম না কখনো, বোকা বোকা ছিলাম, দুষ্টু ছিলাম, কিন্তু রুমা দেখতে অদ্ভুত সুন্দর। রুমা আমার থেকে বয়সে বড়, নুপুরও আমার থেকে বয়সে বড়। আমি মজা করে রুমাকে মাঝে মাঝে দিদি বললেই খেপে গিয়ে বলত দিদি হবে ওই নুপুর। ইতিমধ্যে নবম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষার ফল বেরোলো। কোনো রকমে একটু সম্মানজনক ফল হল আমার। দশম শ্রেণীতে উঠলাম।
দশম শ্রেণীতে যখন উঠলাম, তখন জানতাম না, দুমাস পর থেকে আমার জীবন এত ঘটনাবহুল হতে চলেছে।
এবার থেকে গল্প সেজে উঠতে চলেছে। একের পর এক ঘটনা জীবনকে আকর্ষণীয় করে তুলতে চলেছে। গল্পের নায়কের জীবনে পরিবর্তনের শুরু।
৮.
বাড়িতে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। জীবন অসহনীয়। একদিকে পিছিয়ে পড়া পড়াশোনাতে এগিয়ে আসার চেষ্টা, অন্যদিকে পাপার শৃঙ্খলহীন আচরণ আমাকে, মা’কে অস্থির করে তুলছে। মা অসুস্থ হয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে। পাড়ার সবাই মিলে একটা পিকনিক করবো ঠিক হল। পিকনিকে এত আনন্দের মাঝে, পাপা অন্য একটা পিকনিকে গিয়ে বন্ধুদের সাথে প্রচুর মদ পান করেছিল, উঠে আসতে পারছিল না। বমি করছিল। মা পাড়ার সবার সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে তখন। পাড়ার সবাই আমাদের খুব ভালবাসত। আমাকে ভীষণ ভালবাসত। আমাকে সবাই আগলে আগলে রাখত, আমার কিছু হওয়া মানে গোটা পাড়া এক জায়গায় হয়ে আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যেত। আমার মনে আছে, ক্লাস ফাইভে যখন পড়ি, মা’র একবার খুব জ্বর হয়েছিল। মা আমাকে ফ্রিজ থেকে একটা বেদানা নিয়ে আসতে বলেছিল। আমি বেদানাটা কেটে খাওয়াতে চেয়েছিলাম, বটি নাড়াচাড়া করা অভ্যাস ছিল না। আমি বটিতে বেদানা কাটতে গিয়ে, বটির পাত আমার হাতে গেঁথে যায়। আমি চিৎকার করে উঠি, সাথে সাথে পাড়ার সবাই জড় হয়ে গিয়ে আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছিল। সবাই যে যা রান্না করত সবার বাড়িতে, সেখান থেকে সবাই আমার জন্যও রেখে দিত খাবার। এভাবেই সবার ভালোবাসা পেয়েছি। মুচি, জেলে, চাষি থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ বাড়ির লোক, সবার ভালোবাসা পেয়েছি, সবার আদর পেয়েছি। পাপা তখন ব্যবসাতে উঠতির পথে, ব্যবসা বাড়ছে, ক্ষমতা বাড়ছে, ততোই উদ্ধত হয়ে উঠছে। রাস্তাঘাটে মানুষের হিংসা, ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে, পুলিশি ঝামেলাতে জড়াচ্ছে। পাপা ভীষণ বদমেজাজি। কাউকে ছেড়ে দেয়না রেগে গেলে। আর মদ্যপ অবস্থায় তো একেবারেই নয়। পাপার সাথে সবসময় অনেক লোক থাকে, গুন্ডা প্রকৃতির লোক। ওরা