Sunday, 6 November 2016


পুরোনো সেই সময় নিয়ে। 

সাত বছর আগের সৌম্যজিৎ দত্ত আর আজকের সৌম্যজিৎ দত্ত মানুষটার মধ্যে ভীষণ ব্যবধান। সাদৃশ্য শুধু নামে আর কিছুটা চেহারাতে। সাত বছর আগের সৌম্যজিৎ ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আদলে গড়া এক পুরুষ। জীবনে অসংখ্য মেয়ের আগমন, প্রেমিকা থাকার পরও প্রেমিকাকে আড়াল করে অসংখ্য প্রেম করা, নেশার মধ্যে সমস্ত সময়টা কাটানো, দাম্ভিক পুরুষ। আজ আমি সেই সময়ের একটা গল্প বলছি। দিদি সবে মারা গেছে, আমি ভীষণ একা হয়ে গেছিলাম অত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও। প্রথম থেকেই যে আমি খারাপ ছিলাম, তেমন নয়। ভীষণ সরল, সাদাসিদে একটা ছেলে ছিলাম। আস্তে আস্তে সময় খারাপ হতে শুরু হয়। দিদি মারা যাওয়ার পর আমি নেশার জীবনে প্রবেশ করি। এবং কিছু দিনের মধ্যেই চরম নেশাগ্রস্ত হয়ে উঠি। মেসে থাকতাম। বড়রা আমাকে সবসময় স্নেহ করত। মেসের ম্যানেজমেন্টে যারা ছিল, তারা আমার এই খারাপ হতে শুরু হওয়া অভ্যাসগুলোর সাথে পরিচিত ছিলনা। তাদের চোখে আমি ভীষণ ভালো একটা ছেলে, একটা বাচ্চা ছেলে ছিলাম যে নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রেখেছিল। কিন্তু তাদের চোখের আড়ালে আমি মানুষটা ছিলাম বাস্তবে এক ভয়ঙ্কর চরিত্র। একটা সিঙ্গেল রুমে থাকতাম একা। মেসে যে কেউ সিঙ্গেল রুম পাইনা। অনেক চেয়েও পেতনা কেউ। কিন্তু আমি খুব সহজেই পেয়েছিলাম, আমাকে কখনো চাইতে হয়নি। সবার বিশ্বাস আর ভরসা এমন ভাবেই অর্জন করেছিলাম যে আমাকে সিঙ্গেল রুমটা কম ভাড়াতেই উপহার হিসেবে দিয়ে দেওয়া হয়। একদিন ম্যানেজার আমাকে ডেকে বলে, "সৌম্য আমরা কোনো স্টুডেন্টকে সিঙ্গেল রুম দিইনা এইভাবে। সার্ভিস ম্যানরা পায়। কিন্তু এই রুমটা আজ থেকে তোমার, তুমি এই রুমেই থাকবে এখন থেকে।" আমি জানতাম, বড়দের সামনে আমার আচরণ ও আমার যুক্তি এমনই, আমি যেকোনো দিন এই রুমটা পাবো না চাইতেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা করছিলাম। রুমটা পাওয়ার জন্য প্রায় পঞ্চাশজন আবেদন করেছিল, ওরা কেউ পাইনি। আমি সিঙ্গেল রুমটাতে ঢুকে গেলাম। ঘরে বেশি জায়গা নেই, কিন্তু নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে থাকা যাবে, তাই খুব আনন্দ হচ্ছিল। আমি সবার সাথে মিশতাম না কখনো। আমার খুব কাছের দুজন বন্ধু ছিল। তাদের নাম আমি এখানে করতে পারবো না, পারবো না কারণ তারা আজকের এই লেখা নিয়ে একটু ভয় পেয়ে আছে। তাই ওদের আমি ক ও খ নাম দিলাম এখানে।


