#শুরু_থেকে এখনও পর্যন্ত যতটা লেখা হয়েছে।
আমি সৌম্যজিৎ বলছি ...
শুরু থেকে**************************************************
১.
পাশাপাশি একসাথে চলতে চলতে দুজনে ভাবছিল কিভাবে একে অপরের কাছে আসবে। সেদিন দুজনেই আগে থেকে ফোনে ঠিক করে নিয়েছিল যে আজ তারা চুমু খাবে একে অপরকে। সম্পর্কের পর পাঁচ বছর হতে চলল, সৌম্য আর নূপুর শুধু হাতে হাত ধরে চলা ছাড়া আর কিছুই করেনি। তাতেই দুজনের সুখের শেষ ছিল না।
বয়স কত হবে? বারো পার হয়েছে সবে, নবম শ্রেণীতে পড়ছে সৌম্য, তখন নূপুরের সাথে তার আবার দেখা হয় টিউশান ব্যাচে। প্রথম দিনই নূপুরকে দেখে সৌম্য যেন ফিরে পায় তার ফেলে আসা প্রাইমারী স্কুলের দিনগুলোকে। ফুটফুটে ফর্সা একটা মেয়ে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে, কাঁধে একটা স্টাইলিশ ব্যাগ লাল কালো রঙের, গায়ে কালো রঙের শার্টের ওপর সাদা রঙের বুটিক দেওয়া কাজ আর পরনে ফুল স্কার্ট।
নূপুর এসে সৌম্যর সামনে বসল। একটু মিচকি হাসি হাসল দুজনেই। অঙ্ক করার ফাঁকে দুজনই একে অপরকে লুকিয়ে দেখছিল, এমনভাবে দেখছিল যাতে দুজনের কেউই সেটা জানতে না পারে। কিন্তু বারেবারে চোখে চোখ পড়তেই দুজনে মনে মনে হাসছিল আবার চোখে চোখে বিরক্তি প্রকাশ করছিল। দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত টান ছিল। অনেকে অনেক ভাবে দুজনকে আটকানোর চেষ্টা করেছে, যাতে ওরা একে অপরের সাথে না মেশে। কেউ কিছু করতে পারেনি। সৌম্য একটু ভীতু আর নূপুর ছিল পুরো উল্টো, এক ডাকাবুকো মেয়ে। তের বছর বয়সের একটা মেয়ে নূপুর। যে বয়সে মেয়েরা পরিনত হয়না, পুতুল খেলে কাটায়, নূপুর তখন সুজুকি ফিওরো গাড়ি চালায়, ছেলেদের সাথে টক্কর নেয়, ছেলেদের সাথে গাড়ির রেস দেয়, ক্যারাম খেলাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেদের হারিয়ে দেয়, ক্রিকেট খেলে। আর সৌম্য তখন একবারে বাচ্চা ছেলে। হাফ প্যান্ট পরে পড়তে আসে, ভীষণ দুষ্টু, ছোটাছুটি করে বেড়ায়। মাথাতে সবসময় দুষ্টুমি বুদ্ধি ঘোরে। সৌম্যকে হাফ প্যান্ট ছাড়ানোর জন্য নূপুরকে অনেক সাধ্য সাধনা করতে হয়েছে, মুখের ওপর অপমানও করেছে সে ব্যাচের সামনে যাতে সৌম্য লজ্জা পেয়ে ফুল প্যান্ট পরে।
*** (গল্প থেকে বেরিয়ে কিছুটা এই সময়ের কথা বলছি। আজ ২৯ শে আগস্ট, ২০১৬। সকাল ১১ টা ৪১ মিনিট। আই.এস.আই তে বসে লিখছি। আত্মজীবনীর এই খণ্ডটা শুরু করার প্রথমেই বিতর্কে জড়ালাম। গতকাল ২৮ শে আগস্ট, রাত সাড়ে ন’টাতে আমার ফোনে একটা ফোন আসে। ফোন জিনিসটা এমনিতেই আমার কাছে এক বিরক্তিকর বস্তু। তবু প্রয়োজনে রাখতে হয়। ফোনটা যিনি করেন, উনি নিজের পরিচয় দিলেন করিমপুর থানার এক পুলিশ। পদ জানিনা। বলেননি। কয়েকটা কথা যা বললেন, সেগুলো এমন –
তুই সৌম্যজিৎ দত্ত বলছিস? বাপ – শঙ্কর দত্ত? তোর নামে জি.ডি হয়েছে। তুই একটা মেয়েকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে উত্যক্ত করছিস। সাইবার ক্রাইম। শোন বাড়াবাড়ি করছিস ..