পাপাকে মদত যোগায়। পাপা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। করিমপুরের এক ক্ষমতাবান গুন্ডা প্রকৃতির লোকের একমাত্র ছেলেকে দোলের দিন রাস্তাতে পাপার লোকেরা মেরেছিল। সেই ছেলে বাড়ি গিয়ে পাপার নাম করে। বাড়িতে পাপা ছিলনা, তার বাবা গুন্ডা ধরে এনে আমাদের বাড়ির সামনে ভাংচুর শুরু করে, আমাকে বাড়ি থেকে বার করে মারতে আসে, আমাদের ড্রাইভার আমাকে লুকিয়ে রেখে সব মার নিজে খায়। ড্রাইভারের মুখ ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। আমি তখন ছোট হলেও, ড্রাইভারকে বাঁচাতে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। মা আমাকে পিছন থেকে চেপে ধরে রাখে। চোখের সামনে দেখি ওরা ড্রাইভারকে মারতে মারতে জামা, প্যান্ট ছিঁড়ে দিয়ে উলঙ্গ করে রাস্তা দিয়ে নিয়ে চলে গেল। আমি খুব কাঁদছিলাম। খুব কষ্ট হচ্ছিল ড্রাইভারের জন্য। পাপা পা টলতে টলতে রাতে বাড়ি ফিরে দেখে সব ভাংচুর হয়ে পড়ে আছে বাড়ির সামনে। তখনই পাপার নেশা ছেড়ে যায়। আরও এক মারাত্মক ভুলটা তখন থেকে শুরু হয়। পাপা পুলিশকে খবর দেয়, ও পরে করিমপুর থানার আন্ডারে সমস্ত ছোট, বড় পুলিশের সাথে তখন থেকে পাপার পরিচয় ও পরে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এবার পাপা থানাতে গিয়ে পুলিশদের সাথে বসে মদ পান করতে শুরু করে, কখনো থানাতে বসে, কখনো পুলিশদের কোয়ার্টারে বসে। পাপাকে খুব কম সময়ে দেখতে পাওয়া যায়। ব্যবসাতে অমনোযোগের কারণে কিছু ক্ষতি হয়ে যায়। সেই ক্ষতি পূরণ করতে মা’র নামে একটা জায়গা ছিল, যেখানে মা স্বপ্নের একটা বাড়ি তৈরি করবে ভেবেছিল, সেই জমি জোর করে মা’র সই নিয়ে ছিনিয়ে নেয়। মা অসহায় হয়ে পড়েছিল, সই না করে কোনো উপায় ছিলনা তখন মা’র কাছে। অনেক টাকাতে বিক্রি হওয়ার ফলে সেই টাকা পাপা ব্যবসাতে কাজে লাগিয়ে, বাকি টাকা দিয়ে একটা বিশাল বাড়ি কেনে। মা অপমান সহ্য করতে না পেরে ভেবেছিল ওই বাড়িতে যাবেনা। এদিকে আমার এক দাদু এই সুযোগে মা, পাপার সম্পর্ক ডিভোর্সের জায়গায় নিয়ে যায়। তার অভিসন্ধি ছিল তার মেয়ের সাথে পাপার বিয়ে দেবে। এসব কথা পাপা জানত না। পাপাকে বুঝতে দেয়নি দাদুটা কিছু। দোকান ও বাড়িতে একটাই ফোনের দুটো রিসিভার করা ছিল। মা, দিদা, আমি দাদুর ফোনের সব কথা শুনে নিয়েছিলাম। যদিও পাপা এসব বিশ্বাস করেনি। মা’র হেপাটাইটিস বি ধরা পড়ে। এবার পাপা একটু নরম হয়। মা’কে নিয়ে সেই রাতে একাই পাপা কলকাতাতে চলে আসে। বাঁচার আশা ছিলনা। পাপা তখন খুব কেঁদে ফেলেছিল। পিয়ারলেস হসপিটালে টানা সাত দিনের চিকিৎসার পর মা সুস্থ হয়, তারপর মা’কে নিয়ে পাপা বাড়ি ফেরে।
৯.
