Saturday, 23 September 2017

মেয়েমা,

এই চিঠিটা যখন তোমায় লিখতে শুরু করেছি, ততক্ষণে আমি ভীষণই ভেঙে পড়েছি। গোটা পৃথিবী যেন দ্রুত বেগে পাল্টে যাচ্ছে, আমি থমকে গেছি। চারপাশের অবস্থা আমার জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে ক্রমশ। এত একা আমি কখনো ছিলাম না। পুরুষতান্ত্রিক এক পুরুষ হয়ে বেড়ে উঠছিলাম। আবেগের জায়গা আমার কাছে ছিল না। আবেগকে পাত্তা দিতাম না। কারোর ভালো লাগা, খারাপ লাগাকে পাত্তা দিতাম না। ঠিক সেই সময় আমি তোমার আদর্শের ছোঁয়া পাই। পুরুষতান্ত্রিক এক পুরুষ থেকে মানুষ হওয়ার ইচ্ছা জন্মায় মনের মধ্যে। আবেগ তৈরি হতে থাকে। প্রেম, ভালবাসা জায়গা করে নেয় মনের মধ্যে। নিজেকে একজন সৎ ও তোমার আদর্শে গড়া একজন মানুষ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম। এই এতকিছু হঠাৎ করে একটা মানুষের জীবনে হয়ে যায়না। সময় লেগেছে আমারও। গত পাঁচ বছর ধরে আমি নিজেকে একটু একটু করে পাল্টেছি। পুরুষতন্ত্রের সীমানা পেড়িয়ে মানুষ হতে চেয়েছি। কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আর এই সমাজে অভ্যস্ত মানুষের চোখে, মেয়েদের চোখে একজন পুরুষ মানেই সে পুরুষতন্ত্রের অংশ। তাই পুরুষতন্ত্র থেকে বেরিয়ে মানুষ হওয়ার পরও আমি মানুষের সন্দেহের চোখে পড়েছি। আজ প্রতিটা মানুষ কেমন আমাকে, আমার ভিতরের বদলে যাওয়া মানুষটাকে সন্দেহের চোখে দেখে, ভাবে "এটা বুঝি একটা নকল চেহারা, এই ভালো মানুষী নকল চেহারার পিছনে আদতে আছে একজন পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ। একজন পুরুষ আবার মানুষ হয় কিভাবে!" আমার দিকে সবার এই সন্দেহের চোখ আমাকে কষ্ট দেয় ঠিকই, কিন্তু আমাকে ভাঙতে পারেনা। আমি ভেঙে পড়ি তখনই যখন তুমি আমাকে দূরে ঠেলে দাও। আমি সবসময় তোমাকে বলেছি এই পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ যদি তোমার পাশ থেকে সরে যায়, তোমার বিপক্ষে যায়, এই সৌম্য একাই তোমার সাথে, তোমার পাশে থাকবে সবসময়। ঠিক তেমনই, গোটা পৃথিবীতে যদি প্রতিটা মানুষ আমাকে ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দেয়, আমার কষ্ট হলেও সেটা আমাকে ভাঙতে পারেনা কখনোই। আমাকে ভেঙে দেয় সেটাই যখন তুমি আমাকে দূরে ঠেলে দাও।