ব্যস, এটুকু বলতেই আমার খারাপ লাগল, আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। একেতে আমি কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করিনি, কোনো সাইবার ক্রাইম করিনি, তার ওপর আমার সাথে তুই তুই করে কথা বলছে। সে যেই হোক, তুই তুই করে এভাবে কথা বলছে আমার সাথে? মানুষের কাছে এত সম্মান পেয়েছি, কোনো অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত নই, আর এক লোক পুলিশের পরিচয়ে এভাবে কথা বলবে? না, সেটা ভয় পেয়ে আর যেই মানুক, আমি সৌম্যজিৎ দত্ত, আমি মানবো না। অপরাধ, অন্যায়কে ভয় পাইনা, সত্যের পথে চলি। সত্যের পথে মানবতাবাদি লেখক তসলিমা নাসরিন’কে আদর্শ মেনে চলি, সম্মানজনক জায়গাতে কাজ করি, সেখানে আমি এমন মিথ্যে আর অন্যায় হুমকি কখনই মানবো না। আমি ফোন রেখে দিলাম। ক্রাইম করেছি কি করিনি সেটা প্রমাণ সাপেক্ষ। সৌম্যজিৎ দত্ত এত দুর্বল নয় যে বাজে হুমকিতে ভয় পেয়ে হুশ হারাবে। ঘটনাটা আমার কাছে যথেষ্ট বিরক্তিকর মনে হল। রাতে এক বন্ধু মারফৎ নূপুরের কিছু কথা জানতে পারলাম। আমার লেখালেখিতে নূপুরের কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমি যেন তার নাম এখানে ব্যবহার না করি। ঝামেলা পছন্দ করিনা আমি। লেখা শুরু করার আগে অনেক চিন্তা করেছি, বারবার ভেবেছি এভাবে একটা আসল নাম তুলে ধরবো, সেটা মেয়েটার জন্য ঠিক হবে? কিন্তু মন থেকে একটাই উত্তর পেয়েছি, আমি যদি নাম পাল্টে অন্যকোনো নাম লিখি, তবে সত্যিকে কি অপমান করা হবেনা? পাঠকদের কি আমি সত্যি থেকে বঞ্চিত করবো না? আর আমি তো বানিয়ে বানিয়ে কোনো মিথ্যে গল্প লিখছিনা, আমি সত্যি লিখছি। মানুষের জীবনের প্রতি মুহূর্তে একটা করে সত্যি তৈরী হয়, সেই সত্যিটা যদি কাগজের পাতাতে জমা হয়, তাতে তো কোনো লজ্জা নেই, কোনো অপরাধও নেই। অপরাধ, লজ্জা মানুষের মনে থাকে। মানুষ যেটাকে মনে মনে ভাবে ভুল, অথচ জেনে শুনেও একটু আনন্দ পেতে সেই ভুলটা করে, সেটাকে মানুষ প্রকাশ করতে লজ্জা পায়, ভয় পায়, সেটাকে অন্যায় ভাবে। তাছাড়া আমি মনে করিনা যে নূপুর জেনেশুনে সম্পর্কে কোনো ভুল করেছিল বলে। অজান্তে মানুষের অনেক ভুল হয়ে থাকে, যেটা হয়ত সময়সাপেক্ষে বড় আকার ধারন করে, কিন্তু এই গল্পের নায়িকা ছিল আদর্শ প্রেমিকা। হ্যাঁ, সেও কিছু ভুল করেছিল, কিন্তু সেটা ছিল ভুল বোঝাবুঝি। আর গল্পের নায়ক সেই ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে জর্জরিত হয়ে স্থির বুদ্ধির অভাবে অন্যায় পথে চলতে শুরু করেছিল। লেখকেরা যখন কিছু লেখে, তখন তারা শুধু নিজের জন্য লেখেনা, তারা মানুষের জন্য লেখে, পাঠকদের জন্য লেখে। সমাজকে একটা বার্তা দিতে চায়। আমিও সমাজকে একটা বার্তা দিতেই এই লেখা শুরু করেছি। ভুল বোঝাবুঝি থেকে একটা মানুষ বা কিছু মানুষকে সারাজীবন যে শাস্তি বয়ে বেড়াতে হয়, মানুষ যদি সময় থাকতে সেই ভুল বোঝাবুঝিকে চিনতে পারে, তবে মানুষ অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে অগ্রসর হতে পারবে। শুধু এটুকুর জন্যই আমার এই লেখা “শুরু থেকে” শুরু করেছি।)
২.
