রজনীগন্ধা।
সৌম্যজিৎ।
আমি রজনীগন্ধা,
লোকে লোকে আমাকে চেনে রাতের রজনী নামে,
দিনে রাতে এপাড়ায় ভিড় জমে পুরুষের,
এ ঘর, সে ঘর সব ঘরে বন্ধ দরজা, জানালার পিছনে ঠিক যেন পরিবারের মতো -
রোজ একটা করে পরিবার গড়ে ওঠে,
কিছু মুহূর্তের জন্য স্বামী, স্ত্রী'র মতো একটা পরিবার।
আমার ঘরেও একটা করে পরিবার হয় রোজ,
ঘরের আসবাবপত্র, টেবিল, আয়না, বিছানা সব স্থির, যেমন থাকে,
আমিও সেই পরিবারের একটা স্থির অংশ, জড় পদার্থের মতো,
শুধু পাল্টে যায় পুরুষ মানুষটার মুখ।
লোকের চোখে আমি একটা শুধুই আস্ত রক্ত মাংসের শরীর,
এক জীবন্ত জড়। প্রাণ আছে, শরীর আছে, রক্ত, মাংস সব আছে,
শুধু মন নেই।
মন নেই, প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই, নেই কোনো শখ, আল্লাদ,
শুধু সেই পুরুষগুলোর মনোরঞ্জনের জন্য মুখে রং মেখে, শরীরে সুগন্ধি মেখে,
তাদের হাতে নিজেকে তুলে দেওয়া।
আমারও একটা পরিবার ছিল,
একটাই পরিবার আবছা মনে আসে।
আমি তখন পাঁচ, ছয় হবো,
বাড়িতে উঠোনে দৌঁড়ে দৌঁড়ে খেলতাম, রাতে মা'র কোলে মাথা রেখে ঘুমাতাম,
বাবা ভোর রাতে রিক্সা নিয়ে বের হয়ে যেত,
সন্ধ্যার পর মাতাল হয়ে ফিরত।
একদিন ভীষণ জ্বরে মা আমার বিছানা থেকে উঠতে পারলনা,
আমি পাশের গ্রামের ডাক্তার ডাকতে যাবো, মা আমাকে বারবার যেতে নিষেধ করছিল,
আমি শুনিনি। দৌঁড়ে গিয়ে দেখি ডাক্তার নেই, বাড়ি ফিরে এসে –
উঠোন ভর্তি ভিড় ঠেলে ঘরে ঢুকে দেখি মা শুয়ে আছে,
চুপচাপ। একদম স্থির হয়ে আছে, ঘরের সব জিনিসের মতো স্থির।
আমি ডাকলাম, “মা।”
“মা ওঠো, কথা বলো।”
মা উঠল না। কথা বলল না।
বাবাকে কিছু মানুষ ধরে আনল,
পা টলতে টলতে বাবা এসে মা’র সামনে কিছুক্ষণ বসে থাকল।
তারপর সবাইমিলে মা’কে নিয়ে গেল,
পুড়ে ছারখার হল গোটা শরীর।
কিছুদিন বাবার দেখা পেলাম না, যখন ফিরল,
আমায় এসে বলল, “তুই নতুন জায়গায় যাবি। সেখানে অনেক মানুষ পাবি।
সবাই তোকে খুব ভালোবাসবে, খাইয়ে দেবে।”
আমাকে নিয়ে এখানে চলে এলো।
এ পাড়ার মাসির কাছে আমাকে রেখে বলল,
“আজ থেকে এখানেই থাকবি। মাসি যা বলবে, তাই করবি।
আমি আসবো মাঝে মাঝে। দেখা করে যাবো।”
বাবা চলে গেল।
আর সে এখানে আসেনি।
মাসি আমাকে নাচ শেখাল, গান শেখাল, খাবার দিল,
দিদিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল,
আস্তে আস্তে এটাই আমার পরিবার হয়ে গেল।
এখন আমি বড় হয়েছি, ভরা যৌবন, টানটান চামড়া শরীর জুরে আছে,
আমার ঘরে এখন রোজ রোজ নতুন সঙ্গী আসে, পুরুষ সঙ্গী।
গায়ে পারফিউম আর মুখে মদের গন্ধ নিয়ে আসে,
টলকাতে টলকাতে এসে দরজায় কড়া নাড়ে,
দরজা খুললেই ভিতরে ঢুকে আমাকে জড়িয়ে ধরে,
দরজা বন্ধ করে গোটা শরীরে চুমু খায়, গায়ের কাপড় খুলে দিয়ে –
নেকড়ের মতো কামড়ে কামড়ে দাগ বসিয়ে দেয়,
আমি যন্ত্রণাতে ছটপট করি, যন্ত্রণাতে মুখ ফুটে বেরিয়ে আসা আওয়াজে
তারা তৃপ্ত হয়।
ওরা আমার যন্ত্রণা বোঝেনা, ওরা শুধু আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা-
যন্ত্রণার আওয়াজ উপভোগ করে।
আমি যত চিৎকার করি, তত জোরে আমাকে চেপে ধরে নখের আঁচড় দেয়,
কামড়ায়।
শরীর ফুটে রক্তের দাগ বেরিয়ে আসে।
আমি চুপ হয়ে যাই।
আমার পেট ভারি হয়েছে,
একজন সন্তান আসছে আমার কোলে,
সন্তানের বাবা, মা দুটোই আমি,
শুধু চিন্তাগুলো মাথা নাড়া দিয়ে ওঠে, সন্তানের ভবিষ্যৎ কি হবে!