কিছুদিন যাওয়ার পর বাড়িতে তুমুল অশান্তি শুরু হয়। দাদু ষড়যন্ত্র করছে, পাপা নেশার মধ্যে থাকার জন্য কিছু বুঝতে পারছে না। মা এসব নিয়ে চিন্তাতে অস্থির হয়ে উঠছে। এদিকে পাপা মা’কে নতুন বাড়িতে যাওয়ার জন্য জোর করছে। আমার ক্লাস টেনের প্রিটেস্টের আর একমাস বাকি। পড়াশোনা কিছু হচ্ছেনা। এর মধ্যে দাদু আরও কিছু ষড়যন্ত্র করে বসে। নতুন বাড়িতে আমরা ঢোকার আগে, দাদু, পাপা ও আমার এক মামা গেছিল। পাপা টেবিলে বসে মদ পান করছিল, দাদু সেই সুযোগে কিছু কাগজে পাপার সই নেওয়ার চেষ্টা করে। মামা পিছন থেকে দেখতে পেয়ে যায় ও কাগজগুলো কেড়ে নিয়ে দেখে ট্রান্সপোর্টের পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি, লেখা আছে পাপা সুস্থ মস্তিষ্কে, সজ্ঞানে ট্রান্সপোর্ট বিজনেসের পাওয়ার দাদুর হাতে তুলে দিচ্ছে। মামা কাগজ ফিরিয়ে দেয়না, নতুন বাড়িতে তালা লাগিয়ে, পাপাকে গাড়িতে তুলে পুরোনো বাড়িতে নিয়ে আসে ও আমাদের সেই কাগজ দেখিয়ে সব খুলে বলে। ঘণ্টাখানিকের মধ্যে সেই কাগজ হারিয়ে যায় আমাদের বাড়ি থেকে, পরে পাপাকে যখন সব খুলে বলি যা হয়েছে, পাপা কিছু বিশ্বাস করেনা। দাদুর সামনে বললে দাদু পাপাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে এবং পাপা উল্টে আমাদের ওপরেই রেগে যায়। পাপা বাড়িতে আসা বন্ধ করে দেয়। উপায় না দেখে, মা সবকিছু নিয়ে নতুন বাড়িতে ওঠে। নতুন বাড়িটা বিশাল একটা বাড়ি, সবাই বলেছিল প্রাসাদ। বাড়ির ভিতরে সবকিছু সাজানো, নতুন জিনিসে ভর্তি। ওসব জিনিসের মধ্যে আমাদের পুরোনো বাড়ির পুরোনো জিনিসগুল বেমানান। তাছাড়া এতসব আধুনিক জিনিসের অভ্যাস আমাদের নেই। পুরোনো বাড়িতে আমরা চাপা কলের জল খেতাম, ঘর বলতে দুটো ছোট ছোট ঘর ছিল, একটা ছোট ডাইনিং ছিল, সিঁড়ি ঘরের ছাদ ছিল টিনের, আর ছিল অগনিত মানুষের স্নেহ, ভালোবাসা। নতুন বাড়িতে এসে সবকিছু অন্যরকম। বাড়ির সামনে বিশাল জমি পড়ে আছে, বাড়ির ভিতরে বড় শান বাঁধানো উঠান, বাড়িতে নিচ তলা, ওপর তলা মিলিয়ে চোদ্দটা ঘর, মানুষ মাত্র তিনজন। তারমধ্যে পাপা বাড়িতে ফেরেনা প্রায় তিনমাস। অত বড় বাড়িটাতে আমি আর মা দুজন। পাড়ার লোক তখন কথা বলেনা বিশেষ। আমরা অসহায় হয়ে দিন কাটাতে থাকি, দম বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে প্রিটেস্টের পরীক্ষার রেজাল্ট যাচ্ছেতাই খারাপ হয়, কোনোরকমে পাশ করি।
১০.
অনেকদিন পর পাপা বাড়ি ফিরল। কোলে একটা ফুটফুটে বাচ্চা কুকুর। বাড়ি গিয়েই আমার কোলে ওকে দেয়। আমার কোলে এসে বমি করে দিল। পাপা বলল ওর নাম রাজেশ। আজ থেকে এখানেই থাকবে। আমি বলে উঠি, ওর নাম ভুটো। মা কুকুরকে ভয় পেত, জোর করে মা’র হাতে ওকে দিলাম। বললাম ওর নাম ভুটো। ভুটো মানে পাপা জানেনা, বোঝে না। পাপার রাজেশ নামটাই বেশি পছন্দ। নাম রাখা নিয়ে মা, পাপার মধ্যে চিৎকার চেঁচামেচি করে ঝগড়া হয়ে গেল। খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। মা বলল ভুটো নামটাই বেশি ভালো। তাছাড়া ছেলে ওর নাম ভুটো রেখেছে, তাই ওর নাম ভুটোই থাকবে। পাপা মেনে নিল। ওর নাম তখন থেকে ভুটো হয়ে গেল। এখানে আমার মুখ থেকে ওর নাম