যখন দেখি তোমাকে, এক অজানা ভালোলাগা ছুঁয়ে যায়, পাশে চম্পা, সীমাদের সাথে গল্প করো, হাসো, আমি আড় চোখে তোমাকে বারেবারে দেখি। তোমার প্রতিটা নজর আমার চোখকে কখনও এড়িয়ে যায়নি। এক অদ্ভুতরকম হাসি হাসতাম দাঁত বার করে, তুমি মুগ্ধ হয়ে দেখতে। তোমার মুগ্ধ চোখ আমার চোখে ঝিলিক খেলাত। লাজুক ছিলাম, লজ্জা পেতাম, হাসিতে লজ্জা ঝরে পড়ত।
আগে আগে চলে আসতাম, তোমার অপেক্ষা করতাম। আমার পরপরই তুমি ঢুকতে। খুব ইচ্ছা করত তোমার খুব কাছে যাই, হাত দিয়ে ধরি তোমার গালদুটো, নাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাসকে আমার নাকে, মুখে, ঠোঁটে মাখি। ইচ্ছা করত দরজার পাশে তোমাকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ি, আমার ঠোঁটদুটো বুলিয়ে দিই তোমার ঠোঁটে, গলাতে। তোমাকে হাল্কা করে চেপে ধরি, একটু জড়িয়ে ধরি। বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরি তোমাকে। ছুটির সময় যখন অন্ধকার হয়ে যেত, আমি যেন সেই অন্ধকারেরই অপেক্ষা করতাম। সবার নজর এড়িয়ে তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। ইচ্ছা করত তোমাকে চুমু খাই, সাহস আর হয়ে উঠত না। তোমার শরীরে সবসময় যে ঘামের গন্ধ থাকত, আমি সবার অজান্তেই সেই গন্ধটাকে পান করতাম। কখনো বুঝেছ?
সেই সময় তুমি দিল্লি গেছিলে। দু’সপ্তাহ যে কি ভীষণ কষ্ট আর অপেক্ষা নিয়ে দিনগুলো কেটেছে, যেন হাহাকার! রুমা বারেবারে আমার কাছে ছুটে আসে। রুমাকে আমি খুব কাছথেকে চিনতাম। ও আমার সাথে সবসময় লেগে থাকত, জুরে থাকত। বারবার আমার ঘরে আসে, বারবার আমার জানালায় এসে আমার সাথে কথা বলে। ভালোবাসতাম ওকে, নিজের থেকেও বেশি ভালবাসতাম। ওর কষ্ট সহ্য করতে পারিনা। ওর কষ্ট হলে আমি কষ্ট পাই খুব। কান্না পায় আমার। বাসবোই না কেন? মেয়েটা আমাকে পাগল করে দিত সবসময়। কথা নেই বার্তা নেই, রাত নেই দিন নেই বারেবারে ছুটে আসে, একটু দেখে বা হাসে, মা’র সাথে কথা বলে আর আমার ঘরে উঁকি মারে, আবার পালায়। ও বুঝতে পেরেছিল মনেহয় যে আমি তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি, আমাকে খুব বেশিই চিনত ও। একসময় দেখতাম ও আমার জানালায় এসে বারবার তোমার নামে আমাকে দু-চার কথা শুনিয়ে যেত। বলত তুমি অহংকারী, দিদি তোমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দেয় বা করে দেয়। তুমি ছেলেদের সাথে ঝামেলা করো রাস্তাঘাটে। আরও কত কি বলত! আমি প্রতিবাদ করে উঠতাম, বুঝতাম আমার সেই প্রতিবাদ করে ওঠাটা ওকে খুব কষ্ট দিত। কিন্তু তোমার নামে ও কিছু বলুক, আমি সহ্য করতে পারতাম না। তুমি হঠাৎ করেই ফিরে এলে দিল্লি থেকে। প্রথমে রুমাদের বাড়িতে