যদি মেয়ে হয়, সেও কি আমার মতো করেই বড় হবে এখানে?
সেও কি কখনো আমারই মতো করে যন্ত্রণায় ছটপট করবে আর-
পুরুষগুলো সেটাকে উপভোগ করবে?
আমি চাইনা আমার সন্তান এখানে থাকুক,
আমি চাই সে নিজের পরিচয়ে সম্মানের সাথে বড় হোক,
আমি চাই সে লড়াই করুক অসহায় মেয়েদের জন্য,
আমি চাই আর যেন কোনো মেয়ে এই যন্ত্রণার মধ্যে জীবন না কাটায়।
এক মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের কথা খুব শুনি,
শুনেছি সে নারীদের জন্য অনেক লড়াই করে,
নারীর অধিকার তুলে ধরার চেষ্টা করছে,
আমি চাই আমার সন্তানও যেন নারীদের জন্য লড়াই করে,
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে,
নারীর কষ্ট দূর করতে তসলিমা নাসরিনের মতো একজন মানুষ হয়ে ওঠে।
আরেকটা রজনীগন্ধা যেন এখানে না আসে আমার মতো,
বরং সমস্ত জায়গায় যেন একটা করে তসলিমা নাসরিন জন্ম নিয়ে আসে।
সৌম্যজিৎ।
আমি রজনীগন্ধা,
লোকে লোকে আমাকে চেনে রাতের রজনী নামে,
দিনে রাতে এপাড়ায় ভিড় জমে পুরুষের,
এ ঘর, সে ঘর সব ঘরে বন্ধ দরজা, জানালার পিছনে ঠিক যেন পরিবারের মতো -
রোজ একটা করে পরিবার গড়ে ওঠে,
কিছু মুহূর্তের জন্য স্বামী, স্ত্রী'র মতো একটা পরিবার।
আমার ঘরেও একটা করে পরিবার হয় রোজ,
ঘরের আসবাবপত্র, টেবিল, আয়না, বিছানা সব স্থির, যেমন থাকে,
আমিও সেই পরিবারের একটা স্থির অংশ, জড় পদার্থের মতো,
শুধু পাল্টে যায় পুরুষ মানুষটার মুখ।
লোকের চোখে আমি একটা শুধুই আস্ত রক্ত মাংসের শরীর,
এক জীবন্ত জড়। প্রাণ আছে, শরীর আছে, রক্ত, মাংস সব আছে,
শুধু মন নেই।
মন নেই, প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই, নেই কোনো শখ, আল্লাদ,
শুধু সেই পুরুষগুলোর মনোরঞ্জনের জন্য মুখে রং মেখে, শরীরে সুগন্ধি মেখে,
তাদের হাতে নিজেকে তুলে দেওয়া।
আমারও একটা পরিবার ছিল,
একটাই পরিবার আবছা মনে আসে।
আমি তখন পাঁচ, ছয় হবো,
বাড়িতে উঠোনে দৌঁড়ে দৌঁড়ে খেলতাম, রাতে মা'র কোলে মাথা রেখে ঘুমাতাম,
বাবা ভোর রাতে রিক্সা নিয়ে বের হয়ে যেত,
সন্ধ্যার পর মাতাল হয়ে ফিরত।
একদিন ভীষণ জ্বরে মা আমার বিছানা থেকে উঠতে পারলনা,
আমি পাশের গ্রামের ডাক্তার ডাকতে যাবো, মা আমাকে বারবার যেতে নিষেধ করছিল,
আমি শুনিনি। দৌঁড়ে গিয়ে দেখি ডাক্তার নেই, বাড়ি ফিরে এসে –
উঠোন ভর্তি ভিড় ঠেলে ঘরে ঢুকে দেখি মা শুয়ে আছে,
চুপচাপ। একদম স্থির হয়ে আছে, ঘরের সব জিনিসের মতো স্থির।
আমি ডাকলাম, “মা।”
“মা ওঠো, কথা বলো।”
মা উঠল না। কথা বলল না।
বাবাকে কিছু মানুষ ধরে আনল,
পা টলতে টলতে বাবা এসে মা’র সামনে কিছুক্ষণ বসে থাকল।
