Monday, 1 May 2017


১৩.

প্রেমের নেশা ভূত হয়ে চেপে বসেছে মাথায়। খাওয়া, ঘুম সব উড়ে গেছে। একাদশ শ্রেণীর পরীক্ষা ভীষণ খারাপ হল। পাশ করতে পারবো কিনা সেই বিষয়ে মনের মধ্যে সন্দেহের মেঘ জমা হয়েছে। সবার থেকে নিজেকে একেবারে আলাদা করে ফেলেছি। কারোর সাথে মিশিনা, কথা বলিনা, চুপ হয়ে থাকি, খেলিনা। একেতে দুশ্চিন্তা পরীক্ষার ফল নিয়ে, তার ওপর প্রেমকে না পাওয়ার মন খারাপ। আমি বেশ বুঝতে পারি, নুপুর ভালবাসে আমাকে। অনুভব করতে পারি। কিন্তু তারপরও যেন মনে হতে থাকে আমি ভালবাসা পাওয়ার স্বাদ পেলাম না। নিজেকে ভীষণ হারিয়ে যাওয়া একজন মনে হতে থাকে। অঙ্ক পড়তে যাই, অঙ্ক পড়ার সময় একটু মন শান্ত থাকে, কিন্তু পড়া হয়ে গেলেই আবার মন অশান্ত হয়ে যায়। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি একদমই পড়তে পারছিনা। একদিন দেবালয়ে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলাম, একাকী। মনে মনে ঠিক করলাম, আর এসব একদম মাথায় আসতে দেবো না। আমি মন দিয়ে পড়াশোনা করবো। আর প্রেম নিয়ে ভাববো না। আমি যেখানেই যাই, সবসময় আমার সাথে ব্যাগ ও ব্যাগ ভর্তি বই থাকে। দেবালয়ে বসে এসব ভাবতে ভাবতে ফিজিক্স বইটা ব্যাগ থেকে বার করে পাতা ওলটাতে থাকলাম। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের একটা চ্যাপ্টার। ভাবলাম আজ বাড়ি ফিরে এই চ্যাপ্টারটাই পড়বো। নুপুরের কথা একদম মনে আসতে দেবো না। পরীক্ষায় পাশ করি বা ফেল করি, সেই দুশ্চিন্তাও একদম মাথাতে আসতে দেবো না। আমার কাজ শুধু পড়া, ভাবা আর প্রস্তুতি নেওয়া উচ্চমাধ্যমিকের জন্য। বাড়ি ফিরে এলাম। আমার তখন নিচতলায় একটা বড় পড়ার ঘর। গোটা ঘরে বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কাউকে ঢুকতে দিইনা। শুধু ভুটো ঢোকে ঘরটাতে। আমি ঘরে ঢুকেই মন দিয়ে পড়তে শুরু করে দিই। বেশ ভালো পড়া হয়। তারসাথে ক্যাল্কুলাস থেকে বেশ কয়েকটা অঙ্কও সমাধান করে ফেলি। খুব ভালো লাগে।


পরের দিন স্কুলে গিয়ে দেখি রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। আমি পাশ করে গেছি। কিন্তু রেজাল্ট খুবই খারাপ। যদিও সেই খারাপ রেজাল্ট আমাকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে পারেনা। কারন আমি মনস্থির করে ফেলেছি যে আমি এবার খুব ভালো করে পড়াশোনা করবো। নুপুর কোথাও থেকে আমার রেজাল্টের কথা জানতে পারে। নুপুর ভয় পেয়ে যায়, ভাবে এমন চলতে থাকলে আমি উচ্চমাধ্যমিকে ফেল করবো। আমি বাড়ি ফিরে একটু বিশ্রাম নিই। কিছুক্ষণের মধ্যেই পড়তে যেতে হবে। ইংরাজির টিউশন আছে। আমি একটু শুই। বাড়িতে পপি দিদিরা এসেছে। আমি বিছানায় দশ মিনিট একটু শুতেই হঠাৎ একটা থাপ্পড় খেয়ে চোখ খুলি। পাপা আমাকে থাপ্পড় মেরেছে, পাপা ভেবেছে আমি স্কুলে না গিয়ে ঘুমাচ্ছি। ঘরে ঢুকেই আমাকে শুয়ে থাকতে দেখে মেরেছে। আমার খুব রাগ হয়ে যায়। আমি পড়তে বেরিয়ে যায়। ভাবি আজ আমি বাসের তলায় পড়বো। খুব রাগে আমি তখন ফুটছি। সেইসময় নুপুর হঠাৎ আমার সাইকেলের পাশে এসে আমাকে বলে দেবালয়ে দেখা করতে। আমার মাথায় কিছু ঢোকে না। আমি ভাবতে পারিনা সেদিন  কি হতে যাচ্ছে! সেদিন যা হতে যাচ্ছে সেটা সেইসময় হোক আমি চাইনি, আমি চেয়েছিলাম যাকিছু হওয়ার বা না হওয়ার সব যেন উচ্চমাধ্যমিকের পর হোক। আমি এখন শুধু পড়তে চাই ভালো করে। কিন্তু নুপুর এতটাই ভয় পেয়েছিল, ও ভেবেছিল ওর মনের কথা খুলে বললে হয়ত আমি ভালো করে পড়তে পারবো, ভালো রেজাল্ট করবো। একটা বড় ভুল করে বসল ও সেদিন আমাকে দেবালয়ে ডেকে নিয়ে গিয়ে। আমি দেবালয়ে পৌঁছে ওকে জিজ্ঞাসা করি, কি হয়েছে! সব ঠিকাছে তো!

নুপুরঃ সব ঠিক আছে। কিছু হয়নি।

আমিঃ তাহলে ডাকলি!

নুপুরঃ আমি তোর রেজাল্টের কথা শুনেছি।

আমিঃ আচ্ছা।

নুপুরঃ ভালো করে পড়। তুই শুধু মন দিয়ে পড়াশোনা কর। আর কিছু ভাবিস না। আমার তোকে ভালো লাগে।

আমিঃ ভালো লাগে! আমাকে তো সবারই ভালো লাগে। এটা আর নতুন কি!

নুপুরঃ আমি তোকে ভালবাসি। আমি ভেবেছিলাম তোকে জানাবো না। কিন্তু তোর রেজাল্ট খারাপ হয়েছে দেখে আমি না বলে আর থাকতে পারলাম না।


আমি চুপ হয়ে গেলাম। বেরিয়ে গেলাম দেবালয় থেকে। নুপুর চুপ হয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকল। আমি ভাবলাম এই একটা কথা শোনার জন্য আমি এতোগুলো বছর অপেক্ষা করে আছি, কিন্তু এখন আমি এই কথাটা শোনার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমি এখন ভালো করে পড়তে চেয়েছিলাম, কিন্ত আমি আবারও দুর্বল হয়ে পড়ছি। আমি সাইকেল চালিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে পড়তে চলে গেলাম।

আমি নুপুরকে ভীষণ ভালবাসি। কিন্তু এইসময় আমি ওর থেকে প্রেমের প্রস্তাব নিতে একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। যে কথাটা শোনার জন্য এত অপেক্ষা করেছি, সেটা তখন শুনলাম যখন আমি শুনতে চাইনি। একদিকে প্রেম আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছে, একদিকে আমি পড়াশোনা করতে চেয়েও আর পড়তে পারছিনা।

No comments:

Post a Comment