আদর্শের জন্য শিখি, প্রশ্ন করি।
আমি বেশি সমালোচনা করতে পছন্দ করিনা। বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতাতে বিশ্বাস করি। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে স্বাধিনভাবে নিজের চিন্তা, ভাবনাগুলো তুলে ধরার। গতকাল মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন একটা পোস্ট করেছিলেন, জানতে চেয়েছিলেন এই যে অনেক মানুষ প্রায়ই বলে থাকে যে তারা তসলিমা নাসরিনের সব মতের সাথে একমত হতে পারেনা, কিন্তু কেউ নিশ্চিতভাবে বলেনা যে তারা তসলিমা নাসরিনের কোন কোন মতের সাথে একমত হতে পারেনা, লেখিকা সেই বিষয়গুলো জানতে চেয়েছিলেন ওই পোস্টে। ব্যক্তিগত ভাবে আমি তসলিমা নাসরিনকে আদর্শ মানি, তার সমস্ত চিন্তা, ভাবনাগুলো আমাকে সবসময় কিছুনা কিছু শেখায়, মানুষ হিসেবে আমাকে পরিনত করে। আমি তসলিমা নাসরিনকে আমার ঈশ্বরের থেকে কোনো অংশে কম ভাবিনা বা তসলিমা নাসরিনকে আমার ঈশ্বর মানি এটা মনে করলেও কিছু ভুল মনে করা হয়না। হ্যাঁ আমি ব্যক্তি তসলিমা নাসরিনকে আমার ঈশ্বর মনে করি, তার এতবছরের লড়াই আমাকে অনুপ্রাণিত করে সবসময়, আমি তাকে অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করি, সবকিছুর থেকে অনেক বেশি ভালোবাসি। এমনকি নিজের প্রাণের বিনিময়ে আমি তার জন্য কিছু করতেও কখনো পিছুপা হবো না এই বিশ্বাস রাখি।
একটা ব্যাপারে আমি আমার আদর্শের মানুষটার সাথে একমত হতে পেরেছিলাম না, যখন বাংলাদেশের মেধা তালিকায় থাকা কিছু ছাত্র ছাত্রী অতিরিক্ত ভালো ফল করার পরও, মিডিয়ার করা একটা সার্ভে মিশনে ক্যামেরার সামনে সাধারন জ্ঞান, সাধারন বিজ্ঞানের কিছু প্রশ্নের ভুল উত্তর দিয়ে বা উত্তর দিতে না পেরে একটা হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল গোটা দেশের সামনে, তখন ছাত্রছাত্রীদের ওপর দিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের মতো সাফল্যের তুঙ্গে বসে থাকা ব্যক্তিরা যখন এমন সমালোচনা করেন, তখন ছাত্রছাত্রীদের মনোবল ভেঙে যেতে বাধ্য, তারা মানসিকভাবে পঙ্গুও হয়ে যেতে পারে। আমি আমার আদর্শের মানুষের কাছথেকে এমন সমালোচনা আশা করেছিলাম না, করিনা। উচিৎ ছিল কোথায় ভুল হচ্ছে, সিস্টেমের কোন অংশে ভুল হচ্ছে, ছাত্রছাত্রীদের শুধু নম্বরের পিছনে দৌঁড়াতে শেখানো হচ্ছে, তাতে তাদের শিক্ষার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছেনা, তারা শিখতে পারছেনা, তারা শুধু নাম্বারের লক্ষ্যে পড়াশোনা করছে এমন সিস্টেমের সমালোচনা করা, এমন সিস্টেমকে বদলাতে সমালোচনা করা। শুধুমাত্র এইটুকু ছাড়া আমি আমার লেখিকার সমস্ত মতের সাথেই সবসময় একমত হই। হ্যাঁ, ব্যক্তিবিশেষে ভিন্নমত হতেই পারে, হয়ও। আমি আমার লেখিকার সমস্ত মতকে চিন্তা করে, বিবেচনা করে আত্মস্থ করি, এবং আমার লেখিকার সমস্ত লড়াইকে ভীষণভাবে সম্মান করি, আমার লেখিকা আমার অহংকার। গোটা পৃথিবীও যদি বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায়, আমি আমার লেখিকার পাশে গিয়ে দাঁড়াবো সবসময় গোটা পৃথিবীর বিপরীতে গিয়ে।
২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬, সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর পর লেখিকা তসলিমা নাসরিন একটা পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা লঙ্ঘন করে সৈয়দ শামসুল হক লেখিকার লেখা বই ক'এর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, একশ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেছিলেন ও পরে বাংলাদেশ সরকার বইটা নিসিদ্ধ করে। পরে এই মামলার কোনো শুনানি হয়নি। এখন সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর পর ক'এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে এই নিয়ে একটা পোস্ট। আমার মতে লেখিকা কোনো ভুল কিছু বলেনি। লেখিকার বই নিসিদ্ধ হয়েছে অন্যায়ভাবে, অন্যায়ভাবে লেখিকার নির্বাসন সহ তার লেখাকেও নির্বাসন দিয়েছে বাংলাদেশ, বাকস্বাধীনতাকে মুল্যহীন করে দেওয়া হয়েছে। লেখিকা কেন, একজন সাধারন মানুষের সাথে এমন হলেও সেই সাধারন মানুষের গলা থেকে ক্ষোভ ফুটে উঠত। স্বাভাবিক ভাবেই লেখিকার মধ্যে থেকে ক্ষোভ ফুটে ওঠে। লেখিকা কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেনি গোটা জীবনে, সোজা কথা বলতে পছন্দ করেন এবং সেই সোজা কথা যত বিতর্কিতই হোকনা কেন, উনি কখনোই সেটা প্রকাশ করতে পিছিয়ে যানানি। বরং কিছু ভুল করে থাকলে সেই ভুলটা স্বীকার করেছেন অকপটে। জীবিতকালীন যে মানুষটা লেখিকার সাথে অন্যায় করেছেন, মৃত্যুর পর যদি লেখিকা সৈয়দ হকের প্রসঙ্গে ভালো ভালো কথা বলতেন, তবে সেটা মেকি শোনাত। আমাদের আদর্শেও সেটা চরম ধাক্কা দিত। লেখিকা সেটাই বলেছেন যেটা সত্যিই হয়েছিল বা করা হয়েছিল। লেখিকা আদর্শের পথে অবিচল থেকেছেন। তার এমন লেখা প্রসঙ্গে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, বরং সেটা আমাদের আরও বেশি করে শিখিয়েছে যে পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমরা যেন আমাদের সত্যের রাস্তাতে সবসময় অবিচল থাকি মিথ্যেকে প্রশ্রয় না দিয়ে বা মেকি আচরণ না করে। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট এক নাস্তিকবাদি মানুষ আসিফ মহিউদ্দিন তসলিমা নাসরিনের দিকে প্রশ্ন তুলেছেন, যে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর সেই ব্যক্তিকে অগুরুত্বপূর্ণ করে লেখিকা সবসময় নিজের বই, নিজের লেখা নিয়েই সবসময় বলে গেছেন।
আমি মাননীয় আসিফ মহিউদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, আদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে, সত্যের বিরুদ্ধে গিয়ে, ক্ষোভকে লুকিয়ে রেখে শুধু মাত্র কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে সেই ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা তা সেই ব্যক্তি যতই খারাপকিছু করে থাকুক না কেন, এটা কতটা যুক্তির বা এটা কেমন আদর্শ? আমি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কেউ নই, একজন সাধারন মানুষ হিসেবে আমার একটা প্রশ্ন তুলে ধরলাম।
No comments:
Post a Comment