তারপর সবাইমিলে মা’কে নিয়ে গেল,
পুড়ে ছারখার হল গোটা শরীর।
কিছুদিন বাবার দেখা পেলাম না, যখন ফিরল,
আমায় এসে বলল, “তুই নতুন জায়গায় যাবি। সেখানে অনেক মানুষ পাবি।
সবাই তোকে খুব ভালোবাসবে, খাইয়ে দেবে।”
আমাকে নিয়ে এখানে চলে এলো।
এ পাড়ার মাসির কাছে আমাকে রেখে বলল,
“আজ থেকে এখানেই থাকবি। মাসি যা বলবে, তাই করবি।
আমি আসবো মাঝে মাঝে। দেখা করে যাবো।”
বাবা চলে গেল।
আর সে এখানে আসেনি।
মাসি আমাকে নাচ শেখাল, গান শেখাল, খাবার দিল,
দিদিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল,
আস্তে আস্তে এটাই আমার পরিবার হয়ে গেল।
এখন আমি বড় হয়েছি, ভরা যৌবন, টানটান চামড়া শরীর জুরে আছে,
আমার ঘরে এখন রোজ রোজ নতুন সঙ্গী আসে, পুরুষ সঙ্গী।
গায়ে পারফিউম আর মুখে মদের গন্ধ নিয়ে আসে,
টলকাতে টলকাতে এসে দরজায় কড়া নাড়ে,
দরজা খুললেই ভিতরে ঢুকে আমাকে জড়িয়ে ধরে,
দরজা বন্ধ করে গোটা শরীরে চুমু খায়, গায়ের কাপড় খুলে দিয়ে –
নেকড়ের মতো কামড়ে কামড়ে দাগ বসিয়ে দেয়,
আমি যন্ত্রণাতে ছটপট করি, যন্ত্রণাতে মুখ ফুটে বেরিয়ে আসা আওয়াজে
তারা তৃপ্ত হয়।
ওরা আমার যন্ত্রণা বোঝেনা, ওরা শুধু আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা-
যন্ত্রণার আওয়াজ উপভোগ করে।
আমি যত চিৎকার করি, তত জোরে আমাকে চেপে ধরে নখের আঁচড় দেয়,
কামড়ায়।
শরীর ফুটে রক্তের দাগ বেরিয়ে আসে।
আমি চুপ হয়ে যাই।
আমার পেট ভারি হয়েছে,
একজন সন্তান আসছে আমার কোলে,
সন্তানের বাবা, মা দুটোই আমি,
শুধু চিন্তাগুলো মাথা নাড়া দিয়ে ওঠে, সন্তানের ভবিষ্যৎ কি হবে!
যদি মেয়ে হয়, সেও কি আমার মতো করেই বড় হবে এখানে?
সেও কি কখনো আমারই মতো করে যন্ত্রণায় ছটপট করবে আর-
পুরুষগুলো সেটাকে উপভোগ করবে?
আমি চাইনা আমার সন্তান এখানে থাকুক,
আমি চাই সে নিজের পরিচয়ে সম্মানের সাথে বড় হোক,
আমি চাই সে লড়াই করুক অসহায় মেয়েদের জন্য,
আমি চাই আর যেন কোনো মেয়ে এই যন্ত্রণার মধ্যে জীবন না কাটায়।
এক মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের কথা খুব শুনি,
শুনেছি সে নারীদের জন্য অনেক লড়াই করে,
নারীর অধিকার তুলে ধরার চেষ্টা করছে,
আমি চাই আমার সন্তানও যেন নারীদের জন্য লড়াই করে,
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে,
নারীর কষ্ট দূর করতে তসলিমা নাসরিনের মতো একজন মানুষ হয়ে ওঠে।
আরেকটা রজনীগন্ধা যেন এখানে না আসে আমার মতো,
বরং সমস্ত জায়গায় যেন একটা করে তসলিমা নাসরিন জন্ম নিয়ে আসে।
No comments:
Post a Comment