জাতিভেদই যখন সভ্যতা,
সমাজ তখন অভিশাপ।
সভ্যতা আমাদের মধ্যে জাতিভেদের মতো একটা মারাত্মক ব্যাধি দিয়েছে। এই ব্যাধিতে জর্জরিত হয়েছে প্রায় সমস্ত চেতনা, প্রায় সমস্ত পরিবার আর তাদের গৌরবান্বিত চোখে প্রকাশ পাওয়া সমস্ত বংশ। জাতিভেদের কারণে নষ্ট হয়েছে পূর্বজ মানুষ চেতনা, নষ্ট হচ্ছে তাদেরই সেই চেতনাকে বহন করা বর্তমান প্রজন্ম। আর যারা চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে জাতিভেদ নামক এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে বেরতে চাইছে, তাদের জোর করে জাতিভেদের ঘেরাটোপে আটকানোর চেষ্টা করে চলেছে অভিভাবক, অভিভাবিকারা, সমাজের গড়া নিয়ম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান সমস্ত জায়গাতেই জাতিভেদের মতো অসম মানুষ নীতি সংবিধানের নীতির মতই ধ্রুব সত্য হয়ে গেছে। বর্ণবিদ্বেষ'এর বিরুদ্ধে অনেকেই লড়াই করেছিলেন, অনেকেই তাদের সেই লড়াইতে সফল হয়েছিলেন এবং সংবিধানের স্তরে বর্ণবিদ্বেষকে আইনত, সংবিধানিক ও জাতীয় অপরাধ বলে মান্যতা দিয়ে গেছেন। বি.আর.আম্বেদকরের লড়াই আমরা ভুলিনি। শৈশব থেকে বর্ণ বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন, অতিরিক্ত মেধা থাকার সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়তেন সমাজে স্বীকৃতি লাভে। পরবর্তীকালে তার হাত ধরেই সমাজ, চেতনা উন্নীত হয়, বর্ণবৈষম্যের পতন ঘটে। বর্ণবৈষম্যের পতন ঘটেছিল, জাতিভেদের পতন ঘটেনি। বরং বহাল তবিয়তে জাতিভেদ প্রথা বংশবিস্তার করেছে, কলঙ্কিত হয়েছে মানুষ। আমি আমার জীবনের কিছু কথা উল্লেখ করছি।
আমি আসন্ন নেট ও গেট পরীক্ষার পরীক্ষার্থী। এই দুটো পরীক্ষা আমাদের দেশে একাডেমিক স্তরে সবথেকে বড় পরীক্ষা। গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার জন্য প্রার্থী নির্বাচন করা হয় এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে। গেট পরীক্ষার ফলাফলে কর্মজীবনে আরও অনেক সুযোগ খুলে যায়। ভারত, বাংলাদেশ, এথিওপিয়া, নেপাল, শ্রিলঙ্কা, আরব আমিরশাহ ও সিঙ্গাপুর এই সাতটা দেশের পরীক্ষার্থীরা মিলে এই পরীক্ষা দেয়। তাই পড়াশোনার সময় ভীষণ সজাগ থেকে প্রতিটা বিষয়বস্তু রপ্ত করতে হয়। একটু ভুল হলেই পরীক্ষায় অনেক পিছিয়ে পড়তে হয়, ও সেখানে সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মূলত এতো আশঙ্কা নিয়ে আমি পড়াশোনা করিনা, তবু উত্তেজনা বশত আমার মধ্যে আশঙ্কা চলেই আসে। আমি মোটামুটি সিলেবাসকে রপ্ত করার চেষ্টা করি, ভাবি সিলেবাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা থাকলে ও অতিরিক্ত অনুশীলনের মাধ্যমে আমি একটা উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারবো। তবে এর জন্য আমাকে মনঃসংযোগ করতে হবে অনেকটাই। আমি আমার মতো করে ভীষণ চেষ্টা করছি একটা স্থান পাওয়ার জন্য। কিন্তু সবকিছু আমার ইচ্ছা মতো হবেনা, আমার মনঃসংযোগ ব্যাহত