গেছিলে। তোমার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বাড়িতে আসা, আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু ভয় হোক বা লজ্জা, তুমি পারোনি সেদিন। তবু সাহস করে বাড়ির সামনে এসে সাইকেলে বেল বাজিয়ে ছিলে। তোমার ওই হাঙ্ক স্ট্রেট হ্যান্ড সাইকেলের বেল আমি কোটি কোটি সাইকেলের বেলের থেকে আলাদা করতে পারি না দেখেই। বেল শুনে বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল। ছুটে আসলাম, দেখি তুমি গেটের বাইরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। খুব কালো হয়ে ফিরেছিলে, তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। তবু আমাকে দেখে যেন তোমার চোখ থেকে ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। আমাকে বললে, তোর অঙ্ক খাতাটা দে। বাহানা খুঁজে বার করতে তোমার জুরি মেলা ভার। দিদিকে বলেছিলে অঙ্কে পিছিয়ে পড়েছ, দিদি তোমাকে বলেছিল রুমার কাছথেকে খাতা নিতে। তুমি বলেছিলে সৌম্যর কাছথেকে নিই? দিদি জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন ও পড়াশোনাতে ভালো নাকি যে ওর কাছথেকে নিবি? তুমি বলেছিলে ভালোই তো।
৩.
আমি হেরে যাচ্ছি সবকিছুতে। তুমি পাপ্পুর সাথে ক্যারাম খেলছ, পড়া শেষে পাপ্পুর সাথে কোথায় একটা যাচ্ছ। পাপ্পুর সাথে বেশি কথা বলছ। স্যার বারেবারে কেমন ইঙ্গিত করছে তোমাকে আর পাপ্পুকে নিয়ে। ব্যাচে দিনগুলো খুব অসহায় কাটছে। বাড়ি ফিরছি রাস্তা থেকে একবুক আগুন নিয়ে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করছে। দিনেরপর দিন আমি ভেঙে পড়ছি, শুকিয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ছি, বই সামনে খুলে শুধু মনে মনে তোমার সাথে কথা বলছি, অনেক অনেক অভিযোগ করছি আর কাঁদছি। রাতগুলো দীর্ঘ কাটছে। রুমাকে একেবারে সহ্য হচ্ছেনা, বারবার আমার কাছে আসছে, আমাকে কেমন ভাবে দেখছে। পাশে এসে বসছে। ওর উপস্থিতি আমাকে বিরক্ত করছে, যেন গোটা ঘরে আমি আমার কান্নার শব্দের থেকে বেশি করে রুমার শ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ পাচ্ছি আর দেওয়াল ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটা ঘোরার খচখচ শব্দ আমার কানদুটো ঝালাপালা করে দিচ্ছে। রুমা আমাকে বারেবারে জিজ্ঞাসা করছে, কি হয়েছে তোর? আমি কোনো কথা বলছিনা। শুধু ইচ্ছা করছে দেওয়াল ঘড়িটাতে ঘুসি মেরে ভেঙে ফেলি আর রুমার গলা টিপে ওর প্রশ্নগুলো বন্ধ করে দিই। দুটোর একটাও করিনা। আমি চুপ করে থাকি।
“হঠাৎ আসা মেঘ আর উতলে ওঠা ঢেউয়ে
প্রাণ চঞ্চল হয়ে ওঠে কোনো এক গভীর ক্ষতকে অনুভব করে।
রক্তের সাথে দানা বেঁধে আছে যে স্পর্শ,
অস্পর্শেই তা ক্ষত করে হৃৎপিণ্ডকে বারে বারে।”