ভুটো বেরিয়ে আসার কারণ আছে। ছোট থেকেই আমি ঝগড়া, ঝামেলা পছন্দ করিনা। কিন্তু কোথাও অপমানিত হলে, সেটা মনে রেখে দিই। সময়ের অপেক্ষা করি। একবার স্কুলে টিফিনের সময় আমার এক বন্ধু আমাকে বলে, চল বাবার অফিসে যাই, টাকা নিয়ে এসে একসাথে টিফিন করবো। আমাকে নিয়ে যায় ও ওর বাবার অফিসে। ওর বাবা ওকে পাঁচ টাকা দেয়, ও বলে দুজন আছি, দশ টাকা দাও। ওর বাবা ওকে দশ টাকায় হাতে দিল। বাইরে বেরিয়ে এসে ছেলেটা আমার হাতে এক টাকা দিয়ে বলে কিছু খেয়ে নিস। আমি টাকার অপচয় করিনা, বাড়ি থেকে টিফিনের জন্য দুটাকা করে আনতাম, পঞ্চাশ পইসার খেতাম, পঞ্চাশ পইসা বাস ভাড়া দিতাম ও একটাকা ভাঁড়ে জমাতাম। টাকার ওপরে লোভও কখনো হয়নি তেমন। বন্ধুটা সেদিন নিয়ে যেতে চাইল, তাই গেছিলাম ওর বাবার কাছে। কিন্তু ওর ওই একটাকা দেওয়াটা আমাকে খুব অপমান করে। ওর নাম ছিল ভুটো। আমি ওকে বলেছিলাম, তোর নামে আমি কুকুর পুষবো। তাই ভুটো নামটা রেখেছিলাম। নতুন বাড়ি এসে ওকে নিমন্ত্রন করেছিলাম, খাবার সাজিয়ে ভুটো বলে যেই ডেকেছি, দুই ভুটোই হাজির। তখন আমি আমার বন্ধু ভুটোকে জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু মনে পড়ছে কিনা ওর। ও বুঝতে পারে ও আমাকে স্যরি বলে। সেদিন ও ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল।
১১.
ভুটোকে নিয়ে, ক্রিকেট নিয়ে খেলাতে মেতে আছি। সময় বেশ কাটছে নতুন বাড়িতে এসে। ফুরফুরে মেজাজে। একদিন পুরোনো বাড়িতে গেলাম, দেওয়ালগুলো ছুঁয়ে দেখছিলাম, চোখে জল চলে আসলো। রুমা দূর থেকে ওদের বাড়ির ছাদ থেকে তাকিয়ে দেখছিল। কাঁদছিল। ওকে দেখে আমার আরও কষ্ট হল। আমি হাতে ইশারা করে বললাম, আমি ঠিক আছি, তুই কষ্ট পাসনা। পড়তে গিয়ে আমি নুপুরের দিকে চেয়ে থাকি। নুপুরকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছা করে, ওর সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছা করে, গল্প করতে ইচ্ছা করে। এর মধ্যে একটা পাগলামি ঢুকেছে মাথাতে। আয়নার কাঁচে নিঃশ্বাসের বাষ্প ফেলে আমি নূপুরের নাম লিখছি মাঝে মাঝেই, একদিন মা পিছন থেকে দেখে ফেলল। আমাকে কিছু বলল না। মা তখনও আমাকে স্নান করিয়ে দিত, খাইয়ে দিত। আমাকে বলল বাথরুমে যেতে। আমি গেলাম, ওই সুযোগে মা আয়নার কাঁচে নিঃশ্বাসের বাষ্প ফেলতেই নূপুরের নাম ফুটে উঠল। মা’র চোখ তখন রাগে ফেটে যাচ্ছে। এমনিতেই মা মায়েশ্য বংশকে সহ্য করতে পারেনা, আর আমি সেই বংশের মেয়ের নাম আয়নাতে লিখছি, মানে প্রেম করছি!!! মা বাথরুমে আমাকে স্নান করাচ্ছে আর খুব মারছে। গায়ে, পিঠে দাগ বসিয়ে দিল মেরে মেরে। আমি একটুও কিছু বললাম না। আমি ভয় পেয়ে ছিলাম, জানতাম, এখন কিছু বলা ঠিক হবেনা। একদিন আমি রুমাকে দিয়ে নূপুরের কাছে বলে পাঠালাম, যে করিমপুরে একটা ছেলে আছে যে নূপুরকে খুব ভালোবাসে। রুমা এই কথা নূপুরকে বলতেই নূপুর তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। আমি নিজেও কথাটা বলতে পারতাম, কিন্তু সরাসরি কথাটা বলার মতো সাহস আমার ছিলনা, তাই রুমাকে দিয়ে বলে পাঠাই। নূপুর আমাকে পড়তে যাওয়ার পর শুরু থেকে জিজ্ঞাসা করছে, বল ছেলেটা কে। কার এত সাহস?