হচ্ছে। জাতিভেদের যে অভিশাপ সমাজে বংশবিস্তার করেছে, তার আগুনে আমিও জ্বলছি প্রতিটা মুহূর্ত। এখানে বলে রাখি, আমার মধ্যেও ছোট থেকে জাতিভেদের গোঁড়ামি এসেছিল একটা বয়স পর্যন্ত। আমি আমার জাতি ভিন্ন অন্য কোনো জাতির স্পর্শ থেকে নিজেকে সবসময় দূরে রাখার চেষ্টা করতাম, ঘেন্না করতাম। পরে মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের লেখা পড়ে, তার জীবন সম্পর্কে জেনে ও তার আদর্শের পথকে দেখে আমার মধ্যে আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। জাতিভেদের তীব্র নাশকতার সমাপ্তি ঘটে আমার চেতনা থেকে। মানুষ হয়ে আমি জাতিভেদের ঘেরাটোপে মানুষকে আটকাতে পারিনা, আমার কাছে মানুষের পরিচয় সে কেবল "মানুষ"। কিন্তু আমার মধ্যে থেকে জাতিভেদের এই গোঁড়ামি দূর হলেও, দূর হয়নি আমার পরিবার থেকে, আমার মা, বাবার চিন্তাশক্তি থেকে। তারা আমার এই সমস্ত জাতিকে মানুষ ভেবে আপন করে নেওয়াকে সন্তোষজনক দৃষ্টিতে নিতে পারেনি, উল্টে তারা ভেবেছে আমি মুসলিম দ্বারা প্রভাবিত, তসলিমা নাসরিনের লেখা আমাকে বিপথে নিয়ে গেছে। আমি বারংবার তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি, আমি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান কোনো ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত নই, আমি শুধু ধর্মের থেকে মানুষকে আলাদা করে ভাবতে চেয়েছি, তারা ততোই আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছে। আমি তাদের চোখে ক্রমশ খারাপ হয়েছি, তাদের চিন্তাতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারিনি। তারা ভেবেছে আমি সেই স্বার্থপর সন্তানদের মধ্যে একজন যে নিজের আখের গুছিয়ে বাবা, মা'কে অস্বীকার করে বেরিয়ে যাবে একদিন, শুধু সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করছি। তারা ভেবেছে তসলিমা নাসরিনের লেখা আমার মাথা চিবিয়ে খেয়েছে, আমি অমানুষ হয়ে গেছি। আমি তাদের বোঝাতে পারিনি মানুষের পরিচয় শুধু সে একজন মানুষ। তাদের এই ধরনের কথাবার্তা আমাকে ভেঙে দেয় ভীষণ, আবার নিজে নিজেই ভাবি যে আমি পারবো সবকিছু সামলে দিতে, আমি পারবো মানুষ চেতনার উন্মেষ ঘটাতে, আমি পারবো আগামী পরীক্ষাগুলোতে ভালো ফল করতে। যতবারই এভাবে মনের মধ্যে তীব্র জোর আনার চেষ্টা করি, ততবারই আমাকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় জাতিভেদের কথা তুলে।
শিল্পকে, শিল্পীর প্রতিভাকে আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি। কিছুদিন আগে আমার বান্ধবী আমাকে একটা ছবি উপহার দেয়, আমার ও তসলিমা নাসরিনের ছবি এঁকে সেটা একটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে উপহার দেয়। ছবিটা বাড়িতে নিয়ে আসার পর থেকেই সেটা তাদের মনোভাবকে আরও উস্কে দিয়েছিল, ওরা আরও আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠে। ওদের কথা হল তসলিমা নাসরিন একজন মুসলিম, এমন এক মুসলিম