পড়াশোনা দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিনের অনুশীলন ঠিকমত করতে পারছিনা। ইতিহাস, ভূগোল, বাংলা, জীবন বিজ্ঞান পাতার পর পাতা পড়া জমে থাকছে। ইংরাজি সহজাত, অঙ্ক ও ভৌতবিজ্ঞান ভালোবাসি। কোনোরকমে এই তিনটে বিষয় পড়ছি। তাও সেভাবে চিন্তাভাবনা না করেই পড়ছি। পড়ছি, যেন মন নেই। বাকি বিষয়গুলোতে একেবারেই পড়া হচ্ছেনা। এই তিনটেতে যদিও বা একটু পড়ি, চিন্তাভাবনাহীন। পাতার পর পাতা বীজগণিতের অঙ্ক কষছি, যেন মাথা কাজ করছে না। অঙ্ক মুখস্থ হয়ে গেছে। বই না দেখেই অঙ্কগুলোর প্রশ্ন খাতাতে লিখছি, আর সমাধান করছি। কিন্তু ওই একই রকমের অন্য অঙ্ক করতে গেলে চার, পাঁচ ভুল করে সমাধান করতে পারছি। বিশ্বাস, ভরসা আমার সবথেকে বড় শক্তি। এতদিন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করেছি মনের তীব্র জোরে। এখন সেই বিশ্বাস বড় ঠুনকো মনে হচ্ছে। নিজেকে একেবারে নিয়ন্ত্রন করতে পারছিনা। বারেবারে ভাবছি ভুলে যাবো সব, আমি কেন ভালোবাসবো। তুমি তো আমাকে ভালোই বাসোনি। শুধু আমিই বেসেছি আর আমিই কষ্ট পাচ্ছি। খেতে পারছিনা, ঘুমোতে পারছিনা। সবসময় দেবদাসের মতো মন খারাপ নিয়ে পড়ে আছি। তুমি তো পাপ্পুর সাথে গল্প করো, ছুটির শেষে পাপ্পুর সাথে যাও কোথায় একটা। আমার কি? তোমার ইচ্ছায় তুমি ঘুরছ। কিন্তু তবু আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি ভুলতে পারছিনা। পারছিনা কিছু। আমি হেরে যাচ্ছি।
“এক মহাকাশ ভালোবাসা আমি বুকে ধরেছি,
আলো আছে, অন্ধকার আছে, ঘূর্ণাবর্ত আছে, বৃষ্টিও আছে,
জোর করে ধরি নি।
কক্ষপথের তীব্র আকর্ষণে ছুটে গেছি তোমার কাছে,
গা ঘেঁষে ভালোবাসা দিতে চেয়েছি,
বাইরে কত সুন্দর আরও উপগ্রহদের আমি দেখি নি,
শুধু দেখেছি তোমায় অপ্রতিম।”
আচ্ছা তুমিও মণ্ডল, পাপ্পুও মণ্ডল। আমি দত্ত। তাই বুঝি আমাকে ভালোবাসো না? কিন্তু আমি দত্ত তাতে কি? সবাই তো বলে আমরা চাঁদসওদাগর বংশ। বনিক জাতি। আমরা তো নিচু নই। কোনোভাবেই তোমাদের থেকে নিচু নই, বরং আমাদের বংশের সাথে ইতিহাস জুরে আছে। তাহলে কি শুধু পদবি আলাদা বলেই আমাকে ভালবাসবেনা??
আচ্ছা। তোমরা বিয়ে কর। সুখে সংসার কর। আমি সারাজীবন একাই থাকবো। শুধু তোমাদের যখন মেয়ে হবে, আমাকে সেই মেয়েটা দিও। আমি ওকে নিয়ে বাঁচবো। ওকেই ভালবাসবো। বড় করবো। ও আমার মেয়ে হবে। আচ্ছা নূপুর, সত্যিই কি তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি। সবটাই কি শুধুই আমিই বেসেছি?
“কতদিন, কতরাত পার হয়ে যায় হাহাকারে,
বুক ফেটে চৌচির হয়,
কত প্রশ্ন দরজা, জানলা দিয়ে প্লাবন বইয়ে দেয়,
আমি অসহায়।
ঘুম হারিয়েছি, খিদে হারিয়েছি, ভরসা হারিয়েছি নিজের,
যেটুকু চলছি,
তলিয়ে যাচ্ছি সমুদ্রের তলদেশে।”
৪.
