ঘুমের দেশে রাত্রি ও রক্ত।
সৌম্যজিত দত্ত
দিনগুলো খুব স্বাভাবিক চলতে থাকে, কোনো রহস্য নেই। কোনো নুতন যোগ বিয়োগের হিসাব খুঁজে পাচ্ছিনা, একদম সাদামাঠা। রোজকার রুটিন, চিন্তা, নিজেকে জায়গায় পৌঁছে দিতে নানারকম পরিকল্পনা, ছক কষাকষি। ব্যাস, এতটুকুই এডভেঞ্চার। অনেক ও বহু ক্ষেত্রে আমার পরিকল্পনা, সাজানো পরিকল্পনা গুলো যথেষ্ট পরিমানে বাস্তবায়িত হয়। অনবরত ম্যান ওয়াচ করি, নিজেকেও ওয়াচ করে চলি প্রতিনিয়ত। প্ল্যান এ, প্ল্যান বি, প্ল্যান সি সবসময় রেডি রাখি, ও পরিস্থিতি গুলো নিজের মত করে সাজিয়ে নিই, এবং সবরকম ছোট বড় সম্ভাবনা গুলোকে মাইক্রোস্কপিক্যালি পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করে চলি। এতে ভুলের পরিমান অনেক কমেগেছে, এবং পরিস্থিতি আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে আসার সফলতাও কিছুটা অর্জন করেছি। অহংকার করে বলছিনা, আমার অনেক বন্ধুই হয়ত লেখাটা পড়বে, যারা আমার এই সাইকোলজিকাল পাওয়ার সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছে। আমার নিজেরও বেশ লাগে ব্যাপারটা। এবার আসল কথায় আসা যাক।
ইদানিংকাল আমি আমার মানসিক অবস্থার কিছু পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। হয়ত কাজের চাপ বাড়ছে বলে, হয়ত অতিরিক্ত চিন্তা ভাবনা বাড়িয়ে তুলছি বলে, হয়ত পর্যাপ্ত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে বলে। যেকোনো কারণ থাকতে পারে আমার এই মানসিক পরিবর্তনের পিছনে। তবে এর ফলস্বরূপ যা ঘটছে, তা অতি ভয়ঙ্কর। যখন ঘুমোচ্ছি, তখন নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখছি। দুঃস্বপ্ন, যেখানে মৃত্যু হচ্ছে, রক্ত ঝরছে। মাঝখানে এমন কিছু স্বপ্ন দেখেছি, যা আমার পুরো মনে নেই, তবে আবছা আবছা মনে আসছে, একদিন দেখলাম, একটা বিশাল রাজপ্রাসাদ, সম্ভবত আমি সেখানকার যুবরাজ, সেখানে অনেক অন্ধ কুটির আছে। হঠাত করে দেখি, পৃথিবীর সমস্ত দেশ গুলো একে অপরের সাথে যুদ্ধ করছে। গুলি, তরবারী কোনকিছু বাদ নেই। কেউ ধ্বংস করতে, কেউ ক্ষমতা অধিকার করতে, কেউ পীড়িত মানুষদের উদ্ধার করতে যুদ্ধ করছে। ইংল্যান্ড, চীন, জাপান, পাকিস্তান সব দেশ আছে সেই যুদ্ধে। হঠাত দেখি, আমি, আমার মা, পাপা, আমাদের প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছি। পালাচ্ছি, লুকোচ্ছি, কখনো তরবারির আঘাতে শত্রুদের ধরে মারছি। লড়াই চলছে সারারাত। সবসময় প্রানের মধ্যে ভয় কাজ করছে, এই মনেহয় মরে যাবো, এই মনেহয় কেউ মেরে দেবে। প্রানের মধ্যে ভয়, মনের মধ্যে বাঁচার চেষ্টায় হিংস্রতা, চোখ গুলো লাল। একসময় দেখি, মা পাপা কেউ নেই। আরও ভয় পেয়ে যাই। পাগলের মত আক্রমন করি, সামনে কে, না দেখেই পশুর মত মারতে থাকি। যেকোনো প্রকারে বেঁচে থাকতে হবে। শরীরে আঘাত লাগতে দেওয়া যাবেনা। সেই মুহূর্ত গুলোতে মনের মধ্যে লড়াই করার ধুর্ততাও তৈরী হচ্ছে। এভাবে বেঁচে থাকার লড়াই লড়তে লড়তে দেখি ভোর হয়ে আসল, আমিও