আমি বললাম, অপেক্ষা কর, আমি ঠিক বলবো সামনের দিন পড়তে এসে। পরের দিন পড়তে যাওয়ার পরও নূপুর আমাকে জিজ্ঞাসা করছে, আমি বলি সময় আসলে জানাবো। পড়া ছুটির শেষে আমাকে নূপুর ঘিরে ধরে। আমি ভয় পাই। বলি আর একটা দিন অপেক্ষা কর। নূপুর মানেনা, আমি সাইকেলে সন্ধ্যাবেলাতে চলে আসছি, হঠাৎ আমাদের দোকানের কাছে আসতেই দেখি আমার পাশে নূপুর। খুব জোরে হেঁটে এসেছে। ওর চোখে মুখে তীব্র রাগ। পাশেই দোকান। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। আমি বলি, তুই আজ ফিরে যা। চিন্তা করিস না। আমি কথা দিচ্ছি সামনের দিন ছুটির শেষে আমি তোকে জানিয়ে দেবো নিজেই। নূপুর ফিরে যায়। পরের দিন পড়া ছুটি হলে, সন্ধ্যার অন্ধকারে নূপুর আমার পাশে হাঁটতে থাকে জানার জন্য। আমি সুযোগ খুঁজি, রাস্তার মোড়ে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, এবার বল, আমি বলি তোকে একজন খুব ভালোবাসে এই করিমপুরের। বলল, আমি জানি। নামটা বল।
আমি কেঁপে উঠি, মাথা ঘামছে, আমি ভাবছি বলেই চলে যাবো। আমি বলি,
“ছেলেটা… ছেলেটা…” আবার চুপ হয়ে যাই। নূপুর বলে, “ছেলেটা কে? এখুনি বল, নাহলে..” আমি বলি, “ছেলেটা আমি।” আমি আর কিছু না দেখেই ওখান থেকে বেরিয়ে যাই। একটু দূরে গিয়ে দেখি নূপুর সেখানেই দাঁড়িয়ে। আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে। ও হাসছে মাথা একটু নিচু করে। আমার মনে স্বস্তি আসে একটু। পরের দিন পড়তে গিয়ে দেখি রুমা আমার পরেই ঢুকল। আর কেউ নেই। ও এসেই আমার সামনে দিয়ে রাগ দেখিয়ে ছুটে বারান্দায়। আমি বারান্দায় যাওয়ার সাহস পাইনা। তারপর নূপুর আসে, এসে ঔ রুমার কাছে যায়। রুমাকে ফিরিয়ে আনে। পড়া শেষে রুমা আমাকে বলে, “তোর এত বড় সাহস!! তুই আমাকে দিয়ে ওই হতচ্ছারিকে প্রপোজ করলি!!” রুমা বলে, “এই রুমা তোকে ভালোবাসে। তুই কি চাস বল? আমাকে চাস? কিভাবে চাস? যা চাইবি সব পাবি। আমি সবটা দেবো তোকে। তুই শুধু আমাকেই ভালবাসবি।” রুমা এতবছর আমাকে ভালোবেসে, লুকোচুরির বাধ ভেঙে সরাসরি আমাকে এভাবে বলছে। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। আমি চিনি রুমাকে। ও যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। সবাই ভয়ে কাঁপে রুমাকে দেখে। রুমা কি এখনই আমাকে সবার সামনে কিছু করে দেবে!!! আমি ভয় পেয়ে সরে যাই। পিছনে নূপুরকে আসতে দেখেই আমি নূপুরের কাছে চলে যাই। নূপুর আমাকে উত্তর দেয়নি প্রপোজালের। কিন্তু ওর চোখ, মুখ দেখে বুঝতে পারছি ও আমাকেই ভালোবাসে। নূপুর বলে, “তুই এটা ঠিক করিস নি। সবাই জানে রুমা তোকে পাগলের মতো ভালোবাসে। আমি প্রেম করার জন্য না। আমাকে বাবা ছোট থেকে ছেলেদের মতো করে গড়ে তুলেছে। আমি এসব করতে পারবো না। তুই আর এসব করবি না।” আমি বাধ্য ছেলের মতো শুনি, উত্তর না দিয়ে চলে যাই। মন মানেনা, বুক ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। রুমা পাগলামি শুরু করেছে। গোটা ব্যাচের