জীবন বারেবারে সুযোগ দেয়। প্রতিটা মুহূর্তে প্রতিটা চিন্তা ও চিন্তার পিছনে ব্যর্থতা একটা করে নতুন রাস্তা খুলে দেয় লড়াই করার। লড়াইকে লড়ার মানসিকতা, সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করার নামও জীবন। আবার সময়কে সময়ের মতো করে বইতে দিয়ে নিজেকে স্রোতের টানে ভাসতে দেওয়াটাও জীবন। উপভোগ দুটোই করা যায়। আমি সৌম্য, একদিকে আমার সারল্য, ভালোবাসা, সবকিছুর মধ্যে থেকে হাসিকে খুঁজে বার করা, আবেগে ভেসে যাওয়া আমার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে আমি সময় বিশেষে চরম প্রতিহিংসা পরায়ন, বিজয় অভিলাসি, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে যেকোনো বাধা, দুর্গম পথ পেরোতে দ্বিধাহীন।
একটা মেয়ে ও। আমি কেন নিজেকে শেষ করে ফেলছি একটা মেয়ের জন্য? আমি তো অপরাজেয়। হ্যাঁ, সৌম্য অপরাজেয়। মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিশিং, সল্ভ ফ্যাক্টর, দুটো থিওরেম, দুটো ইংরাজি কবিতা, বাংলাতে দেনা পাওনা, তাসের ঘর, ফিজিক্সের ভেক্টরের দশটা অঙ্ক সমাধান করে ফেললাম। সৌম্য অপরাজেয়, আমি হেরে যাবো না। আজ মন ভীষণ চনমনে লাগছে। হ্যাঁ, আমি আমার পুরোনো বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছি। স্কুলে পরপর দুবার ক্লাস নাইনে ফেল করা তরুন ও বিকাশ, রীতিমত সেকশানের গুন্ডা হয়ে উঠেছে। ওদের কেউ ঘাঁটতে যায়না। অঙ্কের ক্লাসে কেউ কথা বললে মাথা গরম হয়ে যায় আমার। সেদিন শেষ বেঞ্চে বসে আছি, থিওরেম বোঝার চেষ্টা করছি অঙ্কের ক্লাসে। হঠাৎ তরুন আমার খাতাটা নিয়ে নিল, কাগজ ছিঁড়ে নোংরা কথা লিখে এর ওর দিকে ছুঁড়ে মারবে।
আমার খাতাতে হাত দিয়েছে? আমার খাতাতে নোংরা কথা লিখবে, ছিঁড়বে নোংরা হাতে? আমি তখন খাতাটা কেড়ে নিলাম। স্যার সামনে আছে, তাই ওরা তখন কিছু বলল না। স্যার চলে যেতেই তরুন আর বিকাশ এসে আমার জামার কলার চেপে ধরল। আমি বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে তরুন ও বিকাশের গলা টিপে ধরেছি দুহাতে দুজনের, ওদের শরীরে আর জোর নেই উঠে দাঁড়ানোর। সবাই অবাক। সৌম্য কখনো কারোর সাথে ঝামেলা করেনা, আজ ওই দুই গুণ্ডার গলা টিপে ধরেছে দু হাত দিয়ে।
দিনেশ বাবুর ডাক পড়ল। মানিক মনে হয় দিনেশ বাবুকে ডেকে ছিল। দিনেশ বাবুর ভয়ে গোটা স্কুল কাঁপে। আর মানিক আমাদের ক্লাসের এক বন্ধু। আমি মানিক ও শ্রীকান্তকে খুব সম্মান করি। দুজনেই ভীষণ সাহসী ও সৎ। আমি দুজনকে খুব ভরসা করি, ওরা সত্যের সাথে থাকে সবসময়। মানিক দিনেশ বাবুকে জানাল, সৌম্য দুহাতে তরুন আর বিকাশের গলা টিপে ধরেছিল, এটাও বলল তরুন আর বিকাশ ক্লাসে খুব ঝামেলা করে। দিনেশ বাবু আমাদের তিনজনকেই বোর্ডের কাছে ডাকলেন, বললেন কি হয়েছে শুনতে চাইনা, তিনজনেই কান ধরে ওঠবোস কর দশবার। তিনজনেই তাই করলাম। তরুন, বিকাশ সেদিনের পর আর ঝামেলা করেনি আমার সাথে।
No comments:
Post a Comment