Wednesday, 4 October 2017



এই ছবিটাতে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে লেখক হুমায়ুন আহমেদ তাঁর ভক্তদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। পাশে একটু দূরে দাঁড়িয়ে লেখিকা তসলিমা নাসরিন, কালো রঙের একটা ব্যাগ হাতে অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন এবং লেখক রোকসানা ইয়াসমিন একটা সাদা রঙের ব্যাগ হাতে লেখক হুমায়ুন আহমেদকে তাঁর ভক্তদের অটোগ্রাফ দিতে দেখছেন। এই ছবিটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয় সেদিন একুশে ফেব্রুয়ারি বইমেলাতে তসলিমা নাসরিন ও রোকসানা ইয়াসমিন হুমায়ুন আহমেদের অটোগ্রাফ নিচ্ছেন না। আজ হুমায়ুন আহমেদ বেঁচে নেই। কিন্তু আজও বারেবারে এই অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা চলছে যে সেদিন লেখিকা তসলিমা নাসরিন ও রোকসানা ইয়াসমিন হুমায়ুন আহমেদের অটোগ্রাফ নিচ্ছিলেন মেলাতে।

কিছুদিন আগে এক চরম বাগবিতণ্ডা চলেছে এই ছবির মুহূর্তটা নিয়ে লেখিকা জান্নাতুন নাঈম প্রীতি ও ইত্তিলা রায় ইতুর মধ্যে। আমি বারেবারে জড়িয়ে পড়ি এসবের মধ্যে কারণ একেতে আমি লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে আদর্শ মানি, সত্যিটা জানি এবং লেখিকা প্রীতি ও ইতু উভয়েরই বন্ধু। এই বাগবিতণ্ডার জেরে কখনো লেখিকা প্রীতির সাথে ইতুর সম্পর্ক ছিন্ন হয় আবার কখনো লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সাথে প্রীতির সম্পর্ক ছিন্ন হয় ও প্রীতির মনে হয় লেখিকা তসলিমা নাসরিন অসহনশীল হয়ে উঠেছেন। জান্নাতুন নাঈম প্রীতি বারেবারে এই ছবির মুহূর্ত নিয়ে একটা ভুল মন্তব্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে যে সেদিন তসলিমা নাসরিন ও রোকসানা ইয়াসমিন হুমায়ুন আহমেদের অটোগ্রাফ নিতেই গেছিলেন এবং তসলিমা নাসরিন এই ব্যাপারটা অস্বীকার করছেন। সত্যিটা আমরা এই ছবিতে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি আদতে সেদিন কি হয়েছিল। লেখিকা জান্নাতুন নাঈম প্রীতি আমার খুব ভালো বন্ধু, আমি ওকে ভীষণ স্নেহ করি। আমি ওকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে গেছি যে সেদিন তসলিমা নাসরিন ও রোকসানা ইয়াসমিন হুমায়ুন আহমেদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে, কোথাও একটা যাবে বলে। ওনাদের মধ্যে অটোগ্রাফ আদান প্রদানের কোনো মুহূর্তই আসেনি। কিন্তু প্রীতি নিজের জায়গায় স্থির থাকে। আমি ওকে বলেছিলাম যে আমি একটা ছবি দেখেছিলাম, যে ছবিটা স্পষ্ট করে দেয় সেদিন আদতে কি ঘটেছিল। তারপর থেকে আমি তন্নতন্ন করে খুঁজে গেছি সমস্ত জায়গায় এই ছবিটা। আমার দায় আছে সত্যিটা তুলে ধরার। কারণ আমার বিশ্বাস লেখিকা তসলিমা নাসরিন কখনো কোনো মিথ্যের সাথে আপোষ করেন নি। আমি যদি এই ছবিটা প্রমাণ হিসেবে তুলে না ধরতে পারতাম, আমি নিজেই ছোট হয়ে যেতাম।