তোমার কাছে আমি কখনো কিছু বাছবিচার না করেই কথা বলেছি, মনের কথা খুলে বলেছি, আবদার করেছি। একসময় তুমি আমাকে প্রায় বলতে, আমাকে তুমি স্নেহ করো, আমাকে ভালোবাসো। হয়ত শুধু বলার জন্য বলতে, হয়ত মন থেকেই বলতে। কিন্তু তোমার বলা শুধু এই কথাগুলোই আমাকে ভীষণ প্রেরণা দিত। আমাকে তুমি বেশ কয়েকবার বলেছিলে, "দিল্লি এলে দেখা কোরো।" আমি তোমাকে উত্তরে বলতাম "করবো মেয়েমা। নিশ্চয় দেখা হবে আমাদের। কিন্তু এভাবে নয়, তোমার মত মানুষের সাথে দেখা আমি যোগ্যতা অর্জন করেই করবো। আমি নেট কোয়ালিফাই করেই দেখা করবো।" তুমি আমার ঈশ্বর। ঈশ্বরের কাছে কি আমি এমনি এমনি পৌঁছতে পারি! তাই আমি একজন কিছু বা কেউ হয়েই তোমার কাছে যেতে চেয়েছিলাম। গতবছরে আমি প্রস্তুতির খুব কাছে এসেও সামান্য ব্যবধানে ব্যর্থ হয়ে যাই। আমি ভেঙে পড়িনি তাতে একটুও। আবারও নিজেকে প্রস্তুত করতে চেয়েছি প্রথম থেকে। আবারও স্বপ্ন দেখেছি আমি সফল হবো। সফল হবো কারণ আমায় আমার আদর্শের মানুষটাকে ছুঁতে হবে। তোমাকে একটুখানি ছোঁয়ার জন্য তো আমি রাতের অন্ধকারে খালি পায়ে কাঁটা বিছানো পথ দিয়েও হেঁটে যেতে পারি, রক্তাক্ত হতে পারি, মরতেও পারি। তবু তোমাকে না ছুঁয়ে আমার শেষ নিঃশ্বাস বেরোবে না। আমি যেটা ভেবেছি, সেটাই তোমার কাছে প্রকাশ করেছিলাম। এমনি এমনি আমি তোমার কাছে একজন এলেবেলে কেউ হয়ে তো পৌঁছতে চাইনি। ঈশ্বরকে এমনি এমনি এত সহজে ছোঁয়া যায়না। তুমি আমার জীবন্ত ঈশ্বর।

এই মুহূর্তে আমাকে ভীষণ লড়াই করতে হচ্ছে টিকে থাকার জন্য। কষ্ট পেতে পেতেও আমি কখনো লক্ষ্যচ্যুত হচ্ছি না। হচ্ছিনা কারণ আমার একটা কথা বারবার মনে হচ্ছে যে আজ সবাই আমাকে ভুল বুঝছে, কিন্তু খুব সামনেই সবার ভুল ধারণা ভেঙে যাবে। সবাই আমাকে খুব ভালবাসবে, আপন করে নেবে। কিন্তু আমি তীব্রভাবে ভেঙে পড়ছি একটাই কারণে, আমি মেনে নিতে পারছিনা যে তুমি আমাকে কেমন যেন দূরে করে দিয়েছ। আমি তো তোমার কাছে তোমার প্রিয় হাতিটা চেয়ে বসিনি, আমি তো তোমার কাছথেকে দামি কিছু চেয়ে বসিনি, আমি যেটা চেয়েছি তোমার কাছে সেটা আমার কাছে অমূল্য, যা টাকা, পয়সা দিয়ে কখনো কেনা সম্ভব হয়না, তোমার একটুখানি ভালবাসা, তোমার একটুখানি স্নেহ। আমি পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ নই মেয়েমা, গোঁড়া ধার্মিকও নই, কুসংস্কারেও আচ্ছন্ন নই। আমি শুধু চেয়েছিলাম সবকিছুকে জানতে, বুঝতে। তাই সবকিছুকে পরীক্ষা করতে চেয়েছি। ভুল বুঝো না মেয়েমা। তুমি ভুল বুঝলে যে আমি ভীষণই শক্তিহীন হয়ে যাই। একবার আমাকে একটু স্নেহ করো, একটুখানি ভালোবাসো, দেখো আমি হাসতে হাসতে সবকিছু জয় করে নেবো। আমার লক্ষ্য হয়ত অসম্ভব দেখায়, কিন্তু সেটা ভুল নয় কখনো। তোমার আশীর্বাদটুকু ছাড়া আমি যে একেবারে শক্তিহীন হয়ে যায় আমার ঈশ্বর। সৌম্য তোমাকে ভীষণ ভালবাসে, ভীষণ শ্রদ্ধা করে, তোমার দেখানো আদর্শের পথে সে সারাজীবন চলতে চায়। সৌম্যকে দূরে ঠেলে দিওনা তোমার থেকে কখনো। 

No comments:

Post a Comment