আজ ৫ই নভেম্বর সর্বভারতীয় নেট পরীক্ষা ছিল আমার। পরীক্ষা মোটামুটি ভালোই দিয়ে আসলাম। প্রথম ও তৃতীয় পত্রের পরীক্ষা প্রস্তুতি অনুযায়ী যেমন ভালো হওয়ার আশা করেছিলাম, তেমনই হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করলাম দ্বিতীয় পত্রে আমার যে রোগ ছিল, সেটা থেকেই গেল। তুলনায় দ্বিতীয় পত্র খারাপ হয়ে গেল বেশ। আমি দ্বিতীয় পত্রের জন্য অনেক খেটেছিলাম আগেরবার খারাপ হয়েছিল দেখে। ঘরে বসে এবং প্রফেসরদের তত্ত্বাবধানে অনেক অভ্যাস করেছি। এরপরও দ্বিতীয় পত্রে তেমন উন্নতি দেখতে পেলাম না। হয়ত সমস্যাটা মনস্তাত্বিক। সেরে যাবে। আজ পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় অঘটন ঘটল চরম। সকালে সাড়ে ছটায় ঘর থেকে বেরলাম। বাস সিঁথির মোড়ে ঢোকার আগে এক বাইককে ধাক্কা দিল। বাস ড্রাইভারের দোষ ছিল না কোনো। সবুজ আলো দেখেই বাস নির্দিষ্ট গতিতে এগচ্ছিল। হঠাৎই একটা বাইক রাস্তা পার করে বাসকে টেক্কা দিতে গিয়ে বাসের পাশে ধাক্কা লেগে পড়ে যায়। ক্ষতি হয়নি তাতে ওই বাইকের দুজন যাত্রীর। তবে ওরা ঝামেলা শুরু করে। দুজনই বাস দাঁড় করিয়ে হেলমেট খুলে বাসের দরজায় মারতে থাকে ও পরে গাড়ির ভিতরে ঢুকে ড্রাইভারকে মারতে শুরু করে। কেউ ওদের আটকাচ্ছে না দেখে আমি পিছন সিট থেকে উঠে গিয়ে ওই দুজন বাইক আরোহীকে থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকি। ওদের এটাও বলি যে আমার পরীক্ষা আছে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। সেইসময় বাসে আরও অনেক পরীক্ষার্থী ছিল যাত্রীদের সাথে। তারা কেউ এগিয়ে আসেনি। উল্টে বাস থেকে নেমে যাচ্ছে। যাত্রীদের মধ্যে থেকে এক বৃদ্ধা ওই দুই আরোহীকে অনুরোধ করে ড্রাইভারকে ছেরে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ওরা কিছুতেই মানেনা। আমি একজনকে জোরে চেপে ধরি। চেপে ধরে ভালো করেই বলি যা হওয়ার হয়েছে, ড্রাইভারকে না মেরে পুলিশ ডেকে কেস দিয়ে দিতে ও ড্রাইভারকে ছেরে দিতে। সময় প্রায় পনের মিনিট পার হয়ে যায় এসবেই। ওরা আমার কথা মানেনা। বাইরে পুলিশ দাঁড়িয়ে, তারাও এগিয়ে আসেনা। আমাকেই ওরা বলতে থাকে বাস থেকে নেমে গিয়ে অন্য বাস ধরে চলে যেতে। আমি একজনকে চেপে ধরে আটকেছিলাম, কিন্তু অন্যজন ততক্ষণে ড্রাইভারকে মেরে জামা ছিঁড়ে দেয়, ড্রাইভারের পিঠ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। অবশেষে ওখানে একজন অফিসার ইনচার্জ পৌঁছে সবাইকে থামায়। ওই দুই আরোহীসহ ড্রাইভারকে নিয়ে থানাতে যায়। অদ্ভুত সমাজ এটা! প্রথমত বাস ড্রাইভারের কোনো দোষই ছিল না। দোষ ছিল বাইক চালকের। ওরাই সিগ্ন্যাল ভেঙে দুর্ঘটনা ঘটায়। ঘটনা স্থলে পুলিশ থেকেও কোনো হস্তক্ষেপ করেনি কারণ ওই দুই বাইক আরোহী লোকাল ছেলে। ঝামেলা হবে। বাসের যাত্রীরা ইচ্ছা করলে ড্রাইভারকে মারের হাত থেকে বাঁচাতে পারত, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারত। অথচ তারাও চুপ থেকে মজা দেখে। আমি চেষ্টা করলাম, ব্যর্থ চেষ্টা। একজনকে চেপে ধরলাম তো আরেকজন ড্রাইভারকে ভীষণ পেটাল। এর থেকে তো অনেক সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন ওই বৃদ্ধা মানুষটি। উনি নিজের জায়গা থেকে উঠে এসেছিলেন মারামারি থামাতে। কোনো ফল হল না। পুলিশ ওদের ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমিও অন্য বাস ধরে চলে গেলাম। আক্ষেপ থেকে গেল। আমার উচিৎ হয়নি শান্ত থেকে ওই দুই আরোহীকে আটকানোর চেষ্টা করা। আমার উচিৎ ছিল তীব্র প্রতিবাদ করা। কোথাও কি তবে আমিও পিছিয়ে আসলাম না? হ্যাঁ, পিছিয়ে আসলাম। কারণ আমার মাথার মধ্যে তখন শুধু পরীক্ষার চিন্তা ঘুরছিল। আমিও স্বার্থপরের মত থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে পারলাম না। অথচ এই আমিই করিমপুরে থাকতে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে রাতের অন্ধকারে পাশের বাড়িতে যখন ডাকাত পড়েছিল, থানায় ফোন করে পাখি মারা বন্দুক নিয়েই ওই হেঁসো, দাঁ অস্ত্রধারী ডাকাতদের দিকে তাক করে দাঁড়িয়েছিলাম, ডাকাত দলকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়েছিলাম, পাপাকে গর্বিত করেছিলাম। এতটাও স্বার্থপর হলে চলেনা। আমার উচিৎ ছিল তীব্র প্রতিবাদ করা।
No comments:
Post a Comment