আমার রুমের জানালার ওপাড়ে একটা বাড়ি ছিল। সেখানে সতের বা আঠারো বছরের এক ভয়ঙ্কর সুন্দরী মেয়ে থাকত। সেই বাড়িরই মেয়ে। মেসের ছেলেদের কাছে আমি ওর নাম দিয়েছিলাম স্নেহা। আমি ওর নাম জানতাম না। মনে মনে স্নেহা বলে ডাকতাম। ওই বাড়ির দুটো প্রাণীকে জানালা দিয়ে দেখতে পেতাম। স্নেহা ও স্নেহার কুকুর। আমার জানালার বেশ কাছেই। স্নেহাও দেখত জানালা দিয়ে। কথা না বললেও, চোখের ভাষাতে আমাদের অনেক কথায় হত। আমাদের সবারই বয়স তখন কম আর শারীরিক চাহিদা অনেক বেশি। আমি ক ও খ কে আমার জানালার কাছে এনে স্নেহাকে দেখালাম। স্নেহার কুকুরটা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ছিল। স্নেহা আমাদের তিনজনকে দেখিয়ে ওর একটা রুমাল দূরে ছুঁড়ে দিত, কুকুরটা মুখে করে রুমালটা নিয়ে আসত। স্নেহা সেই রুমাল ওর জামার ভিতরে ঢুকিয়ে দিলে, কুকুরটা জামার ভিতরেই মুখ ঢুকিয়ে রুমাল বার করার চেষ্টা করত। স্নেহা তখন ছটপট করত কোনো এক উত্তেজনাতে, আমাদের সেটা দেখাত। আমরাও ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠতাম তিনজনেই সেটা দেখে। মনে মনে আমরা তিনজনই স্নেহার প্রেমে পড়ি। স্নেহার মনে কি ছিল জানিনা,তবে স্নেহা আমাকে জানালা দিয়ে বেশ ইশারা করত, আমিও করতাম। মেসে থাকা সমস্ত সময়টাতেই স্নেহার সাথে আমাদের চোখের ভাষার এভাবেই আদান প্রদান হত।

যাইহোক, এটা ছিল একটা গল্প। আমি এই লেখাটা লিখলাম একটাই কারণে। আজ অনেক সময় পার হয়ে গেছে। আমি মানুষটাও আর তেমন নই। এখন আর ওভাবে যে'কাউকে দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠিনা। এখন সম্পর্কের অর্থ বুঝতে শিখেছি। কিন্তু আমার জীবনের ছোট, বড় সমস্ত কথা আমি অকপটে যেভাবে বলতে শিখেছি, সে ভালো হোক বা খারাপ, ক ও খ এই ব্যাপারে ততটা এগোতে পারেনি। আমি তাদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে একটা ভয় দেখেছি। তারা তাদের প্রেমিকার কাছে সবকিছু খুলে বলতে পারেনা, বলতে পারেনা হয়ত সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ভয় পেয়ে। ক ও খ এই লেখাটা পড়বে, আমি তাদের একটা কথা বলছি, তোরা সম্পর্ককে ভয় পাসনা। যে সম্পর্কে ভয় থাকে, সেই সম্পর্ক আস্তে আস্তে গুমোট হয়ে ওঠে। একে অপরের মধ্যে দম বন্ধ হওয়া একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়। বরং তোরা যদি নিজেদের সবটা সে ভালো হোক বা খারাপ, একে অপরের সাথে ভাগ করে নিস, সেখানে মিষ্টতা বাড়ে। যে মেয়েটাকে তুই ভালবাসিস, মেয়েটার ওপরে অধিকার দেখাস, সেই মেয়েটারও অধিকার আছে তোর জীবনের সবটার ওপরেই। অধিকার, ছোট ছোট কথা, ভালোবাসা ভাগ করে নিলে সম্পর্ক খারাপ হয়না, বরং একে অপরের ওপর বিশ্বাস, ভরসা বেড়ে ওঠে। একজন প্রেমিকা, সে তো শুধু আমার প্রেমিকাই নয়, সে আমার মনের মানুষ। আর মনের মানুষ যে হয়, তাকে আমার মনের সব কথা জানাতে পারি, কোনো দ্বিধা ছাড়াই। তাতে দেখবি ভুল বোঝাবুঝি অনেক কমে যাবে। ভয় কমে যাবে। আমি আজ বুঝি সম্পর্কের এই অর্থগুলো। এটাই তো ভালোবাসা। তোরাও একবার সাহস করে নিজেদের মধ্যে নিজেদের ভাগ করেই দ্যাখ, দেখবি ভীষণ আনন্দ পাবি তোদের সম্পর্কগুলোতে।  আমার মনের মানুষটাও কিন্তু এই লেখাটা পড়বে ও আমার একটা অতীত জানতে পারবে, কিন্তু তাতে আমার কোনো ভয় নেই। বরং আমার মনে হবে আমি তনুশ্রীর সাথে আমার একটা সময় ভাগ করে নিলাম। তনুশ্রী কিন্তু এটাকে কখনো খারাপ ভাবে নেবেনা, এটা আমার ভরসা তনুশ্রীর ওপরে। 

No comments:

Post a Comment