সবার সামনে, স্যারদের বলে বেড়াচ্ছে, আমার সামনেই বলছে, “শান্ত আমাকে ঠকিয়েছে।” কিন্তু আমি তো রুমাকে ঠকাইনি। আমি কিছু বলতে পারিনা। চুপ থাকি। একদিন রুমাকে দিয়েই একটা চিঠি লিখে নূপুরকে পাঠাই। রুমা নূপুরকে চিঠিটা দেয় ঠিকই, কিন্তু ও আরও খেপে ওঠে। স্যাররা হাসাহাসি করে, বলে, “ত্রিকোণ প্রেম!!! এই গল্পে একটা নায়ক, দুটো নায়িকা।” আমি পড়াশোনা করতে পারিনা। একদিন একটা স্যার মাকে বাড়িতে ডেকে সব জানাই। মা বাড়ি এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে। আমি বলি আমি কিছু করিনি। শুধু নূপুরকে বলেছি ওকে আমার ভালো লাগে। মা কিছু বলেনা। আমি খুব অসহায় হয়ে উঠেছি। নূপুরকে ভালোবাসার যন্ত্রণা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে, আর আশেপাশের পরিস্থিতি আমাকে ভেঙে দিচ্ছে। একদিন নূপুরকে দেখি পড়তে গিয়ে হঠাৎ সিঁড়িতে চলে যেতে একা। আমি সবাইকে বলি তোরা দাঁড়া। আমি দেখছি। আমি গিয়ে নূপুরের মাথায় হাত রেখে বলি, “কি হয়েছে?” দেখি ও কাঁদছে। ও বলছে, “তুই রুমাকে ভালবাস। ও তোকে খুব ভালোবাসে। আমি তোদের মাঝে এসেগেছি।” আমি বলি ধুর পাগল। আমি তোকে ভালোবাসি। দশ পাওয়ারের একটা বাল্বের আলোতে আমি আর নূপুর পাশাপাশি বসে, এই প্রথম এত কাছে। আমাদের দুজনের শরীর একে অপরের সাথে ঠেকে যাচ্ছে। আমাদের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে এসে পড়ছে। দু মিনিট এভাবে কাটতেই সীমা এসে নূপুরকে নিয়ে যায়। আমি ঘরে যেতেই আমাকে রুমা বলে, “ওই হতচ্ছারি তোকে কি বলছিল? সত্যি করে বল। নিশ্চয় আমার নামে উল্টোপাল্টা বলেছে?” আমি চুপ থাকি। কিছুই বলিনা। জানি বললে রুমা খারাপ কিছু করতে পারে। আমার মাথা নিচু হয়ে যায়।
হঠাৎ খেয়াল করিনি, একদিন আমার পেনের নিব আমি রুমা ও নূপুরের সামনেই আমার হাতের মধ্যে ঢুকিয়ে দিই। রুমা আঁতকে ওঠে। নূপুর খেপে যায়। নূপুর আমার বাড়িতে ওর এক বান্ধবীকে নিয়ে আসে। কেন এসেছে আমি জানিনা। তবে যেমন ভয় পেয়ে আছি, তেমন খুশিও। মা রেগে না খুশি হয়ে আছে বুঝিনা। মা ফল কেটে ওদের দুজনকে খেতে দেয়। নূপুর চুপ করে থাকে। মা নূপুরকে জিজ্ঞাসা করে, “কিছু বলবি?” নূপুরের মাথা নিচু। ওর বান্ধবী নূপুরকে বলে, সবটা বলতে। মা বলে, “শান্ত কি কিছু করেছে? আমাকে বল।” নূপুর বলে, “আজ শান্ত হাত ফুটো করেছে। ওকে এসব করতে নিষেধ করো। আমি এসব করতে চাইনা।” মা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “ও কি বলছে? এটা কি সত্যি?” আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে বলে উঠি, “না। ও মিথ্যে বলছে। আমি এসব করিনি।” মা নূপুরকে বলে, “শান্ত মিথ্যে বলবে না। তুই মিথ্যে বলছিস তাহলে। বেশ আমি কথা দিচ্ছি শান্ত আর তোর সাথে কথা বলবে না।” মা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “বলবি না তো?” আমি বলি, “ঠিকাছে। আমি বলবো না।” নূপুর লজ্জায়, ঘেন্নায় কিছু না খেয়ে