Sunday, 2 October 2016


দেশ মানে মানুষ। মানবিকতাকে সম্মান করাই দেশভক্তি।


উরি হামলা ও সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে সীমান্তে যখন ভারত ও পাকিস্তানের আবহাওয়া গমগম করছে, দেশের শীর্ষ স্থানে থাকা শিল্পীরা, রাজনীতিবিদরা মুখ খুলেছেন তাদের ব্যক্তিগত অভিমত নিয়ে। অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে সীমান্ত থেকে বহুদূরে দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাবানদের মধ্যে এবং খবরের পাতাগুলোতে রোজ গরম গরম খবরে ছেয়ে যাচ্ছে।


পাকিস্তানের শিল্পী ফাওয়াদ খান, মাহিরা খান'দের যখন ভারত থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হচ্ছে, তখন জনপ্রিয় বলিউড তারকা সলমন খান পাকিস্তানের শিল্পীদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান, দাবি করেন, তাঁরা শিল্পী, জঙ্গি নন। সরকারি ভিসা নিয়ে এ দেশে আসেন তাঁরা। মানবিক বিচারে সলমনের এমন মন্তব্যকে সমর্থন করছি। যুদ্ধ, রাজনীতি, ব্যবসা এসব দিয়ে শিল্প, বিজ্ঞানকে কখনো আটকানো উচিৎ নয়। সলমনের এমন বক্তব্যে বিতর্ক ধেয়ে আসে এই বলিউডি তারকার দিকে। প্রশ্ন ওঠে, এ দেশের ছবিতে কাজ করে অর্থ ও খ্যাতি উপার্জন করলেও কেন পাক শিল্পীরা ভারতে একের পর এক পাক জঙ্গি হানায় মৃতদের জন্য ন্যূনতম শোকপ্রকাশেও রাজি নন। গায়ক অভিজিৎ, রাজ ঠাকরের টুইট বোমা আছড়ে পড়ে সলমনের মন্তব্যের পরই। অভিজিৎ বলেন, "Fawad Khan shows true patriotism towards his country Pakistan whilst bollywood Salman Khan is ashamed to show loyalty to India."   রাজ ঠাকরে বলেন, " ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনও ব্যক্তিগত দুশমনি নেই। যে বুলেট রোজ তাঁদের গায়ে বেঁধে, তা ‘ফিল্মি’ নয়। সিনেমায় তো সলমনের গায়ে বুলেট লাগার পর তিনি উঠে দাঁড়ান। এতই যদি তাঁর পাকিস্তানের প্রতি দরদ, তাহলে সেখানে গিয়েই তিনি কাজকর্মের চেষ্টা করুন।"  এমনকি সলমন এমন মন্তব্য করে মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার রোষের মুখেও পড়েন। 


"দেশ মানে মানুষ" আশির দশকে এমন মানবিক উক্তি তুলে ধরেছিলেন তসলিমা নাসরিন। অত্যন্ত মানবিক উক্তি, সত্যি সোজা ভাষায় সবার সামনে তুলে ধরার জন্য সবসময় বিতর্ক ধাওয়া করেছে এই লেখিকার দিকে। ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো শিল্পীর বা সাধারণ মানুষের নির্বাসন, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণে কর্মস্থল থেকে বিতাড়নকে সমর্থন করিনা। রাষ্ট্রদ্বন্দ্ব রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামরিক দ্বন্দ্বের সাথে শিল্পের কোনো সম্পর্ক নেই, শিল্পীরা চুক্তিবদ্ধভাবে এদেশে কাজ করছেন, তাই তাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিৎ। রাষ্ট্রদ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত শুধু সেনারায় হননা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের সাধারন মানুষও। তাই যুদ্ধকে কখনোই সমর্থন করিনা। রাষ্ট্রদ্বন্দ্ব রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশৃঙ্খলতার ফসল। মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের সাথে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রের সাথে কখনোই জড়িত নন।  তিনি সবসময় সত্যকে, বাকস্বাধীনতাকে, মানবিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তার সমস্ত লেখাগুলোতে আমরা সেসবের পরিচয় পেয়েছি বারেবারে। সলমন খান যখন পাকিস্তানি শিল্পীদের পাশে দাঁড়িয়ে একা সমস্ত বিতর্ককে উপেক্ষা করে নিজের মন্তব্য তুলে ধরেছেন, আমি তার এই সাহসকে কুর্নিশ জানাই। কিন্তু মানবিক অধিকার ও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যখন লেখিকা তসলিমা নাসরিন ভারতীয় সরকারের কাছে লাঞ্ছিত, প্রাক্তন ও বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকার যখন তার লড়াইকে ম্লান করে দিতে সবরকম ভাবে অমানবিক চেষ্টা করে গেছে ও করছে, যখন সিপি আই এম সরকার লেখিকার গায়ে পর্যন্ত হাত দিয়ে ভারতীয় সংবিধানের সমস্ত নীতিকে লঙ্ঘন করে দেশের সংবিধান ও দেশবাসীকে লজ্জার মুখে ফেলেছিল, তখন কোনো একজন ইনফ্লুয়েনশিয়াল ব্যক্তিও মানবিকতার খাতিরে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে লেখিকার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। তসলিমা নাসরিনও কোনো দেশীয় বা আন্তর্জাতিক টেররিস্ট নন তবু তার লেখা বইকে পর্যন্ত নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে তার লেখা দ্বিখণ্ডিত মুক্তি পেলে, রাজনৈতিক ইগোর জালে আটকা পড়েন এই লেখিকা ও নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে নির্বাসিত হন। 


আমার কাছে দেশ কোনো কাঁটা তারের সীমানা নয়, আমার কাছে দেশ মানে মানুষ, দেশ ভক্তি মানে মানবিকতাকে সম্মান করা। আজ যারা দেশ ভক্তি নিয়ে তর্ক করছে, বড় বড় লেকচার দিচ্ছে, সেদিন তারা কোথায় ছিল যখন লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সাথে অমানবিক আচরণ করা হয়েছিল, তার লেখাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তাকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। হাওয়ার অনুকূলে সবাই কথা বলতে পারে, কথা বলে প্রচারের আলোতে উঠে আসতে পারে খুব সহজেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সবাই করতে পারেনা। এরা কেউ দেশভক্ত নয়, হতে পারেনা। 

২/১০/২০১৬। 
সৌম্যজিৎ।

No comments:

Post a Comment