Friday, 23 October 2015

পপি দিদি 

(জন্ম- ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৯। মৃত্যু- ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯)।

পপি দিদিকে নিয়ে লিখতে গেলে কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছিনা। এখান থেকে শুরু করি, একজন মিষ্টভাষী গায়িকা, একজন মেধাবী ছাত্রী, মমতাময়ী দিদি, বুদ্ধিমতি কিন্তু স্বভাবে বোকা মেয়ে। 

আমার বয়স তখন ৪ বছর, ও তখন ৫। আমি করিমপুর থাকতাম, ও কলকাতার মেয়ে। আমার প্রথম কলকাতা আসা।  হঠাত আমাকে মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে কোলে করে বাসে উঠলো পাপা। আমি, মা, পাপা। গন্তব্য কলকাতা। কলকাতা পৌঁছলাম সকালবেলাই। মনে আছে, আমি আর ও ওদের জানালায় দাড়িয়ে রাস্তা চলতি মানুষদের সাথে কথা বলছিলাম, ও সেটা উপভোগ করছিলাম। কাওকে বলছিলাম, তোমাকে দেখতে শাহরুখ খানের মত, আবার কাওকে সালমান বলছিলাম, তারাও হাসাহাসি করছিল। আমাদের খুব মজা হচ্ছিল।

প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষা শেষ হলে করিমপুর যেতো। আমি সারা বছর ধরে অপেক্ষা করতাম ওর। সময় বাড়ার সাথে সাথে আমাদের দুজনের মধ্যে ভালোবাসাও বাড়তে থাকে। একসাথে বড় হয়ে ওঠা, একসাথে পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করা, আসতে আসতে নিজেদের অত্যন্ত গোপন ও ব্যক্তিগত ব্যাপার গুলো একে অপরের সাথে শেয়ার করে নেওয়া, সবটাই ছিল আমাদের মধ্যে। যেন আমার গোটা পৃথিবীটা জুড়ে শুধুই ও। 

আমি ওর থেকে ছোট ছিলাম, কিন্তু ১ ক্লাস উঁচুতে পড়তাম। তাই আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের মাত্রাটা বেড়ে গেছিল। সাল ২০০২, আমার দাদু মারা যান, সেদিন সন্ধ্যায় উঠোনে বসে আমাকে নানারকম ভূতের গল্প শুনিয়েছিল, সেই প্রথম ভূতের গল্পের প্রতি আমার একটা আকর্ষণ তৈরী হয়, যা আজও যায়নি। এরপর শুরু হলো আমাদের দুজনের বড় হতে থাকা। আমি তখন মাধ্যমিক দিয়েছিলাম, জানতাম রেজাল্ট খারাপ হবে, তবু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, সাইন্স নিয়েই পড়ব, পপি দিদিও আমাকে উত্সাহ দিতে শুরু করে, ব্যাস কলকাতায় এসে প্রথম ওর হাত ধরে কোনো অভিভাবক ছাড়াই কলেজ স্ট্রিট যাওয়া, নিজের পছন্দের মত করে অঙ্ক, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বই কিনলাম। সেদিন আমি খুব খুশি ছিলাম। তারপর সন্ধ্যায় বাড়ির সবাই মিলে মিলেনিয়াম পার্কে ঘুরতে যাওয়া, বাচ্চা বলতে আমি, দিদি, বোন।  বাকি সবাই বড় মানুষ। সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলেনিয়াম পার্কে কতকিছু হয়, সেটা নিশ্চয় তোমাদের বলতে হবেনা। আমাকে পপি দিদি হাত ধরে একটা গাছের আড়ালে নিয়ে গিয়ে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে, ওই দ্যাখ শান্ত, ওরা কি করছে, আমি তাকিয়ে অবাক, দেখি গাছের আড়ালে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে চুমু খাচ্ছে , আমি খুব লজ্জা পেয়েগেলাম। তারপর আরো ভেতরে গিয়ে দেখি, অজস্র ছেলে মেয়ে ওই চুমু খাওয়াখায়ী করছে। বেশ মজা লাগছিল দেখতে, যতই হোক, উঠতি বয়স তখন।
বাড়ি ফেরার সময় ওকে কথা দিয়ে গেলাম, আমি কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কলকাতাতে পড়তে আসবো।  ও আমাকে টাটা করে দিল, আমি মন খারাপ করে চলে গেলাম।

