Sunday, 20 November 2016


মনে আছে কলকাতা!
সৌম্যজিৎ।

উৎসর্গ - লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে।


কলকাতা কলকাতা শোনো কলকাতা,
কোলাহলের রাস্তাঘাট, হুগলী সেতুর ধারে কারখানা আর -
হাওড়া সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা,
ধোঁয়াকার আকাশ আর শিয়ালদাহ, হাওড়া স্টেশনে গিজগিজ করা ভিড়,
এই কি তোমার পরিচয়?
কলকাতা মানে কি রবীন্দ্রসদন বা ময়দানে বসে প্রেম প্রেম আমেজ আর -
প্রেমিক প্রেমিকাদের ফুচকার দোকানে জমিয়ে পাতা সেজে টক, ঝাল, নোনতা স্বাদের -
মুচমুচে ফুচকা খাওয়া,
বা স্টারে বসে জমিয়ে আর্টফিল্ম দেখা, নন্দনে বসে ছেলে মেয়েদের চুমু খাওয়া!
কলকাতা মানে কি শুধু শ্যামবাজার গোলবাড়ির বিখ্যাত মাটন কষা,
বিবেকানন্দ রোডের ফুটপাতে শুয়ে থাকা বাচ্চারা!
কলকাতা মানে কলেজস্ট্রিটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থেকে -
এ দোকান, ও দোকান ঘুরে ঘুরে বইয়ের দাম কষা,
বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে দেখা,
আবার বইয়ের নেশায় বই বাছাই করে দাম চোকাতে গিয়ে হঠাৎ -
পকেটে হাত পড়তেই খালি পকেট দেখে সম্বিত ফিরে থমকে যাওয়া।
কলকাতা মানে ফেব্রুয়ারির বইমেলা, আর লেখক লেখিকাদের ঘিরে ধরে অটোগ্রাফ নেওয়া,
কলকাতা মানে ট্রামে চড়ে পুরোনো ঐতিহ্যকে ছোঁয়ার আনন্দ উপভোগ করা।




কলকাতা তোমার মনে আছে রওডনস্ট্রিটের সেই বাড়িটাকে যেখানে -
একসময় একজন মানুষ ঘুরে বেড়াতো ঘরময় বা দালান জুরে,
ছোট্ট মিনুটাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াত, খায়িয়ে দিত, চুমু খেত,
ছবি এঁকে দেওয়াল জুরে গোটা ঘরে টাঙাত,
দিনরাত বই পড়ত, লেখালেখি করত!
মনে আছে কলকাতা তোমার, সেদিন-
যেদিন সেই লেখিকাকে নিয়ে তোমার শহর জুরে
উত্তাল নাটক সাজানো হয়েছিল!
শিয়ালদাহ, মৌলালি, পার্কসার্কাস জুরে সার্কাসের মঞ্চ তৈরি করে কার্ফু লাগানো হয়েছিল!
মনে আছে কলকাতা সেদিন তোমার শহরে কিছু মুসলিমের বুকে পুলিশ, মিলিটারি এসে -
রাবারের গুলি ছুঁড়ে গোটা মুসলিম জাতিকে খেপিয়ে দিয়েছিল,
কিছু ভাড়াটে লোককে রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে নামিয়ে দিয়েছিল সেই লেখিকার অপসারন চেয়ে!
মনে আছে কলকাতা তোমারই শহরে থাকা সেই রওডনস্ট্রিটের বাড়িটাতে -
সেদিনের পুলিশের গুণ্ডামি,
লেখিকার গায়ে হাত দিয়ে তাকে টানতে টানতে বার করে দিল তোমার শহর থেকেই।
মনে আছে কলকাতা?
মনে আছে তোমার, কলকাতা! ..
মনে আছে কলকাতা সেদিন কিভাবে রাজনীতি করে,
ছোট ছোট ছাত্র ছাত্রীদের গড়ে তোলা আদর্শের লড়াইকে থামিয়ে দিয়েছিল তোমার শাসক!
মনে আছে তোমার -
সেদিনের বইমেলাতে যখন ছাত্র ছাত্রীরা একটাও বই কিনবেনা বলে,
বইমেলা হতে দেবেনা বলে সংগঠন গড়েছিল -
এক মানবতাবাদী লেখিকাকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে,
মনে আছে সেদিন কিভাবে লেখিকার মোমের পুতুল গড়ে ছাত্র ছাত্রীদের সাথে ছল করে-
তাদের লড়াইকে ছোট করে দিয়েছিল ছলনাময়ী রাজনীতি!



কলকাতা তুমি যেমন আমার, তুমি যেমন সবার,
তেমন তুমি আমার লেখিকার হতে পারোনি,
কলকাতা তুমি আজও একটা রোবটের শহর হয়ে আছো মাত্র,
কখনও তোমাকে ইংরেজ শুষে খেয়েছে, তোমার ওপর কর্তৃত্ব করেছে,
তোমার পিঠে চাবুক মেরে তোমাকে মজদুরি খাটিয়েছে,
তেমনই আজও তুমি রাজনীতির মজুর হয়েই বেঁচে আছ।
মনে রেখো কলকাতা,
এই বাঁচা তোমার সম্মান নয়, এই বাঁচা শুধু ধর্ষিত হয়ে বেঁচে থাকা। 

No comments:

Post a Comment