প্রীতির মনে হয়েছে যে লেখিকা তসলিমা নাসরিন ইদানীং অতি অসহনশীল হয়ে উঠেছেন। আমি প্রশ্ন করছি, একটা মানুষ তাঁর নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত হয়েছেন, আপনজনহারা হয়েছেন, বাংলার প্রতি প্রবল টানে যখন এই বাংলার রাজ্যে এসে থেকেছেন, তখন সেখান থেকেও নির্বাসিত হয়েছেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্থার শিকার হয়েছেন বারেবারে, কখনো রাজস্থান, কখনো হায়দ্রাবাদ,  কখনো অউরঙ্গবাদে শুধু অপমানিতই হয়েছেন ইসলামি নেতাদের সৌজন্যে ও শাসক গোষ্ঠীর ইসলাম তোষণের প্রভাবে, এতকিছু হয়ে যাওয়ার পরও সেই মানুষটা মানুষের মধ্যে শুধু ভালবাসাই বিলিয়ে দিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, অসহায়দের হয়ে কলম তুলেছে বারেবারে। এরপরও কি বলা যায় যে লেখিকা তসলিমা নাসরিন অতি অসহনশীল হয়ে উঠেছেন? একজন মানুষ কতটা অমানবিক হলে তাকে অতি অসহনশীল বলা হয়? একজন মানুষ কতটা সহ্য করতে পারলে ও তারপরও কতটা নির্বিকার থাকতে পারলে তাকে সহনশীল বলা হয়? যখন লক্ষ লক্ষ সাদা টুপিওয়ালা মানুষ হাতে চাপাতি, লাঠি নিয়ে কোর্ট চত্বরে অপেক্ষা করছিল লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে পেলেই তাঁর শরীর কেটে ছিন্নভিন্ন করবে বলে, মাথায় মেরে মাথাটা মাটিতে ফেলে ফুটবল খেলবে বলে, সেসবের মাঝখান থেকেও তসলিমা নাসরিন কোর্ট চত্বরে হাজিরা দেয়, বেরিয়ে আসে। একজন মানুষের স্নায়ুতে কতটা জোর থাকলে সে এমন পরিস্থিতিকে চোখের সামনে দেখেও, তাঁর নামে অগুন্তি মানুষের গলা ফাটা চিৎকারের তিরস্কার শুনেও জ্ঞান না হারিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে! প্রবল ধ্বস্তাধস্তিতে যখন গায়ের শাড়ি, পায়ের চটি খুলে বেরিয়ে গেছে, তারপরও সেই লেখিকা শুধুমাত্র সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। যখন এয়ারপোর্ট চত্বরে খুনি পুলিশগুলো তাকে প্রায় হুমকির সুরে বলছে এতদিন লেখিকাকে কে বা কারা আশ্রয় দিয়েছে সেসব না বললে খুনি মৌলবাদদের হাতে ছেড়ে দেবে, তারপরও লেখিকা সেইসব আশ্রয় দাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাদের নাম বলে দেয়নি, দেশ থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্তেও নিজের কর্তব্যে স্থির থেকেছেন, সেই মানুষটা অতি অসহনশীল? তসলিমা নাসরিন নামক বিতর্কিত বিষয়টাকে তিরস্কার করলেই মৌলবাদের সমাজে মাথা উঁচিয়ে বেঁচে থাকা ভীষণ সহজ।

তসলিমা নাসরিন কখনো অসহনশীল নয়। তসলিমা নাসরিন মিথ্যেবাদী নয়। বরং মিথ্যে কথা বলেছেন তাঁরা যাদের মুখোশ তসলিমা নাসরিন খুলে দিয়েছেন তাঁর লেখা বইগুলোতে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন পুরুষ লেখক হাজার জন মেয়ের সাথে প্রেম করলেও, বিছানায় শুলেও বা পরকীয়া করলেও তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনা, কারণ সে একজন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষ লেখক। কিন্তু একজন নারী লেখক যদি সেইসব সত্যগুলোকে একেরপর এক তাঁর লেখা বইগুলোতে তুলে ধরতে থাকে, তখন সেই লেখিকা হয় নষ্টা, দুশ্চরিত্রা, পতিতা। কারণ সমাজটা পুরুষতান্ত্রিক। এখানে পুরুষের কোটি গুনাও মাফ, নারী খোঁচা দিলেই সেই নারী হয় বলির পশু। আর যদি সেই নারী হন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন, তাহলে কপালে জোটে নির্বাসন, নিষিদ্ধ অথবা মাথার দাম ঘোষণা। 

No comments:

Post a Comment