আমি যখন প্রেমে পরি, তখন আমার অবস্থা খুব খারাপ ছিল, মেয়েটা (পায়েল) খুব জ্বালিয়েছে আমাকে, আমি মেয়েটার প্রেমে পরার আগে মেয়েটা আমার প্রেমে পরে, কিন্তু ওই সময় আরো একটা মেয়ে আমার প্রেমে পরেছিল, আর সে তার বন্ধুদের বলেছিল যে মেয়েটা আমাকে ভালবাসে। সেখানে পায়েল কনফিউসড হয়েযায়, ও আমাকে সে নিজের মনের কথা না বলে লুকিয়ে রাখে। এদিকে আমিও পায়েল এর প্রেমে পরেগেছি তখন, আর যখন দেখছি পায়েল আমাকে এড়িয়ে চলছে, যেটা ও ইচ্ছা করে করেছিল, তখন খুব ভেঙ্গে পরি, যদিও আমি একমাত্র আমার দিদিকেই কথাগুলো বলেছিলাম। টানা প্রায় ৪ বছরের কাছাকাছি এমন লুকোচুরি চলেছিল আমাদের মধ্যে। আমার রেজাল্ট তখন যাচ্ছেতাই ভাবে খারাপ হচ্ছিল। কিন্তু পপি দিদি সবসময় আমার পাশে থেকে আমাকে বোঝাত। তারপর যে মেয়েটার জন্য পায়েল নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল আমার থেকে, সেই মেয়েটা ভালবাসা, ধৈর্য আর অপেক্ষার যুদ্ধে হেরে যায়, পিছনে সরতে থাকে। অতদিন লড়াই করার পর, যেদিন পায়েল আমাকে প্রথম প্রপোজ করেছিল, সেদিন পপি দিদি করিমপুরে ছিল, আমি সেই আনন্দেই মেতে ছিলাম, তাই পায়েল এর প্রপোজাল ঠিক মত বুঝতে পারিনি, কিন্তু আমার বোঝা উচিত ছিল, কারণ অতগুলো বছর ধরে আমি আর পায়েল ওই দিনটার অপেক্ষা করছিলাম। যাইহোক, আমি পায়েল কে কোনো উত্তর না দিয়েই চলে আসি। পপি দিদিকে খুলে বলি, কিন্তু যেখানে আমার দিদি আছে, সেখানে আর কোনো আনন্দই আমার কাছে কিছুনা, আমি পপি দিদির সাথেই মেতে থাকি, পায়েল কে এড়িয়ে গিয়ে। তারপর যেদিন পপি দিদি চলে আসলো করিমপুর থেকে, সেদিন আমার খুব মন খারাপ হয়েগেল, আমি ফিজিক্স এর টিউশন পড়তে গেছিলাম, জোরে বৃষ্টি পড়ছিল, আমার পড়া শেষ হতেই আমি সাইকেল নিয়ে ভিজতে ভিজতে পায়েল এর পড়ার জায়গায় চলে যাই, পায়েল আমাকে একবার দ্যাখার জন্য প্রতিদিন ওখানে অপেক্ষা করত, অনেক্ষণ অক্লান্তিতে দাড়িয়ে থাকত। আমি ভিজতে ভিজতে সেখানে গিয়ে রাস্তার ওপর দাড়িয়ে ওকে হাতের ইশারায় ডাকি, ও আসলে বলি, আজ আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, পায়েল আমার চোখ দেখে বুঝেগেছিল, আমি পপি দিদিকে মিস করছি, আমার কষ্ট হচ্ছে। আমাকে বলে আজ বিকেলে আমরা একসাথে দ্যাখা করবো, আমি ওকে জিজ্ঞাসা করি, "তুই, সেদিন আমাকে যেটা বলেছিলিস, সেটা কি সত্যি?"। ও একটু মিষ্টি করে হাসে, বলে বিকেলে আসিস। আমি বললাম, আচ্ছা, আসবো, তারপর আমি চলেযাই। সেদিন বিকেলে আমি ওর সাথে দ্যাখা করেছিলাম, একসাথে আমার শৈশব, কিশোর, ও যুব বয়সটা পায়েল এর সাথে কাটিয়ে দিই।

পপি দিদি পায়েল কে খুব পছন্দ করতো। ওরা বন্ধুর মত হয়েগেছিল, আমাকে যখন ঘর বন্দী করে রাখা হয়, তখন পায়েল আমাকে দ্যাখার জন্য পাগলের মত হয়েগেছিলো, আমিও পাগলের মত হয়েগেছিলাম। পপি দিদি পায়েল এর কাছে আমার মেসেজ নিয়ে যায়, "ওকে বলে ধৈর্য রাখতে, বলেছিল, আমার ভাইয়াকে দেখেরেখো, ওকে তোমার হাতে দিয়েগেলাম।" আমাকে এসে বলে পায়েল তোকে খুব মিস করছে, ও তোকে খুব ভালোবাসে।

তারপর আমি উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলকাতাতে চলে আসলাম, ইংলিশ অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম, আমি খুব খুশি ছিলাম, সবসময় পপি দিদিকে কাছে পেতাম, কিন্তু আমার এই কাছে আসাটা ওকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে, আমি কখনো ভাবতে পারিনি। ও প্রেম করা শুরু করলো, আর সেখানে আমার সক্রিয় ভুমিকা ছিল, আমি ক্রিকেট প্রেমী ছিলাম, ছেলেটা আমার মাথাতে ক্রিকেট এর ভূত ঢুকিয়ে নিজের দলে করে নিয়েছিলো। তারপর ওদের প্রেম বাড়তে থাকে। একটা সময় পায়েল কোনো কারণে আমার ওপর রেগেছিল, আমি ওর রাগ ভাঙ্গাতে করিমপুর চলে যায় , পপি দিদির যাওয়ার কথা ছিল আমার সাথে। আমি ওকে না নিয়েই তারাতারি করে চলে যাই।  গিয়ে পায়েলর হাত দুটো ধরে ওর রাগ ভাঙিয়ে ছিলাম, কিন্তু তারপরের দিন বিশ্বকর্মা পুজোতে শুনতে পাই, আমার দিদির এক্সিডেন্ট হয়েছে, মরে গেছে ও।  সেদিন আমি খুব অন্ধকার দেখছিলাম। প্রেমিকার রাগ ভাঙ্গাতে গিয়ে দিদিকে মেরে ফেললাম? ও কিভাবে মরেছে, কি কি  হয়েছিলো, সেসব অন্য আরেকদিন লিখব। আজ আর লিখতে ভালোলাগছেনা।

No comments:

Post a Comment