Wednesday, 19 April 2017





নারীর নাড়ি।
লেখক - জান্নাতুন নাঈম প্রীতি।



পাঠকের পরিদর্শন:

জান্নাতুন নাঈম প্রীতির লেখা নির্বাচিত কলাম সমগ্র নিয়ে "নারীর নাড়ি" একপ্রকার গোগ্রাসেই গিলে ফেললাম। সাবলীল ও সহজেই বোধগম্য ভাষা ও ঘটনাসমূহে লেখা এই বইটাতে একটামাত্র অস্বস্তি বলতে সূচিপত্র নেই। লেখক নিজের জীবনের সমস্যা ও প্রতিবাদের ভাষা খুব সুন্দরভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন যাতে পাঠক সেইসব সত্যকে নিজেদের জীবনে উপলব্ধি করতে পারে ও নিজেদের অভিজ্ঞতাকে স্মৃতিতে টাটকা ও তাজা করতে পারে, চিন্তা করতে পারে, চিন্তাশক্তির দরজা খুলে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। এবং সেইসাথে যেসমস্ত তরুণ প্রজন্ম তাদের জীবনে যেকোনো ক্ষেত্রেই অত্যাচার, অসম্মান ও অসুবিধার সম্মুখীন হবে, সেখানে যেন হীনমন্যতায় না ভুগে সরাসরি প্রতিবাদের ভাষাকে অস্ত্র বানাতে পারে, সেইজন্য এই বইটা বিশেষ উপযোগী ও যোগ্য উদাহরণ।


লেখক একপ্রকার সামাজিক ব্যাধি, একপ্রকার ভাইরাস পাতায় পাতায় তুলে ধরে পাঠককে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে ভাইরাসের নিজস্ব কোনো কর্মক্ষমতা, বৃদ্ধি ও বংশবিস্তার নেই, কিন্তু পরমাধ্যমে তা অনায়াসে দ্রুত গতিতে সংক্রমিত করতে পারে গোটা সমাজকে। সহজ কথায় এই ভাইরাস হল একটি তন্ত্র যা বিশেষ বিশেষ কার্যসিদ্ধিতে কতগুলো নিয়ম নিয়ে গঠিত এবং সেই তন্ত্রদ্বারা বেষ্টিত নিয়মগুলিতে সমাজ আজ এমনই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, যে সেগুলিই চিরন্তন সত্য। সেগুলিই ধর্ম। এবং সেগুলিই কর্মের মাধ্যমে রূপ দিয়ে যুগের পর যুগ বহন করাটাই একমাত্র মনুষ্যত্ব। অথচ এই ভাইরাস যে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, মানবাধিকারকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে, মানবজাতিকে, সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ফেলছে তা মানুষের অবচেতন মস্তিষ্কে ঘুরপাক খেলেও, সেটাকেই নিয়ম মেনে প্রশ্রয় দেওয়াটাই সম্মানের ও টিকে থাকার একমাত্র উপায় ভেবে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে চা, জলখাবারের মত সহজভাবে। লেখকের চরিত্র এই চিরাচরিত ভাইরাসের বিরুদ্ধে কিন্তু মুখ বন্ধ করে থাকেনি, সহ্য করে নেয়নি অন্যায়কে। শিরদাঁড়া সোজা করে লড়াইটাকে রূপ দিয়েছিলেন সাহসের সাথে। একাকী। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে। এমন চরিত্র গোটা সমাজের সামনে অগ্রগতির বাহক। লেখক বারেবারে বুঝিয়েছেন "নারী কোনো বস্তু নয়। পুরুষের সামনে নারী উপভোগ্য বিষয় নয়। নারী শুধু শরীর নয়। নারী মানে মানুষ। যেভাবে পুরুষ চালকের আসনে বসে সমাজকে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সেভাবে নারীও পারে সমাজকে চালনা করতে। নারীরও মস্তিস্ক আছে এবং মানুষ হিসেবে পুরুষ যতটা মস্তিষ্ক-বুদ্ধির অধিকারী, নারীও ততটাই মস্তিষ্কে-বুদ্ধির অধিকারী। তাহলে নারী কেন পুরুষের প্রভুত্ব স্বীকার করবে!"

সম্মান, পরিচয়, সৌন্দর্য্য মানুষের আত্মমর্যাদায়, জ্ঞানে, চিন্তাতে, ব্যক্তিত্বে। "তুমি নারী, আমি পুরুষ তাই আমার সম্মান, পরিচয়, জ্ঞান তোমার থেকে বেশি" এমন চিন্তাই সেই মারাত্মক সংক্রমিত ভাইরাস যা সমাজ নিয়ম করে বহন করছে। লেখক জান্নাতুন নাঈম প্রীতি কিন্তু একজন নারী বলে অন্যায়কে মাথা পেতে এটাই নিয়ম ভেবে মেনে নেয়নি। কলমের ভাষাকে তুলে ধরেছে, লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে গেছে নিজেকে সম্মান করে। যখন সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা জমায়েত হয়ে “এক দফা এক দাবি, প্রীতি তুই কবে যাবি!” স্লোগান তুলেছে, তখনও সে সামনে দিয়ে একাকী হেঁটে গেছে প্রাণে একরাশ ভয় নিয়ে, কিন্তু থেমে যায়নি, হেরে যায়নি। আরও  শক্ত হাতে কলমকে তুলে ধরেছে। নিজের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন হতে দেয়নি।