যাকে তার পরিবার ত্যাগ করেছে, দেশ ত্যাগ করেছে, পশ্চিম বাংলা বহিষ্কার করেছে, সেই মুসলিম মেয়েমানুষের ছবি এই বাড়িতে থাকবে না। এরপরও আমি ছবিটা এনে আমার ঘরে যত্ন করে রেখে দিই। প্রতিদিন এটার জন্য আমার ওপর অত্যাচার বাড়তে থাকে, আমি ভেবেছিলাম সহ্য করে নেবো, একদিন সবাই ঠিক বুঝবে। হয়ত আমি ভালো রেজাল্ট করলে ওরা ঠিক শান্ত হবে। ইতিমধ্যে ওরা বুঝেছে আমি পড়াশোনা করছি, ভালো রেজাল্ট করার চেষ্টা করছি এই বাংলাতে তসলিমা নাসরিনের নির্বাসন প্রত্যাহারের লড়াই সংগঠিত করতে। আমার মা এসব বোঝার পর আমার পড়াশোনার ঘোর বিরোধিতা শুরু করেছে, আমার পরীক্ষা দেওয়ার ঘোর বিরোধিতা শুরু করেছে। সবসময় "এই মুসলিম মেয়ের ছবি" কথাটা আমাকে খুব যন্ত্রণা দেয়। তসলিমা নাসরিনের পরিচয় সে মুসলিম নয়, তিনি একজন মানুষ, মানবিক মানুষ, যিনি সবসময় মানুষ আদর্শ, মানুষ চেতনা, মানুষ স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছেন। জাতির ঘেরাটোপে একদমই এই মানুষকে আটকানো যায়না। "মুসলিম মেয়েমানুষ" বলে তাকে সবসময় খোঁটা দিয়ে কথা বলা আমাকে এতটা ভেঙে দিয়েছিল যে আমি কিছুক্ষণের জন্য মানসিক নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলি ও আমার বালিশটা অজান্তেই ছুঁড়ে ফেলে দিই। সেই বালিশ গিয়ে লাগে ছবির গায়ে, কাঁচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কাঁচ ভাঙার সাথে সাথে আমি বুঝতে পারি যে একটা খুব বড় অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছি। আমি কেঁদে ফেলি, মাথা নিচু হয়ে যায়, আমি নিজেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাই। সেই মুহূর্তে কাঁচ ভাঙার অপরাধে আমার বাবা এসে আমাকে মারল, কিন্তু সেই মারের আঘাত আমি টের পেলাম না। কারণ তার থেকেও বড় আঘাত পেয়েছি কাঁচ ভেঙে যাওয়াতে। এতকিছু ঘটে যাওয়ার পরও জাতিভেদের নাশকতা তাদের ভিতর থেকে কমেনি একটুও। আমাকে এখনও প্রতিমুহূর্তে খোঁটা দিয়ে যাচ্ছে "মুসলিম মেয়ে মানুষের ছবি ঘরে রেখেছে" এই বলে। আমাকে এটাও বলা হয়েছে যে ছবি নিয়ে আমি যেন বাড়িথেকে বেরিয়ে যাই। আমি চুপ হয়ে গেছি। পড়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু এতই ভেঙে পড়ছি যে পড়তে পারছিনা ঠিক করে।
আগামী নেট ও গেট পরীক্ষা আমার জীবনে এমন একটা প্লাটফর্ম যেখানে সফল হলে আমি আমার একটা ভালো জীবনই শুধু গড়তে পারবো সেটা নয়, আমি আমার আদর্শের লড়াইকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবো, আমার আদর্শকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে শক্তি পাবো। এমন মুহূর্তে জাতিভেদ, হিন্দু - মুসলিম ভেদ আমার মানসিকতার জন্য ভীষণ অস্বাস্থ্যকর। লড়াই ছেড়ে বেরিয়ে যেতে শিখিনি, আর লড়াই করার মতো মানসিক শক্তিও আমি হারিয়ে ফেলছি ক্রমশ। এই জাতিভেদের অভিশাপ আর কলঙ্ক দুঃসহ করে তুলেছে আমার জীবন।
- সৌম্যজিৎ।
No comments:
Post a Comment