বাঁচার আশা দেখতে পেলাম। যেন সেই প্রাসাদের মধ্যেই একটা তার কাঁটা-তার বর্ডার দেখতে পেলাম, ব্যাস ঐটুকু পার হতে পারলেই প্রাণে বেঁচে যাবো। লাফ দিয়ে পার হতে গিয়ে দেখলাম, আমার মাও ওই একইভাবে নিজের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে। আমি, মা বেঁচে গেলাম, কিন্তু পাপাকে আর খুঁজে পেলামনা, সত্যি তখন সকাল হয়ে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।
একদিন দেখলাম, একটা কালো রঙের বিষাক্ত সাপ আমাকে কামড়ানোর জন্য সবসময় তাড়া করে বেড়াচ্ছে, যেন সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, আমাকে কামড়াবে। আমি প্রানের ভয়ে এদিক ওদিক ছোটা ছুটি করে বেড়াচ্ছি। কপাল ঘেমে যাচ্ছে। ছোবল মারছে আমাকে, কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে বারবার আমাকে আঘাত করতে, আবার তাড়া করছে, আমাকে কামড়াবে। শেষ পর্যন্ত কামরাতে পারেনি, আমার ঘুম ভেঙে যায়।
কাল রাতেও এমনি এক স্বপ্ন দেখেছি। আমাদের তিনজন, মানে আমি, মা, পাপা, এই তিনজনকে কিছু মানুষ খুন করবে বলে হুমকি দিয়েছে। এমন হুমকি, যেন এটাই বিধিলেখা। নানারকম ছল করে প্রথমে মা কে মেরে ফেলল আমার চোখের সামনে, আমি আঁতকে উঠলাম। কিছু সময় পর, ছল করে পাপাকে মেরে ফেলল। আমি খুব ভেঙে পরলাম। তারপর ওরা একের পর এক আমাকে মারার জন্য হামলা করতে থাকল, আমি প্রানের ভয়ে ও প্রাণ বাঁচাতে লড়াই শুরু করলাম। নিজেকে বাঁচাতে একের পর এক সেই মানুষগুলোকে মারতে থাকলাম, যেন আমাকে বাঁচতেই হবে, তাই সেই মানুষগুলোকে মরতেই হবে, নাহলে আমাকে মেরে ফেলবে। একজন একজন করে আমি তাদের মারলাম। সেটা এমন ভাবে যে, তারা আমাকে মারতে এসেছে, আমি তাদের সাথে হিংস্রতার ছল করে, লুকিয়ে থেকে একের পর এক আঘাত করে মেরে ফেলছি। শেষ পর্যন্ত আমাকে আর কেউ মারতে পারলনা, আমি ওদের সবাইকে এক এক করে মেরে ফেললাম। আমার ঘুম ভেঙে গেল।
স্বপ্ন গুলোতে কিছু কমন জিনিস ছিল। সেগুলো হলো, প্রতিটা স্বপ্নে প্রাণ সংশয় হয়েছে, বাঁচার জন্য লড়াই করেছি, কোনো স্বপ্নে আমাকে শেষ অবধি কেউ মারতে পারেনি। প্রথম স্বপ্নে পাপাকে খুঁজে পাইনি। শেষ স্বপ্নে মা, পাপাকে আমার চোখের সামনে নৃশংস ভাবে মেরে ফেলা হয়েছে।
আমি স্বপ্ন গুলো শেয়ার করলাম, কারণ আমি মনেহয় এই স্বপ্ন গুলোর মধ্যে জীবনে লড়াই করার কোনো ইঙ্গিত পাচ্ছি। তোমাদের কাছে এডভেঞ্চার হিসেবে স্বপ্নের গল্পগুলো ভাললাগতে পারে, কিন্তু আমার রাতের ঘুমকে দুঃসহ করে তুলেছে। বেঁচে থাকার লড়াই, ও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা। স্বপ্নের মধ্যে আমি দেখেছি, আমি ভিতু, ভয় পাচ্ছি, বাস্তব জীবনে আমি কখনো ভয় পাবোনা, আমাকে কেউ মারতে চাইলে, তাকে আস্তে আস্তে খুব মিষ্টি ভাষায় জিজ্ঞাসা করবো, আমাকে কেন মারতে চাইছ? আমার জন্য তোমাদের কি অসুবিধা হচ্ছে? আমাকে খুলে বল, কথা বলেও তো সমস্যার সমাধান হয়, তাহলে মারামারির কোনো প্রয়োজন হয়না।

No comments:
Post a Comment