বইটাতে একটি বিশেষ জায়গা বিশেষভাবে আমার মন কেড়েছে। "একটা ছেলে জন্মের পর থেকে যদি দেখে তার বাবা উড়ে উড়ে অফিসে যাচ্ছে, সে সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করবে। পরে যদি সে তার বাবাকে দুপায়ে হাঁটতে দেখে, সেটাই তার কাছে অস্বাভাবিক লাগবে।" এই সমাজে জন্মের পর থেকেই ছেলেদের শেখানো হয় যে তুই ছেলে, তোর পোশাক শার্ট, প্যান্ট, তুই বন্দুক নিয়ে খেলবি, তুই ছেলে তাই তোকে কাঁদতে নেই, মেয়েদের কাছে হারতে নেই। আর একটা মেয়েকে শেখানো হয় তুই মেয়ে, তোর পোশাক স্কার্ট, ফ্রক, শাড়ি, বোরখা, হিজাব। তুই পুতুল নিয়ে খেলবি। ঘরে থাকবি। পুরুষের দাসত্ব করবি। তোর শরীরটাই ইজ্জত, তাই সেটাকে রক্ষা করবি। ঢাকা থাকবি। এমনভাবে শেখানো হয় যাতে নারী মানেই শরীর। এরপর ছেলে, মেয়েরা তাদের বড়দের থেকে আস্তে আস্তে এমন শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। এটাকেই সমাজের নিয়ম ভেবে চলতে শুরু করে ও পরবর্তীকালে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সেটাই চালিত করে। এভাবেই সমাজের ভাইরাস এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বাহিত হচ্ছে সুরক্ষিতভাবেই। লেখক একটা ছোট ঘটনা তুলে ধরেছেন, ছোটকালে যখন সবে একটা পুরুষের প্রতি প্রেম প্রেম উত্তেজনার উপলব্ধি তৈরি হচ্ছে, একসাথে পুরুষটার সাথে বাড়ি ফেরার পথে আজানের শব্দে পুরুষটি লেখককে মাথা ঢাকতে বলে। লেখক উল্টে তাকে মাথায় টুপি পরতে বলে। ছেলেটি ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে উত্তর দেয় কাপড় শুধু মেয়েদের মাথাতেই দিতে হয়, পুরুষের নয়। তখনই লেখকের মন থেকে পুরুষটির প্রতি ভালোলাগা দূর হয়ে যায়। শিশুকালেই লেখকের মধ্যে নারী, পুরুষ বৈষম্য নিয়ে যে তোলপাড় শুরু হয়েছিল, যে প্রশ্ন উঠেছিল তা তার মননের অগ্রগতির পরিচয় বহন করে।


শুরুতে লেখকের ছাত্রজীবনে যে ভয়ঙ্কর অন্ধকার নেমে এসেছিল, একটা বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পরে, সকলের সামনে লজ্জার হাটে মাথা বিক্রি না করে, বরং নিজচেষ্টায় ঘুরে দাঁড়ানো ও ব্যর্থতার দেওয়াল ছিন্ন করে সাফল্যের দরজা নিজে হাতে খোলার যে সাহস দেখিয়েছিলেন তা সমস্ত পাঠককূলকে নিঃসন্দেহে উজ্জীবিত করবে এবং একইসাথে প্রথাগত চলের বাইরে গিয়ে, টাকার সামনে নিজের স্বপ্নকে আপোষ না করার যে মানসিকতা তুলে ধরেছিলেন তা প্রশংসাযোগ্য।


শুধু মাত্র বুক, পেট, স্তন নিয়েই যে একটা নারী হয়না, শুধুমাত্র শরীর নিয়েই যে একটা নারী হয়না, নারীর নাড়ি যে স্পন্দিত হয়, নারীর নাড়ি যে এক প্রাণ, এক মানুষ, তা গতানুগতিক প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে সেইসব পুরুষতান্ত্রিক পুরুষকে সপাটে থাপ্পড় মেরে বোঝানোর মত করেই পাতায় পাতায় বুঝিয়ে দিয়েছে লেখক জান্নাতুন নাঈম প্রীতি। নারী দুর্বল নয়, নারী অবহেলার যোগ্য নয় এই বিশ্বাস যদি প্রতিটি নারী নিজেদের চিন্তায় তুলে ধরতে পারে, আত্মসম্মান বলতে সমস্ত অসুবিধাগুলো, অত্যাচারগুলো সহ্য করে পাশকাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়া এমন চিন্তার বাইরে বেরিয়ে বাস্তবিকভাবেই নিজেদের মর্যাদা নিজেরা রক্ষা করতে পারবে সেটাকেই আত্মসম্মান বলে তা এই বইটা খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। এবং লেখকের এই আত্মসম্মানবোধকে আমি সম্মান জানাই। এমন এক যোদ্ধা লেখকের লেখা পড়তে পেরে, এমন এক মানববাদী মানুষের চিন্তাকে আমার মননে চিন্তা করতে পেরে, এবং সমাজে এমন একজন চিন্তাধারী মানুষকে পেয়ে আমি বাস্তবিক অগ্রগতির পথে তীব্র আশাবাদী।


                                                                                                ধন্যবাদ।

                                                                                   সৌম্যজিৎ দত্ত। কলকাতা, ভারত।
                                                                                         

No comments:

Post a Comment