বেরিয়ে যায়। পরের দিন পড়তে গিয়ে আমাকে বলে “কাপুরুষ।” আমি চুপ থাকি। মা ওকে কথা দিয়েছে আমি কথা বলবো না বলে। তাই আমি কথা বলতে পারবো না। কিন্তু একটু কথা বলার জন্য আমি অস্থির হয়ে উঠছি। আমি চিঠি লেখা শুরু করি নূপুরকে। মুখে কথা বলতে পারিনা, চিঠি তো লিখতেই পারি। আমি চমকে যাই, যখন দেখি নূপুর স্বর নরম করে, সহানুভূতির সাথে আমাকে চিঠির উত্তর দিয়েছে সবাইকে লুকিয়ে। আমাকে ও বলেছিল চিঠিতে, আমি যেন এই চিঠির কথা কাউকে না জানাই। কিন্তু আমি আনন্দ ধরে রাখতে না পেরে সবাইকেই চিঠি পড়ে শুনিয়ে দিই। ব্যস। নূপুর চিঠি লেখা বন্ধ করে দিল। আমি অসহায় হয়ে উঠলাম। রেজাল্ট এসবে খারাপ হতে হতে মাধ্যমিকে আমার কপালে জুটল ৪৭৪। ছয় নাম্বারের জন্য ফার্স্ট ডিভিশন হাত ছাড়া হয়ে গেল। অথচ এই আমিই সব থেকে প্রমিসিং স্টুডেন্ট ছিলাম। স্কুলের স্যাররা অবাক। আমার কেমিস্ট্রির স্যার ভেবেছিল খুব খারাপ হলেও আমি অন্তত ৬০০ তো পেয়েই যাবো। আত্মীয়রা ভেবেছিল আমি দুর্দান্ত রেজাল্ট করবো। স্টার মার্ক্স!!! আমার কপালে ফার্স্ট ডিভিশনও জুটল না। যে ইংরাজিতে আমি এত নাম্বার পাই, সেই ইংরাজিতে আমি পেলাম ৪৪। অঙ্কে ৪২। লজ্জায় মাথা হেট হয়ে গেল আমার। আমি ঘরেই আটকা থাকলাম। কেমিস্ট্রির স্যার এসে বলল, “এটা কি হয়ে গেল শান্ত!! তোর খাতা কি ভুল দেখা হল! আমি কি তোর খাতা চেক করতে বলবো?” আমি মাথা নিচু করে বলি, না থাক। আমি পরীক্ষা খারাপ দিয়েছিলাম। স্যার বলল, “তুই এই নাম্বারে সায়েন্স পাবিনা। আর তুই যদি সায়েন্স না পাস, তোর কেরিয়ার শেষ হয়ে যাবে। কারণ তুই অন্য সাবজেক্টে ততটা ভালনা, যতটা সায়েন্সে ভালো।” আমি বলি, “আমাকে সায়েন্স নিতেই হবে। অঙ্ক ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না।” স্যার বলল আমি দেখছি কি করা যায়। স্যারের অনেক ক্ষমতা। একসময় কেমিস্ট্রির লেকচারার ছিল কলেজে, পরে হাইস্কুলের টিচার ছিল। এ বি টি এ এর খাতা দেখে। কনফারেন্স করে। স্যারের বলাতে আমি শিকারপুরে সায়েন্স পেয়ে গেলাম। খুব খুশি হলাম। ভাবলাম আমি আর পিছনে তাকাবো না ফিরে। অঙ্ক, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি নিয়ে মেতে থাকি। এভাবেই দু মাস কেটে গেল।
এবার পালা বন্ধুদের। বন্ধুরা আমাকে নূপুর নূপুর করে খেপাতে শুরু করে। আমি পড়া ছুটির শেষে দেখি নূপুর রোজ আমাকে একটু দেখার জন্য বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি আবার দুর্বল হয়ে পড়ি। আমার মন পড়াশোনা থেকে উঠে যায় আবারও। খুব কষ্ট হয় সব মনে করে। কিন্তু আমি তো কথা বলতে পারবোনা। মা নিষেধ করেছিল। তাই ওভাবেই থাকি। আমরা দূর থেকে একে অপরকে দেখি আর পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাই রোজ। জীবন বড় অসহায় হয়ে উঠছে। আমি বুঝতে পারছিনা নূপুর কি চাইছে। ও কেন রোজ আমার জন্য অপেক্ষা করে, আমাকে দেখে! কিছুই বুঝতে পারছিনা।
No comments:
Post a Comment