Monday, 15 May 2017

স্কুল শব্দটা দেশের মত। দেশের জন্য যেমন আমাদের আবেগ, দেশপ্রেম থাকে, তেমনই স্কুলের প্রতিও থাকে। একটা স্কুলের আসল গর্ব তখন হয় যখন সেই স্কুলের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ছাত্র, ছাত্রীরা সমাজের সামনে সেই শিক্ষা, আদর্শকে তুলে ধরে, স্কুলকে গৌরবান্বিত করে। আমার জীবনে চলার পথে ছোট থেকে এমন কিছু শিক্ষকের সাথ পেয়েছি যাদের থেকে আমি প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে পেরেছি। কেন জানিনা তবে যে সমস্ত শিক্ষককে সবাই বেশি করে ভয় পেত, আমি তাদের কাছে ভীষণ স্নেহের, ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠতাম। শাস্তি খুব কম পেয়েছি আমি, মার তো একেবারেই খাইনি। জগন্নাথ হাইস্কুলে পড়তে দীনেশ বাবু ও নিশিথ বাবুকে দেখে সবাই হাড়ে কাঁপত। অথচ আমার ক্ষেত্রে দেখেছি আমি ওদের কাছ থেকে ভীষণ আদর পেয়েছি, দীনেশ বাবু এখনও আমি করিমপুরে গেলেই আমাকে বাড়িতে ডেকে স্নেহ করেন। নিশিথ বাবুর কথা আলাদা করে কি বলবো! মানুষটা আমার দিন রাতের বন্ধু হয়ে গেছিলেন অতগুলো বছরে। আমাকে সবসময় নিজের বাড়িতেই রেখে দিতেন। নিজের বাড়িতে কম থেকেছি, স্যারের বাড়িতেই বেশি থেকেছি আমি। আমার কলকাতাতে ভর্তির সময়ও নিশিথ বাবু নিজে দাঁড়িয়ে আমাকে গাইড করেছেন সবসময়। স্যার মারা যাওয়ার মুহূর্তে আমার কোলে মাথা রেখে শুয়েছিলেন। আমি অসহায় হয়ে উঠেছিলাম। জ্যেঠিমা ও পিউ দিদি ভীষণ কাঁদছিলেন, আমাকে বারবার বলছিলেন "শান্ত স্যারকে বাঁচা।" আমি অসহায় হয়ে হাত, পা মালিশ করছিলাম। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে বললেন স্যার মারা গেছে। আমি চুপ হয়ে যায়। উঠে বেরিয়ে এসে বাথরুমে ঢুকে চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। স্যার আমাকে বারবার বলতেন, "সৌম্য কখনো তোর ভিতরের মানুষটাকে বিক্রি করে দিবিনা। তুই পারবি অনেককিছু পাল্টে দিতে।" শিকারপুর হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমাকে দুজন শিক্ষক অভিভাবকের মত সবসময় আগলে রাখতেন। শনৎ বাবু ও দিপক বাবু। শনৎ বাবু আমার ইংরাজি পরীক্ষার খাতা দেখে একটা কথা বলেছিলেন, যেটা আমার মনের জোর অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। গোটা ক্লাসের মধ্যে উনি বলেছিলেন, "এই সৌম্য কোনো নোট মুখস্থ করে লেখেনা। সৌম্য নিজের থেকে ইংরাজি লেখে, নিজের ভাষায়। ভুল হয়, কিন্তু এভাবেই শিখবে।" দিপকবাবু যেমন ভালবাসতেন, তেমনই আমাকে যেন একটু বেশিই শাসন করতেন। আমি বুঝি, দিপকবাবুর অনেক প্রত্যাশা ছিল আমার ওপরে। উনি লক্ষ্য রাখতেন আমি যেন কিছু ভুল না করে ফেলি দুষ্টুমি করে। কল্যানবাবু! উনি বেশি পড়াননি। কিন্তু আমি যখনই সিলেবাস সম্পর্কিত সমস্যায় পড়েছি, উনি ভীষণ সাহায্য করেছেন। আমি তো অনেক ভরসা করতে শুরু করেছিলাম ওনার ওপরে। তাছাড়া আমরা সমস্ত ছাত্র, ছাত্রী ও শিক্ষকেরা কল্যানবাবুকে অনেক শ্রদ্ধা করি। সত্যিকার অর্থে উনি একজন কিংবদন্তি। আমি আইএসআই তে পড়ার সুযোগ পেয়ে, লেকচারার হওয়ার সুযোগ পেয়ে আমার স্কুলকে গর্বিত করতে পেরেছি। এটা আমার কাছে অহঙ্কারের।  কলকাতা একাডেমী অফ ফাইন আর্টস আমাদের দেশের ঐতিহ্য। যেখানে একসময় আমার আদর্শ লেখিকা তসলিমা নাসরিন কবিতা পাঠ করেছিলেন, ভালোবাসার সহায়তায় সেখানে দাঁড়িয়ে আমি আমারই লেখা কবিতা "বাংলা তোমায় প্রণাম" পাঠ করেছি। আমি আমার স্কুল শিকারপুর উচ্চ (উচ্চতর মাধ্যমিক) বিদ্যালয়কে গর্বিত করতে পেরেছি। আমি যেমন আমার স্কুল, শিক্ষকদের কাছথেকে অনেককিছু শিখেছি, অনেক স্নেহ পেয়েছি, তেমনই লেখিকা তসলিমা নাসরিনের থেকেও আমি অনেক শিখেছি ও স্নেহ পেয়েছি। উনিও আমার শিক্ষক। সবাইকে আমার প্রণাম জানাই।

No comments:

Post a Comment